সুয়েজ খাল ও মিশর দখল: ভারতগামী সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তার
সিরিজ: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার
ভারতগামী সাম্রাজ্যিক পথ রক্ষায় সুয়েজ খাল ও মিশরের ওপর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ
উনিশ শতকের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান ভূখণ্ড ছিল ভারত, কিন্তু ব্রিটেন থেকে ভারতে পৌঁছানোর পুরোনো সমুদ্রপথ ছিল দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। জাহাজকে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করতে হতো। মিশরের মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করা একটি খাল এই দূরত্ব নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিতে পারত। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার পর সেটি দ্রুত ব্রিটেনের বাণিজ্য, নৌবাহিনী এবং ভারতীয় সাম্রাজ্যের জীবনরেখায় পরিণত হয়। সুয়েজ নিয়ন্ত্রণের অর্থ ছিল ব্রিটেন, ভারত এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে দ্রুততম সামুদ্রিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করা।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে মিশরীয় ভূখণ্ড দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথ তৈরির ধারণা প্রাচীন হলেও আধুনিক খাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন ফরাসি কূটনীতিক ফের্দিনান্দ দ্য লেসেপস। তিনি মিশরের শাসক সাঈদ পাশার কাছ থেকে ১৮৫৪ ও ১৮৫৬ সালে খাল নির্মাণের অনুমতি লাভ করেন। সুয়েজ খাল কোম্পানি গঠিত হয় এবং ১৮৫৯ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। কোম্পানির শেয়ারের বড় অংশ ফরাসি বিনিয়োগকারী এবং মিশরীয় সরকার কিনেছিল। ব্রিটিশ সরকার প্রথমদিকে প্রকল্পটির বিরোধিতা করে, কারণ তারা আশঙ্কা করেছিল যে ফরাসি প্রভাবাধীন একটি খাল ভারতের পথে ব্রিটিশ যোগাযোগকে প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে তুলে দেবে।
খাল নির্মাণে বিপুলসংখ্যক মিশরীয় কৃষককে বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োগ করা হয়েছিল। মরুভূমিতে কঠোর আবহাওয়া, রোগ, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং দুর্বল কর্মপরিবেশে বহু শ্রমিক প্রাণ হারান। পরে ইউরোপীয় যন্ত্রপাতি ও খননযন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও প্রকল্পের মানবিক মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি। মিশরীয় সরকার খালের পাশাপাশি নতুন বন্দর, রেলপথ, সেচব্যবস্থা ও নগর নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। উন্নয়নের বাহ্যিক জৌলুশের নিচে বিদেশি ঋণের বিশাল বোঝা জমতে থাকে।
১৮৬৯ সালের নভেম্বরে সুয়েজ খাল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ১৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথ ভূমধ্যসাগরের পোর্ট সাঈদকে লোহিত সাগরের সুয়েজের সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে ইউরোপ থেকে ভারত ও পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার পথে আফ্রিকা প্রদক্ষিণের প্রয়োজন অনেকাংশে দূর হয়। বাষ্পচালিত জাহাজের জন্য খালটি বিশেষভাবে উপযোগী ছিল, কারণ এসব জাহাজ নিয়মিত কয়লা সরবরাহ ও পূর্বনির্ধারিত পথের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ব্রিটিশ বণিকেরা দ্রুত খালটির সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারীতে পরিণত হন, যদিও তাদের সরকার একসময় নির্মাণের বিরোধিতা করেছিল।
ভারত থেকে তুলা, চা, নীল, পাট, গম ও অন্যান্য পণ্য দ্রুত ব্রিটেনে পৌঁছাতে শুরু করে। বিপরীত দিকে ব্রিটিশ শিল্পপণ্য, কর্মকর্তা, সৈন্য ও ডাক ভারতে পাঠানো সহজ হয়। অস্ট্রেলিয়া, চীন, মালয় ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যোগাযোগেও খালের গুরুত্ব বাড়ে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী প্রয়োজনে ইউরোপ থেকে ভারত মহাসাগরে দ্রুত যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে পারত। সুয়েজ খাল শুধু বাণিজ্যের পথ ছোট করেনি; এটি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশকে দ্রুত প্রশাসনিক ও সামরিক যোগাযোগে যুক্ত করেছিল।
মিশরের খেদিভ ইসমাইল দেশটিকে ইউরোপীয় ধাঁচে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। রেলপথ, টেলিগ্রাফ, সেচব্যবস্থা, বন্দর, প্রাসাদ ও নগর উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু দুর্নীতি, অপচয়, উচ্চ সুদের বিদেশি ঋণ এবং সুয়েজ প্রকল্পের ব্যয় রাষ্ট্রকে আর্থিক সংকটে ফেলে। মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় মিশরীয় তুলার দাম বেড়ে যাওয়ায় সাময়িক সমৃদ্ধি এসেছিল; যুদ্ধ শেষ হলে দাম কমে যায় এবং ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ে।
১৮৭৫ সালে অর্থের তীব্র প্রয়োজন দেখা দিলে ইসমাইল সুয়েজ খাল কোম্পানিতে মিশরীয় সরকারের প্রায় ৪৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেলি সংসদের পূর্বানুমোদনের অপেক্ষা না করে রথচাইল্ড ব্যাংক পরিবারের কাছ থেকে দ্রুত ঋণ নিয়ে শেয়ারগুলো কিনে নেন। এর মাধ্যমে ব্রিটেন কোম্পানির একক সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক না হলেও বৃহত্তম শেয়ারধারীদের একটিতে পরিণত হয় এবং খালের ভবিষ্যতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লাভ করে। বন্দুকের আগে অর্থ ও শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমেই সুয়েজে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের প্রথম শক্ত ভিত্তি স্থাপিত হয়।
শেয়ার বিক্রি করেও মিশরের ঋণসংকট শেষ হয়নি। ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিশরের অর্থনীতি পর্যবেক্ষণের জন্য দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা রাজস্ব, ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। বিদেশি ঋণদাতাদের অর্থ ফেরত দেওয়াকে মিশরীয় জনগণের কল্যাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। করের চাপ বিশেষত কৃষকদের ওপর পড়ে, অথচ ইউরোপীয় নাগরিকেরা বিশেষ আইনি ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করতেন। আর্থিক সংকট ধীরে ধীরে মিশরের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকেও সীমিত করে ফেলে।
ইউরোপীয় চাপের মুখে ১৮৭৯ সালে অটোমান সুলতান ইসমাইলকে পদচ্যুত করে তার ছেলে তাওফিককে খেদিভ নিযুক্ত করেন। মিশর আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল, কিন্তু বাস্তবে খেদিভ বংশ প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন করত এবং ইউরোপীয় শক্তি তার নীতিতে ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ করছিল। সেনাবাহিনীতে মিশরীয় কর্মকর্তাদের প্রতি বৈষম্য, বাজেট সংকোচনে সৈন্য ছাঁটাই এবং তুর্কি-সার্কাসীয় অভিজাতদের প্রাধান্য অসন্তোষ বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে কর্নেল আহমদ উরাবি একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন।
উরাবির আন্দোলনের স্লোগান ছিল—“মিশর মিশরীয়দের জন্য।” সেনা কর্মকর্তাদের দাবির সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব, বিদেশি হস্তক্ষেপের অবসান এবং খেদিভের স্বৈরাচার সীমিত করার আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয়। ১৮৮১ সালে উরাবি ও তার সহযোগীরা খেদিভকে সরকার পরিবর্তন ও সংসদীয় সংস্কার মেনে নিতে বাধ্য করেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্স আশঙ্কা করে যে জাতীয়তাবাদী সরকার বিদেশি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ইউরোপীয় বিশেষাধিকার এবং সুয়েজ খালের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
১৮৮২ সালের জুনে আলেকজান্দ্রিয়ায় স্থানীয় মিশরীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হয়। ব্রিটিশ নৌবহর আগে থেকেই বন্দরের কাছে অবস্থান করছিল। উপকূলীয় দুর্গগুলো শক্তিশালী করার অভিযোগে ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল বোমার্ডমেন্টের হুমকি দেন। ফরাসিরা সামরিক অভিযানে অংশ না নিয়ে নিজেদের জাহাজ সরিয়ে নেয়। ১১ জুলাই ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ আলেকজান্দ্রিয়ার দুর্গে গোলাবর্ষণ শুরু করে। শহরে আগুন, লুণ্ঠন ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশ সেনারা পরে বন্দর দখল করে।
ব্রিটিশ সরকার অভিযানটিকে খেদিভের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ইউরোপীয়দের নিরাপত্তা এবং সুয়েজ খাল রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন কোনো মিশরীয় সরকারকে ক্ষমতায় আসতে না দেওয়া, যা বিদেশি ঋণদাতা ও ভারতগামী সাম্রাজ্যিক পথের ওপর ব্রিটিশ প্রভাব সীমিত করতে পারে। ব্রিটিশ বাহিনী ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে সরাসরি কায়রোর দিকে না গিয়ে সুয়েজ খালের ইসমাইলিয়া অঞ্চলে অবতরণ করে। খাল কোম্পানি নিরপেক্ষতার দাবি করলেও ব্রিটিশরা এই কৌশলগত পথ ব্যবহার করে উরাবির বাহিনীর পেছনে পৌঁছে যায়।
১৮৮২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তেল এল-কেবিরে ব্রিটিশ বাহিনী ভোরের অন্ধকারে মিশরীয় প্রতিরক্ষাব্যূহে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। যুদ্ধ অল্প সময়ের মধ্যেই উরাবির বাহিনীর পরাজয়ে শেষ হয়। ব্রিটিশ সৈন্যরা কায়রো দখল করে এবং উরাবিকে বন্দী করা হয়। বিচারে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাকে সিলনে নির্বাসিত করা হয়। খেদিভ তাওফিককে সিংহাসনে রাখা হলেও মিশরের প্রকৃত রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়।
ব্রিটেন প্রথমে দাবি করেছিল যে দখল সাময়িক এবং স্থিতিশীলতা ফিরে এলে সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। বাস্তবে মিশর ১৮৮২ সাল থেকে ব্রিটিশ “আবৃত রক্ষিত রাজ্য” বা গোপন অভিভাবকত্বের মতো ব্যবস্থায় পরিচালিত হতে থাকে। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে অটোমান অধীনস্থ এবং খেদিভের শাসনাধীন থাকলেও ব্রিটিশ কনসাল-জেনারেল গুরুত্বপূর্ণ নীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। এভলিন বারিং বা লর্ড ক্রোমার ১৮৮৩ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত অর্থনীতি, প্রশাসন ও কৃষিনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন।
ব্রিটিশ প্রশাসন ঋণ পরিশোধ, বাজেটের ভারসাম্য, সেচ সম্প্রসারণ এবং তুলা উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। কিছু প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও অর্থনীতি ব্রিটিশ বস্ত্রশিল্পের জন্য কাঁচা তুলা উৎপাদনের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। মিশরীয় কর্মকর্তা ও সাধারণ জনগণ নিজেদের দেশে বিদেশি সিদ্ধান্তের অধীন হয়ে পড়েন। খালের লাভ ও কৌশলগত সুবিধার বড় অংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ পূরণ করত।
মিশর দখল ব্রিটেনকে সুদানেও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলে। সুদান আনুষ্ঠানিকভাবে মিশরীয় শাসনের অংশ হলেও সেখানে মুহাম্মদ আহমদের নেতৃত্বে মাহদিবাদী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৮৫ সালে খার্তুমের পতন ও জেনারেল চার্লস গর্ডনের মৃত্যু ব্রিটেনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরে ১৮৯৬–৯৮ সালের অভিযানে হার্বার্ট কিচেনারের বাহিনী সুদান পুনর্দখল করে। ১৮৯৮ সালের ওমদুরমানের যুদ্ধে আধুনিক অস্ত্রে মাহদিবাদী বাহিনী বিপর্যস্ত হয়। নীল নদের নিয়ন্ত্রণ মিশরের কৃষি, সুয়েজের নিরাপত্তা এবং পূর্ব আফ্রিকায় ব্রিটিশ কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
একই বছর ফাশোদায় ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী মুখোমুখি হলে আফ্রিকায় দুই শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স পিছু হটে এবং নীল উপত্যকায় ব্রিটিশ প্রাধান্য স্বীকার করে। এতে কায়রো থেকে কেপ পর্যন্ত ব্রিটিশ আফ্রিকান প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা শক্তিশালী হয়। সুয়েজ, মিশর, সুদান, এডেন ও ভারত মহাসাগরের ঘাঁটিগুলো মিলিয়ে ব্রিটেন একটি ধারাবাহিক সাম্রাজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটেনের বিপক্ষে যোগ দেয়। ১৯১৪ সালে ব্রিটেন মিশরের ওপর আনুষ্ঠানিক রক্ষিত রাজ্যের মর্যাদা ঘোষণা করে, অটোমান সার্বভৌমত্বের অবসান ঘটায় এবং আব্বাস দ্বিতীয়কে অপসারণ করে। সুয়েজ খাল তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহনের অপরিহার্য পথ ছিল। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে আসা বাহিনী এই খাল অতিক্রম করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছায়। অটোমান বাহিনী খাল আক্রমণের চেষ্টা করলেও তা দখল করতে ব্যর্থ হয়।
যুদ্ধের পর মিশরীয় জাতীয়তাবাদ আরও শক্তিশালী হয়। ১৯১৯ সালের গণবিদ্রোহের পর ব্রিটেন ১৯২২ সালে মিশরকে নামমাত্র স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু সুয়েজ খালের নিরাপত্তা, সাম্রাজ্যিক যোগাযোগ, বিদেশি স্বার্থ ও সুদানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখে। ১৯৩৬ সালের চুক্তিতে ব্রিটিশ সেনা কায়রোসহ অনেক স্থান ছাড়লেও খাল অঞ্চলে অবস্থান বজায় রাখে। ফলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলেও মিশরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ বিদেশি সামরিক নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুয়েজ খাল আবারও ব্রিটিশ যুদ্ধব্যবস্থার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। উত্তর আফ্রিকায় জার্মান ও ইতালীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা খাল এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রের জন্য সরাসরি হুমকি ছিল। এল আলামেইনের যুদ্ধগুলোতে ব্রিটিশ প্রতিরোধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অক্ষশক্তিকে মিশর ও সুয়েজ থেকে দূরে রাখা। যুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলন এবং মিশরীয় সেনাবাহিনীর অসন্তোষ ব্রিটিশ উপস্থিতিকে ক্রমেই অগ্রহণযোগ্য করে তোলে।
১৯৫২ সালের বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতনের পর গামাল আবদেল নাসেরের নেতৃত্বে মিশর সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে এগোয়। ১৯৫৪ সালের চুক্তিতে ব্রিটেন খাল অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়। ১৯৫৬ সালে নাসের সুয়েজ খাল কোম্পানি জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন পরিকল্পনায় মিশর আক্রমণ করে। সামরিকভাবে তারা অগ্রসর হলেও যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। সুয়েজ সংকট দেখিয়ে দেয় যে ব্রিটেন আর আগের মতো স্বাধীনভাবে সাম্রাজ্যিক শক্তি প্রয়োগ করতে সক্ষম নয়।
সুয়েজ খাল ও মিশর দখলের ইতিহাস তাই শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ রক্ষার ঘটনা ছিল না। এটি আর্থিক ঋণ, শেয়ার ক্রয়, কূটনৈতিক চাপ, নৌবাহিনী ও সরাসরি সামরিক দখলের সমন্বয়ে গড়া সাম্রাজ্যবাদের স্পষ্ট উদাহরণ। ব্রিটেন মিশরকে প্রথমে আনুষ্ঠানিক উপনিবেশ ঘোষণা না করেও তার অর্থনীতি, সেনাবাহিনী ও বৈদেশিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করেছিল। ভারত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্র, আর সুয়েজ ছিল সেই কেন্দ্রের সঙ্গে ব্রিটেনকে যুক্ত রাখা প্রধান ধমনি। এই ধমনির নিরাপত্তার নামে মিশরের সার্বভৌমত্ব সীমিত করা হয়, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করা হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক উপস্থিতি কয়েক প্রজন্ম ধরে স্থায়ী করা হয়।
পালেঙ্কে: জঙ্গলের নিচে লুকিয়ে থাকা মায়া রাজাদের বিস্ময়কর প্রাচীন নগরী
টিকাল: গুয়াতেমালার জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন মায়া মহানগরীর রহস্য
মায়া সভ্যতা: জঙ্গলের মাঝে বিশাল নগরীগুলো কেন পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল?
লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ ও গাদ্দাফির পতন: গণবিক্ষোভ থেকে ন্যাটো হস্তক্ষেপ
মিশরের তাহরির স্কয়ার বিপ্লব: ১৮ দিনে মুবারকের ৩০ বছরের শাসনের পতন
তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব: বেন আলীর ২৩ বছরের শাসনের পতন