কনস্টান্টিনোপল বিজয় ১৪৫৩: দ্বিতীয় মেহমেদ কীভাবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন?
সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস
১৪৫৩: কনস্টান্টিনোপলের ঐতিহাসিক পতন
১৪৫৩ সালের বসন্তে কনস্টান্টিনোপলের বিশাল প্রাচীরের সামনে যখন অটোমান সেনাবাহিনী সমবেত হচ্ছিল, তখন এটি শুধু আরেকটি মধ্যযুগীয় নগর অবরোধ ছিল না। একদিকে ছিল প্রায় এগারো শতাব্দী ধরে টিকে থাকা পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শেষ রাজধানী, অন্যদিকে মাত্র একুশ বছর বয়সী অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ। শহরটি এর আগেও বহুবার অবরোধ সহ্য করেছে। কিন্তু এবার মেহমেদ এমনভাবে স্থলবাহিনী, ভারী কামান, নৌবহর, প্রকৌশল ও রাজনৈতিক প্রস্তুতিকে একত্র করেছিলেন যে কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীন প্রতিরক্ষা প্রথমবারের মতো এক নতুন ধরনের সামরিক শক্তির মুখোমুখি হয়।
দ্বিতীয় মেহমেদ ১৪৫১ সালে তার পিতা দ্বিতীয় মুরাদের মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার অটোমান সিংহাসনে বসেন। তার বয়স কম হলেও কনস্টান্টিনোপল দখলের আকাঙ্ক্ষা ছিল সুস্পষ্ট। শহরটি অটোমানদের জন্য শুধু মর্যাদার লক্ষ্য ছিল না; এর অবস্থান অটোমান রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ঐক্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অটোমানদের বিশাল ভূখণ্ড তখন আনাতোলিয়া ও বলকান—দুই পাশে বিস্তৃত, আর তাদের মাঝখানে বসফরাসের কৌশলগত কেন্দ্র দখল করে ছিল বাইজেন্টাইন রাজধানী।
ততদিনে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামমাত্র সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। একসময়ের বিশাল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের হাতে মূলত কনস্টান্টিনোপল, তার আশপাশের কিছু ভূখণ্ড এবং বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অঞ্চল অবশিষ্ট ছিল। তবু শহরটির প্রতীকী মর্যাদা ছিল অসীম। কনস্টান্টিনোপল ছিল রোমান সাম্রাজ্যিক ঐতিহ্য, অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম এবং ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্যপথের অন্যতম ঐতিহাসিক কেন্দ্র।
মেহমেদ প্রথমেই শহরটিকে কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তুতি নেন। ১৪৫২ সালে বসফরাসের ইউরোপীয় তীরে নির্মাণ করা হয় শক্তিশালী রুমেলি হিসারি দুর্গ। এর বিপরীত এশীয় তীরে আগে থেকেই ছিল বায়েজিদ প্রথমের নির্মিত আনাদোলু হিসারি। ফলে বসফরাস দিয়ে কৃষ্ণসাগর থেকে কনস্টান্টিনোপলে আসা জাহাজের ওপর অটোমানদের নিয়ন্ত্রণ অনেক শক্তিশালী হয়।
রুমেলি হিসারি নির্মাণ ছিল কার্যত যুদ্ধের ঘোষণা। মেহমেদ স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তিনি শহরটিকে বাইরের সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান। একটি ভেনিসীয় জাহাজ অটোমান নির্দেশ অমান্য করলে সেটির বিরুদ্ধে কামান ব্যবহার এবং ক্রুদের কঠোর শাস্তি দেখিয়ে দেয় যে বসফরাসে নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অবরোধের প্রস্তুতির সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল অটোমান ভারী কামান। হাঙ্গেরীয় বা মধ্য ইউরোপীয় কামান নির্মাতা ওরবান মেহমেদের জন্য বিশাল বোমবার্ডসহ বিভিন্ন কামান নির্মাণে সহায়তা করেন। মধ্যযুগীয় দুর্গ অবরোধে কামান তখন নতুন ছিল না, কিন্তু কনস্টান্টিনোপলের বিরুদ্ধে যে মাত্রায় ভারী গোলন্দাজ শক্তি ব্যবহার করা হয়, তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই কামানগুলোর সবচেয়ে বড়গুলো বিশাল পাথরের গোলা নিক্ষেপ করতে পারত। এগুলো চালানো ছিল অত্যন্ত কঠিন; পরিবহন করতে বহু পশু ও শ্রমিকের প্রয়োজন হতো এবং প্রতিটি গোলার পর পুনরায় প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময় লাগত। তবু থিওডোসিয়ান প্রাচীরের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কামান হামলা প্রাচীন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করে।
কনস্টান্টিনোপলের স্থল প্রতিরক্ষার প্রধান শক্তি ছিল বিখ্যাত থিওডোসিয়ান প্রাচীর। পঞ্চম শতাব্দীতে নির্মিত এই বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী আক্রমণ প্রতিহত করেছিল। পরিখা, বাইরের প্রাচীর, অভ্যন্তরীণ বিশাল প্রাচীর ও অসংখ্য টাওয়ার মিলিয়ে এটি মধ্যযুগীয় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দুর্গব্যবস্থা ছিল।
কিন্তু ১৪৫৩ সালে সমস্যাটি ছিল প্রাচীরের চেয়ে জনবল। বাইজেন্টাইন সম্রাট একাদশ কনস্টান্টাইন পালাইওলোগোসের হাতে শহর রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য ছিল না। বিভিন্ন হিসাব ভিন্ন হলেও সাধারণভাবে কয়েক হাজার কার্যকর প্রতিরক্ষাকারীর কথা বলা হয়, যাদের মধ্যে বিদেশি যোদ্ধারাও ছিলেন। তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন জেনোয়ার অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা জিওভান্নি জুস্তিনিয়ানি, যিনি স্থলপ্রাচীরের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশের প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দেন।
অন্যদিকে অটোমান বাহিনী সংখ্যায় অনেক বড় ছিল। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে সমসাময়িক ও পরবর্তী সূত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে, তাই অতিরঞ্জিত কয়েক লক্ষ সৈন্যের দাবি সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত। তবে সন্দেহ নেই যে মেহমেদের বাহিনী প্রতিরক্ষাকারীদের তুলনায় বহু গুণ বড় ছিল এবং এতে নিয়মিত পদাতিক, জানিসারি, অশ্বারোহী, অনিয়মিত বাহিনী, গোলন্দাজ ও প্রকৌশলীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিলের দিকে পূর্ণ অবরোধ শুরু হয়। অটোমান কামানগুলো স্থলপ্রাচীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে গোলাবর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু প্রাচীর এক আঘাতেই ভেঙে পড়েনি। বাইজেন্টাইন ও জেনোয়ান প্রতিরক্ষাকারীরা রাতের অন্ধকারে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মাটি, কাঠ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে মেরামত করত। দিনের বেলা অটোমান কামান যে ক্ষতি করত, রাতেই তার একটি অংশ আবার প্রতিরক্ষাযোগ্য করে তোলা হতো।
শহরের আরেকটি বড় প্রতিরক্ষা ছিল গোল্ডেন হর্নের মুখে টানা বিশাল শিকল। এটি শত্রু নৌবহরকে বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দিত। অটোমান নৌবহর সরাসরি এই প্রতিরক্ষা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হওয়ায় মেহমেদ একটি অসাধারণ কৌশল গ্রহণ করেন।
এপ্রিলের শেষভাগে অটোমানরা বসফরাসের দিক থেকে জাহাজগুলোকে স্থলপথে গালাতার পেছনের উঁচু ভূমি অতিক্রম করিয়ে গোল্ডেন হর্নে নামিয়ে আনে। কাঠের তৈরি প্রস্তুত পথ এবং পিচ্ছিল পদার্থ ব্যবহার করে ছোট ও মাঝারি জাহাজ স্থানান্তর করা হয়। ঠিক কতটি জাহাজ স্থানান্তরিত হয়েছিল তা নিয়ে সূত্রভেদে পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু এর কৌশলগত প্রভাব ছিল বিশাল।
হঠাৎ করেই বাইজেন্টাইনরা দেখতে পেল, যে গোল্ডেন হর্নকে তারা তুলনামূলক নিরাপদ ভেবেছিল, সেখানে অটোমান জাহাজ উপস্থিত। এতে শহরের প্রতিরক্ষাকারীদের আরও দীর্ঘ এলাকায় সৈন্য ছড়িয়ে দিতে হয়। মেহমেদের উদ্দেশ্য শুধু নৌযুদ্ধ জেতা ছিল না; সীমিত বাইজেন্টাইন জনবলকে যত বেশি সম্ভব প্রতিরক্ষাস্থলে ভাগ করে দেওয়াও ছিল তার কৌশলের অংশ।
অবরোধ যত দীর্ঘ হয়, দুই পক্ষের ওপর চাপ তত বাড়তে থাকে। অটোমানরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে প্রাচীরের নিচে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, কিন্তু বাইজেন্টাইনরা পাল্টা সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে অনেক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। অটোমানরা অবরোধযন্ত্র ও আক্রমণও চালায়। প্রতিরক্ষাকারীরা আগুন, গোলা এবং কাছাকাছি লড়াইয়ের মাধ্যমে সেগুলো প্রতিহত করে।
মেহমেদের জন্য সময়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। অবরোধ দীর্ঘ হলে পশ্চিম ইউরোপ থেকে সহায়তাকারী নৌবহর আসতে পারে, অটোমান বাহিনীর মনোবল দুর্বল হতে পারে অথবা বলকান ও আনাতোলিয়ায় রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাই মে মাসের শেষদিকে তিনি একটি সর্বাত্মক চূড়ান্ত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।
২৮ মে শহরের ভেতরে শেষ প্রস্তুতি চলতে থাকে। হাগিয়া সোফিয়ায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রতিরক্ষাকারীরা নিজেদের অবস্থানে ফিরে যায়। অন্যদিকে অটোমান শিবিরেও চূড়ান্ত হামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। রাত গভীর হওয়ার পর এবং ২৯ মে ভোরের আগে অটোমান আক্রমণ শুরু হয়।
মেহমেদের পরিকল্পনা ছিল ধারাবাহিক ঢেউয়ে প্রতিরক্ষাকারীদের ক্লান্ত করা। প্রথমে তুলনামূলক অনিয়মিত বাহিনী আক্রমণ করে। এরপর আরও সংগঠিত আনাতোলীয় সৈন্যদের পাঠানো হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও প্রতিরক্ষাকারীরা অবস্থান ধরে রাখে। কিন্তু তারা ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল এবং প্রাচীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে চাপ বাড়ছিল।
শেষ পর্যায়ে জানিসারিদের আক্রমণে পাঠানো হয়। তখন যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে—জিওভান্নি জুস্তিনিয়ানি গুরুতর আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যান। তার চলে যাওয়া প্রতিরক্ষাকারীদের মনোবলে বড় আঘাত করে। একই সময়ে অটোমানরা প্রাচীরের দুর্বল অংশে প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
অবশেষে প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে এবং অটোমান সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করতে শুরু করে। সম্রাট একাদশ কনস্টান্টাইন শেষ লড়াইয়ে নিহত হন বলে সাধারণভাবে স্বীকৃত, যদিও তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তার মৃত্যু শুধু একজন সম্রাটের মৃত্যু ছিল না—তার সঙ্গে কার্যত শেষ হয়ে যায় কনস্টান্টিনোপলকেন্দ্রিক পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অস্তিত্ব।
১৪৫৩ সালের ২৯ মে কনস্টান্টিনোপল অটোমানদের হাতে চলে যায়। ৩৩০ সালে কনস্টান্টাইন দ্য গ্রেটের হাতে সাম্রাজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত শহরটি এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পর নতুন সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শেষ স্বাধীন ভূখণ্ডগুলোর কিছু তখনও কয়েক বছর টিকে থাকবে, কিন্তু কনস্টান্টিনোপলের পতনের সঙ্গে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মূল রাজনৈতিক ইতিহাসের অবসান ঘটে।
বিজয়ের পর শহরে লুণ্ঠন ও বন্দিত্বের ঘটনা ঘটে, যা মধ্যযুগীয় বিজিত নগরের সাধারণ কিন্তু নির্মম বাস্তবতার অংশ ছিল। পরে মেহমেদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তার লক্ষ্য ছিল শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে রাখা নয়; তিনি কনস্টান্টিনোপলকে নিজের সাম্রাজ্যের প্রধান রাজধানীতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।
হাগিয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। একই সঙ্গে শহরের গ্রিক অর্থোডক্স জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় কাঠামোকেও নতুন অটোমান ব্যবস্থার মধ্যে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। মেহমেদ গেন্নাদিওস স্কোলারিওসকে অর্থোডক্স প্যাট্রিয়ার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে তিনি শহরের খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে নতুন সাম্রাজ্যিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন।
মেহমেদ শহরের জনসংখ্যা পুনর্গঠনের জন্যও সক্রিয় পদক্ষেপ নেন। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে কনস্টান্টিনোপলে বসবাসের জন্য আনা বা উৎসাহিত করা হয়। বাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রাসাদ, কর্মশালা এবং জনকল্যাণমূলক স্থাপনা গড়ে ওঠে। যে শহরটি অবরোধের আগে জনসংখ্যা ও অর্থনীতিতে বহু শতাব্দী আগের গৌরব হারিয়েছিল, সেটিকেই মেহমেদ নতুন অটোমান বিশ্বরাজধানী হিসেবে পুনর্গঠন করতে শুরু করেন।
বিজয়ের পর দ্বিতীয় মেহমেদ “ফাতিহ”—বিজেতা নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তিনি একই সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যিক উত্তরাধিকারের দাবিও করেন এবং কায়সার-ই রুম—রোমের সিজার—ধারণাকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ করেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মেহমেদ নিজেকে শুধু একটি তুর্কি-মুসলিম রাজ্যের বিজয়ী হিসেবে দেখছিলেন না; তিনি কনস্টান্টিনোপলকেন্দ্রিক একটি সর্বজনীন সাম্রাজ্যিক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবেও নিজের শাসনকে উপস্থাপন করছিলেন।
কনস্টান্টিনোপলের পতন ইউরোপে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। খ্রিষ্টান বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক রাজধানী এখন মুসলিম অটোমান শাসকের হাতে। একই সঙ্গে অটোমান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মর্যাদা আমূল বদলে যায়। এটি আর শুধু বলকান ও আনাতোলিয়ার শক্তিশালী রাজ্য নয়; কনস্টান্টিনোপলের মতো বিশ্বখ্যাত রাজধানী নিয়ন্ত্রণকারী সাম্রাজ্যিক শক্তি।
তবে ১৪৫৩ সালকে সরাসরি “মধ্যযুগের শেষ” বা ইউরোপীয় রেনেসাঁর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করা হবে। বাইজেন্টাইন পণ্ডিত ও গ্রিক পাণ্ডুলিপি ইতালিতে এর আগেও পৌঁছাচ্ছিল এবং রেনেসাঁ ইতোমধ্যেই বিকাশমান ছিল। একইভাবে কনস্টান্টিনোপলের পতনের কারণেই ইউরোপীয়রা হঠাৎ সমুদ্রপথে এশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল—এমন সরল ব্যাখ্যাও যথেষ্ট নয়। তবু ১৪৫৩ সালের বিজয় পূর্ব ভূমধ্যসাগরের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেয় এবং অটোমানদের ইউরোপীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় রাজনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করে।
সামরিক ইতিহাসের দিক থেকেও কনস্টান্টিনোপল বিজয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কামান একাই শহরটি জয় করেনি; নৌবহর, স্থলবাহিনী, প্রকৌশলী, অবরোধকৌশল, রসদ এবং মেহমেদের দৃঢ় নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করেছিল। কিন্তু ভারী গোলন্দাজ শক্তি প্রমাণ করেছিল যে শতাব্দীপ্রাচীন বিশাল পাথরের দুর্গপ্রাচীরও নতুন বারুদের যুগে আর আগের মতো অজেয় নয়। ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার দুর্গনির্মাণ এবং অবরোধযুদ্ধের ভবিষ্যৎ এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ছিল অটোমান রাষ্ট্রের নিজের মধ্যে। ওসমান প্রথমের ছোট সীমান্ত বেইলিক, ওরহানের বুরসাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র, মুরাদ প্রথমের বলকান সম্প্রসারণ, বায়েজিদের উত্থান ও আঙ্কারার বিপর্যয় এবং দ্বিতীয় মুরাদের পুনর্গঠনের দীর্ঘ পথ ১৪৫৩ সালে এসে একটি নতুন সাম্রাজ্যিক পর্যায়ে প্রবেশ করে।
মাত্র একুশ বছর বয়সে সিংহাসনে ফিরে আসা দ্বিতীয় মেহমেদ দুই বছরের মধ্যে এমন একটি নগর দখল করেছিলেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী অসংখ্য আক্রমণ প্রতিহত করেছিল। কিন্তু তার প্রকৃত সাফল্য শুধু প্রাচীর ভাঙার মধ্যে ছিল না। তিনি বুঝেছিলেন যে কনস্টান্টিনোপল দখল মানে একটি শহর অর্জন নয়—ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে নতুন অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা।
২৯ মে ১৪৫৩ তাই একই সঙ্গে একটি সমাপ্তি এবং একটি সূচনা। কনস্টান্টিনোপলের পতনের মাধ্যমে পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের অবসান ঘটে; আর সেই একই শহর থেকে দ্বিতীয় মেহমেদের অটোমান রাষ্ট্র একটি নতুন সাম্রাজ্যিক যুগে প্রবেশ করে। পরবর্তী শতাব্দীতে যে শক্তি বলকান, কৃষ্ণসাগর, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, ১৪৫৩ সালের কনস্টান্টিনোপল বিজয় সেই অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটিতে পরিণত হয়।
৪৬৮ সালের বিপর্যয় থেকে রোমুলাস অগাস্টুলাস: ব্যর্থ আফ্রিকা অভিযান, পুতুল সম্রাট ও পশ্চিম রোমের শেষ অধ্যায়
মেজোরিয়ান, রিসিমার ও শেষ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা: পশ্চিম রোমকে বাঁচানোর শক্তিশালী প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
এতিয়ুসের হত্যা থেকে ৪৫৫ সালে রোম লুণ্ঠন: রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও ভ্যান্ডাল আক্রমণ কীভাবে সাম্রাজ্যকে বিপর্যস্ত করেছিল?
কসোভোর যুদ্ধ ও বায়েজিদ প্রথম: বলকান জয়, আঙ্কারার বিপর্যয় ও অটোমান সাম্রাজ্যের সংকট
ইউরোপে অটোমানদের প্রবেশ: গ্যালিপোলি থেকে এদির্নে বিজয় ও বলকানে আধিপত্যের সূচনা
ওরহান গাজী ও বুরসা বিজয়: ছোট বেইলিক থেকে শক্তিশালী অটোমান রাষ্ট্রের উত্থান