বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইউরোপের বারুদের স্তূপ বলকান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

সিরিজ: আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ড ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা

ইউরোপের বারুদের স্তূপ বলকান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
বলকানের আঞ্চলিক সংকট থেকে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধের আশঙ্কা।

ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বলকান উপদ্বীপ একসময় ছিল সাম্রাজ্যের সীমানা, ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতীয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সংঘর্ষস্থল। এখানে কোনো ভূখণ্ডের শাসক বদলালে শুধু রাজধানির পতাকা পাল্টাত না; প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপীয় শক্তির প্রভাবও প্রশ্নের মুখে পড়ত। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই অঞ্চলকে তাই বলা হতো “ইউরোপের বারুদের স্তূপ”। তবে বলকান নিজে একা বিশ্বযুদ্ধ তৈরি করেনি। এখানকার সংঘাতকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, সামরিক প্রস্তুতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর পরস্পরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস।

এই অস্থিরতার প্রধান পটভূমি ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া। কয়েক শতাব্দী ধরে বলকানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল অটোমান শাসনের অধীনে ছিল। উনিশ শতকে গ্রিস, সার্বিয়া, রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের অগ্রগতি সেই কর্তৃত্ব সংকুচিত করে। কিন্তু সাম্রাজ্যের পশ্চাদপসরণে স্থায়ী শান্তি আসেনি। বরং প্রশ্ন উঠেছিল, পরিত্যক্ত ভূখণ্ড কার অধীনে যাবে? একই শহর, উপত্যকা বা বন্দরকে একাধিক জাতীয় আন্দোলন নিজেদের ঐতিহাসিক অধিকার বলে দাবি করত। ফলে স্বাধীনতার সংগ্রাম দ্রুত প্রতিবেশী জাতির সঙ্গে সীমান্তবিরোধেও রূপ নিত।

বলকানের জনবিন্যাস এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছিল। সার্ব, ক্রোয়াট, বসনীয় মুসলমান, আলবেনীয়, গ্রিক, বুলগেরীয় এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠী বহু এলাকায় পাশাপাশি বসবাস করত। ভাষা, ধর্ম ও রাজনৈতিক আনুগত্যের সীমারেখা সব সময় এক ছিল না। অথচ জাতীয়তাবাদী নেতারা প্রায়ই এমন রাষ্ট্রের কল্পনা করতেন, যার সীমানার মধ্যে তাঁদের জাতির সব সদস্য থাকবে। বাস্তবের মিশ্র জনবসতির সঙ্গে একজাতিক রাষ্ট্রের আদর্শের এই সংঘাত সীমান্ত নির্ধারণকে বিস্ফোরক করে তুলেছিল। একটি রাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্যের পরিকল্পনা অন্য জনগোষ্ঠীর কাছে অধীনতা কিংবা উচ্ছেদের আশঙ্কা হয়ে উঠত।

এই পরিস্থিতিতে সার্বিয়া বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্বাধীন সার্বীয় রাষ্ট্রের বাইরে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির অন্যান্য অঞ্চলেও বহু সার্ব বাস করত। তাঁদের একত্র করার আকাঙ্ক্ষা সার্বীয় রাজনীতির শক্তিশালী ধারায় পরিণত হয়। পাশাপাশি দক্ষিণ স্লাভ জনগোষ্ঠীকে বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোয় যুক্ত করার ধারণাও ছড়াচ্ছিল। তবে সার্বীয় জাতীয়তাবাদ এবং দক্ষিণ স্লাভ ঐক্যের সব প্রকল্প একই ছিল না। কোনোটি সার্বিয়ার নেতৃত্বে সম্প্রসারণ চাইত, কোনোটি বৃহত্তর যৌথ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখত। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির শাসকদের কাছে উভয় প্রবণতাই উদ্বেগের কারণ ছিল।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ছিল বহু জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত রাজতন্ত্র। জার্মানভাষী অস্ট্রিয়ান ও হাঙ্গেরীয়দের পাশাপাশি সেখানে চেক, স্লোভাক, পোল, রোমানীয় এবং দক্ষিণ স্লাভ জনগোষ্ঠী বসবাস করত। শাসকেরা আশঙ্কা করতেন, সীমান্তের বাইরে শক্তিশালী সার্বিয়া গড়ে উঠলে সাম্রাজ্যের ভেতরের দক্ষিণ স্লাভদের বিচ্ছিন্নতাবাদ উৎসাহিত হবে। ফলে সার্বিয়ার সাফল্যকে তাঁরা কেবল প্রতিবেশীর উন্নতি হিসেবে দেখতেন না; নিজেদের রাষ্ট্রের অখণ্ডতার প্রতি চ্যালেঞ্জ মনে করতেন। এই ভয় থেকেই বলকানে সার্বীয় প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা ভিয়েনার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এই বিরোধের কেন্দ্রে ছিল। ১৮৭৮ সালের বার্লিন কংগ্রেসের ব্যবস্থায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি অঞ্চলটি দখল ও প্রশাসনের অধিকার পায়, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অটোমান সার্বভৌমত্ব বহাল ছিল। ১৯০৮ সালে ভিয়েনা সরাসরি অঞ্চলটি সংযুক্ত করে। সার্বিয়ায় তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়, কারণ বসনিয়ার সার্ব জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা এতে বাধাগ্রস্ত হয়। রাশিয়াও আপত্তি তোলে। কিন্তু জার্মান সমর্থন এবং নিজেদের সামরিক দুর্বলতার মুখে রাশিয়া ও সার্বিয়া শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি মেনে নেয়। সংকট থেমেছিল, কিন্তু অপমানবোধ ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা থেকে গিয়েছিল।

রাশিয়ার বলকাননীতি শুধু স্লাভ জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতি দিয়ে বোঝা যায় না। নিজেকে স্লাভ ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি রাশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে প্রভাব বাড়াতে চাইত। কৃষ্ণসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার প্রণালিগুলোর গুরুত্বও তার কৌশলগত ভাবনায় ছিল। সার্বিয়াকে সমর্থন করলে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির অগ্রগতি ঠেকানো সম্ভব হতো। তবে এই সমর্থন সব সময় নিঃশর্ত ছিল না। রুশ নেতৃত্বকে সামরিক সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হতো।

অন্যদিকে জার্মানি অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে নিজের প্রধান নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখত। ইউরোপের কেন্দ্রে অবস্থিত জার্মানির নেতারা পূর্বে রাশিয়া এবং পশ্চিমে ফ্রান্সের সঙ্গে একযোগে সংঘাতের আশঙ্কা করতেন। সেই পরিস্থিতিতে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দুর্বলতা জার্মানির কৌশলগত অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত করত। ফলে বলকানে ভিয়েনার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন বার্লিনের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এভাবেই সার্বিয়া ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরোধের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে রাশিয়া ও জার্মানি। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃহৎ শক্তির শক্তিপরীক্ষায় পরিণত হওয়ার পথ তৈরি হয়।

ইউরোপের জোটব্যবস্থা এই অবস্থাকে আরও জটিল করে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালি ত্রিশক্তি জোটে যুক্ত ছিল। অন্যদিকে ফ্রান্স ও রাশিয়ার সামরিক জোটের সঙ্গে ব্রিটেনের ফ্রান্স ও রাশিয়ার পৃথক সমঝোতা মিলিয়ে ত্রিশক্তি আঁতাত গড়ে ওঠে। সব চুক্তির প্রকৃতি এক ছিল না, আর কোনো সংকট ঘটলেই প্রত্যেক রাষ্ট্রের যুদ্ধে নামা বাধ্যতামূলক ছিল না। ইতালির নিজস্ব স্বার্থ ছিল; ব্রিটেনের সমঝোতাও ফ্রান্স-রাশিয়ার সামরিক জোটের সমতুল্য ছিল না। তবু প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের ধারণা কূটনীতিতে সন্দেহ বাড়িয়েছিল।

জোটগুলো যুদ্ধ ঠেকানোর উদ্দেশ্যও বহন করত। শক্তিশালী মিত্র থাকলে প্রতিপক্ষ আক্রমণের আগে দ্বিধা করবে—এমন বিশ্বাস ছিল। কিন্তু একই ব্যবস্থা সংকটের সময় উল্টো চাপ সৃষ্টি করতে পারত। মিত্রকে সমর্থন না করলে ভবিষ্যতে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা দেখা দিত। আবার প্রতিপক্ষের পেছনে বড় শক্তি রয়েছে ভেবে কোনো রাষ্ট্র দ্রুত কঠোর অবস্থান নিতে পারত। তাই জোটব্যবস্থার বিপদ ছিল কেবল চুক্তির ধারায় নয়; মর্যাদা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরাপত্তা হারানোর ভয়েও। নেতাদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছিল, যদিও বিকল্প পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

বলকানের উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি ইউরোপে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতাও চলছিল। আফ্রিকা ও এশিয়ায় উপনিবেশ, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা নিয়ে বিরোধ শক্তিগুলোর সম্পর্ক তিক্ত করেছিল। মরক্কোসংক্রান্ত সংকটে জার্মানি ও ফ্রান্স মুখোমুখি হয়; ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সহযোগিতা আরও দৃঢ় হয়। জার্মান নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ ব্রিটেনকে উদ্বিগ্ন করে, কারণ সমুদ্রপথ তার বাণিজ্য ও সাম্রাজ্যের জন্য অপরিহার্য ছিল। এসব বিরোধ সরাসরি বলকানের সীমান্ত নির্ধারণ করেনি, কিন্তু সেখানে নতুন সংকট দেখা দিলে পারস্পরিক আস্থা নিয়ে আলোচনার পরিবেশ দুর্বল করে দিয়েছিল।

১৯১২ সালের প্রথম বলকান যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলে দেয়। সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস ও মন্টেনেগ্রো অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়ে তার ইউরোপীয় ভূখণ্ডের বড় অংশ দখল করে। কিন্তু বিজয়ের পর মিত্রদের মধ্যে ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। বিশেষত মেসিডোনিয়ার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে উত্তেজনা ১৯১৩ সালের দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধে পৌঁছায়। বুলগেরিয়া সাবেক মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অটোমান কর্তৃত্বের পতন জাতীয় বিরোধের অবসান ঘটায়নি; নতুন সীমান্ত ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল।

এই যুদ্ধগুলোতে সার্বিয়া ভূখণ্ড ও মর্যাদা বাড়ায়। তবে আলবেনীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং বৃহৎ শক্তির হস্তক্ষেপে আদ্রিয়াটিক সাগরে সার্বিয়ার প্রত্যাশিত প্রবেশপথ বাধাগ্রস্ত হয়। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার সমুদ্রপথ লাভের বিরোধিতা করেছিল। বেলগ্রেডে তাই ধারণা শক্তিশালী হয় যে ভিয়েনা তার স্বাভাবিক বিকাশ আটকে দিচ্ছে। বিপরীতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় নেতৃত্ব বিজয়ী সার্বিয়াকে আরও বিপজ্জনক মনে করতে থাকে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা জাতীয়তাবাদী আবেগের পাশাপাশি সামরিক আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। সীমান্তের দুই পাশে আপসের সমর্থকদের তুলনায় কঠোর অবস্থানের প্রবক্তারা বেশি প্রভাব অর্জন করেন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় গোপন সংগঠন ও বিপ্লবী তরুণদের তৎপরতা। সার্বীয় সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশের সঙ্গে যুক্ত ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ এবং বসনিয়ার ‘ইয়ং বসনিয়া’ আন্দোলনের মতো গোষ্ঠী সাম্রাজ্যিক শাসনের বিরুদ্ধে সহিংস পথকে গ্রহণযোগ্য মনে করত। তবে সরকার, সামরিক চক্র ও তরুণ বিপ্লবীদের একক সংগঠন হিসেবে দেখা ভুল। তাদের লক্ষ্য ও সম্পর্ক জটিল ছিল। তবু গোপন যোগাযোগ এবং সীমান্তপারের সহায়তা এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যেখানে অল্প কয়েকজনের হামলা রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ককে বিপর্যস্ত করতে পারত।

১৯১৪ সালের মধ্যে বলকানে জমে ছিল পরাজয়ের অপমান, বিজয়ের আত্মবিশ্বাস, অসম্পূর্ণ জাতীয় আকাঙ্ক্ষা এবং সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার ভয়। ইউরোপজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও দ্রুত সেনা সমাবেশের পরিকল্পনা সংকট মোকাবিলায় সময়ের চাপ বাড়িয়েছিল। তবু বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য ছিল না; আগের সংকটগুলো আলোচনায় থেমেছিল। বিপদ ছিল, নতুন কোনো আঘাত এলে নেতারা আপসের পরিবর্তে শক্তিপ্রয়োগ বেছে নিতে পারেন। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশেই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের বসনিয়া সফরের প্রস্তুতি চলছিল। সারায়েভোর পথে তাঁর যাত্রা শিগগিরই বলকানের জমে থাকা সংকটকে ইউরোপীয় কূটনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসবে।