নেপোলিয়নের মিশর অভিযান: পিরামিডের বিজয় থেকে একরের ব্যর্থতা
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
মিশরে স্থলবিজয়ের পরও সমুদ্র ও দুর্গের বাধায় আটকে যায় নেপোলিয়নের স্বপ্ন।
ইতালির বিজয়ী সেনাপতি ফ্রান্সে ফিরে যে নতুন অভিযানের দিকে তাকিয়েছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল ভূমধ্যসাগরের ওপারে মিশর। ১৭৯৮ সালে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ পরিচালনার বাস্তব অসুবিধা নেপোলিয়নের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফরাসি নৌবাহিনী ইংলিশ চ্যানেলে নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে পারছিল না। তিনি তাই ব্রিটিশ শক্তিকে অন্য দিক থেকে আঘাত করার প্রস্তাব দেন। মিশর দখল করলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ফরাসি প্রভাব বাড়বে এবং ভারতের সঙ্গে ব্রিটিশ যোগাযোগ ও বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলা যাবে—এমন প্রত্যাশাই অভিযানের প্রধান যুক্তি ছিল।
তবে মিশর দখল করলেই ব্রিটিশ ভারতের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত না। ব্রিটেনের প্রধান সমুদ্রপথ তখন আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলত। মিশর ছিল সম্ভাব্য পূর্বমুখী সম্প্রসারণের ঘাঁটি এবং বিকল্প যোগাযোগপথের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। নেপোলিয়নের পরিকল্পনায় বাস্তব কৌশলের পাশাপাশি প্রাচ্যের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার কল্পনাও ছিল। ডিরেক্টরি সরকার অভিযান অনুমোদন করে; এতে ব্রিটেনকে চাপে ফেলার সুযোগ ছিল, আবার অত্যন্ত জনপ্রিয় সেনাপতিকে প্যারিস থেকে দূরে রাখার রাজনৈতিক সুবিধাও ছিল। অভিযানের শুরু থেকেই রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
১৭৯৮ সালের মে মাসে তুলোঁ থেকে ফরাসি বহর যাত্রা করে। প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার সৈন্যের পাশাপাশি অভিযানে যোগ দেন দেড় শতাধিক গবেষক, প্রকৌশলী, শিল্পী ও বিভিন্ন বিদ্যার বিশেষজ্ঞ। পথে জুন মাসে মাল্টা দখল করে ফরাসিরা। এরপর ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল হোরেশিও নেলসনের অনুসন্ধান এড়িয়ে বহর মিশরে পৌঁছায়। জুলাইয়ের শুরুতে আলেকজান্দ্রিয়া দখলের পর নেপোলিয়ন কায়রোর দিকে অগ্রসর হন। মানচিত্রে এই যাত্রা সহজ মনে হলেও প্রচণ্ড গরম, পানির অভাব এবং মরুভূমিতে চলাচলের কষ্ট সৈন্যদের দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে।
মিশর তখন আনুষ্ঠানিকভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ, কিন্তু বাস্তবে মামলুক নেতারা ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করতেন। নেপোলিয়ন নিজেকে তাঁদের অত্যাচার থেকে মিশরীয়দের মুক্তিদাতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। ঘোষণায় ইসলাম ও স্থানীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানোর কথাও বলা হয়। কিন্তু বিদেশি সেনাবাহিনীর দখল, কর আদায় এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা এই প্রচারণার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করেছিল। মামলুক শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ তাই স্থানীয় জনগণের সর্বসম্মত সমর্থনে পরিচালিত কোনো মুক্তিযুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল ফরাসি সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভিযান।
২১ জুলাই কায়রোর কাছে ইমবাবার অঞ্চলে সংঘটিত হয় পিরামিডের যুদ্ধ। নামটি বিখ্যাত হলেও প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র গিজার পিরামিডের পাদদেশে ছিল না। মুরাদ বেয়ের মামলুক অশ্বারোহীরা দক্ষ ও সাহসী হলেও ফরাসিদের সুশৃঙ্খল পদাতিক, কামান এবং সমন্বিত গোলাবর্ষণের বিরুদ্ধে সমস্যায় পড়ে। নেপোলিয়ন তাঁর ডিভিশনগুলোকে বড় বর্গাকার প্রতিরক্ষা বিন্যাসে সাজান। বাইরের সারির সৈন্যরা বিভিন্ন দিক থেকে আসা আক্রমণ ঠেকাতে পারে; ভেতরে সরঞ্জাম ও অন্যান্য সদস্য আশ্রয় পায়। কামানও এই বিন্যাসের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মামলুক অশ্বারোহীদের আক্রমণ ফরাসি গোলাবর্ষণে ভেঙে যায়। ইমবাবার প্রতিরক্ষাস্থানও ফরাসিদের হাতে পড়ে এবং বহু প্রতিপক্ষ পালানোর সময় নীল নদে ডুবে মারা যায়। বিজয়ের পর কায়রো দখল করা সম্ভব হয়। পিরামিডের যুদ্ধ দেখায়, ব্যক্তিগত অশ্বারোহী বীরত্বের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলিত পদাতিক ও কামানের সমন্বয় কতটা কার্যকর হতে পারে। নেপোলিয়নের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, কিন্তু মামলুক প্রতিরোধ সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, মিশরের শহর দখল করলেও ফ্রান্সের সঙ্গে যোগাযোগের নিরাপত্তা তখনো নৌবহরের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সেই দুর্বলতা প্রকাশ পায় ১ আগস্ট আবুকির উপসাগরে। ফরাসি অ্যাডমিরাল ব্রুয়েসের বহর উপকূলের কাছে নোঙর করে ছিল। নেলসন এসে আক্রমণ করলে ব্রিটিশ জাহাজগুলো ফরাসি সারির সামনের অংশকে দুই দিক থেকে আঘাত করার সুযোগ পায়। অগভীর জলের দিক দিয়ে শত্রু ঢুকতে পারবে না—ফরাসিদের এই নিরাপত্তাবোধ ভুল প্রমাণিত হয়। সন্ধ্যা থেকে রাতভর যুদ্ধ চলে। ফরাসি প্রধান জাহাজ লরিয়াঁয় আগুন ধরে এবং বিপুল বিস্ফোরণে সেটি ধ্বংস হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ফরাসি যুদ্ধজাহাজগুলোর অধিকাংশ দখল বা ধ্বংস করা হয়।
ইতিহাসে নীল নদের যুদ্ধ নামে পরিচিত এই সংঘর্ষ আসলে নীল নদে নয়, ভূমধ্যসাগরের আবুকির উপসাগরে ঘটেছিল। এর ফল ছিল অভিযানের জন্য বিপর্যয়কর। নেপোলিয়নের স্থলবাহিনী মিশরে বিজয়ী হলেও নিরাপদে সরঞ্জাম, নতুন সৈন্য ও নির্দেশ পাওয়ার পথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবুকিরের নৌপরাজয় মিশরকে সম্ভাব্য সম্প্রসারণের ঘাঁটি থেকে বিচ্ছিন্ন সামরিক অবস্থানে পরিণত করে। একই সঙ্গে উসমানীয় সরকার ফরাসি আক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। নেপোলিয়ন এখন শুধু মামলুকদের নয়, ব্রিটিশ নৌক্ষমতা ও উসমানীয় পাল্টা অভিযানেরও মুখোমুখি।
কায়রোতে ফরাসিরা স্থানীয় পরামর্শ পরিষদ গঠন এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের চেষ্টা করে। গবেষকেরা মিশরের ভূগোল, প্রাচীন স্থাপনা ও সমকালীন সমাজ নিয়ে কাজ শুরু করেন। কিন্তু কর, সামরিক উপস্থিতি ও ধর্মীয় উদ্বেগ থেকে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। অক্টোবরের কায়রো বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করা হয়; আল-আজহার এলাকাও সামরিক অভিযানের শিকার হয়। এই ঘটনা ফরাসিদের ঘোষিত সম্মান ও বাস্তব দখলদারির দূরত্ব স্পষ্ট করে। স্থানীয় সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শাসন কঠিন হলেও নেপোলিয়ন ক্রমেই সামরিক বলের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।
১৭৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সিনাই পেরিয়ে উসমানীয় সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে অগ্রসর হন। উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য শত্রু আক্রমণকে আগেই বাধা দেওয়া এবং নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা। এল-আরিশ ও গাজা পেরিয়ে ফরাসিরা মার্চে জাফা দখল করে। সেখানে বন্দি কয়েক হাজার উসমানীয় সৈন্যকে হত্যা করা হয়, যা অভিযানের অন্যতম গুরুতর নৃশংসতা। একই সময়ে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। অসুস্থতা, আহত সৈন্য এবং দীর্ঘ সরবরাহপথ বাহিনীর সামর্থ্য কমাতে থাকে। দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা ক্রমে কঠিন অবরোধযুদ্ধের বাস্তবতায় আটকে যায়।
একর ছিল সেই বাধার কেন্দ্র। শহরের প্রতিরক্ষা পরিচালনা করছিলেন জেজ্জার আহমদ পাশা; ব্রিটিশ কর্মকর্তা সিডনি স্মিথ সমুদ্র থেকে সহায়তা দেন। ফরাসিদের ভারী অবরোধকামানের একটি চালান ব্রিটিশরা আটক করে, এবং দখল করা কামান প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। সমুদ্রপথ খোলা থাকায় একরের রক্ষাকারীরা সাহায্য পেতে থাকেন। ফরাসিরা প্রাচীরে আঘাত করলেও ভেতরের অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ও পাল্টা আক্রমণের মুখে সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। ইতালির মতো শত্রুর বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে দ্রুত পরাজিত করার সুযোগ এখানে ছিল সীমিত।
মার্চ থেকে মে পর্যন্ত একরের বিরুদ্ধে একাধিক আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এপ্রিলের মাউন্ট তাবরের যুদ্ধে ফরাসিরা উদ্ধারকারী উসমানীয় বাহিনীকে পরাজিত করলেও দুর্গের সমস্যার সমাধান হয়নি। একর দেখিয়ে দেয়, স্থলযুদ্ধের দক্ষতা নৌসহায়তা, অবরোধসরঞ্জাম ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহের অভাব পূরণ করতে পারে না। মে মাসে নেপোলিয়ন অবরোধ তুলে মিশরে ফিরে যান। পিছু হটার সময় অসুস্থ ও আহত সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়া ছিল কঠিন। অভিযানের শুরুতে যে পূর্বমুখী বিস্তারের স্বপ্ন দেখা গিয়েছিল, তা এখন বাহিনী রক্ষা ও মিশরে টিকে থাকার প্রয়োজনে সংকুচিত হয়েছে।
তবু তিনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হননি। ১৭৯৯ সালের জুলাইয়ে আবুকিরে অবতরণ করা উসমানীয় বাহিনীকে স্থলযুদ্ধে পরাজিত করেন। এটি আগের বছরের নৌযুদ্ধ থেকে পৃথক ঘটনা। বিজয় তাঁর সামরিক মর্যাদা কিছুটা পুনরুদ্ধার করে, কিন্তু সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরায়নি। এর মধ্যে ফ্রান্সে রাজনৈতিক দুর্বলতা ও ইউরোপে নতুন যুদ্ধের সংবাদ পৌঁছায়। আগস্টে তিনি সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ক্লেবেরের হাতে দিয়ে গোপনে ফ্রান্সের উদ্দেশে রওনা হন। গবেষণায় রোজেটা প্রস্তরের আবিষ্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ ফল এলেও অভিযানের কৌশলগত লক্ষ্য অপূর্ণ থাকে; অবশিষ্ট ফরাসি বাহিনী শেষ পর্যন্ত ১৮০১ সালে আত্মসমর্পণ করে।
মিশর নেপোলিয়নকে বুঝিয়েছিল, দূরবর্তী সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্নের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিভার চেয়ে বেশি কিছু দরকার। তিনি ব্যর্থতার পূর্ণ পরিণতি আসার আগে ফ্রান্সে ফিরে নিজের জনপ্রিয়তা ও নির্বাচিত বিজয়ের সংবাদকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারেন। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র এবার প্রাচ্যের ভূখণ্ড থেকে প্যারিসের রাষ্ট্রক্ষমতায় সরে আসে। অক্টোবরের প্রত্যাবর্তনের পর দুর্বল ডিরেক্টরি, অসন্তুষ্ট রাজনীতিক এবং নতুন শাসনব্যবস্থার সন্ধানরত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তিনি নিজের সুযোগ দেখতে পান। মিশরের অসমাপ্ত অভিযান পেছনে রেখে এবার তিনি এগোবেন ব্রুমেয়ারের অভ্যুত্থানের দিকে।
এনিয়াস থেকে আলবা লঙ্গা: রোমুলাস ও রেমাসের জন্মের পৌরাণিক ইতিহাস
এনিয়াসের কিংবদন্তি: ট্রয় থেকে ইতালিতে রোমের পূর্বপুরুষের অভিযাত্রা
রোমান পুরাণের উৎপত্তি: ইতালীয় বিশ্বাস ও গ্রিক প্রভাবে দেবদেবীর জগৎ
হলোকাস্ট ও ফাইনাল সলিউশন: ঘেটো, আইনজাটসগ্রুপেন ও গণহত্যার ইতিহাস
নাৎসি সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার: ১৯৪২ সালে হিটলারের ইউরোপীয় আধিপত্য
ব্রিটেনের যুদ্ধ থেকে অপারেশন বারবারোসা: হিটলারের দুই সামরিক ভুল