থমাস পেইনের ‘কমন সেন্স’ ও স্বাধীনতার ঘোষণা: ৪ জুলাই ১৭৭৬-এ নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নের জন্ম
সিরিজ: আমেরিকান বিপ্লব: স্বাধীনতার সংগ্রাম ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম
‘কমন সেন্স’ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণার পথে
১৭৭৫ সালের বসন্তে লেক্সিংটন ও কনকর্ডে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরও অধিকাংশ আমেরিকান উপনিবেশবাসী সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেনি। কন্টিনেন্টাল আর্মি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, বোস্টন অবরুদ্ধ ছিল এবং বাঙ্কার হিলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও ঘটে গেছে—তারপরও অনেকের আশা ছিল রাজা তৃতীয় জর্জের সঙ্গে কোনোভাবে সমঝোতা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভেতরেই উপনিবেশগুলোর অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। মাত্র এক বছরের মধ্যে সেই অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এই পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে ওঠেন তুলনামূলকভাবে নতুন এক অভিবাসী লেখক—থমাস পেইন।
পেইন ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন ১৭৭৪ সালের শেষদিকে। তাঁর পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক খ্যাতি বা ধনী উপনিবেশিক পরিবারের প্রভাব ছিল না। কিন্তু তিনি এমন এক সময়ে পৌঁছেছিলেন যখন আমেরিকার রাজনৈতিক সমাজ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল প্রবল, যুদ্ধও শুরু হয়ে গেছে, অথচ প্রশ্নটির স্পষ্ট উত্তর তখনও পাওয়া যাচ্ছিল না—এই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী?
১৭৭৫ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস অলিভ ব্রাঞ্চ পিটিশন পাঠিয়ে রাজা তৃতীয় জর্জের কাছে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রাজা উপনিবেশগুলোকে বিদ্রোহের অবস্থায় রয়েছে বলে ঘোষণা করেন এবং ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহ দমনে আরও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নিতে থাকে। ব্রিটিশদের বিদেশি, বিশেষত জার্মান রাজ্যগুলোর সৈন্য ব্যবহারের পরিকল্পনার খবরও আমেরিকানদের ক্ষুব্ধ করে। ফলে রাজাকে পার্লামেন্টের ভুল নীতি থেকে আলাদা করে একজন সম্ভাব্য রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখার ধারণা দ্রুত দুর্বল হতে থাকে।
এই রাজনৈতিক মুহূর্তে ১৭৭৬ সালের ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় পেইনের ছোট পুস্তিকা ‘কমন সেন্স’। বইটির লেখকের নাম প্রথম সংস্করণে প্রকাশ করা হয়নি; লেখা হয়েছিল এটি “একজন ইংরেজের” রচনা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পুস্তিকাটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এর বিক্রির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এতে সন্দেহ নেই যে জনসংখ্যার তুলনায় এর প্রচার ছিল বিপুল এবং এর ধারণাগুলো সংবাদপত্র, পুনর্মুদ্রণ ও জনআলোচনার মাধ্যমে আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়েছিল।
পেইনের শক্তি ছিল জটিল সাংবিধানিক বিতর্ককে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতায়। তিনি শুধু দাবি করেননি যে ব্রিটিশ সরকার কিছু ভুল আইন করেছে। তিনি আরও মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন—আমেরিকাকে আদৌ কেন একটি দূরবর্তী দ্বীপের রাজতন্ত্র শাসন করবে? তাঁর যুক্তিতে উত্তরাধিকারসূত্রে রাজত্ব করার ধারণাই ছিল অযৌক্তিক। একটি পরিবার জন্মগতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর শাসনের অধিকার পাবে কেন—এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি সরাসরি রাজতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিকে আক্রমণ করেন।
এটি ছিল আগের অনেক উপনিবেশিক যুক্তির তুলনায় বিপ্লবী পরিবর্তন। স্ট্যাম্প অ্যাক্ট বা টাউনশেন্ড অ্যাক্টের সময় আন্দোলনকারীরা সাধারণত নিজেদের ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে অধিকার দাবি করেছিল। পেইন সেই কাঠামোটিকেই উল্টে দিলেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল—সমস্যাটি শুধু ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কয়েকটি অন্যায় আইন নয়; সমস্যাটি এমন একটি রাজনৈতিক সম্পর্ক, যেখানে একটি বিশাল মহাদেশকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অধীন রাখা হয়েছে।
পেইন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যুক্তিও তুলে ধরেন। ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক আমেরিকাকে ইউরোপীয় যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে রাখছে বলে তিনি যুক্তি দেন। স্বাধীন হলে আমেরিকা অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী বাণিজ্য করতে পারবে। তিনি একটি বৃহৎ মহাদেশের ভবিষ্যৎকে একটি দ্বীপের রাজনৈতিক স্বার্থের অধীন রাখাকে অস্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করেন। স্বাধীনতা তাঁর লেখায় শুধু প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপ নয়, আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির বাস্তব পথ হিসেবেও হাজির হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ‘কমন সেন্স’ স্বাধীনতাকে কল্পনাযোগ্য করে তুলেছিল। এর আগে স্বাধীনতার কথা বলা অনেকের কাছে বিপজ্জনক চরমপন্থা ছিল। পেইন যুক্তি দিলেন, ব্রিটেনের সঙ্গে পুনর্মিলনই বরং অবাস্তব। যুদ্ধের রক্তপাতের পর পুরোনো সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেও একই ধরনের সংকট আবার ফিরে আসতে পারে। তাই সাময়িক সমঝোতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিচ্ছেদই স্থায়ী সমাধান।
পেইনের পুস্তিকা একা আমেরিকানদের স্বাধীনতার পক্ষে নিয়ে যায়নি। যুদ্ধ, ব্রিটিশ সামরিক পদক্ষেপ, বন্দর অবরোধ, রাজনৈতিক দমন এবং রাজা তৃতীয় জর্জের কঠোর অবস্থান ইতিমধ্যে জনমত বদলাচ্ছিল। কিন্তু ‘কমন সেন্স’ সেই বিচ্ছিন্ন ক্ষোভগুলোকে একটি সহজ, শক্তিশালী এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক লক্ষ্যে যুক্ত করেছিল—স্বাধীন প্রজাতন্ত্র। স্বাধীনতা আর শুধু ব্রিটিশ শাসন থেকে পালানোর ধারণা নয়; নতুন ধরনের সরকার গড়ার সম্ভাবনা হয়ে ওঠে।
১৭৭৬ সালের বসন্তে বিভিন্ন উপনিবেশ নিজেদের প্রতিনিধিদের স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেওয়ার অনুমতি দিতে শুরু করে। রাজনৈতিক গতি এত দ্রুত বদলাচ্ছিল যে কয়েক মাস আগেও যে দাবি অত্যন্ত চরম বলে মনে হতো, সেটিই এখন কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ১৫ মে ১৭৭৬ কংগ্রেস উপনিবেশগুলোকে এমন সরকার প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেয়, যা জনগণের কর্তৃত্ব থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করবে—পুরোনো রাজকীয় শাসনব্যবস্থা ভাঙার ক্ষেত্রে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এরপর আসে নির্ধারক মুহূর্ত। ৭ জুন ১৭৭৬ ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি রিচার্ড হেনরি লি কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করেন যে এই যুক্ত উপনিবেশগুলো স্বাধীন ও মুক্ত রাষ্ট্র এবং ব্রিটিশ রাজমুকুটের প্রতি তাদের সমস্ত আনুগত্যের সম্পর্ক শেষ হওয়া উচিত। এটিই ইতিহাসে লি রেজোলিউশন নামে পরিচিত। কিন্তু সব প্রতিনিধি তখনও স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেওয়ার নির্দেশ পাননি। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া হয়।
এই বিরতির মধ্যেই কংগ্রেস সম্ভাব্য স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করার জন্য একটি ঘোষণাপত্র তৈরির দায়িত্ব দেয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিকে। থমাস জেফারসন, জন অ্যাডামস, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, রজার শেরম্যান ও রবার্ট আর. লিভিংস্টন ছিলেন সেই কমিটির সদস্য। ঘোষণার প্রথম খসড়া তৈরির প্রধান দায়িত্ব পড়ে ভার্জিনিয়ার তরুণ প্রতিনিধি থমাস জেফারসনের ওপর।
জেফারসন সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক দর্শন আবিষ্কার করেননি। তাঁর ভাষায় আলোকায়ন যুগের প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি এবং জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে সরকারের বৈধতার ধারণা প্রতিফলিত হয়। একই সঙ্গে আমেরিকান উপনিবেশগুলোর বহু বছরের রাজনৈতিক যুক্তিও এতে স্থান পায়। কিন্তু তিনি এসব ধারণাকে এমন শক্তিশালী ভাষায় একত্র করেন, যা পরবর্তীকালে শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের বহু রাজনৈতিক আন্দোলনের ভাষায় প্রবেশ করবে।
ঘোষণার সবচেয়ে বিখ্যাত অংশে বলা হয়, সব মানুষ সমভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে—জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অনুসন্ধান তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সরকার এসব অধিকার রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত এবং তার বৈধ ক্ষমতা আসে শাসিত মানুষের সম্মতি থেকে। কোনো সরকার যদি এই উদ্দেশ্য ধ্বংস করে, জনগণের সেই সরকার পরিবর্তন বা বিলুপ্ত করার অধিকার রয়েছে। এই যুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন থেকে বিচ্ছেদকে শুধু রাজনৈতিক সুবিধার সিদ্ধান্ত নয়, প্রাকৃতিক অধিকারের ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু এই উচ্চ আদর্শের সঙ্গে ১৭৭৬ সালের আমেরিকান বাস্তবতার গভীর বৈপরীত্য ছিল। দাসপ্রথা তখনও বিদ্যমান ছিল এবং ঘোষণার প্রধান লেখক জেফারসন নিজেও দাসমালিক ছিলেন। নারীরা সমান রাজনৈতিক অধিকার পায়নি, অধিকাংশ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী নতুন রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সমান অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়নি এবং ভোটাধিকারও সর্বজনীন ছিল না। জেফারসনের খসড়ায় দাসবাণিজ্য নিয়ে রাজা তৃতীয় জর্জকে আক্রমণ করা একটি অংশ ছিল, কিন্তু কংগ্রেসের সংশোধনের সময় সেটি বাদ দেওয়া হয়।
এই বৈপরীত্য স্বাধীনতার ঘোষণাকে গুরুত্বহীন করে না; বরং এর ইতিহাসকে আরও জটিল করে। যে সমাজ “সব মানুষ সমভাবে সৃষ্টি হয়েছে” ঘোষণা করেছিল, সেই সমাজই সেই নীতিকে বাস্তবে সবার জন্য প্রয়োগ করেনি। পরবর্তী প্রজন্মের দাসপ্রথাবিরোধী কর্মী, নারী অধিকার আন্দোলনকারী এবং নাগরিক অধিকার নেতারা ঠিক এই ঘোষিত আদর্শকেই ব্যবহার করে আমেরিকাকে তার নিজের প্রতিশ্রুতির মুখোমুখি দাঁড় করাবেন।
জুনের শেষদিকে কংগ্রেসে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন দ্রুত বাড়তে থাকে। ১ জুলাই লি প্রস্তাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। পরদিন, ২ জুলাই ১৭৭৬, কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস স্বাধীনতার মূল প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই কারণেই জন অ্যাডামস ধারণা করেছিলেন ২ জুলাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মহান বার্ষিকী হয়ে উঠবে। রাজনৈতিক অর্থে সেদিনই উপনিবেশগুলো ব্রিটেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
কিন্তু যে তারিখটি ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায় সেটি ৪ জুলাই ১৭৭৬। ২ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত কংগ্রেস জেফারসনের খসড়া নিয়ে আলোচনা ও সংশোধন করে। কিছু বাক্য পরিবর্তন করা হয়, কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণার চূড়ান্ত পাঠ অনুমোদিত হয়। এ কারণেই ঘোষণাপত্রে ৪ জুলাই তারিখ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে এই দিনটিই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, ৪ জুলাই সব প্রতিনিধি একত্র হয়ে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। বাস্তবে ঘটনাটি এত সরল ছিল না। ৪ জুলাই ছিল ঘোষণার পাঠ গ্রহণের দিন; বিখ্যাত পার্চমেন্ট কপিতে অধিকাংশ প্রতিনিধির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর পরে, প্রধানত ২ আগস্ট থেকে, যুক্ত হয়। ফলে পরবর্তী শিল্পকর্মে দেখা নাটকীয় সমবেত স্বাক্ষরের দৃশ্যকে ৪ জুলাইয়ের একটি একক মুহূর্ত হিসেবে দেখা ঐতিহাসিকভাবে বিভ্রান্তিকর।
ঘোষণাপত্রের একটি বড় অংশ ছিল রাজা তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা। আইনসভায় হস্তক্ষেপ, বিচারব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ, স্থায়ী সেনাবাহিনী, বাণিজ্যে বাধা, সম্মতি ছাড়া কর এবং উপনিবেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে কংগ্রেস দেখাতে চেয়েছিল যে বিচ্ছেদ কোনো হঠাৎ আবেগের সিদ্ধান্ত নয়। ঘোষণাটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক দর্শনের বিবৃতি, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে স্বাধীনতার যুক্তি।
আন্তর্জাতিক দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্বাধীনতা ঘোষণা না করলে উপনিবেশগুলোর পক্ষে ফ্রান্সের মতো ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গড়া কঠিন ছিল। বিদ্রোহী ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে সাহায্য চাওয়া এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কূটনৈতিক সম্পর্ক চাওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল। ফলে স্বাধীনতার ঘোষণা আমেরিকান বিপ্লবকে একটি অভ্যন্তরীণ ব্রিটিশ বিদ্রোহ থেকে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রবেশের সংগ্রামে রূপান্তরিত করে।
তবে ৪ জুলাই ঘোষণা গ্রহণ করলেই স্বাধীনতা বাস্তবে নিশ্চিত হয়ে যায়নি। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তখনও অত্যন্ত শক্তিশালী, কন্টিনেন্টাল আর্মি নানা সংকটে জর্জরিত এবং যুদ্ধের ফল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ছিল। নিউইয়র্কে বিশাল ব্রিটিশ বাহিনী সমবেত হচ্ছিল। নতুন ঘোষিত রাষ্ট্রের কাছে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার, পর্যাপ্ত অর্থ বা স্থিতিশীল সেনাবাহিনী—কোনোটিই নিশ্চিত ছিল না। ১৭৭৬ সালের জুলাইয়ে স্বাধীনতা ছিল অর্জিত বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।
এই কারণেই থমাস পেইনের ‘কমন সেন্স’ এবং স্বাধীনতার ঘোষণাকে একই ঐতিহাসিক ধারায় দেখা গুরুত্বপূর্ণ। পেইন সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন—কেন স্বাধীনতা নয়? জেফারসনের ঘোষণাপত্র এবং কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস সেই প্রশ্নকে রাষ্ট্রনৈতিক ভাষায় উত্তর দিয়েছিল—কারণ বৈধ সরকার জনগণের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, এবং যে সরকার মানুষের মৌলিক অধিকার ধ্বংস করে তার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার অধিকার জনগণের রয়েছে।
৪ জুলাই ১৭৭৬-এ একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ নতুন রাষ্ট্র জন্ম নেয়নি; জন্ম নিয়েছিল সেই রাষ্ট্রের প্রকাশ্য দাবি এবং তার রাজনৈতিক আদর্শ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তেরো বিদ্রোহী উপনিবেশ নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিল, কিন্তু সেই দাবিকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে তাদের আরও বহু বছর লড়তে হবে। তবু ‘কমন সেন্স’-এর সহজ ভাষায় ছড়িয়ে পড়া স্বাধীনতার ধারণা থেকে ফিলাডেলফিয়ায় গৃহীত ঘোষণাপত্র পর্যন্ত কয়েক মাসের এই অসাধারণ পরিবর্তন আমেরিকান বিপ্লবের লক্ষ্যই বদলে দেয়। অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লড়াই আর যথেষ্ট ছিল না—এবার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল ব্রিটেনের শাসন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে একটি নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ।
দ্বিতীয় মেহমেদের সাম্রাজ্য নির্মাণ: কনস্টান্টিনোপল থেকে বলকান ও আনাতোলিয়ায় অটোমান বিশ্বশক্তির উত্থান
কনস্টান্টিনোপল বিজয় ১৪৫৩: দ্বিতীয় মেহমেদ কীভাবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন?
অটোমান গৃহযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মুরাদ: আঙ্কারার বিপর্যয়ের পর সাম্রাজ্যের পুনর্জন্ম
৪৭৬ সালে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন: ওদোয়াকারের হাতে রোমুলাস অগাস্টুলাসের ক্ষমতাচ্যুতি এবং পরবর্তী ইউরোপ
৪৬৮ সালের বিপর্যয় থেকে রোমুলাস অগাস্টুলাস: ব্যর্থ আফ্রিকা অভিযান, পুতুল সম্রাট ও পশ্চিম রোমের শেষ অধ্যায়
মেজোরিয়ান, রিসিমার ও শেষ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা: পশ্চিম রোমকে বাঁচানোর শক্তিশালী প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?