মেরি শেলি: ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ লিখে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ইতিহাস বদলে দেওয়া তরুণী
সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা
একটি সৃষ্টি আর স্রষ্টার দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাহিত্যের নতুন পথ খুলেছিলেন মেরি শেলি।
ঝড়বৃষ্টির এক গ্রীষ্মে কয়েকজন তরুণ সাহিত্যপ্রেমী ভৌতিক গল্প লেখার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। সেই আড্ডা থেকে যে কাহিনির সূচনা হয়, তা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষকে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে চলেছে: জীবন সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করলে স্রষ্টা কি তার সৃষ্টির দায়ও নেবেন? প্রশ্নটি তুলেছিলেন মেরি শেলি। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তাঁর মনে জন্ম নেওয়া গল্প পরে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসে রূপ পায়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সমাজ থেকে প্রত্যাখ্যাত এক প্রাণীকে একসঙ্গে এনে তিনি এমন সাহিত্য রচনা করেন, যা আধুনিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ভিত্তি গড়ার অন্যতম কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৭৯৭ সালে লন্ডনে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট গডউইনের জন্ম। তাঁর মা মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট ছিলেন নারীশিক্ষা ও নারীর অধিকার নিয়ে প্রভাবশালী লেখক; বাবা উইলিয়াম গডউইন ছিলেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও লেখক। মেরির জন্মের কিছুদিন পরই তাঁর মা মারা যান। ফলে মাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানতে পারেননি, কিন্তু মায়ের লেখা ও পরিচয় তাঁর বড় হয়ে ওঠার পরিবেশের অংশ ছিল। বাবার বাড়িতে বই, লেখক, দার্শনিক ও নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা চলত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও মেরি ব্যাপকভাবে পড়াশোনা করেন। সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও মানুষের সমাজ নিয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস তাঁর লেখালেখির ভিত তৈরি করে।
কৈশোরে কবি পার্সি বিশি শেলির সঙ্গে মেরির ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তাঁদের সম্পর্ক সামাজিক বিতর্কের জন্ম দেয়, কারণ পার্সি তখন অন্য একজনের সঙ্গে বিবাহিত ছিলেন। ১৮১৪ সালে মেরি তাঁর সঙ্গে ইংল্যান্ড ছেড়ে ইউরোপে যান। এই সিদ্ধান্তকে কেবল রোমান্টিক অভিযাত্রা ভাবলে তাঁদের জীবনের বাস্তব চাপ আড়াল হয়ে যায়। অর্থকষ্ট, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও সন্তানের মৃত্যু মেরিকে অল্প বয়সেই গভীর শোকের মুখোমুখি করে। পরবর্তী উপন্যাসে জন্ম, জীবন, মৃত্যু এবং সন্তানের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নগুলো এত তীব্রভাবে ফিরে আসার পেছনে তাঁর জীবনকে সরাসরি একমাত্র কারণ বলা যায় না; তবে এসব অভিজ্ঞতা তাঁর ভাবনার জগৎ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ।
১৮১৬ সালের গ্রীষ্মে মেরি ও পার্সি জেনেভা হ্রদের কাছে ছিলেন। সেখানে তাঁদের সঙ্গে সময় কাটান কবি লর্ড বায়রন, চিকিৎসক জন পলিডরি এবং মেরির সৎবোন ক্লেয়ার ক্লেয়ারমন্ট। সে বছর অস্বাভাবিক ঠান্ডা ও বৃষ্টির কারণে বাইরে সময় কাটানো কঠিন ছিল। ঘরে বসে তাঁরা ভৌতিক কাহিনি পড়তেন এবং জীবন ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতেন। একসময় বায়রন প্রত্যেককে একটি ভূতের গল্প লেখার প্রস্তাব দেন। মেরি প্রথমে উপযুক্ত গল্প খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরে তাঁর মনে আসে এমন একজন গবেষকের ছবি, যিনি প্রাণহীন দেহে জীবন আনেন—তারপর নিজের কাজ দেখে আতঙ্কিত হন। গল্পটির কেন্দ্রে ছিল জীবনের জন্মের মুহূর্তের চেয়েও বেশি, জন্মের পর স্রষ্টার আচরণ।
সে সময় ইউরোপে বিদ্যুৎ ও দেহের পেশির প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা মানুষের কৌতূহল জাগাচ্ছিল। মৃত বা বিচ্ছিন্ন টিস্যুতে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনায় নড়াচড়া দেখা যেতে পারে—এ ধরনের পরীক্ষা জীবন আসলে কী, সেই প্রশ্নকে আরও আলোচিত করে। মেরি এই বৈজ্ঞানিক আবহ থেকে কাহিনির উপাদান নেন, কিন্তু তাঁর উপন্যাসে প্রাণীটিকে ঠিক কোন যন্ত্র বা পদ্ধতিতে জীবন্ত করা হয়, তার পূর্ণ প্রযুক্তিগত বিবরণ দেননি। আজকের চলচ্চিত্রে বজ্রপাত, বৈদ্যুতিক সুইচ ও বিশাল গবেষণাগার খুব পরিচিত দৃশ্য। সেগুলোকে মেরি শেলির মূল উপন্যাসের হুবহু বর্ণনা ভাবা ভুল। তাঁর প্রধান আগ্রহ ছিল পরীক্ষাটি সফল হলে মানুষ ও সমাজের সামনে কী নৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
জেনেভায় কাহিনির সূত্র পাওয়ার পর মেরি লেখাটি বিস্তৃত উপন্যাসে রূপ দেন। ১৮১৮ সালে বইটি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন; অথবা আধুনিক প্রমিথিউস নামে বেনামে প্রকাশিত হয়। তখন তাঁর বয়স কুড়ি। প্রথম সংস্করণে লেখকের নাম না থাকা এবং বইটির ভূমিকায় পার্সি শেলির সম্পৃক্ততার কারণে লেখক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু উপন্যাসটি মেরিরই রচনা। পরবর্তী সংস্করণে তাঁর নাম প্রকাশিত হয়; ১৮৩১ সালে তিনি বইটির একটি সংশোধিত সংস্করণও প্রকাশ করেন এবং গল্পের সূচনা সম্পর্কে নিজের স্মৃতি তুলে ধরেন। বইটির জন্ম তাই একটি রাতের হঠাৎ লেখা গল্পের ঘটনা নয়; প্রাথমিক ভাবনাকে পরিশ্রম করে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে পরিণত করার ইতিহাস।
উপন্যাসের প্রধান বিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষায় তিনি একটি জীবন্ত প্রাণী সৃষ্টি করেন, কিন্তু প্রাণীটি চোখ মেলার পর তার চেহারা দেখে ভীত হয়ে পালিয়ে যান। এখানেই গল্পের নৈতিক সংকট শুরু। ভিক্টর যা করতে চেয়েছিলেন, তা করতে পেরেছেন; কিন্তু যাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন, তার খাদ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা কিংবা সঙ্গের ব্যবস্থা করেননি। পরবর্তী বিপর্যয়কে শুধু একটি ‘ভয়ংকর পরীক্ষা’র ফল বললে তাই কাহিনির বড় অংশ বাদ পড়ে। মেরি শেলি দেখিয়েছেন, সাফল্য ও দায়িত্ব একই মুহূর্তে শুরু হতে পারে—অথচ মানুষ প্রথমটিকে গ্রহণ করে দ্বিতীয়টি থেকে পালাতে পারে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নামটি অনেক সময় প্রাণীটির জন্য ব্যবহৃত হয়। মূল উপন্যাসে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন স্রষ্টা ভিক্টরের নাম; তাঁর সৃষ্ট প্রাণীটি আলাদা কোনো ব্যক্তিগত নাম পায় না। এই নামহীনতাও তার অবস্থাকে বুঝতে সাহায্য করে। সে ভাষা শেখে, মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে, ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা কামনা করে। কিন্তু তার চেহারা দেখে মানুষ তাকে ভয় পায় এবং দূরে ঠেলে দেয়। ফলে পাঠককে কেবল প্রাণীটি কী করছে, তা নয়; তার সঙ্গে মানুষ কী করেছে, সেটিও বিচার করতে হয়। স্রষ্টার প্রত্যাখ্যান ও সমাজের ঘৃণা কীভাবে তাকে বদলে দেয়, উপন্যাসের আবেগময় শক্তি সেখানে।
মেরি গল্পটি এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে পাঠক একটিমাত্র দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকে না থাকেন। অভিযাত্রী রবার্ট ওয়ালটনের চিঠির ভেতর দিয়ে ভিক্টরের কাহিনি আসে; আবার সেই কাহিনির মধ্যেই প্রাণীটি নিজের অভিজ্ঞতা জানায়। ওয়ালটনও জ্ঞান ও খ্যাতির জন্য বিপজ্জনক অভিযানে বেরিয়েছেন। ফলে ভিক্টরের সিদ্ধান্ত শোনার সময় পাঠক আরেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের অবস্থাও দেখতে পান। প্রাণীটি নিজের কথা বললে প্রথমে ভিক্টরের দেওয়া বিবরণকেও নতুন করে বিচার করতে হয়। এই স্তরবিন্যাস কাহিনিকে সাধারণ দানবের আক্রমণের গল্প থেকে সরিয়ে কার বক্তব্য আমরা বিশ্বাস করছি এবং কাকে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছি, সেই প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়।
উপন্যাসটির নামের দ্বিতীয় অংশ, ‘আধুনিক প্রমিথিউস’, গ্রিক পুরাণের সেই চরিত্রকে মনে করায়, যিনি দেবতাদের কাছ থেকে আগুন এনে মানুষের হাতে দিয়েছিলেন। ভিক্টরও প্রকৃতির গোপন ক্ষমতা অধিকার করতে চান। কিন্তু মেরির গল্পে প্রশ্ন কেবল মানুষের কত দূর যাওয়া উচিত, তা নয়। নতুন ক্ষমতা অর্জনের পর তার ফল ভোগ করবে কারা, তাদের প্রতি উদ্ভাবকের কর্তব্য কী—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বইটি বিজ্ঞানবিরোধী সরল সতর্কবার্তা হয়ে থাকে না। ভিক্টরের জ্ঞানার্জনের ইচ্ছার সঙ্গে তাঁর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে আলাদাভাবে দেখতে হয়।
ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে অনেকেই প্রথম আধুনিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনির উপন্যাস বলেন। ‘প্রথম’ উপাধিটি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কারণ মেরির আগেও কল্পিত আবিষ্কার ও অস্বাভাবিক জ্ঞানচর্চা নিয়ে সাহিত্য রচিত হয়েছে। তাঁর কাজের স্বাতন্ত্র্য হলো, একটি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনাকে গল্পের চালিকাশক্তি করে তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও নৈতিক পরিণতি অনুসন্ধান করা। প্রাণীটি জাদুমন্ত্রে হাজির হয় না; ভিক্টরের গবেষণা ও পরীক্ষার ফল হিসেবে আসে। আর পরীক্ষার পরিণতি নিয়ে প্রশ্নই পুরো উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আধুনিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বহু রচনায় এই কাঠামো ফিরে দেখা যায়।
মেরি শেলির জীবন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন প্রকাশের পরও লেখালেখি ও শোকের মধ্য দিয়ে চলেছে। তিনি আরও উপন্যাস, ভ্রমণবিষয়ক লেখা ও জীবনী রচনা করেন। তাঁদের কয়েকটি সন্তান অল্প বয়সে মারা যায়; ১৮২২ সালে পার্সি বিশি শেলি নৌদুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এরপর মেরি বেঁচে থাকা ছেলে পার্সি ফ্লোরেন্সকে নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং নিজের লেখার পাশাপাশি স্বামীর রচনা সম্পাদনা ও প্রকাশে কাজ করেন। ১৮৫১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। শুধু একটি বিখ্যাত বইয়ের লেখক হিসেবে দেখলে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবন ও কাজের পরিসর চোখ এড়িয়ে যায়।
তবু ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কেন বারবার নতুন পাঠক পায়, তার উত্তর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় সম্পর্কেই রয়েছে। ভিক্টর জীবন সৃষ্টি করেন, কিন্তু সেই জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াতে চান না। প্রাণীটি মানুষ হতে চায়, কিন্তু মানুষ তাকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে না। বিজ্ঞান যত এগোয়, নতুন কিছু তৈরির সম্ভাবনা তত বাড়ে; একই সঙ্গে সেই সৃষ্টির ফল কার জীবনে পড়বে, সে প্রশ্নও জরুরি হয়ে ওঠে। আঠারো বছর বয়সে মেরি শেলির মনে আসা কাহিনি তাই আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি ভবিষ্যতের কোনো যন্ত্রের ছবি আঁকেননি; নতুন ক্ষমতার সামনে মানুষের দায়িত্বের প্রশ্নটি এমনভাবে লিখেছিলেন, যা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পথ বদলে দিয়েছে।
মেরি অ্যানিং: জীবাশ্ম আবিষ্কার করে পৃথিবীর প্রাচীন প্রাণের ইতিহাস যেভাবে বদলে দিয়েছিলেন
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার: পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ কীভাবে ব্রিটিশ শাসনে এসেছিল?
বোয়ার যুদ্ধ ও দক্ষিণ আফ্রিকা: সোনা, হীরা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
আফ্রিকার জন্য প্রতিযোগিতা: মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস