বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের উত্থান: তুলোঁ থেকে প্যারিসে জাতীয় খ্যাতি

সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন

ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের উত্থান: তুলোঁ থেকে প্যারিসে জাতীয় খ্যাতি
তুলোঁর কামান থেকে প্যারিসের রাজপথে নেপোলিয়নের উত্থান।

১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছিলেন একজন তরুণ গোলন্দাজ কর্মকর্তা। তাঁর হাতে কোনো বিশাল সেনাবাহিনী ছিল না, প্যারিসের রাজনীতিতেও তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন না। জন্মভূমি কর্সিকার পরিচয়, সীমিত পারিবারিক সামর্থ্য এবং উচ্চারণে বিদেশি টান তাঁকে ফরাসি সামরিক সমাজে কিছুটা বহিরাগত করে রেখেছিল। অথচ মাত্র ছয় বছরের মধ্যে এই কর্মকর্তাই তুলোঁর অবরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন এবং প্যারিসে প্রজাতন্ত্রের সরকার রক্ষার দায়িত্ব পাবেন। তাঁর উত্থান বুঝতে হলে ব্যক্তিগত সামরিক প্রতিভার পাশাপাশি বিপ্লবে বদলে যাওয়া ফ্রান্সের সুযোগ ও সংকটও দেখতে হয়।

নেপোলিয়নের জন্ম ১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট কর্সিকার আজাচ্চোতে। দ্বীপটি তখন সদ্য ফরাসি নিয়ন্ত্রণে এসেছে; জেনোয়ার সঙ্গে ১৭৬৮ সালের চুক্তির পর ফ্রান্স সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর বাবা কার্লো বুয়োনাপার্তে প্রথমদিকে কর্সিকার স্বাধীনতাকামী নেতা পাসকুয়ালে পাওলির সমর্থক ছিলেন, পরে ফরাসি প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। পরিবারটি স্থানীয় অভিজাত বংশের হলেও বিপুল সম্পদের মালিক ছিল না। বাবার রাজনৈতিক যোগাযোগ ও স্বীকৃত অভিজাত পরিচয় নেপোলিয়নের জন্য ফ্রান্সে সরকারি সহায়তায় শিক্ষা গ্রহণের দরজা খুলে দেয়।

১৭৭৯ সালে নেপোলিয়ন ব্রিয়েনের সামরিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ফরাসি ভাষা শেখার অসুবিধা, কর্সিকান উচ্চারণ এবং সহপাঠীদের সামাজিক পার্থক্যের মধ্যে তাঁর কৈশোর কাটে। গণিত ও ভূগোলে দক্ষতা তাঁকে গোলন্দাজবিদ্যার দিকে নিয়ে যায়। কামান পরিচালনায় দূরত্ব, গতিপথ, অবস্থান এবং সরবরাহের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্যারিসের সামরিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ১৭৮৫ সালে তিনি গোলন্দাজ বাহিনীর দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হন। পরবর্তী জীবনের যুদ্ধপরিকল্পনায় যে ভূখণ্ড বিশ্লেষণ ও কেন্দ্রীভূত আঘাতের দক্ষতা দেখা যায়, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই শিক্ষায়।

বিপ্লবের আগে ফরাসি সেনাবাহিনীর উচ্চপদে বংশপরিচয় ও দরবারি যোগাযোগের বড় প্রভাব ছিল। বিপ্লব সেই কাঠামোকে অস্থির করে দেয়। বহু অভিজাত কর্মকর্তা দেশ ছাড়েন, কারও রাজনৈতিক আনুগত্য সন্দেহের মুখে পড়ে, আবার যুদ্ধের কারণে নতুন নেতৃত্বের চাহিদা বাড়ে। এতে নিম্নপদস্থ যোগ্য কর্মকর্তাদের দ্রুত উন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এটি নিরাপদ সুযোগ ছিল না। এক সরকারের অধীনে অর্জিত পরিচিতি পরের রাজনৈতিক পরিবর্তনে গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর কারণ হতে পারত। নেপোলিয়নের প্রাথমিক জীবনেও এই অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমদিকে তাঁর মনোযোগের বড় অংশ ছিল কর্সিকার রাজনীতিতে। তিনি দীর্ঘ ছুটি নিয়ে দ্বীপে থাকতেন এবং স্থানীয় জাতীয় রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। পাওলি তখনও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, কিন্তু দুজনের রাজনৈতিক পথ ক্রমে আলাদা হয়ে যায়। নেপোলিয়ন ফরাসি বিপ্লব ও প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে কর্সিকার ভবিষ্যৎ দেখতে শুরু করেন; পাওলি বিপ্লবী প্যারিসের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব নিয়ে ক্রমেই বিরূপ হন। ১৭৯৩ সালে এই বিরোধ তীব্র হলে বোনাপার্ট পরিবার কর্সিকা ছেড়ে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে আশ্রয় নেয়। জন্মভূমিতে ক্ষমতা অর্জনের আশা ভেঙে যাওয়ায় ফরাসি সামরিক জীবনই হয়ে ওঠে নেপোলিয়নের প্রধান পথ।

এদিকে ফ্রান্স বাইরের যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে বিপর্যস্ত। ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ডের পর ইউরোপীয় রাজশক্তিগুলোর সঙ্গে সংঘাত বেড়েছে। দক্ষিণ ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি তুলোঁতে বিপ্লবী সরকারের বিরোধীরা কর্তৃত্ব দখল করে ব্রিটিশ ও স্প্যানিশ নৌবাহিনীকে প্রবেশের সুযোগ দেয়। ১৭৯৩ সালের আগস্টে বিদেশি বাহিনীর হাতে বন্দর চলে যাওয়া প্যারিসের জন্য গুরুতর বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে ছিল ফরাসি ভূমধ্যসাগরীয় নৌবহর, অস্ত্রভাণ্ডার ও জাহাজ নির্মাণের অবকাঠামো। তুলোঁ পুনর্দখল তাই সামরিক প্রয়োজনের পাশাপাশি প্রজাতন্ত্রের মর্যাদার প্রশ্নও ছিল।

সেপ্টেম্বরে নেপোলিয়ন অবরোধকারী বাহিনীর গোলন্দাজ নেতৃত্বের দায়িত্ব পান। তখন তাঁর পদ ক্যাপ্টেন, বয়স চব্বিশ। ফরাসি বাহিনীর সমস্যা ছিল শুধু সৈন্যসংখ্যা নয়; কার্যকর কামান, প্রশিক্ষিত গোলন্দাজ এবং সুসংগঠিত আক্রমণপরিকল্পনারও অভাব ছিল। নেপোলিয়ন আশপাশ থেকে কামান সংগ্রহ, গোলাবারুদের সরবরাহ এবং নতুন কামানঘাঁটি তৈরিতে উদ্যোগী হন। রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগও কাজে লাগান। তাঁর দক্ষতা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্যাকে নির্দিষ্ট কাজের তালিকায় নামিয়ে এনে দ্রুত সমাধান করার মধ্যে।

তুলোঁর ক্ষেত্রে তাঁর মূল উপলব্ধি ছিল বন্দরের ভৌগোলিক দুর্বলতা। শহরের দেয়ালে সরাসরি আক্রমণের বদলে এমন অবস্থান দখল করতে হবে, যেখান থেকে মিত্রশক্তির জাহাজের নোঙরস্থানকে কামানের আওতায় আনা যায়। লেগিয়েত ও বালাগিয়েরের আশপাশের অবস্থান এবং সেগুলো রক্ষাকারী মুলগ্রেভ দুর্গ তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নেপোলিয়নের পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল শত্রুর নৌসহায়তা অকার্যকর করে শহরে তাদের অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব করে তোলা। এটি অবরোধের সমস্যাকে স্থল ও নৌযুদ্ধের সমন্বিত হিসাব হিসেবে দেখার উদাহরণ।

তবে তুলোঁর জয়কে এক ব্যক্তির কৃতিত্ব বলা ভুল হবে। প্রথমদিকের কমান্ডারদের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার উদ্যোগের মধ্যে পরিকল্পনা এগোয়। অভিজ্ঞ জেনারেল জ্যাক ফ্রাঁসোয়া দুগোমিয়ে নেতৃত্ব গ্রহণের পর চূড়ান্ত আক্রমণ কার্যকরভাবে সংগঠিত হয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাস্থানে আক্রমণ চালানো হয়; নেপোলিয়ন নিজেও আহত হন। ফরাসিরা প্রয়োজনীয় উচ্চভূমি দখল করলে মিত্রবাহিনীর নৌঅবস্থান বিপন্ন হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ও সহযোগী বাহিনী সরে যায়, আর ১৯ ডিসেম্বর তুলোঁ পুনর্দখল সম্পন্ন হয়।

এই সাফল্য নেপোলিয়নের জীবনের প্রথম বড় মোড়। ডিসেম্বরেই তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হন। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে এমন পদোন্নতি পুরোনো সামরিক কাঠামোয় অত্যন্ত কঠিন ছিল। তাঁর নাম এখন প্রজাতন্ত্রের সামরিক নেতৃত্বের কাছে পরিচিত। কিন্তু তুলোঁতে কাজ করার সময় অগুস্তাঁ রোবসপিয়েরসহ বিপ্লবী রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ পরবর্তী সংকটও ডেকে আনে। ১৭৯৪ সালের জুলাইয়ে রোবসপিয়েরপন্থীদের পতনের পর নেপোলিয়ন গ্রেপ্তার হন। পরে মুক্তি পেলেও ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, বিপ্লবী ফ্রান্সে সামরিক সাফল্য রাজনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।

১৭৯৫ সালে তাঁর অবস্থান আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পশ্চিম ফ্রান্সে পদাতিক দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে বিরোধ এবং উপযুক্ত নিয়োগের অভাবে তিনি প্যারিসে সুযোগ খুঁজছিলেন। একই সময়ে জাতীয় কনভেনশন নতুন সংবিধানের অধীনে ডিরেক্টরি শাসন প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নতুন আইনসভায় কনভেনশনের সদস্যদের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত বিরোধীদের ক্ষুব্ধ করে। প্যারিসের কয়েকটি বিভাগে রাজতন্ত্রী ও সরকারবিরোধী শক্তি সশস্ত্রভাবে সংগঠিত হয়। বিপ্লবের রাজধানীতেই সরকারের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।

১৭৯৫ সালের ৫ অক্টোবর, বিপ্লবী বর্ষপঞ্জির ১৩ ভঁদেমিয়েরে, বিদ্রোহীরা কনভেনশনের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। সরকার রক্ষার সামরিক দায়িত্বে থাকা পল বারাস নেপোলিয়নকে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর নেতৃত্ব দেন। নেপোলিয়ন দ্রুত বুঝতে পারেন, শহরের সরু রাস্তায় সংগঠিত কামান প্রতিরক্ষা সংখ্যায় বড় জনতাকে থামাতে পারে। জোয়াকিম মুরা কামান সংগ্রহের অভিযানে ভূমিকা রাখেন। কনভেনশনের আশপাশের প্রবেশপথে কামান বসিয়ে সৈন্য মোতায়েন করা হয়। সাঁ-রক গির্জার কাছাকাছিসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে কামানের ছররা গোলা বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ভেঙে দেয়।

এই দমন ছিল প্রাণঘাতী এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তুলোঁতে নেপোলিয়ন বিদেশি সমর্থিত একটি ঘাঁটির বিরুদ্ধে লড়েছিলেন; প্যারিসে তিনি ফরাসি নাগরিকদের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করেন। সরকারের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন সংকটের মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য সামরিক রক্ষক। তাঁকে ডিভিশন জেনারেল করা হয় এবং অভ্যন্তরীণ সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়। তুলোঁ তাঁকে দক্ষ যুদ্ধপরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত করেছিল, আর প্যারিসের সাফল্য তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়।

কর্সিকার তরুণ কর্মকর্তার উত্থান তাই প্রতিভা, বিপ্লবের তৈরি শূন্যস্থান, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দ্রুত সিদ্ধান্তের সম্মিলিত ফল। তিনি তখনও সম্রাট নন, ইউরোপজয়ী সেনাপতিও নন; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দুই সংকটে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন। প্যারিসে অর্জিত আস্থা তাঁর সামনে আরও বড় দায়িত্বের দরজা খুলে দেয়। ১৭৯৬ সালের মার্চে ইতালির সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব তাঁর হাতে আসে। এবার রাজধানীর রাজপথ ছেড়ে তাঁকে যেতে হবে আল্পসের কাছে—যেখানে দুর্বল সরবরাহে ক্লান্ত একটি বাহিনী নিয়ে অস্ট্রিয়া ও তার মিত্রদের মোকাবিলা করাই হবে তাঁর খ্যাতির পরবর্তী পরীক্ষা।