বোয়ার যুদ্ধ ও দক্ষিণ আফ্রিকা: সোনা, হীরা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার
সোনা, হীরা ও দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃত্ব নিয়ে ব্রিটিশ-বুর রক্তক্ষয়ী সংঘাত
দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ ও বুরদের সংঘাত শুধু দুটি শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বিরোধ ছিল না। এর পেছনে ছিল উত্তমাশা অন্তরীপের কৌশলগত অবস্থান, বিশ্বের বৃহত্তম হীরা ও সোনার খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ, আফ্রিকার দক্ষিণাংশে সাম্রাজ্যিক আধিপত্য এবং কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের ভূমি ও শ্রমের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। উনিশ শতকের শেষভাগে খনিজসম্পদ আবিষ্কারের পর দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব এত দ্রুত বেড়ে যায় যে ব্রিটেন সেখানে স্বাধীন বুর প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বকে নিজের বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক পরিকল্পনার বাধা হিসেবে দেখতে শুরু করে। সোনা ও হীরা যুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল না, কিন্তু এগুলো পুরোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে বিস্ফোরণের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল।
বুররা মূলত সপ্তদশ শতক থেকে কেপ অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী ডাচ, জার্মান ও ফরাসি হুগেনো বংশোদ্ভূত কৃষকদের উত্তরসূরি। তারা আফ্রিকান্স ভাষায় কথা বলত এবং নিজেদের পৃথক ধর্মীয় ও কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলেছিল। নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময় ব্রিটেন কেপ দখল করে এবং ১৮১৫ সালে অঞ্চলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসে। ইংরেজি ভাষার প্রসার, ব্রিটিশ আইন, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং ১৮৩৪ সালে দাসত্ব বিলোপ বহু বুর কৃষকের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
১৮৩০ ও ১৮৪০-এর দশকে হাজার হাজার বুর বসতি স্থাপনকারী গরুর গাড়িতে পরিবার ও সম্পদ নিয়ে কেপ থেকে উত্তরের অভ্যন্তরভাগে চলে যান। এই অভিবাসন মহাযাত্রা নামে পরিচিত। তারা আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর ভূমিতে প্রবেশ করে সংঘর্ষ, চুক্তি ও দখলের মাধ্যমে নতুন বসতি গড়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত ট্রান্সভাল বা দক্ষিণ আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট নামে দুটি স্বাধীন বুর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটেন বিভিন্ন সময় তাদের স্বাধীনতা স্বীকার করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ কখনো শেষ হয়নি।
১৮৬৭ সালে কিম্বার্লির কাছে হীরা আবিষ্কার পরিস্থিতি বদলে দেয়। কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার খনিশ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী সেখানে পৌঁছে যায়। হীরাসমৃদ্ধ গ্রিকুয়াল্যান্ড পশ্চিম অঞ্চল নিয়ে বুর রাষ্ট্র ও স্থানীয় আফ্রিকান শাসকদের প্রতিদ্বন্দ্বী দাবি থাকলেও ব্রিটেন সেটি নিজের অধীনে নেয়। সেসিল রোডস ধীরে ধীরে খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করে ডি বিয়ার্স প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং বিপুল সম্পদের মালিক হন। খনিতে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের কম মজুরি, কঠোর নজরদারি ও আবদ্ধ শ্রমশিবিরে কাজ করানো হতো।
ব্রিটেন ১৮৭৭ সালে আর্থিক দুর্বলতা ও আফ্রিকান রাজ্যগুলোর সম্ভাব্য আক্রমণের অজুহাতে ট্রান্সভাল দখল করে। বুররা প্রথমে রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং পরে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে। ১৮৮০ সালে প্রথম বোয়ার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ভূখণ্ডে অভ্যস্ত বুর অশ্বারোহীরা বিচ্ছিন্ন দলে দ্রুত চলাচল করত এবং দূর থেকে নির্ভুল গুলি চালাত। উজ্জ্বল লাল পোশাক পরা ব্রিটিশ সেনারা তাদের সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠত।
১৮৮১ সালের মাজুবা পাহাড়ের যুদ্ধে বুর যোদ্ধারা একটি ব্রিটিশ বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে। এই অপমানজনক পরাজয়ের পর ব্রিটিশ সরকার ট্রান্সভালকে সীমিত স্বশাসন ফিরিয়ে দেয়, যদিও সাম্রাজ্যিক তত্ত্বাবধানের দাবি বজায় রাখে। প্রিটোরিয়া ও লন্ডন চুক্তির মাধ্যমে বুররা কার্যত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। প্রথম যুদ্ধ তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও এটি বুরদের মধ্যে শক্তিশালী জাতীয় আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং ব্রিটিশদের মনে প্রতিশোধ ও পুনর্নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা রেখে যায়।
১৮৮৬ সালে ট্রান্সভালের উইটওয়াটারস্র্যান্ড অঞ্চলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণভান্ডার আবিষ্কৃত হয়। মরুভূমিসদৃশ প্রান্তরে দ্রুত জোহানেসবার্গ নগর গড়ে ওঠে এবং ট্রান্সভাল দরিদ্র কৃষিভিত্তিক প্রজাতন্ত্র থেকে ধনী খনিজরাষ্ট্রে পরিণত হয়। স্বর্ণখনি থেকে বিপুল রাজস্ব প্রেসিডেন্ট পল ক্রুগারের সরকারকে অস্ত্র কেনা, রেলপথ নির্মাণ এবং প্রশাসন শক্তিশালী করার সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে ট্রান্সভাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দক্ষিণ আফ্রিকান উপনিবেশগুলোর তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্বর্ণের সন্ধানে ব্রিটিশসহ বিপুলসংখ্যক বিদেশি শ্রমিক, প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী ট্রান্সভালে প্রবেশ করেন। বুররা তাদের বিদেশাগত বাসিন্দা হিসেবে দেখত। তারা অর্থনীতির বড় অংশ পরিচালনা করলেও সহজে ভোটাধিকার পেত না। ক্রুগার আশঙ্কা করতেন, দ্রুত ভোটাধিকার দিলে সংখ্যায় বাড়তে থাকা বিদেশিরা নির্বাচনের মাধ্যমে বুর প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে একীভূত করতে পারে। ব্রিটিশ সরকার তাদের রাজনৈতিক অধিকারের দাবিকে ট্রান্সভালের ওপর চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
কেপ কলোনির প্রধানমন্ত্রী সেসিল রোডস দক্ষিণ আফ্রিকার বুর রাষ্ট্রগুলোকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে এনে কায়রো থেকে কেপ পর্যন্ত প্রভাববলয় গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ১৮৯৫ সালের শেষ দিকে তার সহযোগী লিয়েন্ডার স্টার জেমসন সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ট্রান্সভালে প্রবেশ করেন। পরিকল্পনা ছিল জোহানেসবার্গে বিদেশিদের বিদ্রোহের সঙ্গে অভিযানটি যুক্ত হবে। কিন্তু প্রত্যাশিত বিদ্রোহ ঘটেনি এবং জেমসনের বাহিনী দ্রুত আত্মসমর্পণ করে। এই ব্যর্থ অভিযান রোডসের রাজনৈতিক পতন ঘটায় এবং বুরদের কাছে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে ওঠে।
এরপর কেপের ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি আলফ্রেড মিলনার বিদেশিদের ভোটাধিকার প্রশ্নে ক্রুগারের ওপর চাপ বাড়ান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সচিব জোসেফ চেম্বারলেইনও কঠোর অবস্থান নেন। আলোচনার পাশাপাশি ব্রিটেন দক্ষিণ আফ্রিকায় সৈন্য পাঠাতে শুরু করে। ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট এটিকে আসন্ন আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে দেখে। ১৮৯৯ সালের অক্টোবরে ট্রান্সভাল ব্রিটেনকে সৈন্য প্রত্যাহারের চরমপত্র দেয়; তা প্রত্যাখ্যাত হলে দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধ শুরু হয়।
প্রথম পর্যায়ে বুর বাহিনী নাটাল ও কেপ সীমান্ত অতিক্রম করে লেডিস্মিথ, কিম্বার্লি ও মাফেকিং অবরোধ করে। তারা ম্যাগার্সফন্টেইন, স্টর্মবার্গ ও কোলেনসোর যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে। ১৮৯৯ সালের ডিসেম্বরের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা ব্রিটেনে “কালো সপ্তাহ” নামে পরিচিত হয়। বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য তুলনামূলক ছোট দুটি কৃষক প্রজাতন্ত্রের কাছে অপমানজনকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ায় ব্রিটিশ সামরিক নেতৃত্ব কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে।
ব্রিটেন এরপর ফ্রেডরিক রবার্টস ও হার্বার্ট কিচেনারের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক সৈন্য পাঠায়। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও বাহিনী আসে। ১৯০০ সালে কিম্বার্লি, লেডিস্মিথ ও মাফেকিংয়ের অবরোধ ভেঙে দেওয়া হয়। ব্রিটিশরা ব্লুমফন্টেইন, জোহানেসবার্গ ও প্রিটোরিয়া দখল করে এবং দুটি বুর প্রজাতন্ত্রকে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করে। ব্রিটিশ নেতৃত্ব যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে মনে করলেও বুর যোদ্ধারা নিয়মিত সেনাবাহিনী ভেঙে ছোট অশ্বারোহী দলে গেরিলা লড়াই শুরু করে।
বুর যোদ্ধারা রেলপথ, টেলিগ্রাফ, সামরিক চৌকি ও সরবরাহবহরে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে দ্রুত সরে যেত। তাদের মোকাবিলায় কিচেনার দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া ও ছোট সুরক্ষিত চৌকির বিস্তৃত রেখা নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনী পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে। বুর যোদ্ধাদের খাদ্য ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত করতে খামারবাড়ি পোড়ানো, শস্য ধ্বংস, গবাদিপশু হত্যা এবং কূপ নষ্ট করা হয়। এতে যোদ্ধাদের পাশাপাশি বেসামরিক পরিবারও সম্পূর্ণভাবে জীবিকা হারায়।
উচ্ছেদ করা নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ব্রিটিশরা বন্দিশিবিরে পাঠায়। অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপর্যাপ্ত খাদ্য এবং হাম ও টাইফয়েডের মতো রোগে প্রায় আটাশ হাজার বুর বেসামরিক মানুষ মারা যায়, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু। ব্রিটিশ সমাজকর্মী এমিলি হবহাউস শিবির পরিদর্শন করে দুর্দশার বিবরণ প্রকাশ করলে ব্রিটেনে জনমত ক্ষুব্ধ হয়। পরে কিছু প্রশাসনিক উন্নতি করা হলেও ততদিনে বিপুল প্রাণহানি ঘটে গেছে।
কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন বোয়ার যুদ্ধের প্রচলিত বিবরণে উপেক্ষিত ছিল। উভয় পক্ষই তাদের রসদ বহন, পথনির্দেশ, খনি ও খামারের কাজ এবং কখনো সশস্ত্র দায়িত্বে ব্যবহার করেছিল। বুর খামার ধ্বংস হওয়ার সময় কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক ও ভাড়াটেরাও ঘর ও জীবিকা হারায়। তাদের জন্য নির্মিত পৃথক বন্দিশিবিরে খাদ্য ও চিকিৎসার অবস্থা আরও খারাপ ছিল। এই শিবিরগুলোতে অন্তত চৌদ্দ হাজার এবং সম্ভবত আরও অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান মারা যান।
ব্রিটিশরা যুদ্ধকে বুর শাসনের অন্যায় দূর করা এবং বিদেশি বাসিন্দাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার অভিযান হিসেবে প্রচার করেছিল। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রাজনৈতিক অধিকার তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল না। অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান আশা করেছিলেন, ব্রিটিশ বিজয়ের পর ভোটাধিকার ও জমির অধিকার বাড়বে। বাস্তবে যুদ্ধশেষে শ্বেতাঙ্গ বুরদের সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠাই ব্রিটিশ নীতির অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। যুদ্ধটি দক্ষিণ আফ্রিকার গণতন্ত্রের জন্য নয়; খনিজসম্পদ, শ্বেতাঙ্গ রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণের বিন্যাস নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল।
দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধ, পরিবারগুলোর দুর্দশা এবং সামরিক ক্লান্তির কারণে বুর নেতৃত্ব আলোচনায় সম্মত হয়। ১৯০২ সালের ৩১ মে ভেরেনিজিং শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়। বিনিময়ে বুর যোদ্ধাদের সাধারণ ক্ষমা, ডাচ ভাষার সীমিত ব্যবহার, খামার পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে স্বশাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকারের প্রশ্ন ভবিষ্যৎ শ্বেতাঙ্গশাসিত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের জন্য রেখে দেওয়া হয়।
ব্রিটেন দ্রুত বুঝতে পারে, স্থায়ী শাসনের জন্য পরাজিত বুর জনগোষ্ঠীকে সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ রিভার কলোনি কয়েক বছরের মধ্যে দায়িত্বশীল সরকার লাভ করে। ১৯১০ সালে কেপ, নাটাল, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ রিভার কলোনি যুক্ত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সংঘরাষ্ট্র গঠন করে। এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি স্বশাসিত অধিরাজ্য ছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ব্রিটিশ ও আফ্রিকানার শ্বেতাঙ্গ নেতাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
নতুন রাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ, মিশ্রবর্ণ ও ভারতীয় জনগণের অধিকারের প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে। ১৯১৩ সালের ভূমি আইন দেশের অধিকাংশ ভূমি শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত করে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে অল্প কিছু নির্ধারিত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। খনিশিল্পে জাতিভিত্তিক মজুরি ও চাকরির বিভাজন আরও কঠোর হয়। পরে এই ব্যবস্থাগুলোই প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী শাসনের ভিত্তি গড়ে দেয়। যে যুদ্ধ ব্রিটিশ ও বুরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে শুরু হয়েছিল, তার পরিণতিতে উভয় শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সমঝোতা কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠের বঞ্চনাকে স্থায়ী করে।
ব্রিটেন যুদ্ধ জিতলেও বিজয়ের মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি। কয়েক লক্ষ সৈন্য মোতায়েন, বিপুল অর্থব্যয়, দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধ এবং বন্দিশিবিরের মানবিক বিপর্যয় সাম্রাজ্যের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইউরোপের বহু দেশে বুরদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। যুদ্ধ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও রণকৌশলের দুর্বলতাও প্রকাশ করে, যা পরে সামরিক সংস্কারে প্রভাব ফেলে।
বোয়ার যুদ্ধ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সোনা ও হীরা নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল সমগ্র অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সংঘাত। ব্রিটেন এমন একটি স্বাধীন, ধনী ও সশস্ত্র বুর রাষ্ট্র মেনে নিতে চায়নি, যা দক্ষিণ আফ্রিকায় তার সাম্রাজ্যিক প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। বুররা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়লেও তাদের প্রজাতন্ত্রও আফ্রিকান জনগণের জমি ও শ্রমের ওপর নির্মিত ছিল। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বিজয় দক্ষিণ আফ্রিকাকে একত্র করেছিল, কিন্তু সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধ, বন্দিশিবির, ভূমি দখল এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের ভিত্তির ওপর।
পালেঙ্কে: জঙ্গলের নিচে লুকিয়ে থাকা মায়া রাজাদের বিস্ময়কর প্রাচীন নগরী
টিকাল: গুয়াতেমালার জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন মায়া মহানগরীর রহস্য
মায়া সভ্যতা: জঙ্গলের মাঝে বিশাল নগরীগুলো কেন পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল?
লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ ও গাদ্দাফির পতন: গণবিক্ষোভ থেকে ন্যাটো হস্তক্ষেপ
মিশরের তাহরির স্কয়ার বিপ্লব: ১৮ দিনে মুবারকের ৩০ বছরের শাসনের পতন
তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব: বেন আলীর ২৩ বছরের শাসনের পতন