বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মেজোরিয়ান, রিসিমার ও শেষ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা: পশ্চিম রোমকে বাঁচানোর শক্তিশালী প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

Series: পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন: ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এক সাম্রাজ্যের অবসান

  • Author: Admin
  • September 10, 2026
মেজোরিয়ান, রিসিমার ও শেষ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা: পশ্চিম রোমকে বাঁচানোর শক্তিশালী প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
মেজোরিয়ানের শেষ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা ও রিসিমারের উত্থান

৪৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ভ্যান্ডাল রাজা গাইজেরিকের হাতে রোম লুণ্ঠনের পর পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা দেখে মনে হতে পারত যে তার পতন আর ঠেকানো সম্ভব নয়। উত্তর আফ্রিকার সমৃদ্ধ প্রদেশগুলো হারিয়ে গেছে, ব্রিটেনে রোমান শাসন শেষ, হিস্পানিয়ার বড় অংশ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং গলেও ভিসিগথ, বার্গান্ডিয়ান ও অন্যান্য শক্তি নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করছে। সাম্রাজ্যের রাজস্ব কমছে, সেনাবাহিনীর ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হচ্ছে এবং সম্রাটদের তুলনায় শক্তিশালী সেনাপতিদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে। ঠিক এই সময়ে পশ্চিমের সিংহাসনে উঠে আসেন মেজোরিয়ান, যিনি পতনকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে সাম্রাজ্যকে সামরিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠনের উচ্চাভিলাষী চেষ্টা করেন।

মেজোরিয়ানের শাসনকাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত—৪৫৭ থেকে ৪৬১ খ্রিষ্টাব্দ, মাত্র চার বছরের কিছু বেশি। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন, যার কারণে তাঁকে পশ্চিম রোমের শেষ যুগের সবচেয়ে সক্ষম সম্রাটদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর লক্ষ্য শুধু ইতালিতে নিজের সিংহাসন রক্ষা করা ছিল না। তিনি গলে সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, হিস্পানিয়ায় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী, প্রশাসনিক দুর্নীতি কমানো, করব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং শেষ পর্যন্ত ভ্যান্ডালদের কাছ থেকে উত্তর আফ্রিকা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু মেজোরিয়ানের গল্প বুঝতে হলে প্রথমে আরেকজন ব্যক্তিকে বুঝতে হয়—রিসিমার। পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিম রোমের রাজনীতিতে রিসিমার এমন এক শক্তিশালী সামরিক নেতায় পরিণত হন, যিনি নিজে সম্রাট না হয়েও একাধিক সম্রাটের উত্থান-পতনের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখেন। তাঁর পিতা সুয়েবি রাজপরিবারের সঙ্গে এবং মা ভিসিগথিক রাজবংশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। রোমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তিনি একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে উঠে আসেন।

রিসিমারের বংশগত পরিচয় তাঁর সম্রাট হওয়ার পথে বাস্তব রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। পশ্চিমের সামরিক জগতে জার্মানিক বংশোদ্ভূত ব্যক্তির উচ্চপদে ওঠা অস্বাভাবিক ছিল না, কিন্তু সাম্রাজ্যিক সিংহাসনের জন্য রোমান অভিজাত ও ধর্মীয় বৈধতার প্রশ্ন ছিল আলাদা। ফলে রিসিমারের জন্য সরাসরি সম্রাট হওয়ার চেয়ে নিজের অনুকূল সম্রাট বসিয়ে পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করা বেশি বাস্তবসম্মত ছিল।

৪৫৫ সালে তৃতীয় ভ্যালেন্টিনিয়ানের মৃত্যুর পর পশ্চিমে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। পেট্রোনিয়াস ম্যাক্সিমাস কয়েক মাসের মধ্যেই নিহত হন। এরপর গলের শক্তিশালী অভিজাতদের সমর্থনে অ্যাভিটাস সম্রাট হন। তাঁর পেছনে ভিসিগথদের সমর্থনও ছিল। কিন্তু ইতালিতে তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রিসিমার ও মেজোরিয়ান তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

৪৫৬ সালে প্লাসেন্তিয়ার কাছে অ্যাভিটাস পরাজিত হন এবং ক্ষমতা হারান। এর পরপরই পশ্চিমে একটি নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হয়। রিসিমার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদ লাভ করেন, আর মেজোরিয়ানও ক্রমশ কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত ৪৫৭ সালের এপ্রিলে মেজোরিয়ান পশ্চিম রোমের সম্রাট ঘোষিত হন।

প্রথমদিকে রিসিমার ও মেজোরিয়ানকে সহযোগী বলেই মনে হয়। দুজনই সামরিক পটভূমি থেকে উঠে এসেছিলেন এবং অ্যাভিটাসকে অপসারণে ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। রিসিমার এমন সম্রাট চাইতেন যাঁর ওপর তাঁর প্রভাব বজায় থাকবে। অন্যদিকে মেজোরিয়ান খুব দ্রুত প্রমাণ করেন যে তিনি নামমাত্র সম্রাট হয়ে থাকতে রাজি নন।

মেজোরিয়ানের সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইতালির নিরাপত্তা। ভ্যান্ডাল নৌবাহিনী তখন পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে সক্রিয় এবং ইতালির উপকূলেও হামলা চালাতে সক্ষম। মেজোরিয়ান তাদের একটি অভিযানের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই সাফল্য তাঁর সামরিক মর্যাদা বাড়ায় এবং দেখায় যে নতুন সম্রাট ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করতে সক্ষম।

এরপর তিনি গলের দিকে মনোযোগ দেন। অ্যাভিটাসের পতনের পর গলের কিছু রোমান অভিজাত মেজোরিয়ানকে সহজে স্বীকৃতি দেয়নি। একই সঙ্গে ভিসিগথরা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছিল। মেজোরিয়ান একটি বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে গলে প্রবেশ করেন এবং আরেলাতে বা বর্তমান আর্ল অঞ্চলে ভিসিগথদের বিরুদ্ধে সাফল্য অর্জন করেন।

ভিসিগথিক রাজা দ্বিতীয় থিওডোরিককে শেষ পর্যন্ত মেজোরিয়ানের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হয়। এর ফলে দক্ষিণ গলের কিছু অঞ্চলে সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার হয় এবং ভিসিগথদের আবার রোমের মিত্র হিসেবে স্বীকৃত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কারণ বহু বছর ধরে পশ্চিম রোম প্রধানত ভূখণ্ড হারাচ্ছিল; মেজোরিয়ানের অধীনে প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছিল কেন্দ্র আবার সক্রিয়ভাবে হারানো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনছে।

তিনি শুধু যুদ্ধের ওপর নির্ভর করেননি। তাঁর শাসনামলে জারি করা আইনগুলো থেকে বোঝা যায় যে তিনি পশ্চিমের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, আক্রমণ এবং ভূখণ্ড হারানোর ফলে সরকারের করভিত্তি সংকুচিত হয়েছিল। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও কর আদায়ের অনিয়ম রাষ্ট্রের আয় আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছিল।

মেজোরিয়ান করব্যবস্থা সংস্কার, বকেয়া করের সমস্যা মোকাবিলা এবং প্রাদেশিক জনগণের ওপর প্রশাসনিক অত্যাচার কমানোর চেষ্টা করেন। তিনি বুঝেছিলেন যে কৃষক ও ভূমিমালিকদের সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে স্বল্পমেয়াদে কর আদায় করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের করভিত্তিই ধ্বংস হয়ে যায়। তাই তাঁর নীতির মধ্যে রাজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা রক্ষা করার প্রচেষ্টাও দেখা যায়।

রোমের প্রাচীন সরকারি ভবন ও স্মৃতিস্তম্ভ রক্ষার জন্যও তিনি আইন জারি করেন। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে পুরোনো সরকারি স্থাপনা ভেঙে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। মেজোরিয়ান এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। এটি শুধু স্থাপত্য রক্ষার বিষয় ছিল না; রোমান রাষ্ট্রের নাগরিক ও প্রশাসনিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের তাঁর বৃহত্তর ধারণার অংশ হিসেবেও এটিকে দেখা যায়।

তবে তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল উত্তর আফ্রিকা পুনরুদ্ধার। মেজোরিয়ান উপলব্ধি করেছিলেন যে পশ্চিম রোমকে সত্যিকার অর্থে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু গল বা হিস্পানিয়ায় সামরিক সাফল্য যথেষ্ট নয়। কার্থেজ ও আফ্রিকার সমৃদ্ধ প্রদেশগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ সেখানকার কৃষি, ভূমি কর, বাণিজ্য এবং বন্দর থেকে আসা রাজস্ব পশ্চিমা সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বাড়াতে পারত।

৪৩৯ সালে গাইজেরিক কার্থেজ দখলের পর থেকেই ভ্যান্ডাল রাজ্য পশ্চিম রোমের জন্য প্রধান কৌশলগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের নৌবহর পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এবং ৪৫৫ সালে রোম লুণ্ঠন তাদের সামরিক সক্ষমতার নাটকীয় প্রমাণ দিয়েছিল। তাই আফ্রিকা পুনরুদ্ধার করা মানে শুধু হারানো প্রদেশ ফিরে পাওয়া নয়; ভ্যান্ডাল নৌশক্তির কেন্দ্র ধ্বংস করে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমাংশে রোমান আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

এই উদ্দেশ্যে মেজোরিয়ান ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি গল হয়ে হিস্পানিয়ায় অগ্রসর হন এবং সেখানে একটি বড় নৌবহর প্রস্তুত করেন। প্রাচীন সূত্রে জাহাজের সংখ্যা সম্পর্কে অত্যন্ত বড় সংখ্যা দেওয়া হয়েছে, যদিও সেগুলোর নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবুও স্পষ্ট যে অভিযানটি ছিল তাঁর শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রকল্পগুলোর একটি।

পরিকল্পনা ছিল হিস্পানিয়ার উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে উত্তর আফ্রিকায় আক্রমণ করা। সফল হলে গাইজেরিককে কার্থেজ থেকে উৎখাত করা এবং আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারত। সম্ভবত পশ্চিম রোমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজি ছিল এই অভিযান।

গাইজেরিকও বিপদের গুরুত্ব বুঝেছিলেন। তিনি মেজোরিয়ানের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেন বলে জানা যায়, কিন্তু সম্রাট তাঁর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি। ভ্যান্ডাল রাজা তখন সরাসরি সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি এমন কৌশল গ্রহণ করেন, যাতে রোমান অভিযান শুরু হওয়ার আগেই অকার্যকর হয়ে যায়।

৪৬০ সালের দিকে মেজোরিয়ানের নৌবহর হিস্পানিয়ার কার্থাগো নোভা বা বর্তমান কার্তাহেনার কাছাকাছি অবস্থান করছিল। সেখানেই বিপর্যয় ঘটে। ভ্যান্ডালরা রোমান জাহাজের একটি বড় অংশ দখল বা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। প্রাচীন সূত্রে বিশ্বাসঘাতকতার ইঙ্গিত রয়েছে—সম্ভবত গাইজেরিক অর্থের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে প্রভাবিত করেছিলেন। কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত নিশ্চিতভাবে পুনর্গঠন করা কঠিন।

ফলাফল অবশ্য পরিষ্কার ছিল। আফ্রিকা আক্রমণের জন্য তৈরি মেজোরিয়ানের নৌবহর কার্যত অকার্যকর হয়ে যায় এবং পুরো অভিযান বাতিল করতে হয়। কয়েক বছরের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি এক আঘাতে ভেঙে পড়ে।

এই ব্যর্থতা মেজোরিয়ানের পুনরুদ্ধার প্রকল্পের জন্য ছিল মারাত্মক। আফ্রিকা দখল ছাড়া পশ্চিমের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পুনর্গঠন অত্যন্ত কঠিন ছিল। গল ও হিস্পানিয়ায় সামরিক সাফল্য অর্জন করলেও সেখান থেকে দ্রুত এমন রাজস্ব পাওয়া সম্ভব ছিল না, যা সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তিকে আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে পারে। কার্থেজ তখনও গাইজেরিকের হাতে এবং পশ্চিম রোমের অর্থনৈতিক সংকটও অব্যাহত।

মেজোরিয়ান বাধ্য হয়ে গাইজেরিকের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যান এবং পরে ইতালিতে ফিরে আসেন। কিন্তু এবার তাঁর সামনে বাইরের শত্রুর চেয়েও বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছিল—রিসিমার

মেজোরিয়ানের স্বাধীন ও সক্রিয় শাসন রিসিমারের রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে ক্রমেই সংঘর্ষে যাচ্ছিল। সম্রাট কয়েক বছর ধরে ইতালির বাইরে নিজস্ব সেনাবাহিনী নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেছেন, প্রাদেশিক অভিজাতদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন এবং প্রশাসনিক সংস্কার চালিয়েছেন। তিনি সফল হলে পশ্চিম রোমে প্রকৃত সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারত। আর সেটি হলে রিসিমারের মতো সামরিক ক্ষমতাধরের প্রভাব কমে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

আফ্রিকা অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর মেজোরিয়ানের সামরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। তাঁর বাহিনীর একটি অংশকে বিদায় দেওয়া বা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তিনি যখন অল্পসংখ্যক অনুসারী নিয়ে ইতালিতে ফিরছিলেন, তখন রিসিমার সুযোগ গ্রহণ করেন।

৪৬১ সালের আগস্টে তোর্তোনার কাছে মেজোরিয়ানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে সম্রাটের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই হত্যা করা হয়। সরকারি বর্ণনায় তাঁর মৃত্যুকে অসুস্থতার ফল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে রিসিমারের নির্দেশে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়।

মেজোরিয়ানের মৃত্যু পশ্চিম রোমের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতিয়ুসের মতো তিনিও বিদেশি শত্রুর হাতে মারা যাননি। পশ্চিম রোম আবারও নিজের সবচেয়ে সক্ষম নেতাদের একজনকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ধ্বংস করল। মাত্র সাত বছর আগে ভ্যালেন্টিনিয়ান এতিয়ুসকে হত্যা করেছিলেন; এবার রিসিমার মেজোরিয়ানকে সরিয়ে দিলেন।

মেজোরিয়ানের পর রিসিমার লিবিয়াস সেভেরাসকে সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তাঁর শাসন পশ্চিমের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে। পূর্ব রোম তাঁকে স্বীকৃতি দেয়নি, গলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতারাও তাঁর কর্তৃত্ব পুরোপুরি মেনে নেয়নি এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও সংকুচিত হয়।

এখানে মেজোরিয়ানের ব্যর্থতার কারণ শুধু রিসিমারের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল বলা যথেষ্ট নয়। তাঁর পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সামনে আরও গভীর কাঠামোগত সমস্যা ছিল। পশ্চিম রোমের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না, আফ্রিকা হারিয়ে গেছে, গলের ওপর নিয়ন্ত্রণ অসম্পূর্ণ, হিস্পানিয়ায় একাধিক শক্তি সক্রিয় এবং সেনাবাহিনীর বড় অংশ বিভিন্ন ফেডারেট ও আঞ্চলিক সামরিক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল। একজন অত্যন্ত দক্ষ সম্রাটও এই সব সমস্যা কয়েক বছরের মধ্যে সমাধান করতে পারতেন কি না, তা অনিশ্চিত।

তবুও মেজোরিয়ানের শাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ৪৫৭ সালেও পশ্চিম রোম সম্পূর্ণ মৃত রাষ্ট্র ছিল না। শক্তিশালী নেতৃত্ব থাকলে সেনাবাহিনী সংগঠিত করা, গলে অভিযান চালানো, ভিসিগথদের সমঝোতায় বাধ্য করা, হিস্পানিয়ায় সাম্রাজ্যিক উপস্থিতি পুনরুজ্জীবিত করা এবং উত্তর আফ্রিকা পুনর্দখলের জন্য বড় নৌবহর তৈরি করা সম্ভব ছিল।

এই কারণেই তাঁর আফ্রিকা অভিযান ব্যর্থ হওয়া এত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কার্থেজ পুনরুদ্ধার করা যেত, পশ্চিম রোম তার সবচেয়ে মূল্যবান হারানো করভিত্তির একটি ফিরে পেতে পারত। এর অর্থ আরও সেনাবাহিনী, আরও নৌবহর এবং প্রদেশগুলোর ওপর পুনরায় চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা। মেজোরিয়ানের প্রকল্পের কেন্দ্রে তাই একটি পরিষ্কার কৌশল ছিল—প্রথমে সামরিক কর্তৃত্ব পুনর্গঠন, তারপর আফ্রিকার রাজস্ব পুনরুদ্ধার এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে পশ্চিম সাম্রাজ্যকে আবার শক্তিশালী করা।

কিন্তু ইতিহাস উল্টো পথে যায়। নৌবহর হারানোর ফলে আফ্রিকা অভিযান ব্যর্থ হয়; আফ্রিকা হারানো থাকায় আর্থিক দুর্বলতা অব্যাহত থাকে; আর সেই সামরিক ব্যর্থতা রিসিমারকে মেজোরিয়ানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেয়। ফলে একটি সামরিক বিপর্যয় এবং একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড মিলিত হয়ে পশ্চিমের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পুনরুদ্ধার প্রকল্পগুলোর একটির সমাপ্তি ঘটায়।

রিসিমার নিজেও পশ্চিম রোমকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন—এমন সরল সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। তাঁর ক্ষমতা ও মর্যাদাও সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু তিনি এমন একটি পশ্চিম রোম চেয়েছিলেন যেখানে সম্রাটের স্বাধীন ক্ষমতা সীমিত এবং সামরিক রাজনীতির কেন্দ্রে তিনি নিজেই থাকবেন। সমস্যা হলো, পতনের মুখে থাকা একটি সাম্রাজ্যের জন্য দুর্বল সম্রাট হয়তো ক্ষমতাধর সেনাপতির জন্য সুবিধাজনক, কিন্তু রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের জন্য বিপজ্জনক।

মেজোরিয়ানের মৃত্যুর পরও পশ্চিম রোম আরও পনেরো বছর টিকে থাকবে। এমনকি ৪৬৮ সালে পূর্ব রোমের বিশাল সহায়তায় ভ্যান্ডালদের বিরুদ্ধে আরেকটি বৃহৎ অভিযানও পরিচালিত হবে। কিন্তু সেটিও বিপর্যস্ত হবে। ক্রমে পশ্চিমের সম্রাটরা ইতালিকেন্দ্রিক সীমিত রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতীকে পরিণত হবেন, আর প্রকৃত সামরিক শক্তি থাকবে বিভিন্ন সেনাপতি ও তাদের বাহিনীর হাতে।

মেজোরিয়ান তাই পশ্চিম রোমের ‘শেষ সম্রাট’ ছিলেন না, কিন্তু তাঁকে শেষ যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী পুনরুদ্ধারবাদী সম্রাটদের একজন বলা যায়। তাঁর চার বছরের শাসন দেখিয়েছিল যে সাম্রাজ্যকে বাঁচানোর জন্য শুধু সীমান্তে প্রতিরক্ষা যথেষ্ট ছিল না। প্রয়োজন ছিল হারানো রাজস্বভিত্তি ফিরিয়ে আনা, প্রশাসন সংস্কার করা, আঞ্চলিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সম্রাটের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

শেষ পর্যন্ত তিনি এর কোনোটিই স্থায়ীভাবে সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি। ভ্যান্ডাল নৌশক্তি তাঁর আফ্রিকা অভিযান ভেঙে দেয়, পশ্চিমের সীমিত সম্পদ তাঁকে দ্বিতীয়বার একই মাত্রার অভিযান সংগঠনের সুযোগ দেয় না এবং রিসিমারের ক্ষমতার রাজনীতি তাঁর জীবন ও শাসনের অবসান ঘটায়।

মেজোরিয়ানের পতনের ট্র্যাজেডি এখানেই—পশ্চিম রোম তখনও লড়াই করার ক্ষমতা হারায়নি, কিন্তু সফল পুনরুদ্ধারের জন্য যে রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং ধারাবাহিক নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল, সেগুলো একসঙ্গে আর তার হাতে ছিল না। ৪৬১ সালে মেজোরিয়ানের হত্যার সঙ্গে শুধু একজন সম্রাটের শাসন শেষ হয়নি; পশ্চিম সাম্রাজ্যকে নিজের শক্তিতে ব্যাপকভাবে পুনর্গঠনের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল শেষ প্রচেষ্টাগুলোর একটিও ভেঙে পড়েছিল। ৪৭৬ সালের পতন তখনও পনেরো বছর দূরে, কিন্তু সাম্রাজ্যকে সেই পরিণতি থেকে ফিরিয়ে আনার পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।