বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অটোমান গৃহযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মুরাদ: আঙ্কারার বিপর্যয়ের পর সাম্রাজ্যের পুনর্জন্ম

সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস

অটোমান গৃহযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মুরাদ: আঙ্কারার বিপর্যয়ের পর সাম্রাজ্যের পুনর্জন্ম
ধ্বংসের কিনারা থেকে অটোমানদের পুনর্জন্ম

১৪০২ সালের আঙ্কারার যুদ্ধের পর অটোমান রাষ্ট্রের সামনে প্রশ্নটি আর নতুন ভূখণ্ড জয়ের ছিল না; প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্রটি আদৌ টিকে থাকবে কি না। তিমুরের হাতে বায়েজিদ প্রথমের পরাজয় ও বন্দিত্ব কয়েক দশকের অটোমান সম্প্রসারণকে মুহূর্তের মধ্যে উল্টে দিয়েছিল। আনাতোলিয়ায় বায়েজিদের দখল করা বহু তুর্কি বেইলিক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভেঙে পড়ে এবং তার পুত্ররা উত্তরাধিকারের জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। যে অটোমানরা কিছুদিন আগেই কনস্টান্টিনোপলকে চাপে রেখেছিল এবং নিকোপোলিসে ইউরোপীয় ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করেছিল, তারা এখন নিজেদের মধ্যেই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

১৪০২ থেকে ১৪১৩ সাল পর্যন্ত এই সময়কে অটোমান ইতিহাসে ফেতরেত দেবরি, অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকাল নামে পরিচিত করা হয়। বায়েজিদের পুত্রদের মধ্যে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সুলেইমান চেলেবি, ইসা চেলেবি, মুসা চেলেবি এবং মেহমেদ চেলেবি। প্রত্যেকে অটোমান উত্তরাধিকারের দাবিদার ছিলেন এবং প্রত্যেকের হাতে রাষ্ট্রের কোনো না কোনো অঞ্চলের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ছিল।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছিল অটোমান রাষ্ট্রের দুই মহাদেশে বিস্তৃত ভূগোল। আনাতোলিয়ার পরিস্থিতি ছিল একরকম, রুমেলিয়া বা ইউরোপীয় অটোমান ভূখণ্ডের পরিস্থিতি ছিল আরেক রকম। সুলেইমান চেলেবি এদির্নেকে কেন্দ্র করে রুমেলিয়ার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, অন্যদিকে মেহমেদ চেলেবি আনাতোলিয়ার আমাসিয়া অঞ্চলে নিজের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। ইসা পশ্চিম আনাতোলিয়ায় ক্ষমতার জন্য লড়াই করেন এবং মুসাও পরে ইউরোপীয় অটোমান ভূখণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।

এই গৃহযুদ্ধে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং বলকানের অন্যান্য শক্তিও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পেরেছিল, অটোমান রাজপুত্রদের ঐক্য তাদের জন্য বিপজ্জনক, কিন্তু বিভক্ত অটোমান রাষ্ট্র তাদের জন্য সুযোগ। ফলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন রাজপুত্রকে সমর্থন দেওয়া, আশ্রয় দেওয়া বা তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা চলতে থাকে। বাইজেন্টাইন সম্রাটদের জন্য এটি ছিল কয়েক দশক ধরে অটোমান চাপের পর কিছুটা কৌশলগত স্বস্তি পাওয়ার বিরল সুযোগ।

মেহমেদ চেলেবি ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সুবিধা অর্জন করেন। প্রথমে আনাতোলিয়ায় ইসাকে পরাজিত করে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেন। এরপর ইউরোপীয় অংশে ক্ষমতার লড়াই আরও জটিল হয়ে ওঠে। সুলেইমানের বিরুদ্ধে মুসা উঠে দাঁড়ান এবং শেষ পর্যন্ত সুলেইমান নিহত হন। কিন্তু মুসার শাসনও স্থায়ী হয়নি। তার কঠোর নীতি এবং বাইজেন্টাইনদের ওপর চাপ বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন পক্ষ তার বিরুদ্ধে চলে যায়।

মেহমেদ এই পরিস্থিতির সুযোগ নেন। বাইজেন্টাইন সমর্থনসহ বিভিন্ন মিত্রকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুসার বিরুদ্ধে অভিযান চালান। অবশেষে ১৪১৩ সালে মুসা পরাজিত ও নিহত হলে মেহমেদ চেলেবি অটোমান রাষ্ট্রের একক শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি ইতিহাসে সুলতান মেহমেদ প্রথম নামে পরিচিত।

এই মুহূর্তটি অটোমান ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ যে মেহমেদ প্রথমকে কখনো কখনো অটোমান রাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ওসমান প্রথম রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়েছিলেন; কিন্তু আঙ্কারার বিপর্যয় ও এগারো বছরের গৃহযুদ্ধের পর মেহমেদ প্রথমকে কার্যত ভেঙে যাওয়া সেই রাষ্ট্র আবার জোড়া লাগাতে হয়েছিল।

তার প্রধান লক্ষ্য ছিল নতুন বিশাল বিজয় নয়, বরং পুনর্গঠন। আনাতোলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অটোমান কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করা এবং বলকানের ভূখণ্ড ধরে রাখা ছিল তার অগ্রাধিকার। তিনি বুঝেছিলেন যে আঙ্কারার যুদ্ধের আগের বায়েজিদের মতো অত্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারণ করলে আবারও সদ্য একীভূত রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

তবু সমস্যা শেষ হয়নি। মেহমেদের বিরুদ্ধে শেখ বেদরেদ্দিনের সঙ্গে যুক্ত বিদ্রোহ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলন দেখা দেয়। একই সময়ে বায়েজিদের আরেক পুত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া মুস্তাফা চেলেবি অটোমান সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হন। এই মুস্তাফাকে পরবর্তী অটোমান সূত্রে প্রায়ই দুজমেজে মুস্তাফা বা “মিথ্যা মুস্তাফা” বলা হয়েছে, যদিও তার পরিচয়কে শুধু প্রতারক বলে উড়িয়ে দেওয়া ইতিহাসগতভাবে সহজ নয়। তিনি সম্ভবত বায়েজিদের প্রকৃত পুত্রই ছিলেন।

১৪২১ সালে মেহমেদ প্রথম মারা গেলে তার পুত্র দ্বিতীয় মুরাদ সিংহাসনে বসেন। তখনও অটোমান পুনর্গঠন সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল না। নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ সুলতানের বিরুদ্ধে পুরোনো উত্তরাধিকার সংকট আবার ব্যবহার করা হয়। বাইজেন্টাইনরা মুস্তাফাকে সমর্থন করে মুক্ত করে দেয় এবং তিনি রুমেলিয়ায় মুরাদের বিরুদ্ধে গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেন।

কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যে মুস্তাফা ইউরোপীয় অটোমান বাহিনীর একটি অংশের সমর্থন লাভ করেন। কিন্তু মুরাদ দ্বিতীয় দ্রুত পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। মুস্তাফার সমর্থন ভেঙে পড়ে এবং ১৪২২ সালে তাকে ধরে হত্যা করা হয়। এরপর মুরাদের নিজের ছোট ভাই, যাকেও মুস্তাফা বলা হতো, তার নাম ব্যবহার করেও বিদ্রোহ সংগঠিত করা হয়। সেই বিদ্রোহও দমন করা হয়।

এই ঘটনাগুলো দ্বিতীয় মুরাদের শাসনের চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। তিনি এমন একটি রাষ্ট্র পেয়েছিলেন যার স্মৃতিতে আঙ্কারার পরাজয় ও রাজবংশীয় গৃহযুদ্ধ তখনও জীবন্ত। তাই কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব শক্তিশালী রাখা তার জন্য শুধু প্রশাসনিক বিষয় ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

১৪২২ সালে মুরাদ কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন। যদিও তিনি শহরটি দখল করতে পারেননি, এই অভিযান দেখিয়ে দেয় যে মাত্র বিশ বছর আগে তিমুরের আঘাতে বিপর্যস্ত অটোমানরা আবার বাইজেন্টাইন রাজধানীর ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগ করার অবস্থায় ফিরে এসেছে। তবে মুরাদের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমে বলকানে স্থানান্তরিত হয়।

বলকানে অটোমানদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ছিল হাঙ্গেরি, সার্বিয়া এবং ভেনিস। একই সঙ্গে আলবেনিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলেও প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছিল। বিশেষ করে হাঙ্গেরির সামরিক নেতা ইয়ানোশ হুনিয়াদি অটোমানদের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন। তার নেতৃত্বে খ্রিষ্টান বাহিনী একাধিক সংঘর্ষে অটোমানদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।

১৪৪৩–১৪৪৪ সালের তথাকথিত দীর্ঘ অভিযানে হুনিয়াদি ও তার মিত্ররা অটোমান ভূখণ্ডে গভীরভাবে অগ্রসর হয়। কঠিন শীত, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যে মুরাদ শেষ পর্যন্ত আলোচনায় যান। ১৪৪৪ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সাময়িক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সময়ে আনাতোলিয়ার কারামানীয়দের সঙ্গেও তাকে সমস্যার সমাধান করতে হচ্ছিল।

এই পর্যায়ে দ্বিতীয় মুরাদ একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেন—তিনি সিংহাসন তার অল্পবয়সী পুত্র মেহমেদ দ্বিতীয়ের হাতে ছেড়ে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু ইউরোপীয় শক্তিগুলো অটোমান সিংহাসনে এক কিশোর শাসকের উপস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখে। শান্তিচুক্তি ভেঙে নতুন ক্রুসেড সংগঠিত হয়।

হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের রাজা প্রথম ভ্লাদিস্লাভ, হুনিয়াদি এবং অন্যান্য খ্রিষ্টান বাহিনী বলকান অতিক্রম করে কৃষ্ণসাগরের উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়। অটোমান রাষ্ট্র আবারও গুরুতর বিপদের মুখে পড়ে। পরিস্থিতির চাপে মুরাদকে পুনরায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হয়।

১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর ভারনার যুদ্ধ অটোমান পুনরুত্থানের অন্যতম নির্ধারক মুহূর্তে পরিণত হয়। বর্তমান বুলগেরিয়ার ভারনার কাছে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের একটি পর্যায়ে ক্রুসেডারদের সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হলেও রাজা ভ্লাদিস্লাভ সরাসরি অটোমান কেন্দ্রের দিকে আক্রমণ চালিয়ে মারাত্মক ঝুঁকি নেন। তিনি যুদ্ধে নিহত হন এবং তার বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে।

ভারনায় অটোমান বিজয় ১৪০২ সালের আঙ্কারার বিপর্যয়ের পর রাষ্ট্রটির পুনরুত্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক প্রমাণগুলোর একটি। পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপীয় শক্তির সমন্বয়ে গঠিত আরেকটি বড় ক্রুসেড অটোমানদের বলকান থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়।

তবু মুরাদের কাজ তখনও শেষ হয়নি। ১৪৪৮ সালে হুনিয়াদি আবার একটি বড় বাহিনী নিয়ে বলকানে অটোমান শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেন। এবার যুদ্ধক্ষেত্র ছিল সেই কসোভো সমভূমি, যেখানে ১৩৮৯ সালে মুরাদ প্রথমের যুগে অটোমান ও সার্বিয়ান বাহিনীর ঐতিহাসিক সংঘর্ষ ঘটেছিল।

১৪৪৮ সালের দ্বিতীয় কসোভোর যুদ্ধে কয়েক দিনের কঠিন সংঘর্ষের পর হুনিয়াদির বাহিনী পরাজিত হয়। এই বিজয়ের তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত গভীর। ভারনার পর দ্বিতীয় কসোভো দেখিয়ে দেয় যে বলকানে অটোমান আধিপত্য ভাঙতে বৃহৎ স্থলবাহিনী পাঠানোর কৌশলও সফল হচ্ছে না। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অটোমান সামরিক অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়।

দ্বিতীয় মুরাদের সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আনাতোলিয়া ও বলকান—দুই দিকের ভারসাম্য রক্ষা করা। বায়েজিদ প্রথম অত্যন্ত দ্রুত উভয় অঞ্চলে সম্প্রসারণ করেছিলেন এবং তিমুরের আক্রমণের সময় আনাতোলিয়ার সদ্য অধীনস্থ শক্তিগুলোর আনুগত্য ভেঙে পড়েছিল। মুরাদ তুলনামূলকভাবে সতর্কভাবে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনর্গঠন করেন এবং প্রয়োজনে যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনীতি ও সাময়িক সমঝোতাও ব্যবহার করেন।

এই সময়ে অটোমান সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোও আরও পরিণত হচ্ছিল। জানিসারি বাহিনী, কাপিকুলু ব্যবস্থা এবং তিমারভিত্তিক অশ্বারোহী শক্তি সুলতানের সামরিক ক্ষমতাকে আগের সীমান্তযোদ্ধানির্ভর ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত করে। কেন্দ্রীয় প্রশাসন, কর আদায় এবং প্রাদেশিক সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্কও শক্তিশালী হয়। ফলে রাষ্ট্রটি শুধু কোনো শক্তিশালী সুলতানের ব্যক্তিগত অনুসারীদের ওপর নির্ভরশীল থাকেনি।

১৪৫১ সালে দ্বিতীয় মুরাদ মারা গেলে তার পুত্র মেহমেদ দ্বিতীয় আবার সিংহাসনে বসেন। এবার তিনি ১৪৪৪ সালের সেই অনভিজ্ঞ কিশোর নন। তার হাতে যে রাষ্ট্রটি আসে, সেটি আঙ্কারার যুদ্ধের পর বিভক্ত অটোমান রাষ্ট্রের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। আনাতোলিয়ায় কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অনেকটাই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত, বলকানে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীগুলো পরাজিত এবং এদির্নেকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সামরিক-প্রশাসনিক ব্যবস্থা সক্রিয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ভারনা ও দ্বিতীয় কসোভোর বিজয় কনস্টান্টিনোপলের সম্ভাব্য পশ্চিমা সামরিক সহায়তার পথকে অনেক দুর্বল করে দিয়েছিল। বলকানে অটোমান অবস্থান নিরাপদ না হলে মেহমেদ দ্বিতীয়ের পক্ষে বাইজেন্টাইন রাজধানীর বিরুদ্ধে বিশাল অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতো। মুরাদের বিজয় সেই কৌশলগত নিরাপত্তার অনেকটাই তৈরি করে দেয়।

এ কারণেই ১৪৫৩ সালের কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের ইতিহাস শুধু মেহমেদ দ্বিতীয়ের কামান, নৌবহর ও সামরিক প্রতিভা দিয়ে শুরু হয় না। তার পেছনে ছিল প্রায় অর্ধশতাব্দীর এক কঠিন পুনর্গঠনের ইতিহাস। মেহমেদ প্রথম ভেঙে যাওয়া রাষ্ট্রকে আবার একত্র করেছিলেন, আর দ্বিতীয় মুরাদ সেই পুনর্গঠিত রাষ্ট্রকে আবার বলকানের প্রধান সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।

১৪০২ সালে আঙ্কারার প্রান্তরে বায়েজিদ প্রথম বন্দী হওয়ার পর অটোমান রাজবংশের ভবিষ্যৎ একসময় সত্যিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। এগারো বছরের গৃহযুদ্ধ সেই সংকটকে আরও গভীর করেছিল। অথচ মাত্র অর্ধশতাব্দীর মধ্যে একই রাষ্ট্র আবার এমন শক্তি অর্জন করে যে ইউরোপীয় ক্রুসেডার বাহিনীকে ভারনা ও কসোভোতে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

অটোমান সাম্রাজ্যের এই পুনর্জন্ম তাই শুধু কয়েকটি যুদ্ধ জয়ের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল রাজবংশীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব শক্তিশালী করা, সামরিক প্রতিষ্ঠানকে পরিণত করা এবং আনাতোলিয়া ও বলকানের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আঙ্কারার বিপর্যয় অটোমান রাষ্ট্রকে প্রায় ধ্বংস করেছিল; মেহমেদ প্রথম তাকে আবার জোড়া লাগিয়েছিলেন; আর দ্বিতীয় মুরাদ সেই পুনর্গঠিত রাষ্ট্রকে এমন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, যার ওপর তার পুত্র মেহমেদ দ্বিতীয় মাত্র দুই বছর পর ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল জয় করে অটোমান ইতিহাসের নতুন যুগের সূচনা করবেন।


আপনার পছন্দ হতে পারে