বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নারহোয়ালের বিশাল ‘শিং’ আসলে একটি দাঁত! সমুদ্রের ইউনিকর্নের রহস্য

নারহোয়ালের বিশাল ‘শিং’ আসলে একটি দাঁত! সমুদ্রের ইউনিকর্নের রহস্য
নারহোয়ালের মাথার সামনে বেরিয়ে থাকা প্যাঁচানো অংশটি শিং নয়, অস্বাভাবিক দীর্ঘ একটি দাঁত।

উত্তর মেরুর ঠান্ডা সমুদ্রে ভাসমান বরফের পাশ দিয়ে একটি ধূসর-সাদা প্রাণী এগিয়ে যাচ্ছে। তার শরীর তিমির মতো, কিন্তু মাথার সামনে প্রসারিত রয়েছে দীর্ঘ প্যাঁচানো একটি অংশ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কোনো রূপকথার প্রাণী বাস্তবে চলে এসেছে। এই অদ্ভুত চেহারার কারণেই নারহোয়ালকে সমুদ্রের ইউনিকর্ন বলা হয়। কিন্তু তার পরিচিত ‘শিং’ কপাল থেকে গজানো কোনো শিং নয়। এটি ওপরের চোয়ালের একটি দাঁত, যা অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ঠোঁট ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। এর গঠন যত বিস্ময়কর, ব্যবহার নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানও তত আকর্ষণীয়।

নারহোয়াল দাঁতযুক্ত তিমিদের একটি স্বতন্ত্র প্রজাতি। বেলুগা তিমি তার নিকট আত্মীয়। এটি মাছ নয়, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী। বাতাসে শ্বাস নেয়, বাচ্চা জন্ম দেয় এবং মায়ের দুধ খাইয়ে শাবক বড় করে। উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফঘেরা সমুদ্র তার জীবনের কেন্দ্র। কানাডার উত্তরের জলভাগ ও গ্রিনল্যান্ডের আশপাশের অঞ্চল এর গুরুত্বপূর্ণ আবাস। ঠান্ডা পানি, দীর্ঘ অন্ধকার ঋতু এবং পরিবর্তনশীল সামুদ্রিক বরফের মধ্যে তাকে খাবার খুঁজতে ও শ্বাস নেওয়ার সুযোগ বজায় রাখতে হয়।

একটি পূর্ণবয়স্ক নারহোয়ালের শরীর কয়েক মিটার দীর্ঘ হতে পারে। পুরুষের বাইরে বেরিয়ে থাকা দাঁত কখনো প্রায় তিন মিটার পর্যন্ত বাড়ে। অর্থাৎ প্রাণীটির শরীরের সামনে আরও একটি দীর্ঘ অংশ যুক্ত থাকে, যা দূর থেকেও আলাদা করে চেনা যায়। তবে প্রতিটি পুরুষের দাঁত একই দৈর্ঘ্যের নয়। বয়স, বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত বৈচিত্র্যের কারণে আকার বদলায়। কোনো ছবি দেখে দাঁতের দৈর্ঘ্য অনুমান করাও কঠিন হতে পারে, কারণ দৃষ্টিকোণ ও পানির নিচে থাকা অংশ দৃশ্যমান অনুপাত বদলে দেয়।

এই দাঁত সাধারণত ওপরের চোয়ালের বাম পাশের দাঁত থেকে তৈরি হয়। মাথার সামনের দৃশ্যে সেটি মাঝখানে আছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তার উৎস কপালের কেন্দ্র নয়। সাধারণ অবস্থায় অপর পাশের সংশ্লিষ্ট দাঁত চোয়ালের ভেতরে থেকে যায়। বিরল ক্ষেত্রে দুটি দাঁতই বাইরে বাড়তে পারে, তখন দুই দীর্ঘ দাঁতযুক্ত নারহোয়াল দেখা যায়। এই ব্যতিক্রম দাঁতটির প্রকৃত পরিচয় বুঝতে সাহায্য করে। শিংয়ের সঙ্গে বাহ্যিক মিল থাকলেও এটি দাঁতের বিকাশেরই একটি বিশেষ রূপ।

শিং ও দাঁতের পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গরু বা ছাগলের শিংয়ের গঠন এবং নারহোয়ালের দাঁতের গঠন এক নয়। নারহোয়ালের দীর্ঘ অংশের মূল উপাদান দন্তিন, যা অন্য স্তন্যপায়ীর দাঁতেও থাকে। বাইরের অংশে সিমেন্টাম থাকে এবং ভেতরে জীবন্ত টিস্যু ও স্নায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত অংশ রয়েছে। ফলে এটি কেবল শক্ত, অনুভূতিহীন একটি বর্শা নয়। দাঁত হিসেবে এর শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাইরে দেখে আমরা যে প্যাঁচানো সাদা কাঠামো দেখি, তার ভেতরে একটি জটিল জীবন্ত ব্যবস্থা কাজ করে।

দাঁতের বাইরের সর্পিল রেখা এর সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য। এটি গোড়া থেকে আগার দিকে প্যাঁচানো খাঁজের মতো এগিয়েছে। এই আকৃতি মানুষের তৈরি পাকানো দণ্ডের সঙ্গে মিললেও দাঁতটি প্রকৃতির বৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। কেন এই নির্দিষ্ট সর্পিল বিন্যাস বিবর্তিত হয়েছে এবং এর যান্ত্রিক সুবিধা কতটা, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে শুধু প্যাঁচ দেখে এটিকে বরফে গর্ত করার যন্ত্র বলা যায় না। গঠন দেখে সম্ভাব্য কাজ অনুমান করা এবং বন্য পরিবেশে সেই কাজ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা দুটি আলাদা ধাপ।

সব নারহোয়ালের দীর্ঘ দাঁত থাকে না। বড় বাইরে বেরিয়ে থাকা দাঁত মূলত পুরুষদের বৈশিষ্ট্য। স্ত্রীদের অধিকাংশের এমন দাঁত নেই, যদিও কিছু স্ত্রীর মধ্যে তা দেখা যায়। এই পার্থক্য বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। দাঁতটি যদি খাবার ধরার জন্য একেবারে অপরিহার্য হতো, তাহলে দাঁতবিহীন স্ত্রী প্রাণীরা কীভাবে টিকে থাকত? তারা স্বাভাবিকভাবেই খাদ্য সংগ্রহ করে ও বংশবিস্তার করে। তাই দাঁতের প্রধান বিবর্তনীয় ভূমিকা এবং সুযোগমতো ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করা দরকার।

প্রজননসংক্রান্ত প্রতিযোগিতা দাঁতের বিকাশের একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা। অনেক প্রাণীর পুরুষদের মধ্যে বড় শিং, উজ্জ্বল পালক বা অন্য অতিরঞ্জিত বৈশিষ্ট্য থাকে। এগুলো প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিজের সক্ষমতা বোঝাতে অথবা সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। নারহোয়ালের দাঁতও এমন বৈশিষ্ট্য হতে পারে। বড় দাঁত দেখিয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে সরাসরি বিপজ্জনক সংঘর্ষ ছাড়াই শক্তি বা অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়া সম্ভব। তবে স্ত্রী নারহোয়াল ঠিক কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সঙ্গী নির্বাচন করে, সে বিষয়ে সব প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।

দুই হাজার বিশ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় শরীরের আকারের সঙ্গে দাঁতের দৈর্ঘ্যের সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখেন, দাঁতের বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন পুরুষের মধ্যে এর ব্যাপক পার্থক্য প্রজননসংক্রান্ত নির্বাচনের ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি দাঁতের গুরুত্ব বোঝার শক্তিশালী প্রমাণ, কিন্তু প্রত্যেক বড় দাঁতযুক্ত পুরুষ বেশি শাবকের পিতা হয়—এমন সরাসরি হিসাব নয়। বন্য পরিবেশে আচরণ, সঙ্গী নির্বাচন এবং প্রজননের ফল একসঙ্গে অনুসরণ করা কঠিন। তাই ফলাফলকে তার প্রকৃত সীমার মধ্যে ব্যাখ্যা করা জরুরি।

কখনো নারহোয়ালকে পানির ওপর দাঁত উঁচু করে রাখতে অথবা অন্য নারহোয়ালের দাঁতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখা যায়। বাইরে থেকে এটি তলোয়ার লড়াইয়ের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি দাঁত-সংযোগ যে হিংস্র যুদ্ধ, এমন নয়। সামাজিক যোগাযোগ, প্রতিযোগী যাচাই বা অন্য আচরণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। আবার দাঁত ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন সংঘর্ষের সম্ভাবনাও দেখায়। একটি ছোট দৃশ্য দেখে আচরণের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা কঠিন, কারণ তার আগে ও পরে কী ঘটেছে, সেই তথ্য প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।

দাঁতের আরেকটি আলোচিত ভূমিকা হলো সংবেদন। নারহোয়ালের দাঁতের বাইরের অংশ থেকে ভেতরের স্নায়ুযুক্ত ব্যবস্থার দিকে সূক্ষ্ম নালিকার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দাঁতের এই গঠন এবং পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতি শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়েছে। বিশেষ করে পানির লবণাক্ততার পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একটি দীর্ঘ দাঁত পানির সরাসরি সংস্পর্শে থাকে বলে তার সংবেদনমূলক ভূমিকা বাস্তবসম্মত প্রশ্ন। তবে একে এমন কোনো সর্বজ্ঞ যন্ত্র বলা যাবে না, যা সমুদ্রের সব বৈশিষ্ট্য নিখুঁতভাবে মেপে দেয়।

সংবেদনশীল দাঁত এবং শিকার শনাক্ত করার শব্দব্যবস্থাকে এক করে দেখাও ভুল। নারহোয়াল অন্য দাঁতযুক্ত তিমির মতো শব্দ তৈরি করে এবং ফিরে আসা প্রতিধ্বনি থেকে পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য পায়। অন্ধকার বা ঘোলা পানিতে এই ব্যবস্থা বিশেষ উপকারী। দীর্ঘ দাঁতের সম্ভাব্য সংবেদনমূলক কাজ আলাদা একটি তথ্যের উৎস হতে পারে। দুই ব্যবস্থা কীভাবে একসঙ্গে ব্যবহার হয়, তা নিয়ে আরও গবেষণা দরকার। দাঁতকে তার শব্দনির্ভর অনুসন্ধানব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিকল্প ভাবলে প্রাণীটির আচরণের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

খাদ্য সংগ্রহে দাঁতের ব্যবহার নিয়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুই হাজার পঁচিশ সালে প্রকাশিত গবেষণায় চালকবিহীন উড়ন্ত পর্যবেক্ষণযন্ত্রে ধারণ করা দৃশ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে নারহোয়ালকে মাছ অনুসরণ করতে, দাঁত দিয়ে স্পর্শ করতে এবং কখনো আঘাত করতে দেখা যায়। এসব আচরণ মাছের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া বদলে দিতে পারে। পর্যবেক্ষণ দাঁতকে শুধু প্রদর্শনের অঙ্গ হিসেবে দেখার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। তবে কয়েকটি দৃশ্য থেকে সব অঞ্চলের নারহোয়াল একইভাবে নিয়মিত শিকার করে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

এই আচরণকে মাছ দাঁতে গেঁথে ধরার গল্প হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক নয়। পর্যবেক্ষণে মাছের সঙ্গে দাঁতের সংযোগ, চাপ বা আঘাত গুরুত্বপূর্ণ ছিল; বর্শার মতো গেঁথে তোলা নয়। কিছু আঘাত মাছকে সাময়িকভাবে অক্ষম করতে বা গুরুতর ক্ষতি করতে পারে বলে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সব স্পর্শের পর মাছ খাওয়া হয়নি। তাই প্রতিটি যোগাযোগকে সফল খাদ্যগ্রহণের ঘটনা বলা যাবে না। নারহোয়ালের দাঁতের ব্যবহার বোঝার জন্য মাছের প্রতিক্রিয়া এবং পরে প্রাণীটি কী করেছে—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু দৃশ্যে অনুসন্ধানমূলক আচরণ ও সম্ভাব্য খেলার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। কোনো প্রাণী একটি বস্তুকে বারবার পরীক্ষা করছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে খাচ্ছে না—এমন আচরণ শুধু শিকারের প্রয়োজন দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা খেলা শনাক্ত করতে সতর্ক মানদণ্ড ব্যবহার করেন। মানুষের কাছে মজার লাগলেই প্রাণী খেলছে, এমন নয়। নারহোয়ালের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ নতুন প্রশ্ন তুলেছে: তারা কি নতুন ধরনের শিকার পরীক্ষা করছে, একে অপরের আচরণ থেকে শিখছে, নাকি কিছু ক্ষেত্রে নিছক অনুসন্ধানমূলক খেলায় অংশ নিচ্ছে?

খাবার খাওয়ার জন্য নারহোয়াল মানুষের মতো দাঁত দিয়ে চিবিয়ে টুকরো করে না। মুখ ও জিহ্বার নড়াচড়ায় পানি ও শিকার ভেতরে টানার ক্ষমতা খাদ্যগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী তার খাদ্যের অংশ। দাঁতবিহীন স্ত্রীদের স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণও দেখায়, দীর্ঘ দাঁত ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব। সুতরাং দাঁত শিকারকে প্রভাবিত করতে ব্যবহার করা হলেও সেটি নারহোয়ালের একমাত্র খাদ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নয়। একই অঙ্গ সুযোগ অনুযায়ী সহায়ক হতে পারে, অথচ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে অপরিহার্য নাও হতে পারে।

দাঁতটির বিশাল দৈর্ঘ্য দেখে একে বরফ ভাঙার হাতিয়ার বলা হয়। কিন্তু শক্ত সামুদ্রিক বরফে নিয়মিত গর্ত করার প্রধান যন্ত্র হিসেবে এর ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত নয়। নারহোয়ালকে শ্বাস নিতে পানির ওপরে উঠতে হয় এবং বরফের ফাঁক বা উন্মুক্ত অংশ ব্যবহার করতে হয়। দাঁত সামনে প্রসারিত থাকলেও তা দিয়ে মাথার ওপরের বরফ ভেঙে পথ করা সহজ ব্যাখ্যা নয়। তাছাড়া দাঁতবিহীন প্রাণীরাও একই বরফঘেরা পরিবেশে বাস করে। জনপ্রিয় ধারণা গ্রহণের আগে এই বাস্তবতাগুলো বিবেচনা করা দরকার।

নারহোয়ালের দাঁত শক্ত হলেও অবিনাশী নয়। কিছুটা নমনীয়তা থাকলেও আঘাতে ভাঙতে পারে। এর ওপর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার চিহ্ন জমা হয়। গবেষকেরা দাঁতের বৃদ্ধির স্তর পরীক্ষা করে বয়স এবং অতীতের পরিবেশ বা খাদ্য সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধান করতে পারেন। নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান ও সমস্থানিকের পরিবর্তন সেই ইতিহাসের সূত্র দেয়। তবে একটি স্তরের অর্থ বোঝার জন্য উপযুক্ত তুলনা ও বিশ্লেষণ দরকার। দাঁত তাই জীবন্ত প্রাণীর ব্যবহারের অঙ্গ হওয়ার পাশাপাশি অতীত জীবনের তথ্যধারকও হতে পারে।

এই প্রাণী নিয়ে জ্ঞান অর্জন কঠিন হওয়ার কারণ তার আবাসস্থল। বরফঘেরা দূরবর্তী সমুদ্রে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। পানির ওপর অল্প সময় দেখা গেলেও জীবনের বড় অংশ ঘটে পানির নিচে। ফলে শুধু নৌকা থেকে দেখা দৃশ্যে সম্পূর্ণ আচরণ বোঝা যায় না। অবস্থানসংকেত, শব্দ রেকর্ড এবং আকাশ থেকে পর্যবেক্ষণের মতো পদ্ধতি গবেষণায় সহায়তা করে। স্থানীয় ইনুইট জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীটির চলাচল ও আচরণ সম্পর্কে স্থানীয় জ্ঞান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন বোঝাপড়া তৈরি করতে পারে।

নারহোয়ালের দাঁত একসময় মানুষের কল্পনায় সত্যিকারের ইউনিকর্নের শিং হিসেবে স্থান পেয়েছিল। দূরবর্তী মেরু অঞ্চলের প্রাণী সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান সীমিত ছিল, কিন্তু তার অদ্ভুত দাঁত বাণিজ্যের মাধ্যমে অন্য অঞ্চলে পৌঁছাত। ফলে দাঁতটির উৎস না জেনে কাল্পনিক প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্ক করা সহজ হয়েছিল। এই ইতিহাস নামটির আকর্ষণ ব্যাখ্যা করে, কিন্তু আজকের বিজ্ঞান একেবারে ভিন্ন গল্প বলে। জাদুকরী শিংয়ের বদলে আমরা দেখি একটি তিমির পরিবর্তিত দাঁত, যার বিকাশে প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং আচরণের জটিল ভূমিকা রয়েছে।

দাঁতের রহস্য বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো একটি অঙ্গের একাধিক কাজ থাকতে পারে। প্রজননসংক্রান্ত প্রতিযোগিতা তার দীর্ঘ আকারের বিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, আবার সেই দাঁত পরিবেশ অনুভব করা বা মাছের সঙ্গে যোগাযোগেও ব্যবহৃত হতে পারে। এসব ব্যাখ্যা পরস্পরকে বাতিল করে না। কোনো অঙ্গ কেন প্রথম বড় হয়েছে এবং বর্তমানে কী কী কাজে লাগে—প্রশ্ন দুটি আলাদা। নারহোয়ালের দাঁতকে শুধু অস্ত্র, শুধু সংবেদনযন্ত্র অথবা শুধু অলংকার হিসেবে বর্ণনা করলে এই বহুমুখিতা হারিয়ে যায়।

নারহোয়ালের বিশাল ‘শিং’ আসলে ওপরের চোয়াল থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘ, প্যাঁচানো দাঁত। এই পরিচয় নিশ্চিত হলেও দাঁতের প্রতিটি ভূমিকার গুরুত্ব এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। শরীরের অনুপাত, দাঁতের গঠন, সামাজিক আচরণ এবং মাছের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে বিজ্ঞান ধীরে ধীরে উত্তর খুঁজছে। সমুদ্রের ইউনিকর্নের আকর্ষণ তাই রূপকথায় সীমাবদ্ধ নেই। একটি দাঁত কীভাবে প্রদর্শন, অনুভব, অনুসন্ধান ও ব্যবহারিক কাজের সম্ভাবনা একসঙ্গে ধারণ করতে পারে, সেই বাস্তব বিবর্তনীয় গল্পই তাকে আরও বিস্ময়কর করে তোলে।


আপনার পছন্দ হতে পারে