বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মাকড়সার জাল কি ইস্পাতের চেয়ে শক্তিশালী? রেশমের বিস্ময়কর বিজ্ঞান

মাকড়সার জাল কি ইস্পাতের চেয়ে শক্তিশালী? রেশমের বিস্ময়কর বিজ্ঞান
কম ওজন, টান সহ্য করার ক্ষমতা ও প্রসারণের সমন্বয়েই মাকড়সার রেশম অসাধারণ।

বাগানের দুই ডালের মাঝখানে টানানো মাকড়সার জাল দেখতে এতটাই সূক্ষ্ম যে আঙুলের হালকা ছোঁয়াতেই ছিঁড়ে যায়। অথচ এই উপাদান সম্পর্কে বলা হয়, তা ইস্পাতের চেয়েও শক্তিশালী। আপাতবিরোধী দুটি অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনটি সত্য? আসলে তুলনার পদ্ধতি না জানলে বক্তব্যটি বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। মাকড়সার রেশম অত্যন্ত কার্যকর একটি প্রাকৃতিক তন্তু, কিন্তু শক্তি, ওজন, প্রসারণ এবং ভাঙার আগে শক্তি শোষণের ক্ষমতা আলাদা বৈশিষ্ট্য। এগুলো পৃথক করে বুঝলেই তার আসল বিস্ময় সামনে আসে।

প্রথমে জাল ও রেশমের পার্থক্য বোঝা দরকার। রেশম হলো মাকড়সার তৈরি তন্তু; জাল হলো সেই তন্তু দিয়ে নির্মিত কাঠামো। একটি জাল কতটা আঘাত সহ্য করবে, তা শুধু তন্তুর গুণের ওপর নির্ভর করে না। তন্তুর পুরুত্ব, সংযোগের সংখ্যা, টান, বিন্যাস এবং কোথায় বল পড়ছে—সবই গুরুত্বপূর্ণ। একই শক্তিশালী উপাদান দিয়ে দুর্বল কাঠামো বানানো সম্ভব, আবার উপযুক্ত বিন্যাসে অল্প উপাদানও ভালো কাজ করতে পারে। তাই একটি সম্পূর্ণ জালের সঙ্গে ইস্পাতের দণ্ডের সরাসরি তুলনা অর্থপূর্ণ নয়।

মাকড়সা এক ধরনের রেশমই তৈরি করে, এমন ধারণাও ভুল। অনেক জালবোনা মাকড়সা বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা তন্তু তৈরি করতে পারে। জালের প্রধান কাঠামো ও নিরাপত্তার দড়িতে ব্যবহৃত তন্তু তুলনামূলক শক্ত। পতঙ্গ ধরার সর্পিল অংশে বেশি প্রসারণক্ষম তন্তু এবং আঠালো পদার্থ থাকতে পারে। আবার ডিমের আবরণ বা শিকার মুড়ে রাখার জন্য অন্য ধরনের রেশম ব্যবহৃত হয়। ইস্পাতের সঙ্গে আলোচনায় সাধারণত কাঠামো ও নিরাপত্তার দড়ির শক্ত তন্তুকেই বোঝানো হয়।

কোনো তন্তুকে টেনে ছিঁড়তে যত বড় বল লাগে, সেই বলকে তার প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল দিয়ে ভাগ করলে টানজনিত পীড়ন পাওয়া যায়। ভাঙার আগে সর্বোচ্চ যে পীড়ন সহ্য করতে পারে, সেটিই টানসহনক্ষমতার একটি মাপ। মাকড়সার শক্ত কাঠামোগত রেশমের ক্ষেত্রে এই মান অনেক পরীক্ষায় প্রায় এক থেকে দেড় গিগাপাস্কালের পর্যায়ে পাওয়া যায়। প্রজাতি ও পরীক্ষার অবস্থাভেদে মান কমবেশি হতে পারে। এক গিগাপাস্কাল মানে প্রতি বর্গমিটারে একশ কোটি নিউটন বলের সমতুল্য পীড়ন।

এই টানসহনক্ষমতা অনেক সাধারণ ইস্পাতের চেয়ে বেশি হতে পারে। কিন্তু উচ্চক্ষমতার কিছু ইস্পাত সমপর্যায়ের বা আরও বেশি পীড়ন সহ্য করে। ইস্পাত নিজেও একটিমাত্র নির্দিষ্ট উপাদান নয়; মিশ্রণ, তাপপ্রয়োগ ও উৎপাদনপদ্ধতিতে তার বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। ফলে সমান পুরুত্বের যেকোনো রেশমতন্তু যেকোনো ইস্পাতের তারের চেয়ে শক্তিশালী—এমন সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। কোন রেশম ও কোন ইস্পাত তুলনা করা হচ্ছে, সেটি জানতেই হবে।

রেশমের বিশেষ সুবিধা স্পষ্ট হয় ওজন বিবেচনা করলে। এর ঘনত্ব সাধারণত প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে প্রায় এক দশমিক তিন গ্রাম, যেখানে ইস্পাতের ঘনত্ব প্রায় সাত দশমিক আট গ্রাম। অর্থাৎ সমান আয়তনে রেশমের ওজন প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ। কাছাকাছি টানসহনক্ষমতা থাকলে অনেক কম ওজনেই কার্যকর শক্তি পাওয়া যায়। এই কারণেই ওজনের তুলনায় মাকড়সার রেশমকে অসাধারণ শক্তিশালী বলা হয়। তবে সুবিধার সুনির্দিষ্ট গুণিতক নির্ভর করে তুলনায় ব্যবহৃত উপাদানের ওপর।

তাহলে আঙুলের ছোঁয়ায় জাল ছিঁড়ে যায় কেন? কারণ তার তন্তু অত্যন্ত সরু। কোনো উপাদান প্রতি একক ক্ষেত্রফলে অনেক বল সহ্য করলেও ক্ষেত্রফল খুব ছোট হলে মোট সহনীয় বলও ছোট থাকে। একটি সূক্ষ্ম ইস্পাতের তারও মোটা দণ্ডের সমান ভার নিতে পারে না। তার ওপর আঙুল দিয়ে জাল সরানোর সময় বহু তন্তু ও সংযোগে অসমভাবে চাপ পড়ে। তাই সহজে ছিঁড়ে যাওয়া রেশমের উপাদানগত গুণের বিরোধী নয়; তার সূক্ষ্ম আকারের স্বাভাবিক পরিণতি।

রেশমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ভাঙার আগে প্রসারিত হওয়ার ক্ষমতা। শক্ত কাঠামোগত তন্তুও টানের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে লম্বা হতে পারে। শিকার ধরার কিছু তন্তু আরও বেশি প্রসারিত হয়। উড়ন্ত পতঙ্গ জালে আঘাত করলে এই প্রসারণ তাকে হঠাৎ থামানোর বদলে কিছুটা দূরত্ব ও সময় নিয়ে থামাতে সাহায্য করে। ফলে আঘাতের শক্তি সামলানো সহজ হয়। শুধু কঠিন হওয়া এখানে যথেষ্ট নয়; টান সহ্য করার সঙ্গে নিয়ন্ত্রিতভাবে বদলে যাওয়ার ক্ষমতাও দরকার।

ভাঙার আগে একটি উপাদান কত শক্তি শোষণ করতে পারে, সেটিকে টানসহনক্ষমতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। কোনো উপাদান অনেক পীড়ন সহ্য করলেও খুব অল্প প্রসারণে ভেঙে যেতে পারে। অন্যটি তুলনামূলক কম পীড়ন সহ্য করেও বেশি প্রসারিত হয়ে অনেক শক্তি গ্রহণ করতে পারে। মাকড়সার রেশমে শক্তি ও প্রসারণের ভালো সমন্বয় আছে। এই সমন্বয়ই তাকে পতঙ্গের ধাক্কা বা মাকড়সার হঠাৎ পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে কার্যকর করে।

এই গুণের উৎস রেশমের প্রোটিনভিত্তিক গঠন। তন্তুর মধ্যে ছোট সুশৃঙ্খল অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত কম সুশৃঙ্খল নমনীয় অঞ্চল থাকে। সুশৃঙ্খল অংশগুলো প্রোটিনশৃঙ্খলকে দৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখে, আর নমনীয় অংশ টানের মধ্যে বিন্যাস বদলাতে পারে। বহু দুর্বল আণবিক বন্ধন সঠিক বিন্যাসে একসঙ্গে কাজ করে বড় শক্তি তৈরি করে। তন্তুর অসাধারণ বৈশিষ্ট্য তাই শুধু কী উপাদান দিয়ে তৈরি, তার ওপর নয়; সেই উপাদান কীভাবে সাজানো, তার ওপরও নির্ভর করে।

মাকড়সার শরীরে রেশম তৈরির শুরু হয় বিশেষ গ্রন্থিতে জমা থাকা ঘন প্রোটিন দ্রবণ থেকে। সরু নালির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অম্লতা, লবণের পরিবেশ এবং প্রবাহজনিত বলের পরিবর্তন প্রোটিনকে সংগঠিত হতে সাহায্য করে। শেষে উদরের পেছনের রেশম নির্গমন অঙ্গ দিয়ে তন্তু বের হয়। এটি শুধু আঠালো তরল বাইরে এসে শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়। দ্রবণ থেকে কার্যকর তন্তুতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি নিজেই একটি সূক্ষ্ম জৈবিক উৎপাদনব্যবস্থা।

সম্পূর্ণ জালের বিন্যাসও ক্ষতি সামলাতে সাহায্য করে। একটি স্থানে বড় চাপ পড়লে কয়েকটি তন্তু ছিঁড়লেও বাকি কাঠামো অক্ষত থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, রেশমের টানের প্রতি পরিবর্তনশীল প্রতিক্রিয়া এবং জালের সংযোগবিন্যাস স্থানীয় ক্ষতিকে সীমিত রাখতে ভূমিকা রাখে। এতে মাকড়সাকে প্রতিটি ছোট দুর্ঘটনার পরে পুরো জাল নতুন করে তৈরি করতে হয় না। এখানে উপাদানের বৈশিষ্ট্য ও নির্মাণপদ্ধতি পরস্পরকে শক্তিশালী করে।

তবে রেশমের ক্ষমতা স্থির নয়। আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, তন্তু তৈরির গতি এবং পরীক্ষায় টান দেওয়ার হার ফলাফলে প্রভাব ফেলে। কিছু রেশম ভিজে সংকুচিত হয় এবং যান্ত্রিক আচরণ বদলে যায়। এই বৈচিত্র্যের কারণেই একটি গবেষণার সংখ্যা দিয়ে সব মাকড়সার তন্তুকে বিচার করা যায় না। নির্ভরযোগ্য তুলনায় প্রজাতি, তন্তুর ধরন এবং পরীক্ষার শর্ত উল্লেখ করা জরুরি।

বিজ্ঞানীরা রেশমের প্রোটিন তৈরি ও কৃত্রিমভাবে তন্তু উৎপাদনের চেষ্টা করছেন। উদ্দেশ্য হালকা দড়ি, বিশেষ কাপড়, চিকিৎসার উপাদান এবং আঘাত শোষণকারী কাঠামোর সম্ভাবনা পরীক্ষা করা। কিন্তু প্রোটিন বানানো আর প্রাকৃতিক রেশমের সমান তন্তু বানানো এক নয়। প্রোটিনের বিন্যাস, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং খরচ বড় চ্যালেঞ্জ। মাকড়সার রেশমের আসল শিক্ষা তাই সব কাজে ইস্পাতকে হারানো নয়; কম উপাদান দিয়ে শক্তি, নমনীয়তা ও শক্তি শোষণের ভারসাম্য তৈরি করা। সূক্ষ্ম একটি জালের মধ্যে প্রকৃতি সেই ভারসাম্যের অসাধারণ উদাহরণ রেখেছে।