বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যামাজন রেইনফরেস্ট: পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন কতটা বিশাল?

অ্যামাজন রেইনফরেস্ট: পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন কতটা বিশাল?
পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন অ্যামাজনের বিস্ময়কর বিস্তার

অ্যামাজন রেইনফরেস্টকে শুধু একটি বিশাল বন বললে এর প্রকৃত মাত্রা বোঝানো কঠিন। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর ও মধ্যভাগের এক বিরাট অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ক্রান্তীয় অরণনের আয়তন প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার বলে সাধারণভাবে ধরা হয়। অর্থাৎ এটি এমন একটি বনভূমি, যার আয়তন অনেক বড় দেশের সম্মিলিত আয়তনের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যামাজন রেইনফরেস্ট আর অ্যামাজন অববাহিকা একই জিনিস নয়। বৃহত্তর অ্যামাজন নদী অববাহিকার আয়তন প্রায় ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার, যার অধিকাংশ অংশ ঘন ক্রান্তীয় বন দিয়ে আবৃত। এই পার্থক্যটি না বুঝলে অ্যামাজনের আকার সম্পর্কে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

এই বনভূমির সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে ব্রাজিলে। মোট অ্যামাজন বনের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ ব্রাজিলের সীমানার মধ্যে পড়ে। তবে অ্যামাজন কোনো একক দেশের বন নয়। এর বিস্তার পেরু, কলম্বিয়া, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, গায়ানা, সুরিনাম ও ফরাসি গায়ানার বিভিন্ন অংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে অ্যামাজন প্রকৃত অর্থেই একটি আন্তঃদেশীয় বাস্তুতন্ত্র। রাজনৈতিক মানচিত্রে সীমান্তরেখা থাকলেও বনের ভেতরের নদী, বৃষ্টিপাত, প্রাণীর চলাচল, বীজের বিস্তার কিংবা বায়ুমণ্ডলীয় জলপ্রবাহ সেই সীমান্ত অনুসরণ করে না।

অ্যামাজনের বিশালতা বোঝার জন্য এর পূর্ব থেকে পশ্চিম বিস্তার কল্পনা করা যেতে পারে। পশ্চিমে আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশ থেকে শুরু করে পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত এই বিশাল প্রাকৃতিক ব্যবস্থার বিস্তার হাজার হাজার কিলোমিটার। আন্দিজে পড়া বৃষ্টি ও বরফগলা পানি অসংখ্য নদীর মাধ্যমে নিচু ভূমিতে নেমে আসে এবং শেষ পর্যন্ত অ্যামাজন নদীব্যবস্থার অংশ হয়ে আটলান্টিকে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে নদীগুলো শুধু পানি বহন করে না; পলি, পুষ্টি, জৈব পদার্থ এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য উপাদানও পরিবহন করে।

অ্যামাজনকে ওপর থেকে দেখলে প্রথমে মনে হতে পারে এটি যেন একটানা সবুজ চাদর। বাস্তবে এই সবুজ চাদরের নিচে রয়েছে অত্যন্ত জটিল ভূপ্রকৃতি ও বহু ধরনের বন। কোথাও বছরের অধিকাংশ সময় ভূমি তুলনামূলক শুকনা থাকে, কোথাও মৌসুমি বন্যায় বিশাল অঞ্চল পানির নিচে চলে যায়, আবার কোথাও স্থায়ী জলাভূমি রয়েছে। সাদা পানির নদীর প্লাবিত বন, কালো পানির নদীর আশপাশের বন, উঁচু শুকনা ভূমির বন এবং নদীতীরবর্তী অঞ্চল—প্রতিটি পরিবেশে উদ্ভিদ ও প্রাণীর গঠন আলাদা।

বনের সবচেয়ে বিস্তৃত অংশের একটি হলো এমন উঁচু ভূমির অরণন, যা নিয়মিত নদীর বন্যায় ডুবে যায় না। এখানে বিশাল বৃক্ষরাজি এমন ঘন ছাদ তৈরি করে যে সূর্যের আলো অনেক স্থানে সরাসরি মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। কোনো কোনো গাছ আশপাশের বনচ্ছাদের ওপরে উঠে যায়। নিচের স্তরে অপেক্ষাকৃত কম আলোয় অভিযোজিত উদ্ভিদ, লতা, ছোট গাছ, ছত্রাক ও অসংখ্য অণুজীবের পৃথক জগৎ গড়ে উঠেছে। তাই ওপর থেকে একরকম মনে হলেও উচ্চতার দিক থেকে অ্যামাজন আসলে বহুস্তরবিশিষ্ট একটি জীবন্ত কাঠামো।

এই বনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত অ্যামাজন নদী। পানিপ্রবাহের পরিমাণের বিচারে এটি পৃথিবীর বৃহত্তম নদী। পৃথিবীর নদীগুলো থেকে সমুদ্রে যাওয়া মোট স্বাদুপানির একটি অত্যন্ত বড় অংশ একাই অ্যামাজন নদীব্যবস্থা বহন করে। প্রধান নদীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাজারের বেশি উল্লেখযোগ্য উপনদী এবং অগণিত ছোট নদী, খাল ও জলধারা। এর মধ্যে কয়েকটি উপনদী নিজেরাই পৃথিবীর বৃহৎ নদীগুলোর সমপর্যায়ের। ফলে অ্যামাজনকে শুধু একটি নদীর চারপাশে গড়ে ওঠা বন ভাবলে ভুল হবে; এটি আসলে বন ও পানির এক বিশাল আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা।

বর্ষাকালে এই জলজ জগতের আকার আরও নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। নদীর পানি বেড়ে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে প্রবেশ করে। কোথাও পানির উচ্চতা বছরের শুষ্ক সময়ের তুলনায় বহু মিটার বেড়ে যেতে পারে। তখন যে জায়গায় শুকনা মৌসুমে প্রাণী হেঁটে বেড়ায়, সেখানে মাছ গাছের ডালের নিচ দিয়ে সাঁতার কাটতে পারে। অনেক উদ্ভিদের ফল ও বীজ মাছ খায় এবং পরে অন্য স্থানে ছড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ অ্যামাজনের কিছু অংশে মাছও বনের বীজ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। বন ও নদীর এই সম্পর্ক পৃথিবীর অন্য অনেক বাস্তুতন্ত্রের তুলনায় অত্যন্ত ব্যতিক্রমী।

অ্যামাজনের আরেকটি বিস্ময় হলো এর জীববৈচিত্র্যের ঘনত্ব। পৃথিবীর পরিচিত জীববৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে রয়েছে। এখানে কয়েক দশক হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, হাজারের বেশি পাখির প্রজাতি, শত শত স্তন্যপায়ী প্রাণী, বিপুলসংখ্যক সরীসৃপ ও উভচর এবং কয়েক হাজার স্বাদুপানির মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়। অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও অণুজীবের প্রকৃত বৈচিত্র্য আরও অনেক বেশি এবং এখনো সম্পূর্ণভাবে তালিকাভুক্ত হয়নি। বিজ্ঞানীরা নিয়মিত এমন প্রজাতি শনাক্ত করছেন যেগুলো আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞানের কাছে পরিচিত ছিল না।

এক হেক্টর অ্যামাজনীয় বনেও কখনো এমন সংখ্যক বৃক্ষপ্রজাতি পাওয়া যায়, যা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের বিশাল বনভূমির মোট বৃক্ষবৈচিত্র্যের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। একই এলাকায় অসংখ্য প্রজাতির গাছ পাশাপাশি জন্মানোর কারণে বনের পরিবেশগত সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। কোনো নির্দিষ্ট পোকা একটি বিশেষ উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল, সেই পোকা আবার কোনো পাখির খাদ্য, আর সেই পাখি কোনো ফল খেয়ে অন্যত্র বীজ ছড়িয়ে দিতে পারে। এই সম্পর্কের লক্ষ লক্ষ শৃঙ্খল মিলেই অ্যামাজনের জীবন্ত জাল তৈরি হয়েছে।

জাগুয়ার এই বনের সবচেয়ে পরিচিত বৃহৎ শিকারিদের একটি। কিন্তু অ্যামাজনের জীবজগত শুধু বড় প্রাণী দিয়ে বোঝা যায় না। হার্পি ঈগল বনচ্ছাদের শক্তিশালী শিকারি, বিভিন্ন প্রজাতির বানর গাছের ওপরের স্তরে চলাচল করে, স্লথ ধীরগতির জীবনযাপনের জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত, আর নদীতে রয়েছে গোলাপি নদী ডলফিন, বিশালাকার মাছ ও অসংখ্য ছোট জলজ প্রাণী। গাছের কাণ্ড, পাতা, মৃত কাঠ এবং মাটির ক্ষুদ্র অংশেও আলাদা আলাদা জীবসমাজ থাকতে পারে।

অ্যামাজনের আকার বোঝার আরেকটি উপায় হলো এর নিজস্ব বৃষ্টিচক্রের দিকে তাকানো। আটলান্টিক থেকে আসা আর্দ্র বায়ু বনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বৃষ্টি ঝরায়। গাছ তাদের শিকড় দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি গ্রহণ করে এবং পাতার মাধ্যমে সেই পানির বড় অংশ আবার জলীয় বাষ্প হিসেবে বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেয়। কোটি কোটি গাছ একসঙ্গে এই কাজ করায় বনের ওপর বিপুল আর্দ্রতা তৈরি হয়। সেই জলীয় বাষ্প আবার মেঘ ও বৃষ্টির সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। ফলে একই পানি স্থলভাগের ওপর দিয়ে অগ্রসর হওয়ার পথে একাধিকবার বৃষ্টি ও বাষ্পীভবনের চক্রে অংশ নিতে পারে।

এই বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা শুধু অ্যামাজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুপ্রবাহ বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প দক্ষিণ আমেরিকার অন্য অঞ্চলের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ কারণে অ্যামাজনের বন দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তৃত এলাকার বৃষ্টিপাতের ধরন ও জলচক্রের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি, নদী, জলবিদ্যুৎ এবং শহরের পানির সরবরাহ পর্যন্ত পরোক্ষভাবে এই বৃহৎ আর্দ্রতা পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই অ্যামাজনের গাছ কাটা মানে শুধু নির্দিষ্ট একটি বনাঞ্চল হারানো নয়; পর্যাপ্ত বড় মাত্রায় বনহানি হলে আঞ্চলিক জলচক্রেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।

অ্যামাজনকে প্রায়ই “পৃথিবীর ফুসফুস” বলা হয়, কিন্তু এই জনপ্রিয় উপমাটি বৈজ্ঞানিকভাবে কিছুটা বিভ্রান্তিকর। বন অবশ্যই সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বিপুল অক্সিজেন উৎপন্ন করে। কিন্তু একই বাস্তুতন্ত্রে উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবের শ্বসন এবং মৃত জৈব পদার্থের পচনের সময় বিপুল অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়। ফলে অ্যামাজন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মোট অক্সিজেনের বিশাল নতুন সরবরাহকারী—এমন ধারণা সঠিক নয়। এর বৈশ্বিক গুরুত্ব বরং বিপুল পরিমাণ কার্বন জীবিত গাছপালা ও মাটিতে ধরে রাখা, জলচক্র নিয়ন্ত্রণ এবং অসাধারণ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মধ্যে বেশি স্পষ্ট।

অ্যামাজনের গাছ ও মাটিতে বিপুল কার্বন সঞ্চিত রয়েছে। শত শত বছর ধরে বেড়ে ওঠা বিশাল গাছের কাণ্ড, শাখা, শিকড় এবং মৃত জৈব পদার্থে কার্বন জমা থাকে। বন কেটে ফেললে শুধু ভবিষ্যতে কার্বন ধারণের ক্ষমতাই কমে না; গাছ পোড়ানো বা পচে যাওয়ার মাধ্যমে আগে সঞ্চিত কার্বনের একটি অংশ বায়ুমণ্ডলেও ফিরে যেতে পারে। এ কারণে অ্যামাজনের ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এত বিশাল ও ঘন বন হওয়া সত্ত্বেও অ্যামাজনের মাটি সর্বত্র অত্যন্ত উর্বর নয়। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে জৈব পদার্থ দ্রুত পচে যায় এবং প্রবল বৃষ্টিপাতে মাটির অনেক খনিজ নিচের স্তরে ধুয়ে যেতে পারে। বনের পুষ্টির একটি বড় অংশ তাই গভীর উর্বর মাটিতে জমা না থেকে জীবন্ত উদ্ভিদ, শিকড়, পাতার আবর্জনা এবং দ্রুত পুনর্ব্যবহৃত জৈব পদার্থের মধ্যে আবর্তিত হয়। গাছের পাতা পড়ার পর ছত্রাক, অণুজীব ও ক্ষুদ্র প্রাণী দ্রুত সেটি ভেঙে দেয় এবং মুক্ত পুষ্টি আবার উদ্ভিদের শিকড় গ্রহণ করে। এই দ্রুত পুনর্ব্যবহারই ঘন অরণনকে টিকিয়ে রাখে।

এই কারণেই বন কেটে কৃষিজমি তৈরি করলে প্রথম দিকে জমি উৎপাদনশীল মনে হলেও অনেক স্থানে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বনচ্ছাদন সরে গেলে প্রবল বৃষ্টি সরাসরি মাটিতে আঘাত করে, ক্ষয় বাড়ে এবং পুষ্টির স্বাভাবিক চক্র ভেঙে যায়। বিশেষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া অনেক জমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। ফলে অ্যামাজনের সবুজ বিস্তার দেখে এর নিচে সর্বত্র গভীর, অত্যন্ত উর্বর কৃষিজমি রয়েছে বলে ধরে নেওয়া ভুল।

অ্যামাজনের বিশালতার মধ্যে মানুষের উপস্থিতিও বহু প্রাচীন। এই বনকে কখনো সম্পূর্ণ মানবস্পর্শহীন অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা দেখিয়েছে যে ইউরোপীয়দের আগমনের বহু শতাব্দী আগে থেকেই এখানে বড় আদিবাসী সমাজ বসবাস করত। তারা নদীতীরবর্তী বসতি নির্মাণ, উদ্ভিদ ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ ধরনের উর্বর মাটি তৈরিসহ বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। আজও অ্যামাজন অঞ্চলে বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও বনসম্পর্কিত জ্ঞান এই ভূখণ্ডের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বনের কিছু গভীর অঞ্চলে এমন জনগোষ্ঠীও রয়েছে যারা বাইরের সমাজের সঙ্গে খুব সীমিত যোগাযোগ বজায় রাখে বা যোগাযোগ এড়িয়ে চলে। তাদের জন্য বন শুধু খাদ্য ও আশ্রয়ের উৎস নয়; এটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা। নদীর মৌসুমি পরিবর্তন, কোন গাছের ফল কখন পাকে, কোন উদ্ভিদের কী ব্যবহার, প্রাণীর চলাচল এবং বনের সূক্ষ্ম পরিবর্তন সম্পর্কে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত জ্ঞান তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু পৃথিবীর বৃহত্তম এই ক্রান্তীয় বন অক্ষত নেই। কয়েক দশক ধরে গবাদিপশুর চারণভূমি তৈরি, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, কাঠ সংগ্রহ, খনি, সড়ক নির্মাণ, অগ্নিকাণ্ড এবং নতুন বসতি বিস্তারের কারণে অ্যামাজনের উল্লেখযোগ্য অংশে বন হারিয়েছে বা অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক তৈরি হলে আগে দুর্গম এলাকায় মানুষের প্রবেশ সহজ হয়। পরে সেই সড়কের দুই পাশে শাখার মতো নতুন রাস্তা ও বন পরিষ্কারের অঞ্চল তৈরি হতে পারে। মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতে অনেক সময় এই বিন্যাস স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

বনহানি আর বন অবক্ষয়ও এক বিষয় নয়। কোনো এলাকা পুরোপুরি পরিষ্কার করে দিলে সেটি সরাসরি বনহানি। কিন্তু বন বাইরে থেকে সবুজ দেখালেও আগুন, নির্বাচিত গাছ কাটা, খরা বা প্রান্তীয় প্রভাবের কারণে তার ভেতরের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বড় গাছ কমে যেতে পারে, বন আরও শুষ্ক হতে পারে এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে শুধু কত বর্গকিলোমিটার বন এখনো মানচিত্রে রয়েছে তা দিয়ে অ্যামাজনের স্বাস্থ্য পুরোপুরি বিচার করা যায় না।

অ্যামাজনের জন্য আগুন বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, কারণ আর্দ্র ক্রান্তীয় অরণন স্বাভাবিকভাবে নিয়মিত বড় দাবানলের জন্য অভিযোজিত নয়। মানুষ বন পরিষ্কারের কাজে আগুন ব্যবহার করলে শুষ্ক অবস্থায় সেই আগুন আশপাশের অরণনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একবার আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বনচ্ছাদন পাতলা হয়, সূর্যের আলো বেশি প্রবেশ করে এবং ভেতরের পরিবেশ আরও শুকিয়ে যায়। এরপর পরবর্তী আগুন আরও সহজে ছড়াতে পারে। এভাবে আগুন ও বন অবক্ষয় একে অপরকে শক্তিশালী করার ঝুঁকি তৈরি করে।

বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো, ব্যাপক বনহানি ও ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা মিলিত হলে অ্যামাজনের কিছু অঞ্চলের নিজস্ব বৃষ্টিচক্র দুর্বল হতে পারে। গাছ কমলে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ফেরত যাওয়ার পরিমাণ কমতে পারে; বৃষ্টি কমলে শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ বা তীব্র হতে পারে; দীর্ঘ শুষ্কতা আবার গাছের মৃত্যু ও আগুনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এই প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী হলে বিশেষত দক্ষিণ ও পূর্ব অ্যামাজনের কিছু বন ধীরে ধীরে আরও খোলা ও শুষ্ক বাস্তুতন্ত্রের দিকে পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে পুরো অ্যামাজন ঠিক কোন মাত্রায় পৌঁছালে একই সঙ্গে অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে যাবে—এমন একটি নির্ভুল সীমা এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত নয়।

এখানেই অ্যামাজনের প্রকৃত বিশালতার আরেকটি দিক সামনে আসে। ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার শুধু একটি আয়তনের সংখ্যা নয়। এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার নদী ও জলধারা, অসংখ্য বনপ্রকার, কোটি কোটি বড় গাছ, বিপুল অণুজীব, লক্ষ লক্ষ পরিচিত ও অজানা জীবের জনগোষ্ঠী এবং মানুষের বহু প্রাচীন সংস্কৃতি। একই সঙ্গে এই অঞ্চল দক্ষিণ আমেরিকার পানি, বৃষ্টিপাত, কার্বনচক্র এবং আঞ্চলিক জলবায়ুর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে একটি অংশের পরিবর্তনের প্রভাব অনেক দূরে পৌঁছাতে পারে।

মানচিত্রে অ্যামাজনকে দেখলে এর আকার বিশাল মনে হয়, কিন্তু মাটিতে দাঁড়িয়ে এর মাত্রা উপলব্ধি করা আরও কঠিন। বনের একটি স্থানে দাঁড়ালে চারপাশে কয়েকশ মিটার দেখা গেলেও পুরো ব্যবস্থাটি হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত। একটি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যে বন দেখা যায়, সেটি এমন এক মহাদেশীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষুদ্র অংশ যার অন্য প্রান্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন নদী, ভিন্ন বৃষ্টির ধরন এবং ভিন্ন প্রজাতির সমাবেশ থাকতে পারে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই অ্যামাজনের প্রকৃত মহত্ত্ব।

অ্যামাজন তাই পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন শুধু তার আয়তনের কারণে নয়; এর ভেতরে কার্যকর প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোর মাত্রাও অসাধারণ। পানি মাটি থেকে গাছে ওঠে, পাতা থেকে বায়ুমণ্ডলে যায়, মেঘে রূপ নেয়, আবার বৃষ্টি হয়ে নামে; নদী সেই পানি হাজার হাজার কিলোমিটার বহন করে সমুদ্রে নিয়ে যায়; উদ্ভিদ কার্বন ধারণ করে; প্রাণী পরাগায়ন ও বীজ বিস্তারে সাহায্য করে; অণুজীব মৃত পদার্থ ভেঙে পুষ্টি আবার জীবনের চক্রে ফিরিয়ে দেয়। এই অসংখ্য প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলার ফলেই বিশাল বনটি টিকে থাকে।

পৃথিবীর মানচিত্রে অ্যামাজন একটি সবুজ অঞ্চল, কিন্তু বাস্তবে এটি যেন মহাদেশের ভেতরে আরেকটি জীবন্ত জগৎ। এর আয়তন কয়েক মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার হলেও শুধু সংখ্যায় এর বিশালতা ধরা যায় না। এর প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যায় নদীর প্রবাহে, বায়ুমণ্ডলে ওঠা জলীয় বাষ্পে, কোটি কোটি বৃক্ষের মধ্যে সঞ্চিত কার্বনে, অসংখ্য প্রজাতির পারস্পরিক নির্ভরতায় এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এর সম্পর্কের মধ্যে। সেই কারণেই অ্যামাজন রেইনফরেস্ট পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন হওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল, বিস্তৃত এবং বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীবন্ত প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোরও একটি।


আপনার পছন্দ হতে পারে