বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মালদ্বীপ: হাজারের বেশি প্রবালদ্বীপ নিয়ে তৈরি দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কতটা নিচু?

মালদ্বীপ: হাজারের বেশি প্রবালদ্বীপ নিয়ে তৈরি দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কতটা নিচু?
সমুদ্রের বুকের নিচু প্রবালদ্বীপের দেশ মালদ্বীপ

ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা মালদ্বীপকে আকাশ থেকে দেখলে মনে হয়, সমুদ্রের ওপর কেউ অসংখ্য ক্ষুদ্র সবুজ বিন্দু আর ফিরোজা রঙের বলয় এঁকে রেখেছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম অস্বাভাবিক ভূগঠন। মালদ্বীপ কোনো বিশাল স্থলভাগের বিচ্ছিন্ন অংশ নয়, আবার সাধারণ মহাদেশীয় দ্বীপপুঞ্জও নয়। দেশটির ভূমি মূলত প্রবাল, বালি এবং সামুদ্রিক জীবের তৈরি চুনজাতীয় কণার সঞ্চয়ে গড়ে উঠেছে। এর দ্বীপগুলো এতটাই নিচু যে অনেক স্থানে সমুদ্রের পানি থেকে মানুষের বসতি পর্যন্ত উচ্চতার ব্যবধান মাত্র এক থেকে দুই মিটার। এই কারণেই মালদ্বীপকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মালদ্বীপের ভৌগোলিক বিস্তার বুঝতে হলে প্রথমেই এর দৃশ্যমান স্থলভাগ আর সামুদ্রিক এলাকার মধ্যে বিশাল পার্থক্যটি বুঝতে হয়। দেশটি উত্তর থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের ওপর প্রায় আটশ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। কিন্তু এত দীর্ঘ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকলেও এর মোট স্থলভাগ মাত্র কয়েকশ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ মানচিত্রে মালদ্বীপ যে বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চল দখল করে আছে বলে মনে হয়, তার অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশই আসলে শুকনো ভূমি। বাকি অংশ সমুদ্র, প্রবালপ্রাচীর ও অগভীর উপহ্রদ।

দেশটিতে এক হাজারেরও বেশি প্রবালদ্বীপ রয়েছে। সাধারণভাবে প্রায় এক হাজার দুই শত দ্বীপের কথা বলা হলেও দ্বীপ গণনার পদ্ধতি, বালুচরের পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিকভাবে নতুন ক্ষুদ্র স্থলভাগ তৈরি বা পুরোনো স্থলভাগ ক্ষয় হওয়ার কারণে সংখ্যায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এসব দ্বীপ আবার বৃহত্তর বলয়াকার প্রবালগঠনের মধ্যে বিন্যস্ত। মালদ্বীপের প্রশাসনিক বিভাজন এবং প্রাকৃতিক প্রবালবলয় এক বিষয় নয়। ভূতাত্ত্বিকভাবে দেশটির দ্বীপগুলো বহু বৃহৎ প্রবালবলয়, প্রবালপ্রাচীর ও উপহ্রদের সমন্বয়ে গঠিত এক অসাধারণ সামুদ্রিক ভূদৃশ্য।

মালদ্বীপের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য এর গড় উচ্চতা। দেশটির প্রাকৃতিক ভূমির বড় অংশ গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক দেড় মিটারের কাছাকাছি উচ্চতায় অবস্থিত। অনেক দ্বীপের অধিকাংশ অংশই এক থেকে দুই মিটারের মধ্যে। প্রাকৃতিকভাবে সর্বোচ্চ স্থানগুলোও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তুলনায় অবিশ্বাস্যভাবে নিচু। অর্থাৎ এখানে কোনো পাহাড় নেই, উঁচু মালভূমি নেই, এমনকি এমন কোনো বিস্তৃত প্রাকৃতিক উচ্চভূমিও নেই যেখানে উপকূলীয় দুর্যোগের সময় সমগ্র জনগোষ্ঠী সহজে আশ্রয় নিতে পারে।

তবে “মালদ্বীপ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে” বলা সঠিক নয়। দেশটির স্থলভাগ সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে, কিন্তু ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। মালদ্বীপ এখনো ডুবে থাকা কোনো দেশ নয়; বরং এটি এমন একটি দেশ যার অধিকাংশ ভূমি বর্তমান সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র অল্প ওপরে অবস্থান করছে। ফলে সমুদ্রের গড় উচ্চতায় কয়েক দশমিক মিটার পরিবর্তনও এখানে অন্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মালদ্বীপ এত নিচু কেন, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এর জন্মের ইতিহাসে। ভারত মহাসাগরের তলদেশে একসময় আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে এসব আগ্নেয় কাঠামোর চারপাশে প্রবাল জন্মাতে থাকে। উষ্ণ, পরিষ্কার ও অগভীর পানিতে প্রবালপ্রাচীর ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। পরে আগ্নেয় দ্বীপগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত ও নিমজ্জিত হলেও প্রবাল সূর্যালোক পাওয়ার উপযোগী অগভীর পানির দিকে বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে গভীর বা অগভীর উপহ্রদ এবং চারপাশে বলয়াকার প্রবালপ্রাচীরবিশিষ্ট কাঠামো তৈরি হয়।

এই বলয়াকার প্রবালগঠনকেই সাধারণভাবে প্রবালবলয় বলা হয়। এর ওপর ঢেউ ও স্রোত ভাঙা প্রবাল, শামুকের খোলস, সামুদ্রিক প্রাণীর কঙ্কালের কণা এবং অন্যান্য চুনজাতীয় পদার্থ এনে জমা করে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব কণা সঞ্চিত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে বালুময় দ্বীপ তৈরি করতে পারে। পরে সেখানে উদ্ভিদ জন্মায়, শিকড় বালিকে স্থিতিশীল করে এবং ধীরে ধীরে বাসযোগ্য ভূমির সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ মালদ্বীপের একটি দ্বীপকে শুধু জমে থাকা নিষ্ক্রিয় বালির স্তূপ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি প্রবালপ্রাচীর, ঢেউ, স্রোত, বালি এবং জীবজগতের পারস্পরিক ক্রিয়ায় গঠিত একটি গতিশীল ব্যবস্থা।

এই গতিশীলতার কারণেই মালদ্বীপের দ্বীপগুলোর আকৃতি স্থায়ী নয়। কোনো দ্বীপের এক পাশ থেকে বালি ক্ষয় হয়ে অন্য পাশে জমতে পারে। মৌসুমি বায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সৈকতের অবস্থানও বদলাতে পারে। কোথাও ভূমি সংকুচিত হয়, কোথাও আবার নতুন বালুচর তৈরি হয়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি পেলেই প্রতিটি দ্বীপ একই হারে সরাসরি পানির নিচে চলে যাবে—বাস্তব প্রক্রিয়াটি এত সরল নয়। সুস্থ প্রবালপ্রাচীর নতুন চুনজাতীয় উপাদান তৈরি করতে পারে এবং ঢেউ সেই উপাদান দ্বীপে পৌঁছে দিতে পারে। কিছু প্রবালদ্বীপ পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে আংশিকভাবে খাপ খাইয়ে আকৃতি ও অবস্থান বদলাতেও পারে।

কিন্তু এই স্বাভাবিক অভিযোজনেরও সীমা রয়েছে। যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ দ্রুত বাড়ে, প্রবালপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বালির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং উপকূলীয় অবকাঠামো দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রবাল বিবর্ণতা ও প্রবালের মৃত্যু মালদ্বীপের জন্য শুধু জীববৈচিত্র্যের সমস্যা নয়। প্রবালপ্রাচীরই ঢেউয়ের শক্তি কমায়, বালির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের উৎস হিসেবে কাজ করে এবং দ্বীপের চারপাশে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করে।

মালদ্বীপের নিচু অবস্থানের কারণে শুধু স্থায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি নয়, সাময়িক উচ্চ পানিও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক জোয়ার, ঝড়ের কারণে পানি ফুলে ওঠা এবং দূরের ঝড় থেকে আসা শক্তিশালী ঢেউ একত্রিত হলে কোনো দ্বীপে সাময়িক প্লাবন ঘটতে পারে। একটি পাহাড়ি দেশে সমুদ্রের পানি কয়েক দশ মিটার ভেতরে ঢুকলেও দেশের অধিকাংশ এলাকা নিরাপদ থাকতে পারে। কিন্তু মাত্র কয়েক মিটার উঁচু এবং কয়েকশ মিটার প্রশস্ত একটি প্রবালদ্বীপে একই ঘটনা বসতি, রাস্তা, বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং মিঠাপানির উৎসকে একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মিঠাপানিই মালদ্বীপের নিচু ভূপ্রকৃতির অন্যতম অদৃশ্য দুর্বলতা। অনেক ছোট প্রবালদ্বীপের নিচে বৃষ্টির পানি মাটির ভেতর প্রবেশ করে অপেক্ষাকৃত হালকা মিঠাপানির একটি পাতলা স্তর তৈরি করে। এর নিচে থাকে লবণাক্ত পানি। এই ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির স্তর খুব গভীর নয়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলন, দীর্ঘ খরা, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ অথবা প্লাবনের ফলে এটি দ্রুত দূষিত হতে পারে। তাই কোনো দ্বীপ সম্পূর্ণ পানির নিচে না গেলেও পানযোগ্য পানির সংকট সেটিকে বসবাসের জন্য কঠিন করে তুলতে পারে।

আরেকটি সমস্যা হলো উপকূল ক্ষয়। মালদ্বীপের দ্বীপগুলো ছোট হওয়ায় কয়েক মিটার উপকূল হারানোও গুরুত্বপূর্ণ। সৈকত শুধু পর্যটনের সৌন্দর্য নয়; এটি দ্বীপের প্রতিরক্ষার অংশ। ঢেউয়ের শক্তি সৈকতে এসে ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। কিন্তু সৈকত সরু হয়ে গেলে বড় ঢেউ সরাসরি বসতি ও অবকাঠামোর কাছে পৌঁছাতে পারে। কোথাও কৃত্রিম প্রাচীর, পাথরের বাঁধ এবং অন্যান্য উপকূলরক্ষা কাঠামো নির্মাণ করা হয়। এগুলো নির্দিষ্ট স্থানে কার্যকর হলেও ভুলভাবে নির্মাণ করা হলে স্বাভাবিক বালি পরিবহন ব্যাহত করে পাশের উপকূলে ক্ষয় বাড়াতে পারে।

রাজধানী মালেও এই সমস্যার একটি বিশেষ উদাহরণ। অল্প আয়তনের দ্বীপে বিপুল জনসংখ্যা ও অবকাঠামোর ঘনত্ব শহরটিকে প্রাকৃতিক প্রবালদ্বীপের চেয়ে অনেক বেশি পরিবর্তিত পরিবেশে পরিণত করেছে। চারপাশে উপকূলরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই মালদ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা শেষ হয়ে যায় না। কারণ শত শত জনবসতিপূর্ণ দ্বীপের প্রত্যেকটিকে একই ধরনের ভারী প্রকৌশল কাঠামো দিয়ে রক্ষা করা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত কঠিন।

এই বাস্তবতা থেকেই কৃত্রিমভাবে উঁচু ভূমি তৈরির ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। মালদ্বীপে সমুদ্র থেকে বালি তুলে ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে নতুন এলাকা তৈরি করা হয়েছে। হুলহুমালে এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। পরিকল্পিতভাবে তৈরি এই দ্বীপের ভূমি অনেক প্রাকৃতিক দ্বীপের তুলনায় উঁচু রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য শুধু নতুন আবাসন তৈরি নয়; ভবিষ্যতের সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি ও প্লাবনের ঝুঁকির বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ নগরভূমি গড়ে তোলাও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে পুরো মালদ্বীপকে কৃত্রিমভাবে উঁচু করা বাস্তবসম্মত নয়। হাজারের বেশি দ্বীপের দেশটিতে বসতি, পর্যটনকেন্দ্র, বিমানবন্দর, বন্দর, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। কোথায় উপকূলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে, কোথায় সৈকতে নতুন বালি যোগ করা হবে, কোথায় ম্যানগ্রোভ বা প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা সংরক্ষণ করা হবে এবং কোথায় ভবিষ্যতে জনবসতি তুলনামূলক উঁচু দ্বীপে কেন্দ্রীভূত করা হবে—এসব সিদ্ধান্ত মালদ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত।

সমুদ্রের উষ্ণতাও এখানে একটি মৌলিক বিষয়। প্রবাল নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পরিবেশে ভালো থাকে। দীর্ঘ সময় অস্বাভাবিক উষ্ণ পানি থাকলে প্রবালের শরীরে বসবাসকারী ক্ষুদ্র সহবাসী শৈবাল বেরিয়ে যেতে পারে এবং প্রবাল সাদা হয়ে যায়। একে প্রবাল বিবর্ণতা বলা হয়। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে প্রবাল পুনরুদ্ধার করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী তাপচাপ ব্যাপক প্রবালমৃত্যু ঘটাতে পারে। মালদ্বীপের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো একই সঙ্গে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, পর্যটন, মৎস্যসম্পদ, ঢেউ থেকে সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ দ্বীপ গঠনের উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধিও প্রবালের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি অংশ সমুদ্র শোষণ করলে পানির রাসায়নিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। এতে প্রবালসহ চুনজাতীয় কঙ্কাল তৈরি করা জীবের জন্য শক্ত কাঠামো গঠন কঠিন হতে পারে। একটি মহাদেশীয় দেশের জন্য এটি প্রধানত সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের সমস্যা হতে পারে, কিন্তু মালদ্বীপের ক্ষেত্রে প্রবালপ্রাচীরই দেশটির ভৌত অস্তিত্বের ভিত্তির অংশ। তাই প্রবালের স্বাস্থ্য এবং দেশের ভূগোল এখানে সরাসরি সম্পর্কিত।

মালদ্বীপ নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, একদিন পুরো দেশটি সমুদ্রের নিচে চলে যাবে। এই বক্তব্য সম্ভাব্য বিপদের গুরুত্ব বোঝালেও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা আরও জটিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ ধীরে ধীরে বাড়লে সব দ্বীপ একই সময়ে এবং একইভাবে অদৃশ্য হবে না। কিছু দ্বীপ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে, কিছু দ্বীপের আকৃতি বদলাতে পারে, কিছু স্থানে বালি জমতে পারে এবং কিছু দ্বীপ প্রকৌশল ব্যবস্থার মাধ্যমে উঁচু করা সম্ভব হতে পারে। তাই ভবিষ্যৎকে শুধু একটি নির্দিষ্ট বছরে সম্পূর্ণ দেশ ডুবে যাওয়ার দৃশ্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

বরং বড় প্রশ্ন হলো, দ্বীপগুলো কতদিন নিরাপদ ও কার্যকরভাবে বসবাসযোগ্য থাকবে। কোনো ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে থাকলেও সেখানে যদি নিয়মিত প্লাবন ঘটে, পানীয় জল লবণাক্ত হয়ে যায়, রাস্তা ও বিদ্যুৎব্যবস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘরবাড়ি রক্ষা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তাহলে সেই দ্বীপের বসবাসযোগ্যতা অনেক আগেই সংকটে পড়তে পারে। এই কারণেই মালদ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণায় শুধু “ডুবে যাবে কি না” প্রশ্নের বদলে প্লাবনের হার, মিঠাপানি, প্রবালপ্রাচীরের স্বাস্থ্য, উপকূল ক্ষয় এবং অবকাঠামোর সহনশীলতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

মালদ্বীপ একই সঙ্গে অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং আশ্চর্যজনকভাবে গতিশীল একটি ভূব্যবস্থা। এর দ্বীপগুলো হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্রের পরিবর্তনের মধ্যেই তৈরি হয়েছে। প্রবাল বেড়েছে, ভেঙেছে, বালি তৈরি হয়েছে, ঢেউ সেই বালি স্থানান্তর করেছে এবং নতুন ভূমি গড়ে উঠেছে। এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে যত বেশি সুস্থ রাখা যাবে, দ্বীপগুলোর অভিযোজনের সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে। কিন্তু দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন, প্রবাল ক্ষয়, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং অতিরিক্ত উপকূলীয় হস্তক্ষেপ একসঙ্গে ঘটলে সেই প্রাকৃতিক অভিযোজন ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই মালদ্বীপ শুধু সুন্দর সমুদ্রসৈকত ও বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রের দেশ নয়; এটি পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ বোঝার এক জীবন্ত পরীক্ষাগার। এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের কয়েক সেন্টিমিটার বৃদ্ধি, একটি প্রবালপ্রাচীরের ক্ষয় কিংবা একটি দ্বীপের সৈকতরেখার সামান্য পরিবর্তনও বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্য অনেক দেশে যে পরিবর্তন দূর ভবিষ্যতের সমস্যা বলে মনে হয়, মালদ্বীপে তার অনেকটাই বর্তমান পরিকল্পনার অংশ।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভারত মহাসাগরের গভীর তলদেশ থেকে উঠে আসা প্রাচীন আগ্নেয় কাঠামোর ওপর জীবন্ত প্রবালের বৃদ্ধি, অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর তৈরি চুনজাতীয় পদার্থ এবং ঢেউয়ের বহন করা বালি মিলেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভূমি তৈরি করেছে। পৃথিবীর খুব কম দেশের ভূখণ্ড জীবজগতের সঙ্গে এত সরাসরি যুক্ত। মালদ্বীপের মাটি তাই শুধু ভূতাত্ত্বিক পদার্থ নয়; এর একটি বড় অংশই প্রাচীন সামুদ্রিক জীবনের উত্তরাধিকার।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে মাত্র দেড় মিটারের কাছাকাছি উচ্চতার এই দেশটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—কোনো দেশের নিরাপত্তা শুধু তার আয়তন, অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; কখনো কখনো সমুদ্রের পানির সঙ্গে ভূমির মাত্র কয়েক হাত উচ্চতার পার্থক্যও একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। হাজারের বেশি ক্ষুদ্র প্রবালদ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা মালদ্বীপ তাই একই সঙ্গে প্রকৃতির অসাধারণ নির্মাণশৈলীর নিদর্শন এবং পরিবর্তিত পৃথিবীতে নিচু উপকূলীয় ভূখণ্ড কতটা সংবেদনশীল হতে পারে তার অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ।


আপনার পছন্দ হতে পারে