রিচার্ড তৃতীয় কি সত্যিই দুই রাজপুত্রকে হত্যা করেছিলেন? ইতিহাসের বিতর্কিত রহস্য
Series: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য
- Author: Admin
- August 30, 2026
রিচার্ড তৃতীয় কি সত্যিই দুই রাজপুত্রকে হত্যা করেছিলেন?
ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এমন খুব কম শাসক আছেন, যাঁর নামের সঙ্গে একটি অপ্রমাণিত হত্যাকাণ্ড এত গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে যতটা তৃতীয় রিচার্ডের সঙ্গে। পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাঁকে এমন এক রাজা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি ইংল্যান্ডের মুকুট নিশ্চিত করতে নিজের দুই কিশোর ভাতিজাকে টাওয়ার অব লন্ডনের ভেতরে গোপনে হত্যা করিয়েছিলেন। পরবর্তী ইতিহাস, সাহিত্য এবং বিশেষ করে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটক এই ধারণাকে এত শক্তিশালী করেছে যে অনেকের কাছে রিচার্ডের অপরাধ প্রায় প্রতিষ্ঠিত সত্যের মতো মনে হয়।
কিন্তু সমস্যাটি হলো—রিচার্ড তৃতীয় যে দুই রাজপুত্রকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার কোনো চূড়ান্ত প্রত্যক্ষ প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।
তাহলে তিনি কি সত্যিই হত্যাকারী ছিলেন? নাকি বিজয়ী টিউডর রাজবংশ রাজনৈতিকভাবে পরাজিত একজন রাজাকে ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত খলনায়কে পরিণত করেছিল?
রহস্যটির কেন্দ্রে থাকা দুই শিশু ছিল রাজা চতুর্থ এডওয়ার্ডের পুত্র—পঞ্চম এডওয়ার্ড এবং রিচার্ড অব শ্রুসবেরি, ডিউক অব ইয়র্ক। ১৪৮৩ সালের এপ্রিলে চতুর্থ এডওয়ার্ডের আকস্মিক মৃত্যুর পর মাত্র ১২ বছর বয়সী এডওয়ার্ড ইংল্যান্ডের রাজা হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক রাজা মানেই ক্ষমতার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা।
একদিকে ছিল এডওয়ার্ডের মা এলিজাবেথ উডভিলের শক্তিশালী পরিবার। অন্যদিকে ছিলেন মৃত রাজার ছোট ভাই রিচার্ড, ডিউক অব গ্লস্টার। চতুর্থ এডওয়ার্ডের জীবদ্দশায় রিচার্ড তাঁর ভাইয়ের প্রতি তুলনামূলকভাবে অনুগত ছিলেন এবং উত্তর ইংল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মৃত রাজার পর রিচার্ড দ্রুত নতুন রাজার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চম এডওয়ার্ডকে লন্ডনে আনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত টাওয়ার অব লন্ডনে রাখা হয়। কিছুদিন পর তাঁর ছোট ভাইকেও সেখানে নিয়ে আসা হয়।
আজ টাওয়ারকে প্রধানত কারাগার হিসেবে মনে করা হলেও তখন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় দুর্গ ও আবাসস্থলও ছিল। তাই ভবিষ্যৎ রাজাকে সেখানে রাখা প্রথমদিকে নিজে থেকেই অস্বাভাবিক ছিল না।
কিন্তু এরপর ঘটনাপ্রবাহ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
দাবি ওঠে, চতুর্থ এডওয়ার্ড এলিজাবেথ উডভিলকে বিয়ে করার আগেই অন্য এক নারীর সঙ্গে বিবাহের বৈধ প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ ছিলেন। ফলে এলিজাবেথের সঙ্গে তাঁর বিয়ে অবৈধ এবং তাঁদের সন্তানরাও সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী নয়—এমন যুক্তি সামনে আনা হয়।
এরপর রিচার্ডকে রাজা হওয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং ১৪৮৩ সালের জুলাইয়ে তিনি তৃতীয় রিচার্ড হিসেবে অভিষিক্ত হন।
পরবর্তী সময়ে Titulus Regius আইনের মাধ্যমে তাঁর সিংহাসনের দাবিকে আনুষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া হয়।
এখান থেকেই রিচার্ডের বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালী যুক্তিটি তৈরি হয়—উদ্দেশ্য।
দুই রাজপুত্র জীবিত থাকলে তারা রিচার্ডের জন্য বিপজ্জনক ছিল। আইন করে তাদের অবৈধ ঘোষণা করা হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটি যথেষ্ট ছিল না। রিচার্ডের বিরোধীরা পঞ্চম এডওয়ার্ডকে বৈধ রাজা ঘোষণা করে বিদ্রোহ করতে পারত। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে রাজবংশীয় দাবি সামরিক সংঘর্ষের শক্তিশালী ভিত্তি ছিল।
তাই রাজপুত্রদের মৃত্যু হলে রিচার্ড সরাসরি উপকৃত হতেন।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সুযোগ।
দুই শিশু এমন একটি দুর্গে ছিল যা রিচার্ডের সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। তাদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং বাইরে যাওয়ার সুযোগ রাজকীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল। কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে টাওয়ারে প্রবেশ করে দুই রাজপুত্রকে গোপনে হত্যা করা সহজ ছিল না।
অর্থাৎ রিচার্ডের কাছে উদ্দেশ্যও ছিল, সুযোগও ছিল।
কিন্তু এখানেই ইতিহাসবিদকে গোয়েন্দার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হয়—উদ্দেশ্য ও সুযোগ অপরাধ প্রমাণ করে না।
১৪৮৩ সালের গ্রীষ্মে দুই রাজপুত্রকে টাওয়ারের আশপাশে দেখা যাওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। তারপর তাদের জনসমক্ষে উপস্থিতি ক্রমশ কমে আসে। বছরের শেষ দিকে তারা কার্যত অদৃশ্য।
এবং খুব দ্রুত গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
এই মুহূর্তে রিচার্ডের আচরণ তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরোক্ষ প্রশ্ন তৈরি করে। যদি রাজপুত্ররা জীবিত থাকত, তাহলে তিনি কেন তাদের জনসমক্ষে এনে হত্যার গুজব বন্ধ করেননি?
রিচার্ড কখনো এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রকাশ্য প্রদর্শন করেননি যা প্রমাণ করত তাঁর দুই ভাতিজা নিরাপদে জীবিত আছে।
এটি সন্দেহজনক, কিন্তু তবুও চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কারণ আমরা জানি না রাজপুত্রদের সুনির্দিষ্ট ভাগ্য কী ছিল বা রাজদরবারের ভেতরে তখন কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল।
রিচার্ডের বিরুদ্ধে বহুল পরিচিত হত্যার বিবরণ আসে অনেক পরে।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্যার থমাস মোরের লেখা। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, রিচার্ড প্রথমে টাওয়ারের লেফটেন্যান্টের মাধ্যমে রাজপুত্রদের হত্যা করানোর চেষ্টা করেন। পরে স্যার জেমস টায়রেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তাঁর লোকেরা রাতে ঘুমন্ত দুই শিশুকে হত্যা করে।
এই কাহিনি পরবর্তী শতাব্দীতে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
কিন্তু সমস্যা রয়েছে।
মোর জন্মেছিলেন ১৪৭৮ সালে। রাজপুত্রদের অন্তর্ধানের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছরের কাছাকাছি। তিনি ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না এবং তাঁর বিবরণ লেখা হয়েছিল বহু বছর পরে, টিউডর শাসনের পরিবেশে।
আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, টায়রেলের কথিত স্বীকারোক্তির কোনো আসল নথি আমাদের হাতে নেই।
সপ্তম হেনরির শাসনামলে টায়রেলকে ১৫০২ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে বলা হয়, তিনি রাজপুত্রদের হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর নিজের স্বাক্ষর করা স্বীকারোক্তি বা জিজ্ঞাসাবাদের নির্ভরযোগ্য পূর্ণ নথি টিকে নেই।
তাই টায়রেল তত্ত্ব সম্ভব, কিন্তু প্রমাণিত নয়।
এরপর আসে আরেক সম্ভাব্য সন্দেহভাজন—হেনরি স্ট্যাফোর্ড, ডিউক অব বাকিংহাম।
১৪৮৩ সালে রিচার্ডের ক্ষমতা দখলের সময় বাকিংহাম তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী এবং রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। টাওয়ারের রাজপুত্রদের সরিয়ে দিলে রিচার্ডের সরকার আরও নিরাপদ হবে—এটি তাঁর বোঝার কথা।
তাই একটি তত্ত্ব হলো, বাকিংহাম হয়তো রিচার্ডের নির্দেশ ছাড়াই রাজপুত্রদের হত্যা করিয়েছিলেন, হয় নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে, নয়তো নতুন রাজার প্রতি আনুগত্য প্রমাণের জন্য।
কিন্তু এই তত্ত্বের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা—প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।
আরও রহস্যময় বিষয় হলো, কয়েক মাসের মধ্যেই বাকিংহাম রিচার্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। কেন তাঁদের সম্পর্ক এত দ্রুত ভেঙে গেল, সেটিও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
তৃতীয় বহুল আলোচিত সন্দেহভাজন হেনরি টিউডর, যিনি ১৪৮৫ সালে রিচার্ডকে পরাজিত করে সপ্তম হেনরি হন।
রাজপুত্ররা জীবিত থাকলে হেনরির সিংহাসনের দাবি দুর্বল হয়ে যেত। পঞ্চম এডওয়ার্ড তাঁর তুলনায় অনেক শক্তিশালী ইয়র্কীয় উত্তরাধিকারী ছিলেন। তাই হেনরিরও সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ছিল।
কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুযোগ ও সময়।
১৪৮৩ সালে হেনরি ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন না। তিনি নির্বাসিত অবস্থায় ছিলেন এবং টাওয়ার অব লন্ডনে তাঁর কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। যদি রাজপুত্ররা ১৪৮৩ সালেই মারা গিয়ে থাকে, তাহলে হেনরি সরাসরি হত্যাকারী হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত দুর্বল।
তবে টিউডরদের ভূমিকা অন্য জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ—রিচার্ডের পরবর্তী ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি নির্মাণে।
১৪৮৫ সালের বসওয়ার্থের যুদ্ধে রিচার্ড নিহত হন। হেনরি টিউডর বিজয়ী হন এবং নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বৈধতা শক্তিশালী করতে পরাজিত রিচার্ডকে একজন দখলদার ও অত্যাচারী হিসেবে দেখানো রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ছিল।
পরবর্তী টিউডর ইতিহাসচর্চায় রিচার্ডের নেতিবাচক চিত্র আরও শক্তিশালী হয়।
তারপর আসেন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার।
তাঁর Richard III নাটকে রিচার্ড একজন অসাধারণ নাটকীয় খলনায়ক—কৌশলী, নির্মম, বিকৃত এবং ক্ষমতার জন্য হত্যা করতে দ্বিধাহীন। সাহিত্য হিসেবে চরিত্রটি অসাধারণ সফল। কিন্তু নাটকটি রিচার্ডের মৃত্যুর এক শতাব্দীরও বেশি পরে লেখা এবং ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিচারিক নথি নয়।
শেক্সপিয়ারের রিচার্ড এত শক্তিশালী সাংস্কৃতিক চরিত্র হয়ে ওঠে যে বাস্তব রিচার্ডকে তার ছায়া থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়।
এই সমস্যার একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ পাওয়া যায় রিচার্ডের শারীরিক চেহারা নিয়ে।
টিউডর ও পরবর্তী সাহিত্যে তাঁকে বিকৃতদেহী মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ২০১২ সালে ইংল্যান্ডের লেস্টারে একটি পার্কিং এলাকার নিচে তাঁর কঙ্কাল আবিষ্কৃত হওয়ার পর আধুনিক বিশ্লেষণে দেখা যায় তাঁর স্কোলিওসিস ছিল। মেরুদণ্ড বাঁকা হলেও পরবর্তী নাটকীয় বর্ণনার অনেক অংশ অতিরঞ্জিত।
২০১৩ সালে ডিএনএসহ বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে কঙ্কালটির পরিচয় অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে রিচার্ড তৃতীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই আবিষ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—রিচার্ড সম্পর্কে শতাব্দী ধরে প্রচলিত সব বিবরণকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যায় না।
কিন্তু তাই বলে কি তিনি রাজপুত্রদের হত্যার অভিযোগ থেকেও মুক্ত?
না। তাঁর বিরুদ্ধে পরিস্থিতিগত প্রমাণ এখনও শক্তিশালী।
দুই রাজপুত্র তাঁর হেফাজতে অদৃশ্য হয়েছিল। তাদের মৃত্যু তাঁর সিংহাসনকে নিরাপদ করত। তারা অদৃশ্য হওয়ার পর তিনি তাদের জীবিত থাকার প্রমাণ দেননি। এবং তাঁর সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অত্যন্ত নিরাপদ স্থানে তাদের রাখা হয়েছিল।
এই কারণেই বহু ইতিহাসবিদ এখনও রিচার্ডকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য দায়ী ব্যক্তি মনে করেন।
কিন্তু রহস্যের সবচেয়ে আলোচিত বস্তুগত প্রমাণ আসে তাঁর মৃত্যুর প্রায় দুই শতাব্দী পরে।
১৬৭৪ সালে টাওয়ার অব লন্ডনের হোয়াইট টাওয়ারের একটি সিঁড়ির কাছে নির্মাণকাজের সময় কিছু মানব অস্থি আবিষ্কৃত হয়। সেগুলো দুই শিশুর বলে মনে করা হয় এবং দ্রুত ধারণা করা হয় যে এগুলোই হারিয়ে যাওয়া রাজপুত্রদের দেহাবশেষ।
রাজা দ্বিতীয় চার্লসের নির্দেশে অস্থিগুলো ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাহিত করা হয়।
১৯৩৩ সালে সেগুলো পরীক্ষা করা হয়েছিল। পরীক্ষকেরা ধারণা করেছিলেন অস্থিগুলো উপযুক্ত বয়সের দুই শিশুর হতে পারে। কিন্তু সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আজকের ফরেনসিক মানের তুলনায় সীমিত ছিল। অস্থিগুলো দুই ছেলে শিশুর কি না, তারা পরস্পরের ভাই কি না কিংবা তারা সত্যিই চতুর্থ এডওয়ার্ডের সন্তান কি না—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অতএব টাওয়ারে পাওয়া অস্থি এখনও প্রমাণিতভাবে পঞ্চম এডওয়ার্ড ও তাঁর ভাইয়ের নয়।
আধুনিক ডিএনএ বিশ্লেষণ একদিন এই রহস্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিক রাজকীয় সমাধি খোলা, নমুনা সংগ্রহ এবং উপযুক্ত বংশগত তুলনামূলক ডিএনএ নির্ধারণ—সবই জটিল বিষয়।
এখানে আরও একটি সমস্যা রয়েছে।
ধরে নেওয়া যাক, ভবিষ্যতে প্রমাণ হলো অস্থিগুলো সত্যিই দুই রাজপুত্রের। তাতেও হত্যাকারীর পরিচয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানা যাবে না।
দেহাবশেষ পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে, সম্ভব হলে মৃত্যুর কিছু তথ্যও দিতে পারে; কিন্তু কে নির্দেশ দিয়েছিল—সেটি জানতে ঐতিহাসিক নথির প্রয়োজন হবে।
তাহলে রিচার্ডের পক্ষে যুক্তি কী?
তাঁর সমর্থকেরা বলেন, রাজপুত্রদের হত্যা তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণও ছিল। তাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি শিশু হত্যাকারী হিসেবে ঘৃণার লক্ষ্য হতে পারেন—যা বাস্তবেই ঘটেছিল। জীবিত কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য ঘোষিত অবস্থায় তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়তো তাঁর জন্য নিরাপদ হতে পারত।
তারা আরও বলেন, রিচার্ডের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি হত্যার নির্দেশ নেই, টায়রেলের কথিত স্বীকারোক্তি অনুপস্থিত এবং পরবর্তী টিউডর সূত্রগুলো নিরপেক্ষ ছিল না।
এই যুক্তিগুলো উপেক্ষা করা যায় না।
অন্যদিকে তাঁর বিরোধীদের প্রশ্নও শক্তিশালী—রাজপুত্ররা যদি তাঁর নির্দেশে নিহত না হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন টাওয়ারে তারা কীভাবে অদৃশ্য হলো? অন্য কেউ হত্যা করলে রাজা কি তা জানতে পারেননি? আর জানলে হত্যাকারীকে প্রকাশ্যে শাস্তি দিয়ে নিজের নাম পরিষ্কার করেননি কেন?
এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর নেই।
এ কারণেই রহস্যটির সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ঐতিহাসিক অবস্থান হলো—রিচার্ড তৃতীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভবত প্রধান সন্দেহভাজন, কিন্তু তাঁর অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।
আর এখানেই “প্রিন্সেস ইন দ্য টাওয়ার” রহস্য সাধারণ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব থেকে আলাদা।
এটি এমন কোনো গল্প নয় যেখানে প্রচুর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কল্পিত রহস্য তৈরি করা হয়েছে। এখানে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হারিয়ে গেছে। দুই রাজপুত্রের নিশ্চিত দেহাবশেষ নেই, মৃত্যুর তারিখ নেই, প্রত্যক্ষ হত্যাকারীর নির্ভরযোগ্য স্বীকারোক্তি নেই এবং রাজকীয় নির্দেশও নেই।
ফলে ইতিহাসবিদদের কাজ হলো সম্ভাবনা বিচার করা—নিশ্চিততা তৈরি করা নয়।
রিচার্ডের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য ছিল। সুযোগ ছিল। রাজনৈতিক লাভ ছিল। পরিস্থিতিগত প্রমাণও রয়েছে। কিন্তু পাঁচ শতাব্দী পরও সেই একটি দলিল পাওয়া যায়নি, যা তাঁকে সন্দেহভাজন থেকে নিশ্চিত হত্যাকারীতে পরিণত করতে পারে।
সম্ভবত কোনো এক রাতে টাওয়ার অব লন্ডনের পাথরের দেয়ালের ভেতরে দুই কিশোর রাজপুত্রের জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। হয়তো নির্দেশ এসেছিল ইংল্যান্ডের নতুন রাজার কাছ থেকে। হয়তো তাঁর কোনো উচ্চাভিলাষী সহযোগী নিজের উদ্যোগে কাজ করেছিল। অথবা ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া কোনো ঘটনা আমাদের পরিচিত সব তত্ত্বকেই ভুল প্রমাণ করতে পারে।
তৃতীয় রিচার্ড ১৪৮৫ সালে বসওয়ার্থের যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর রাজবংশ হারিয়েছে, তাঁর কবরও কয়েক শতাব্দীর জন্য হারিয়ে গিয়েছিল—শেষ পর্যন্ত সেটি খুঁজে পাওয়া গেছে।
কিন্তু তাঁর দুই ভাতিজার ভাগ্য এখনও অন্ধকারে।
রিচার্ডের কঙ্কাল মাটির নিচ থেকে ফিরে এসে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছে; কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটির উত্তর দিতে পারেনি—তিনি কি সত্যিই নিজের সিংহাসন রক্ষার জন্য দুই শিশুকে হত্যা করিয়েছিলেন?
আজও তার সবচেয়ে নির্ভুল উত্তর হলো—সম্ভবত তিনি দায়ী ছিলেন, কিন্তু ইতিহাস এখনও তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো চূড়ান্ত প্রমাণ খুঁজে পায়নি।
হিন্টারকাইফেক হত্যাকাণ্ড: নির্জন জার্মান খামারে একই পরিবারের ছয়জনকে কে হত্যা করেছিল?
ডি. বি. কুপার রহস্য: বিমান ছিনতাইয়ের পর মুক্তিপণের টাকা নিয়ে প্যারাসুটে ঝাঁপ দেওয়া লোকটি কোথায় হারিয়ে গেল?
তুতানখামুনের অভিশাপ: সমাধি আবিষ্কারের পর রহস্যময় মৃত্যুগুলো কি শুধুই কাকতালীয়?
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের অন্তর্ধান: পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে গিয়ে বিখ্যাত বৈমানিকের কী হয়েছিল?
ফ্ল্যানান দ্বীপের বাতিঘর: তিন বাতিঘররক্ষক একই রাতে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন?
জোডিয়াক কিলার: সাংকেতিক বার্তা পাঠানো রহস্যময় খুনির আসল পরিচয় কী ছিল?