স্প্লিট রক বাতিঘর: ভয়াবহ ঝড় ও জাহাজডুবির পর জন্ম নেওয়া আমেরিকার বিখ্যাত বাতিঘর
সিরিজ: ইতিহাসের কিংবদন্তি বাতিঘর
স্প্লিট রক বাতিঘর
স্প্লিট রকের ইতিহাস বোঝার জন্য সুপিরিয়রকে সাধারণ হ্রদ হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। এর বিস্তৃত জলরাশির ওপর প্রবল বাতাস দীর্ঘ পথ ধরে বয়ে ঢেউ তৈরি করতে পারে। উত্তর তীরের অনেক অংশ পাথুরে, খাড়া এবং আশ্রয় নেওয়ার অনুপযোগী। ঝড়ের সঙ্গে তুষারপাত যুক্ত হলে জাহাজ থেকে তীর চেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিপদ ছিল শুধু ঢেউয়ের আঘাতে নয়; দৃশ্যমানতা হারিয়ে শিলাময় উপকূলের অতিরিক্ত কাছে চলে যাওয়াও জাহাজের জন্য মারাত্মক হয়ে উঠত।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে মিনেসোটার লৌহ আকরিক অঞ্চল আমেরিকার ইস্পাতশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খনি থেকে আকরিক রেলপথে বন্দরে পৌঁছাত, তারপর মালবাহী জাহাজে শিল্পাঞ্চলের দিকে যেত। ১৯০১ সালে ইউএস স্টিলের বহরে ১১২টি ইস্পাতের মালবাহী জাহাজ ছিল। পরিবহনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সুপিরিয়রের উত্তর তীরে উন্নত নৌসংকেতের প্রয়োজনও বাড়ছিল। ফলে স্প্লিট রক নির্মাণের পেছনে প্রাণরক্ষার পাশাপাশি শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার অর্থনৈতিক তাগিদও কাজ করেছিল।
১৯০৫ সালের ২৮ নভেম্বরের মাতাফা ঝড় সেই প্রয়োজনকে জরুরি দাবিতে পরিণত করে। সুপিরিয়র হ্রদে ওই দুর্যোগে ২৯টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয় এবং ৩৬ জন প্রাণ হারান। সংখ্যাটি উল্লেখ করার সময় একটি পার্থক্য মনে রাখা দরকার: ২৯টি জাহাজের সবগুলো সম্পূর্ণ ডুবে যায়নি। কোনোটি তীরে আটকে পড়েছিল, কোনোটি ভেঙেছিল, আবার কোনোটি ডুবে গিয়েছিল। একই ঝড়ে এতগুলো জাহাজের বিপর্যয় উত্তর তীরের নৌনিরাপত্তার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়।
বাতিঘরের কাছাকাছি সংঘটিত মাদেইরা জাহাজের দুর্ঘটনা এই দুর্যোগের বিশেষ স্মারক। মাদেইরা ছিল নিজস্ব ইঞ্জিনবিহীন একটি মালবাহী বার্জ, যাকে উইলিয়াম ইডেনবর্ন নামের বাষ্পচালিত জাহাজ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। ঝড়ে টানার সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মাদেইরা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গোল্ড রকের তীরে আঘাত করে ভাঙতে থাকে। নাবিক ফ্রেড বেনসনের সাহসী প্রচেষ্টায় একজন ছাড়া বাকি সবাই রক্ষা পান। এই ঘটনায় দেখা যায়, কম খরচে মাল পরিবহনের ব্যবস্থা দুর্যোগের মধ্যে কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারত।
ঝড়ের পর জাহাজমালিক ও ইস্পাতশিল্পের প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনে নতুন আলোকসংকেত কেন্দ্রের জন্য চাপ দেন। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ ইউএস স্টিলের বহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯০৭ সালে কংগ্রেস বাতিঘর ও কুয়াশার সংকেতব্যবস্থা নির্মাণের জন্য ৭৫ হাজার ডলার বরাদ্দ করে। নির্বাচিত স্থানটি আগে স্টোনি পয়েন্ট নামে পরিচিত ছিল। উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিদের ব্যবহারে স্প্লিট রক নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরও দুর্গম স্থানে নির্মাণের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে হয়েছিল।
নির্বাচিত শিলাপাহাড়টি হ্রদের জলপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩০ ফুট উঁচু। এই উচ্চতা আলোকে দূর থেকে দৃশ্যমান করার সুবিধা দেয় এবং মূল স্থাপনাকে সরাসরি ঢেউয়ের আঘাতের ওপরে রাখে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর সড়ক ছিল না। নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, খাদ্য এবং শ্রমিকদের নৌপথে আনতে হতো। যে পাহাড় বাতিঘরকে কার্যকর অবস্থান দিয়েছিল, সেই পাহাড়ই তার নির্মাণকে কঠিন করে তুলেছিল। নৌকা থেকে সামগ্রী নামানো এবং ওপরের নির্মাণস্থলে পৌঁছানো ছিল পুরো প্রকল্পের কেন্দ্রীয় সমস্যা।
প্রকৌশলী রালফ রাসেল টিংকহ্যাম নকশা, উপকরণের হিসাব এবং নির্মাণ তদারকির দায়িত্ব নেন। ১৯০৯ সালের বসন্তে পাহাড়ের পাশে বাষ্পচালিত উত্তোলনযন্ত্র ও ভার তোলার কাঠামো বসানো হয়। হ্রদের নৌকা থেকে একশ ফুটেরও বেশি ওপরে নির্মাণসামগ্রী তোলা হতো। কাজ চলার সময় প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ জন শ্রমিক সেখানে অবস্থান করতেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩১০ টন সামগ্রী ওপরে তোলা হয়, বড় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই। যোগাযোগহীন স্থানে এই সরবরাহব্যবস্থা চালু রাখাই ছিল উল্লেখযোগ্য প্রকৌশলসাফল্য।
শ্রমিকেরা খোলা পাহাড়চূড়ায় তাঁবুতে থাকতেন। শক্ত শিলায় ভিত্তি তৈরির জন্য বিস্ফোরণের কাজ, রাজমিস্ত্রির নির্মাণ এবং কাঠমিস্ত্রির কাজ সমন্বয় করতে হয়। তীব্র শীতের বিরতি বাদ দিয়ে নির্মাণপর্ব প্রায় তেরো মাস স্থায়ী হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯১০ সালের ৩১ জুলাই প্রথম আলো জ্বলে ওঠে। নির্মিত কেন্দ্রটি শুধু একটি টাওয়ার ছিল না; রক্ষকদের বাসস্থান, জ্বালানি রাখার ভবন এবং কুয়াশার সংকেতভবন মিলিয়ে এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কর্মস্থল হয়ে ওঠে।
স্প্লিট রকের আলোকপ্রযুক্তির মূল ছিল ফ্রান্সে তৈরি তৃতীয় ক্রমের ফ্রেনেল লেন্স। এর বিভিন্ন কাচের অংশ আলোকে প্রতিসরণ ও প্রতিফলনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দিকে কেন্দ্রীভূত করত। ফলে বাতির চারদিকে ছড়িয়ে পড়া আলো শক্তিশালী রশ্মিতে রূপ নিত। প্রথম দিকে এখানে কেরোসিনের বাষ্প ব্যবহারকারী বাতি ছিল। প্রতি দশ সেকেন্ডে একটি আলোর ঝলক ছিল স্প্লিট রকের পরিচিত সংকেত, যার স্বীকৃত দৃশ্যমান দূরত্ব ছিল প্রায় ২২ মাইল। এই নির্দিষ্ট ছন্দ নাবিকদের বাতিঘরটি শনাক্ত করতে সাহায্য করত।
ভারী লেন্স ঘোরানোর ব্যবস্থাটিও ছিল চমকপ্রদ। প্রায় দেড় হাজার পাউন্ড ওজনের লেন্সসমষ্টি তরল পারদের ওপর ভাসমান অবস্থায় ঘুরত, ফলে ঘর্ষণ কমে যেত। ঘড়ির মতো যান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিচে নামতে থাকা ভারের শক্তি লেন্সকে ঘোরাত। রক্ষকদের নিয়মিত সেই ব্যবস্থা পুনরায় প্রস্তুত করতে হতো। এখানে আলো জ্বালিয়ে রাখাই যথেষ্ট ছিল না; বাতির জ্বালানি, কাচের পরিচ্ছন্নতা এবং ঘূর্ণনের গতি ঠিক রাখাও জরুরি ছিল। সংকেতের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করত এসব নিয়মিত কাজের ওপর।
কুয়াশায় আলো আড়াল হয়ে গেলে শব্দসংকেত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। দৃশ্যমানতা প্রায় পাঁচ মাইলের নিচে নামলে রক্ষকেরা কুয়াশার সংকেত চালাতেন। বিশ সেকেন্ডের ব্যবধানে শব্দ দেওয়া হতো, যাতে কাছে আসা জাহাজ তীরের উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক হতে পারে। পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে; ১৯৩৬ সালে দুই স্বরের ডায়াফোন যুক্ত হয়। আলো ও শব্দ ছিল পরস্পরের পরিপূরক সতর্কতা, যদিও কোনো ব্যবস্থাই ঝড়ের মধ্যে জাহাজ পরিচালনার সব বিপদ দূর করতে পারত না।
বাতিঘরের কর্মীদের জীবন ছিল কঠোর শৃঙ্খলানির্ভর। সাধারণত একজন প্রধান রক্ষক ও দুজন সহকারী কেন্দ্র পরিচালনা করতেন। রাতের পাহারা চার ঘণ্টার পালায় ভাগ করা ছিল; দিনে আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতা পর্যবেক্ষণ করতে হতো। যন্ত্র মেরামত, হিসাব রাখা এবং সরবরাহের ব্যবস্থাও তাঁদের দায়িত্বে পড়ত। প্রথম দিকে পরিবারগুলো অনেক সময় শুধু গ্রীষ্মে স্বল্প সময়ের জন্য আসত। মে থেকে ডিসেম্বরের নৌপরিবহন মৌসুম শেষে কেন্দ্রের শীতকালীন বিরতিতে রক্ষকেরা পরিবারের সঙ্গে যোগ দিতেন।
প্রথম প্রধান রক্ষক অরেন ‘পিট’ ইয়াং ১৯১০ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনের মধ্যেই কেন্দ্রের বিচ্ছিন্নতা কমতে শুরু করে। ১৯১৫–১৬ সালে সরবরাহ ওপরে তোলার জন্য ঢালু পথে মালবাহী ট্রামব্যবস্থা তৈরি হয়। এরপর ১৯২৪ সালে উপকূলীয় মহাসড়ক পৌঁছালে স্থলপথে যাতায়াত সম্ভব হয়। এতে কর্মী ও পরিবারের জীবন সহজ হয়, পাশাপাশি পর্যটকের আগমন বাড়ে। নৌযানের পথপ্রদর্শক স্থাপনাটি ক্রমে স্থলভ্রমণকারীদের আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়।
১৯৩৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাতিঘর পরিষেবা কোস্ট গার্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়। পরের বছর স্প্লিট রকে বিদ্যুৎ আসে এবং কেরোসিনবাতির বদলে এক হাজার ওয়াটের বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহৃত হয়। পরে রাডার ও অন্যান্য নৌপরিচালনা প্রযুক্তির প্রসারে পুরোনো সংকেতকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমে। ১৯৬১ সালে কুয়াশার সংকেত বন্ধ হয়; ১৯৬৯ সালে বাতিঘরটি আনুষ্ঠানিক নৌসংকেত পরিষেবা থেকে অবসর নেয়। প্রায় ছয় দশকের কার্যক্রম শেষে তার গুরুত্ব ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের দিকে সরে যায়।
মিনেসোটা রাজ্য ১৯৭১ সালে স্থানটি অধিগ্রহণ করে এবং ১৯৭৬ সালে ঐতিহাসিক কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব মিনেসোটা হিস্টোরিক্যাল সোসাইটিকে দেয়। স্থাপনাগুলোকে বিশের দশকের চেহারায় সংরক্ষণ করা হয়েছে; ২০১১ সালে এটি জাতীয় ঐতিহাসিক স্থাপনার স্বীকৃতি পায়। এখানে এডমন্ড ফিটজেরাল্ডের ১৯৭৫ সালের জাহাজডুবিও স্মরণ করা হয়। সেই আলাদা দুর্ঘটনায় নিহত ২৯ জন নাবিকের সম্মানে নভেম্বরের দশ তারিখে আলো জ্বালানোর প্রথা রয়েছে। স্প্লিট রক তাই নির্মাণকৌশল, নৌবাণিজ্য এবং জলপথে হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি—তিনটিরই সাক্ষ্য বহন করে।
পেনা প্রাসাদ: পর্তুগালের পাহাড়চূড়ায় রঙিন রোমান্টিক স্থাপত্যের রূপকথার রাজপ্রাসাদ
করভিন ক্যাসেল: ট্রান্সিলভানিয়ার গথিক দুর্গ, বন্দিত্ব ও ড্রাকুলার অন্ধকার কিংবদন্তি
পেলেশ ক্যাসেল: আধুনিক প্রযুক্তি ও রাজকীয় বিলাসিতায় নির্মিত রোমানিয়ার অপূর্ব প্রাসাদ
তুর্কমেনিস্তানের ‘ডোর টু হেল’: দারভাজা আগুনের গর্তের আসল ইতিহাস
রাশিয়ার ওয়মিয়াকনে মানুষ কীভাবে বাঁচে? পৃথিবীর শীতলতম জনবসতিগুলোর একটির জীবন
পৃথিবীর কোথায় কয়েক মাস সূর্য অস্ত যায় না? মধ্যরাতের সূর্যের বিজ্ঞান