মেরি অ্যানিং: জীবাশ্ম আবিষ্কার করে পৃথিবীর প্রাচীন প্রাণের ইতিহাস যেভাবে বদলে দিয়েছিলেন
সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা
পাথরের ভেতর থেকে প্রাচীন পৃথিবীকে চিনিয়েছিলেন মেরি অ্যানিং।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে ঝড় থেমে গেলে অন্যদের চোখে যে ভাঙা পাথর আর কাদামাটি পড়ত, মেরি অ্যানিং সেখানে খুঁজতেন বহু আগের প্রাণের চিহ্ন। সমুদ্রের ঢেউ ও পাহাড়ধসে উন্মুক্ত হওয়া শিলার ভেতর থেকে তিনি এমন সব কঙ্কাল উদ্ধার করেছিলেন, যাদের মতো জীবন্ত প্রাণী মানুষ কখনো দেখেনি। তাঁর কাজের সময় জীবাশ্মবিদ্যা আজকের মতো প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্র ছিল না। বিলুপ্ত প্রাণী, পৃথিবীর প্রাচীন পরিবেশ ও শিলাস্তরের ইতিহাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যেও অনেক প্রশ্ন ছিল। মেরি অ্যানিংয়ের আবিষ্কার সেই প্রশ্নগুলোর সামনে হাতে ধরা যায় এমন প্রমাণ এনে দেয়।
১৭৯৯ সালে ইংল্যান্ডের ডরসেট অঞ্চলের লাইম রিজিসে মেরি অ্যানিংয়ের জন্ম। তাঁর বাবা রিচার্ড অ্যানিং কাঠের কাজ করতেন এবং বাড়তি আয়ের জন্য সমুদ্রতটে পাওয়া জীবাশ্ম সংগ্রহ করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতেন। ছোটবেলায় মেরি বাবার সঙ্গে পাথরের মধ্যে পাকানো অ্যামোনাইট ও অন্যান্য জীবাশ্ম খুঁজতে যেতেন। ফলে তাঁর শিক্ষা শুরু হয়েছিল শ্রেণিকক্ষে নয়, উপকূলের শিলাস্তরের সামনে। কোন পাথরে জীবাশ্ম থাকার সম্ভাবনা বেশি, কখন পাহাড়ধসের পর নতুন স্তর দেখা যায় এবং ভঙ্গুর নমুনা কীভাবে অক্ষত রাখতে হয়—এসব তিনি কাজ করতে করতেই শিখেছিলেন।
১৮১০ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি গুরুতর আর্থিক সমস্যায় পড়ে। জীবাশ্ম সংগ্রহ তখন মেরির কাছে কৌতূহলের পাশাপাশি জীবিকার উপায়ও হয়ে ওঠে। কাজটি অবশ্য সহজ ছিল না। লাইম রিজিসের খাড়া পাহাড় বর্ষা ও শীতের সময় ভেঙে পড়তে পারত; আবার নিচের সৈকতে জোয়ার এসে অনুসন্ধানকারীর ফেরার পথ আটকে দিত। সদ্য ধসে পড়া পাথরে জীবাশ্ম পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকায় ঝুঁকির সময়েই তাঁকে বের হতে হতো। একটি গুরুত্বপূর্ণ নমুনা খুঁজে পাওয়ার পেছনে ছিল দীর্ঘ হাঁটা, আবহাওয়া বোঝার দক্ষতা এবং বিপজ্জনক স্থানে সতর্কভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
তাঁর প্রথম বড় আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন বড় ভাই জোসেফ। ১৮১১ সালের দিকে জোসেফ একটি অদ্ভুত প্রাণীর মাথার খুলি খুঁজে পান। মেরি পরে আশপাশের শিলায় অনুসন্ধান চালিয়ে সেই প্রাণীর দেহের আরও অংশ উদ্ধার করেন। কঙ্কালটি ইকথিওসরের—সমুদ্রে বসবাসকারী এক বিলুপ্ত সরীসৃপের। আজ জানা যায়, ইকথিওসর ডাইনোসর ছিল না; তার মাছের মতো দেহ ও সাঁতারের উপযোগী অঙ্গ ছিল। কিন্তু সে সময় এত পূর্ণাঙ্গ একটি সামুদ্রিক সরীসৃপের কঙ্কাল ছিল বিস্ময়কর। বিচ্ছিন্ন দাঁত বা হাড়ের তুলনায় মাথা থেকে শরীর পর্যন্ত যুক্ত অংশ বিজ্ঞানীদের প্রাণীটির গঠন বোঝার অনেক ভালো সুযোগ দেয়।
এই আবিষ্কারের তাৎপর্য বুঝতে সেই সময়ের জ্ঞানের অবস্থাটি মনে রাখা দরকার। অনেক জীবাশ্ম আগে থেকেই পরিচিত ছিল, কিন্তু অচেনা হাড় কোন প্রাণীর, সে কীভাবে বেঁচে থাকত বা কেন এখন আর দেখা যায় না—এসব নিয়ে মতভেদ ছিল। ইকথিওসরের কঙ্কাল দেখাল, লাইম রিজিসের বর্তমান শুষ্ক পাহাড়ি পাথরের ভেতর একসময়ের সামুদ্রিক প্রাণীর দেহ সংরক্ষিত আছে। আজকের স্থলভাগ অতীতে ভিন্ন পরিবেশের অংশ ছিল—এই ধারণাকে এমন আবিষ্কার আরও শক্ত ভিত্তি দেয়। একই সঙ্গে জীবাশ্মকে কেবল বিচিত্র বস্তু হিসেবে দেখার বদলে প্রাচীন জীবনের নথি হিসেবে পড়ার গুরুত্ব বাড়ে।
১৮২৩ সালে মেরি আরেকটি অসাধারণ কঙ্কাল খুঁজে পান: প্রায় সম্পূর্ণ একটি প্লেসিওসর। এর ছোট মাথা, লম্বা গলা, প্রশস্ত দেহ ও চারটি পাখনার মতো অঙ্গ পরিচিত প্রাণীদের সঙ্গে সহজে মেলানো যাচ্ছিল না। কঙ্কালটির অস্বাভাবিক গঠন দেখে কেউ কেউ প্রথমে এর সত্যতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। নমুনাটি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এটি সত্যিকারের প্রাচীন প্রাণী। প্লেসিওসরের এই কঙ্কাল শুধু নতুন এক আকৃতি দেখায়নি; এটি বুঝিয়েছিল যে অতীতের সমুদ্রে আজকের পরিচিত প্রাণীদের চেয়ে অনেক ভিন্ন সরীসৃপ বাস করত।
জীবাশ্ম উদ্ধারের সময় মেরির কাজ কেবল পাথর থেকে হাড় আলাদা করা ছিল না। কঙ্কালের কোন অংশ কোথায় রয়েছে, একটি হাড় আরেকটির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত এবং পাথর সরাতে গিয়ে কোন সূক্ষ্ম অংশ ভেঙে যেতে পারে—এসব সিদ্ধান্ত মাঠেই নিতে হতো। সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ কঙ্কাল পাওয়া এত মূল্যবান হওয়ার একটি কারণ এখানেই। বিচ্ছিন্ন হাড় থেকে যে সম্পর্ক আন্দাজ করতে হয়, যুক্ত কঙ্কালে তার অনেকটাই দেখা যায়। মেরির ধৈর্য ও প্রস্তুতির দক্ষতার ফলে সংগৃহীত নমুনাগুলো পরবর্তী গবেষণার উপযোগী হয়ে উঠত।
১৮২৮ সালে তিনি ব্রিটেনে পাওয়া প্রথম উড়ন্ত সরীসৃপের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন। পরে প্রাণীটিকে ডাইমরফোডন নামে চিহ্নিত করা হয়। ডানা থাকা মানেই এটি পাখি ছিল না; এটি ছিল টেরোসর গোত্রের বিলুপ্ত সরীসৃপ। সমুদ্রের ইকথিওসর ও প্লেসিওসরের পাশাপাশি উড়ন্ত সরীসৃপের এই নমুনা প্রাচীন প্রাণীজগতের বৈচিত্র্যকে আরও স্পষ্ট করে। একই অঞ্চলের শিলা থেকে পাওয়া জীবাশ্মগুলো মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা কেবল আলাদা আলাদা প্রাণীর নাম জানছিলেন না, বহু আগের একটি পরিবেশে কী ধরনের জীবন ছিল, তারও ছবি গড়তে পারছিলেন।
মেরি ছোট জীবাশ্মের গুরুত্বও বুঝতেন। প্রাণীর পেটের অংশের কাছে পাওয়া মাছের আঁশ ও হাড় দেখে তিনি তাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পাথরের মতো শক্ত কিছু বস্তু যে প্রাচীন প্রাণীর মল হতে পারে, সে সম্ভাবনাও তিনি চিনতে সাহায্য করেন; এগুলোকে এখন জীবাশ্মীভূত মল বলা হয়। দেখতে আকর্ষণীয় কঙ্কালের তুলনায় এমন নমুনা সহজে উপেক্ষিত হতে পারত। অথচ কোনো প্রাণী কী খেত এবং খাদ্যশৃঙ্খলে তার অবস্থান কী ছিল, তা বোঝার জন্য এগুলো মূল্যবান। জীবাশ্ম যে প্রাণীর মৃত্যুর প্রমাণের পাশাপাশি তার বেঁচে থাকার সূত্রও বহন করে, মেরির পর্যবেক্ষণ সে দিকটি উন্মোচন করেছিল।
নিজের দক্ষতা বাড়াতে তিনি জীবন্ত প্রাণীর দেহগঠন পর্যবেক্ষণ করতেন এবং উদ্ধার করা হাড়ের সঙ্গে তুলনা করতেন। তাঁর সংগ্রহ দেখতে ও নমুনা কিনতে বহু ভূতত্ত্ববিদ এবং সংগ্রাহক লাইম রিজিসে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা থেকে মেরি যেমন নতুন প্রশ্ন জানতেন, তেমনি তাঁর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকেও তাঁরা উপকৃত হতেন। কোন নমুনা কোথায় পাওয়া গেছে, শিলার ভেতর সেটি কী অবস্থায় ছিল—এসব তথ্য ছাড়া কেবল কঙ্কাল হাতে পেলেই সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। তাই তাঁর পর্যবেক্ষণের মূল্য নমুনা সংগ্রহের বাইরেও বিস্তৃত ছিল।
তবু তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতির পথ ছিল সংকীর্ণ। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ব্রিটেনের বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। দরিদ্র পরিবারের একজন নারী হিসেবে মেরির পক্ষে ব্যয়বহুল শিক্ষা বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ পাওয়াও সম্ভব ছিল না। তাঁর উদ্ধার করা নমুনা নিয়ে পুরুষ বিজ্ঞানীরা আলোচনা ও গবেষণাপত্র প্রকাশ করতেন, কিন্তু সেই আলোচনায় আবিষ্কারকের নাম সব সময় যথাযথ গুরুত্ব পেত না। জীবাশ্ম বিক্রি করে তাঁকে সংসার চালাতে হতো; ফলে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করলেও আর্থিক নিশ্চয়তা আসেনি। তাঁর জীবনের এই বৈপরীত্য বিজ্ঞানচর্চায় শ্রম ও স্বীকৃতি কীভাবে অসমভাবে ভাগ হতো, তা স্পষ্ট করে।
মেরি অ্যানিংকে নিয়ে একটি ভুল ধারণা হলো, তিনি একাই বিলুপ্তি বা পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসের ধারণা আবিষ্কার করেছিলেন। বাস্তবে এসব প্রশ্ন নিয়ে তাঁর আগে ও তাঁর সমসাময়িক অনেকেই কাজ করছিলেন। তাঁর বিশেষ অবদান ছিল আলোচনার জন্য অসাধারণ জীবাশ্ম ও নির্ভরযোগ্য মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ সরবরাহ করা। ইকথিওসর, প্লেসিওসর ও টেরোসরের নমুনা দেখিয়েছিল, পৃথিবীতে এমন প্রাণী একসময় ছিল যারা এখন আর নেই। শিলার স্তর এবং তার ভেতরের প্রাণীর অবশেষ মিলিয়ে অতীতকে বোঝার যে বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা এগোচ্ছিল, মেরির কাজ তাকে শক্তিশালী করেছিল।
তাঁর আবিষ্কারের প্রভাব জনসাধারণের কল্পনাতেও পৌঁছায়। ভূতত্ত্ববিদ হেনরি ডি লা বেশ লাইম রিজিসের জীবাশ্মের ভিত্তিতে প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীদের একটি দৃশ্য আঁকেন। ছবিটি বিক্রি করে মেরিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়। এ ধরনের ছবিতে প্রথমবারের মতো বহু মানুষের সামনে জীবাশ্মের হাড়গুলো সম্ভাব্য জীবন্ত প্রাণী ও তাদের পরিবেশের রূপ পায়। তবে ছবির দৃশ্য কল্পনার সহায়তায় নির্মিত; প্রতিটি আচরণ সরাসরি জীবাশ্মে সংরক্ষিত ছিল না। প্রমাণ ও পুনর্গঠনের এই সম্পর্ক আজও প্রাচীন প্রাণী নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৮৪৭ সালে মেরি অ্যানিংয়ের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে তাঁর অবদানের মূল্যায়ন আরও বিস্তৃত হয়, কিন্তু তাঁর জীবনের গল্পের গুরুত্ব শুধু বিলম্বিত স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দেখিয়েছিলেন, গভীর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও গড়ে উঠতে পারে—যদি অনুসন্ধানকারী দীর্ঘদিন ধরে একই স্থান পর্যবেক্ষণ করেন, প্রমাণ যত্নে সংরক্ষণ করেন এবং অচেনা কিছু দেখলে প্রশ্ন করতে থাকেন। লাইম রিজিসের ভঙ্গুর পাহাড়ে পাওয়া তাঁর জীবাশ্মগুলো আজও মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ইতিহাস বোঝার বড় পরিবর্তন কখনো কখনো শুরু হয় পাথরের ভেতর লুকিয়ে থাকা একটি হাড় চিনতে পারা থেকে।
হেলেন কেলার: দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারিয়েও বিশ্বজুড়ে অধিকার আন্দোলনের কণ্ঠ হয়ে ওঠার ইতিহাস
মেরি শেলি: ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ লিখে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ইতিহাস বদলে দেওয়া তরুণী
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার: পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ কীভাবে ব্রিটিশ শাসনে এসেছিল?
বোয়ার যুদ্ধ ও দক্ষিণ আফ্রিকা: সোনা, হীরা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
আফ্রিকার জন্য প্রতিযোগিতা: মিশর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস