বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভারতের স্বাধীনতা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাঙন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান

সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার

ভারতের স্বাধীনতা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাঙন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান
ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাঙনের সূচনা

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিজয়ী পক্ষের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল। মানচিত্রে তখনো ভারত, বার্মা, মালয়, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড এবং অসংখ্য দ্বীপ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এই দৃশ্যমান বিশালতার আড়ালে সাম্রাজ্য মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধ ব্রিটেনের অর্থনীতি নিঃশেষ করেছিল, উপনিবেশের জনগণের রাজনৈতিক প্রত্যাশা বদলে দিয়েছিল এবং ইউরোপীয়দের স্বাভাবিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা ভেঙে দিয়েছিল। যুদ্ধের মাত্র দুই বছরের মধ্যে ভারতের স্বাধীনতা প্রমাণ করে যে ব্রিটেন আর আগের মতো শক্তি প্রয়োগ করে সাম্রাজ্য ধরে রাখতে সক্ষম নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন শক্তিশালী ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সীমিত রাজনৈতিক সংস্কার, রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং ব্রিটিশ অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে গণআন্দোলনে রূপ দেয়। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন ও লবণ সত্যাগ্রহ ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানায়, আর মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও পৃথক রাষ্ট্রের দাবি ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পর ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই ব্রিটিশ সরকার ভারতকেও যুদ্ধে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রতিবাদে কংগ্রেসের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাগুলো পদত্যাগ করে। মুসলিম লীগ এই সুযোগে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করে এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর জন্য পৃথক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি তোলে। ফলে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের পাশাপাশি ভারতের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে।

যুদ্ধের সময় ভারত ব্রিটিশ সামরিক শক্তির প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়। প্রায় পঁচিশ লক্ষ ভারতীয় সৈন্য স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, যা তখন ইতিহাসের বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীগুলোর একটি ছিল। ভারতীয় সৈন্যরা উত্তর আফ্রিকা, ইতালি, মধ্যপ্রাচ্য, মালয় ও বার্মার রণাঙ্গলে যুদ্ধ করে। ভারত থেকে খাদ্য, বস্ত্র, অর্থ ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এই বিপুল অবদানের বিনিময়ে স্বাধীনতার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে ব্রিটিশ সরকার অনিচ্ছুক ছিল। যুদ্ধের নামে জরুরি আইন, সংবাদ নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার এবং অর্থনৈতিক শোষণ আরও বৃদ্ধি পায়।

১৯৪২ সালে জাপানি বাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করে এবং দ্রুত বার্মা অতিক্রম করে ভারতের পূর্ব সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়। সিঙ্গাপুরকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে মনে করা হতো; তার দ্রুত পতন এশিয়ায় ইউরোপীয় অজেয়তার ধারণা ধ্বংস করে। ভারতীয়রা দেখল যে একটি এশীয় শক্তি ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করতে পারে। ব্রিটেনের পক্ষে ভারত রক্ষা করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও দেখা দেয়। সিঙ্গাপুরের পতন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামরিক মর্যাদায় এমন আঘাত করেছিল, যা স্বাধীনতার দাবিকে আরও শক্তিশালী করে।

একই বছর ব্রিটিশ সরকার স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতে পাঠায়। যুদ্ধ শেষে ভারতকে ডোমিনিয়ন মর্যাদা দেওয়ার অস্পষ্ট প্রস্তাব করা হলেও তাৎক্ষণিক ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। কংগ্রেস এই প্রস্তাব মেনে নেয়নি। আগস্টে মহাত্মা গান্ধী “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনের ডাক দেন। কংগ্রেসের প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলন থামেনি। বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘট, বিক্ষোভ, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা এবং সমান্তরাল প্রশাসন গঠনের চেষ্টা চলে। ব্রিটিশ সরকার গুলি, গণগ্রেপ্তার ও কঠোর দমননীতির মাধ্যমে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করে।

১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ক্ষোভ আরও গভীর করে। যুদ্ধকালীন মূল্যবৃদ্ধি, চালের বাজারে অস্থিরতা, পরিবহন সংকট, মজুতদারি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সরকারের অগ্রাধিকারের ফলে খাদ্যের প্রবেশাধিকার ভেঙে পড়ে। প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ অনাহার ও রোগে মারা যায় বলে বহুলভাবে অনুমান করা হয়। খাদ্য থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা বাঁচতে পারেনি। দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ঔপনিবেশিক সরকারের বিলম্ব ও উদাসীনতা তার নৈতিক বৈধতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেন সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের হাতে বন্দী ভারতীয় সৈন্য ও প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠন করেন। এই বাহিনী জাপানি সেনাদের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অগ্রসর হলেও ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধে পরাজিত হয়। সামরিকভাবে অভিযান ব্যর্থ হলেও যুদ্ধ শেষে আজাদ হিন্দ ফৌজের কর্মকর্তাদের বিচার ভারতজুড়ে প্রবল জনসমর্থন সৃষ্টি করে। কংগ্রেসপন্থী, মুসলিম লীগপন্থী ও অন্যান্য রাজনৈতিক মতের মানুষও অভিযুক্তদের সমর্থনে একত্রিত হয়।

১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বোম্বাই থেকে শুরু হওয়া রয়্যাল ইন্ডিয়ান নৌবিদ্রোহ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে আরও উদ্বিগ্ন করে। নিম্নমানের খাবার, বর্ণবাদী আচরণ ও কঠোর শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে নাবিকদের প্রতিবাদ দ্রুত বহু জাহাজ ও নৌঘাঁটিতে ছড়িয়ে পড়ে। বোম্বাইয়ে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ তাদের সমর্থনে ধর্মঘট করে। রাজনৈতিক নেতাদের আহ্বানে বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করলেও ঘটনাটি দেখায় যে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আনুগত্য আর নিশ্চিত নয়। যে সেনা ও নৌবাহিনীর ওপর ব্রিটিশ শাসন দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের মধ্যেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়া সাম্রাজ্যের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা ছিল।

যুদ্ধ শেষে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। জার্মান বোমাবর্ষণে শহর ও শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, বৈদেশিক ঋণ বেড়েছিল এবং দেশটি খাদ্য ও কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কাছে বিপুল ঋণ ছিল। ভারতীয় সরকারও যুদ্ধের সময় ব্রিটেনের হয়ে বিপুল ব্যয় বহন করেছিল, ফলে ব্রিটেন ভারতের কাছে বড় অঙ্কের দেনায় পড়ে। লক্ষাধিক সৈন্য রেখে ভারত শাসন করা অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ জনগণও যুদ্ধের পর সাম্রাজ্য রক্ষার চেয়ে বাসস্থান, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পুনর্গঠনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

১৯৪৫ সালের নির্বাচনে উইনস্টন চার্চিলের রক্ষণশীল দল পরাজিত হয় এবং ক্লেমেন্ট অ্যাটলির নেতৃত্বে শ্রমিক দল ক্ষমতায় আসে। নতুন সরকার ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে আগের সরকারের তুলনায় বাস্তববাদী ছিল। অ্যাটলি বুঝেছিলেন, ভারতীয় জনগণের সম্মতি ছাড়া দীর্ঘকাল শাসন চালিয়ে যেতে হলে বিপুল অর্থ ও সেনাশক্তি প্রয়োজন হবে—যা যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের নেই। আন্তর্জাতিক পরিবেশও বদলে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পুরোনো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যব্যবস্থার প্রতি সন্দিহান ছিল এবং জাতিসংঘের সনদে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি গুরুত্ব পাচ্ছিল।

১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ভারতে এসে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সঙ্গে আলোচনা করে। তাদের পরিকল্পনায় একটি শিথিল ভারতীয় সংঘ গঠনের প্রস্তাব ছিল, যেখানে প্রদেশগুলো তিনটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত থাকবে। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রেখে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা, প্রাদেশিক গোষ্ঠীবিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ সংবিধান নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়।

মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। ১৯৪৬ সালের আগস্টে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পর কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। পরে নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাব এবং অন্যান্য অঞ্চলে হিন্দু, মুসলমান ও শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসন ক্রমে নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সহযোগিতাও কার্যকর হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে ১৯৪৮ সালের জুনের মধ্যে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হবে। নতুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতে এসে দেখেন, রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এগিয়ে এনে ১৯৪৭ সালের আগস্ট নির্ধারণ করেন। কংগ্রেস নেতৃত্ব অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেশভাগ মেনে নেয়, কারণ তারা দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও দুর্বল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের আশঙ্কা করছিল। মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন করে।

ব্রিটিশ সংসদে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাস হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ আধিপত্যের অবসান ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে আসে বিভাজনের বিপর্যয়। পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করা হয় এবং তাড়াহুড়ো করে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। নতুন সীমান্তের ভুল পাশে পড়ে যাওয়ার ভয়ে কোটি কোটি হিন্দু, মুসলমান ও শিখ ঘরবাড়ি ছেড়ে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়।

এই জনস্থানান্তর আধুনিক ইতিহাসের বৃহত্তম ও সবচেয়ে রক্তাক্ত উদ্বাস্তু সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়। শরণার্থীবাহী ট্রেন ও কাফেলায় হামলা, গ্রাম ধ্বংস, নারী অপহরণ এবং প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক লক্ষ থেকে দশ লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে বলে বিভিন্ন অনুমানে উল্লেখ করা হয়। প্রায় দেড় কোটি মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে। ভারতের স্বাধীনতা ছিল ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির ঐতিহাসিক বিজয়, কিন্তু দেশভাগ সেই বিজয়কে গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

ভারতের স্বাধীনতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য শুধু একটি বড় উপনিবেশ হারানো ছিল না। ভারতীয় রাজস্ব, সৈন্য, বন্দর, বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থান এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ শক্তির ভিত্তি ছিল। ভারত হারানোর পর সুয়েজ থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত সাম্রাজ্যিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পুরোনো যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা অন্যান্য জনগণও বুঝতে পারে যে সংগঠিত আন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ ও ব্রিটেনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।

১৯৪৮ সালে বার্মা ও সিলন স্বাধীন হয়। একই বছরে ব্রিটেন ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেট ত্যাগ করে। মালয়ে ব্রিটিশরা আরও কিছুদিন সামরিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলেও স্বাধীনতার দাবি আর উপেক্ষা করা যায়নি। আফ্রিকায় ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দ্রুত শক্তিশালী হয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট দেখিয়ে দেয় যে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া স্বাধীনভাবে বৃহৎ সাম্রাজ্যিক অভিযান চালাতে পারছে না। পরবর্তী দুই দশকে আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও এশিয়ার অধিকাংশ ব্রিটিশ উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

স্বাধীনতার পরও সাবেক উপনিবেশগুলোর অনেকটি কমনওয়েলথের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ব্রিটেন সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্বের বদলে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক সীমান্ত, বিভক্ত সমাজ, রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি এবং অসম প্রশাসনিক কাঠামোর উত্তরাধিকার বহন করতে বাধ্য হয়। ভাষা, আইন, শিক্ষা ও রেলপথের মতো ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও সেগুলো যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে নির্মিত হয়েছিল, তার প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

ভারতের স্বাধীনতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের একমাত্র কারণ ছিল না, কিন্তু এটি সেই পতনের নির্ণায়ক মোড়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটেনকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করেছিল, জাপানি বিজয় ইউরোপীয় অজেয়তার ধারণা ভেঙেছিল এবং ভারতীয় আন্দোলন ঔপনিবেশিক শাসনকে রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে অচল করে দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের জন্মের পর সাম্রাজ্যের বাকি অংশ ধরে রাখার যুক্তি দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। যে সাম্রাজ্য একসময় পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ শাসন করেছিল, ভারতের স্বাধীনতার পর সেটিই কয়েক দশকের মধ্যে প্রধানত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর একটি স্বেচ্ছাসংঘে রূপান্তরিত হয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে