বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গরিলা কতটা শক্তিশালী? শান্ত স্বভাবের বিশাল প্রাণী সম্পর্কে সত্য ও ভুল ধারণা

গরিলা কতটা শক্তিশালী? শান্ত স্বভাবের বিশাল প্রাণী সম্পর্কে সত্য ও ভুল ধারণা
বিশাল শক্তির আড়ালে গরিলার জীবন ভরা পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক যোগাযোগে।

বনের মধ্যে একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ গরিলাকে দেখলে তার শক্তি নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। প্রশস্ত কাঁধ, মোটা বাহু, বিশাল বুক এবং ভারী শরীর তাকে অসাধারণ শক্তিশালী প্রাণীর চেহারা দেয়। কিন্তু এই চেহারা থেকেই বহু অতিরঞ্জিত গল্প তৈরি হয়েছে। গরিলা নাকি মানুষের দশ গুণ শক্তিশালী, কয়েক টন ওজন তুলতে পারে কিংবা সব সময় আক্রমণের সুযোগ খোঁজে—এমন দাবি প্রচুর শোনা যায়। বাস্তব গরিলার পরিচয় আরও আকর্ষণীয়। সে শক্তিশালী, কিন্তু তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে খাবার খোঁজা, বিশ্রাম, চলাফেরা এবং পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে।

গরিলা হলো মানুষের নিকটাত্মীয় বৃহৎ বনমানুষদের একটি। তারা আফ্রিকার নির্দিষ্ট বনাঞ্চলে বাস করে এবং প্রধানত পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় দুটি প্রজাতিতে বিভক্ত। এই দুই প্রজাতির মধ্যেও উপপ্রজাতি রয়েছে। পাহাড়ি গরিলা এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় নিম্নভূমির গরিলার আবাস, খাদ্য ও সামাজিক জীবনে কিছু পার্থক্য আছে। তাই একটি গরিলার আচরণ বা শরীরের মাপকে সব গরিলার জন্য প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এই বৈচিত্র্যও তাদের সম্পর্কে বোঝার অংশ।

পূর্ণবয়স্ক পুরুষ গরিলা সাধারণত স্ত্রী গরিলার তুলনায় অনেক বড়। বহু পুরুষের ওজন প্রায় একশ চল্লিশ থেকে একশ আশি কিলোগ্রামের মধ্যে হতে পারে, যদিও প্রজাতি, বয়স, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ অনুযায়ী পার্থক্য হয়। তাদের দীর্ঘ বাহু এবং শক্তিশালী ওপরের শরীর চলাফেরা, ডাল ধরে ওঠা ও উদ্ভিদ সামলানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। মাটিতে চলার সময় সাধারণত হাতের আঙুলের গাঁটের ওপর ভর রাখে। এই শরীর মানুষের মতো দীর্ঘ দূরত্ব দৌড়ানো বা নির্দিষ্ট নিয়মে ভারোত্তোলনের জন্য তৈরি নয়; বনজীবনের কাজের জন্য অভিযোজিত।

তাহলে গরিলা মানুষের কত গুণ শক্তিশালী? নির্ভরযোগ্য উত্তর হলো, সব ধরনের শক্তিকে এক সংখ্যায় প্রকাশ করা যায় না। টানা, ধরা, ঠেলা কিংবা ওজন তোলার জন্য আলাদা পেশি, ভঙ্গি ও দক্ষতা লাগে। কোন বয়সের গরিলার সঙ্গে কোন মানুষের তুলনা করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় পুরুষ গরিলার আকার ও গঠন তাকে অনেক কাজে সাধারণ মানুষের তুলনায় স্পষ্ট সুবিধা দেয়। কিন্তু প্রচলিত ছয় গুণ বা দশ গুণের মতো সংখ্যাকে সব কাজের পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক ফল হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

একই কারণে গরিলার নির্দিষ্ট ভারোত্তোলনের ক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত দাবিগুলোও সাবধানে বিচার করা দরকার। মানুষের প্রতিযোগিতায় ওজন, ভঙ্গি ও সফল চেষ্টার নিয়ম নির্ধারিত থাকে। গরিলার ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতিতে মানসম্মত তুলনা নেই। শক্ত ডাল ভাঙতে দেখা বা কোনো বস্তুকে টানতে দেখা থেকে সরাসরি তার সর্বোচ্চ ভারোত্তোলনের হিসাব করা যায় না। গরিলার শক্তি স্বীকার করতে অবিশ্বাস্য সংখ্যা প্রয়োজন নেই; তার শরীর ও দৈনন্দিন আচরণেই শক্তির যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

এত বড় পেশি থাকা সত্ত্বেও গরিলার খাদ্য প্রধানত উদ্ভিদনির্ভর। তারা পাতা, কচি কাণ্ড, অঙ্কুর, ফল এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের অংশ খায়। পাহাড়ি গরিলার খাবারে পাতাজাতীয় উপাদান বেশি থাকে; নিম্নভূমির গরিলা ফলের প্রাপ্যতা অনুযায়ী খাদ্য বদলাতে পারে। কিছু গরিলা পোকামাকড়ও খায়। তবে তারা বড় প্রাণী শিকার করে পেশি গড়ে তোলে না। আবার শুধু কলা খেয়ে বেঁচে থাকে—এই জনপ্রিয় ছবিও ভুল। প্রাকৃতিক বনে তাদের খাবার বৈচিত্র্যময় এবং মৌসুম ও আবাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।

উদ্ভিদ থেকে পুষ্টি পাওয়া মানেই তাদের শক্তির কোনো রহস্যময় উৎস আছে, এমন নয়। উদ্ভিদেও আমিষসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে। গরিলা দীর্ঘ সময় খাবার সংগ্রহ ও খাওয়ায় ব্যয় করে; পরিপাকতন্ত্রের অণুজীব উদ্ভিদের আঁশ ভাঙতেও ভূমিকা রাখে। শরীরের গঠন নির্ধারণে খাদ্যের পাশাপাশি বংশগত বৈশিষ্ট্য ও বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই মানুষের সঙ্গে শুধু খাবারের তালিকা মিলিয়ে একই পেশি বা শক্তি পাওয়ার সিদ্ধান্ত করা যায় না। গরিলার পুষ্টি ও শরীরকে তার নিজস্ব জীববিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে দেখতে হয়।

‘সিলভারব্যাক’ নামে পরিচিত গরিলাকে অনেকে আলাদা প্রজাতি মনে করেন। আসলে এটি পরিণত পুরুষ গরিলার পিঠে রুপালি লোম তৈরি হওয়ার সঙ্গে যুক্ত পরিচয়। অনেক পারিবারিক দলের নেতৃত্বে এমন পুরুষ থাকে, কিন্তু সব দলের গঠন এক নয়। কোনো দলে একাধিক পরিণত পুরুষও থাকতে পারে। নেতৃত্বের সঙ্গে দলের নিরাপত্তা, চলাফেরা এবং সামাজিক সম্পর্ক জড়িত। শুধু সবচেয়ে বেশি শক্তি দেখালেই একটি স্থিতিশীল পরিবার তৈরি হয় না; দলের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।

গরিলার সামাজিক জীবনে যত্ন ও সান্নিধ্যের ভূমিকা স্পষ্ট। শিশুরা খেলতে খেলতে শরীরের ব্যবহার ও সামাজিক আচরণ শেখে। মায়ের সঙ্গে শিশুর দীর্ঘ সম্পর্ক থাকে। কিছু পরিণত পুরুষও ছোটদের প্রতি সহনশীলতা দেখায় এবং তাদের উপস্থিতি নিরাপত্তা দিতে পারে। তবে গরিলার পরিবারকে মানুষের পরিবারের হুবহু প্রতিচ্ছবি ভাবা ঠিক নয়। তাদের আচরণের নিজস্ব নিয়ম আছে। শান্ত দলেও প্রতিযোগিতা, বিরোধ এবং সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

বুক চাপড়ানো নিয়ে ভুল ধারণা বিশেষভাবে প্রচলিত। চলচ্চিত্রে গরিলাকে প্রায়ই মুঠো দিয়ে বুকে আঘাত করতে দেখানো হয়। বাস্তবে তারা সাধারণত হাত কাপের মতো বাঁকিয়ে শব্দ তৈরি করে। এটি যোগাযোগের একটি প্রদর্শন, যার অর্থ পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলাতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিজের উপস্থিতি ও সক্ষমতা জানানো তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ২০২১ সালের পাহাড়ি গরিলাবিষয়ক গবেষণায় বড় পুরুষের বুক চাপড়ানোর শব্দের প্রধান কম্পাঙ্ক তুলনামূলক নিচু পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই শব্দ শরীরের আকার সম্পর্কে তথ্য বহন করতে পারে।

এই যোগাযোগ সরাসরি সংঘর্ষের প্রয়োজন কমাতেও সাহায্য করতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বীর আকার সম্পর্কে ধারণা পেলে একটি প্রাণী লড়াইয়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে। তবে বুক চাপড়ানোর প্রতিটি ঘটনা আক্রমণের ঘোষণা নয়। কমবয়সী গরিলাও এই আচরণ করে। আবার শব্দের মাত্রা বা আঘাতের সংখ্যা দেখেই শক্তির নির্ভুল হিসাব করা যায় না। গবেষণার ফল কোন প্রজাতি ও পরিস্থিতির জন্য পাওয়া হয়েছে, সেই সীমাও মনে রাখতে হয়।

শান্ত স্বভাবের অর্থ অবশ্য সম্পূর্ণ নিরীহ নয়। হুমকি অনুভব করলে গরিলা সতর্কতা দেখাতে, দ্রুত এগিয়ে আসতে কিংবা আক্রমণ করতে পারে। পুরুষদের প্রতিযোগিতায় গুরুতর সংঘর্ষও ঘটে। দল পরিবর্তন ও প্রজনন প্রতিযোগিতার কিছু পরিস্থিতিতে শিশুহত্যার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। তাই গরিলাকে নিষ্ঠুর দানব বলা যেমন ভুল, তেমনি সব সময় কোমল ও নিরাপদ প্রাণী হিসেবে দেখাও ভুল। তার আচরণ বুঝতে পরিস্থিতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং হুমকির ভূমিকা বিবেচনা করতে হয়।

গরিলার শক্তি তাকে মানুষের তৈরি বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে না। বন উজাড়, শিকার, ফাঁদ এবং সংক্রামক রোগ তাদের জন্য গুরুতর হুমকি। মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জৈবিক সম্পর্কের কারণে কিছু মানববাহিত সংক্রমণও উদ্বেগের বিষয়। খাবার খোঁজা, বীজ ছড়ানো এবং উদ্ভিদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তারা বনজীবনের অংশ। ফলে তাদের সংরক্ষণ শুধু একটি শক্তিশালী প্রাণী বাঁচানোর কাজ নয়; তার আবাস ও পরিবেশের সম্পর্কগুলো রক্ষার কাজও।

গরিলার প্রকৃত বিস্ময় তার শক্তি ও সামাজিক জীবনের সহাবস্থানে। যে বাহু শক্ত ডাল সামলাতে পারে, সেই শরীরই শিশুর খেলায় ধৈর্য ধরে বসে থাকে। যে বুকের শব্দ প্রতিদ্বন্দ্বীকে সতর্ক করে, সেই প্রাণী দিনের বড় অংশ শান্তভাবে খাবার খোঁজে ও বিশ্রাম নেয়। গরিলাকে বুঝতে মানুষের সঙ্গে কাল্পনিক লড়াইয়ের হিসাব দরকার নেই। তার শরীর কী কাজে ব্যবহৃত হয়, কীভাবে যোগাযোগ করে এবং কীভাবে পরিবারে বেঁচে থাকে—এসব জানলেই শক্তির আড়ালের আসল প্রাণীটি দেখা যায়।