বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সাপ পা ছাড়াই কীভাবে চলে? পেশি, আঁশ ও চলাচলের বিস্ময়কর বিজ্ঞান

সাপ পা ছাড়াই কীভাবে চলে? পেশি, আঁশ ও চলাচলের বিস্ময়কর বিজ্ঞান
পেশির ছন্দ, আঁশের ঘর্ষণ ও পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয়েই এগিয়ে চলে সাপ।

ঘাসের মধ্যে একটি সাপকে দ্রুত সরে যেতে দেখলে মনে হয়, তার শরীর যেন নিজে থেকেই মাটির ওপর বয়ে চলেছে। পা নেই, চাকা নেই, তবু সে পাথর পেরোয়, গাছে ওঠে, পানিতে সাঁতরায় এবং সরু গর্তে ঢুকে যায়। এই চলাচল কোনো রহস্যময় পিছলে যাওয়া নয়। এর পেছনে কাজ করে পেশির সুনির্দিষ্ট সংকোচন, নমনীয় মেরুদণ্ড, পেটের আঁশ এবং আশপাশের পৃষ্ঠের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত সংযোগ। সাপের পুরো শরীরই চলাচলের যন্ত্র। কোথাও শরীর ভর তৈরি করে, কোথাও বাঁক বদলায়, আবার কোথাও সামনে এগিয়ে যায়।

তবে শুরুতেই একটি ধারণা সংশোধন করা দরকার: সব সাপ খুব দ্রুত চলে না। প্রজাতি, শরীরের আকার, তাপমাত্রা, মাটির ধরন এবং চলার উদ্দেশ্য অনুযায়ী তাদের গতি বদলে যায়। কোনো সাপ দ্রুত আশ্রয়ে ঢোকে, আবার কোনোটি ধীরগতিতে শিকারের দিকে এগোয়। দূরত্বের তুলনায় আকস্মিক নড়াচড়া আমাদের চোখে বেশি দ্রুত মনে হতে পারে। তাই সাপের চলাচলের বিস্ময় শুধু গতিতে নয়; পা ছাড়াই সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে কার্যকরভাবে চলতে পারার মধ্যে।

সাপের লম্বা শরীরে অসংখ্য কশেরুকা থাকে। প্রজাতিভেদে এই সংখ্যা ভিন্ন এবং অনেক সাপে তা কয়েক শ পর্যন্ত পৌঁছায়। দেহের বড় অংশে কশেরুকার সঙ্গে পাঁজর যুক্ত থাকে। প্রতিটি সন্ধিতে সীমিত নড়াচড়া হলেও বহু সন্ধির পরিবর্তন মিলিয়ে শরীর বড় বাঁক তৈরি করতে পারে। এই ব্যবস্থা সাপকে নমনীয় করে, আবার শরীরের গঠনও ধরে রাখে। মেরুদণ্ডের দুই পাশের পেশিগুলো বিভিন্ন অংশে সংকুচিত ও শিথিল হয়ে সেই বাঁক নিয়ন্ত্রণ করে। পুরো শরীর একসঙ্গে এলোমেলোভাবে মোচড়ায় না; নড়াচড়ার একটি নির্দিষ্ট ছন্দ থাকে।

সাপকে সাধারণত মসৃণ দেখালেও তার চামড়া পিচ্ছিল শ্লেষ্মায় ঢাকা নয়। অনেক স্থলচর সাপের পেটের দিকে চওড়া আঁশ থাকে, যা চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ। আঁশের বিন্যাস ও সূক্ষ্ম পৃষ্ঠগঠনের কারণে সব দিকে পিছলে যাওয়ার প্রতিরোধ সমান হয় না। কিছু পৃষ্ঠে সামনে এগোনোর তুলনায় পাশে বা পেছনে সরে যাওয়া বেশি বাধার মুখে পড়ে। এই দিকভেদে ঘর্ষণের পার্থক্য সাপকে শরীরের বাঁক ব্যবহার করে এগোতে সাহায্য করে। তবে প্রজাতি ও পৃষ্ঠভেদে আঁশের কার্যকারিতা বদলায়; সব সাপের জন্য একই হিসাব প্রযোজ্য নয়।

ঘর্ষণ এখানে শুধু বাধা নয়, এগিয়ে যাওয়ার সহায়কও। মানুষ হাঁটার সময় পা মাটির ওপর পিছলে না গেলে সামনে যেতে পারে। সাপও শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে পরিবেশের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ করে। মাটি বা কোনো বস্তু তার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলে শরীর এগোয়। কোথায় ভর রাখতে হবে এবং কোথায় শরীর সরাতে হবে, সেই সমন্বয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পেশি শক্তিশালী হলেই চলে না; পৃষ্ঠের সঙ্গে উপযুক্ত সংযোগ তৈরি না হলে শরীর নড়লেও অগ্রগতি কম হয়।

সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি হলো পাশ থেকে পাশে আঁকাবাঁকা চলন। সাপ শরীরে একের পর এক বাঁক তৈরি করে এবং বাঁকের তরঙ্গ মাথার দিক থেকে লেজের দিকে অগ্রসর হয়। শরীর ছোট পাথর, ডাল, ঘাসের গোড়া কিংবা মাটির অসম অংশের বিরুদ্ধে চাপ দেয়। এই চাপের সম্মিলিত ফল সাপকে সামনে নিয়ে যায়। দৃশ্যমান বড় বাধা না থাকলেও উপযুক্ত পৃষ্ঠে আঁশের ঘর্ষণ এগোতে সাহায্য করতে পারে। ফলে সাপকে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য আলাদা পাথর খুঁজতে হয় না।

অত্যন্ত মসৃণ পৃষ্ঠে একই চলন কম কার্যকর হতে পারে। শরীর বাঁকছে, কিন্তু যথেষ্ট প্রতিরোধ পাচ্ছে না—ফলে সাপ বেশি পিছলে যায়। ঘাস, মাটি এবং রুক্ষ পৃষ্ঠে যে কৌশল কাজ করে, তা মসৃণ কাচে একইভাবে কাজ করবে না। এই পার্থক্য দেখায়, চলাচলের জন্য শরীর ও পরিবেশ দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। সাপ শুধু নিজের নড়াচড়া তৈরি করে না; সেই নড়াচড়াকে কাজে লাগানোর মতো সংযোগও তৈরি করে।

সংকীর্ণ গর্তে বা এমন স্থানে, যেখানে পাশে বড় বাঁক তৈরির জায়গা নেই, সাপ শরীর গুটিয়ে ও প্রসারিত করে এগোতে পারে। প্রথমে শরীরের একটি অংশ ভাঁজ করে গর্তের দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে। সেই অংশ স্থির রেখে সামনের অংশ প্রসারিত করে। পরে সামনে নতুন ভর তৈরি করে পেছনের শরীর টেনে আনে। এই প্রক্রিয়া বারবার চলতে থাকে। দেখতে এটি ভাঁজ করা বাদ্যযন্ত্রের প্রসারণ ও সংকোচনের মতো। সাধারণত এই চলন তুলনামূলক ধীর এবং শক্তির ব্যয়ও বেশি হতে পারে।

বালুর ওপর কিছু সাপের চলন আরও আলাদা। তারা শরীরে পাশাপাশি দোলন ও ওপরনিচে ওঠানামা সমন্বয় করে তির্যকভাবে এগোয়। একই সময়ে শরীরের কিছু অংশ বালুর ওপর ভর রাখে, অন্য অংশ মাটি থেকে উঠে নতুন অবস্থানে যায়। যেখানে ভর থাকে, সেখানে পিছলে যাওয়া কমিয়ে রাখা সম্ভব হয়। ফলে আলগা বালুতেও অগ্রগতি ঘটে এবং পেছনে বিচ্ছিন্ন তির্যক ছাপ পড়ে। এই চলনের মূল সুবিধা শুধু গরম বালু এড়ানো নয়; নরম ও সহজে সরে যাওয়া পৃষ্ঠে স্থিতিশীলভাবে চলা।

বালুর ঢাল বেয়ে ওঠার সময় এই সমন্বয় আরও সূক্ষ্ম হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ ধরনের মরুভূমির সাপ ঢাল বাড়লে বালুর সঙ্গে সংযুক্ত শরীরের দৈর্ঘ্য বাড়াতে পারে। এতে ভর উপযুক্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং পিছলে যাওয়া কমে। শরীরের কতটা অংশ মাটিতে থাকবে, তা পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলানোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই কৌশল অনুকরণ করে যন্ত্রেও বালুর ঢাল ওঠার ক্ষমতা উন্নত করা হয়েছে।

বড় অজগর বা বোয়া কখনো প্রায় সোজা শরীর রেখেই সামনে এগোয়। এই পদ্ধতিতে মেরুদণ্ডকে পাশ থেকে পাশে বাঁকানো প্রধান কাজ নয়। পাঁজরের সঙ্গে চামড়া যুক্ত করা বিশেষ পেশি পেটের চামড়া ও আঁশের অবস্থান বদলায়। পেটের কিছু অংশ মাটিতে স্থিরভাবে ভর রাখলে পেশি দেহের কাঠামোকে সামনে টানে। পরে চামড়ার অংশগুলো নতুন অবস্থানে যায়। এই চলনকে পাঁজর দিয়ে হাঁটা বলা ভুল; পাঁজর পায়ের মতো মাটিতে পা ফেলে না।

গাছে ওঠার সময় সাপকে মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধেও কাজ করতে হয়। অনেক সাপ শরীরের একটি অংশ দিয়ে ডাল বা কাণ্ড আঁকড়ে ধরে, অন্য অংশ সামনে বাড়ায়। নতুন জায়গায় ভর নিশ্চিত হলে আগের অংশ সরিয়ে আনে। ডালের ব্যাস, বাকলের রুক্ষতা ও ঢাল অনুযায়ী পদ্ধতি বদলে যায়। সরু ডাল আঁকড়ে ধরা আর মোটা মসৃণ কাণ্ড বেয়ে ওঠা একই কাজ নয়। শরীরের নমনীয়তা, পেশির চাপ এবং ঘর্ষণ একসঙ্গে গাছে চলার সুযোগ তৈরি করে।

পানিতে সাপ সাধারণত শরীরের বাঁক ব্যবহার করে জলকে সরিয়ে এগোয়। এখানে মাটির আঁশ-ঘর্ষণের বদলে পানির প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিছু জলজ সাপের চ্যাপ্টা লেজ সাঁতারে সহায়তা করে। আবার স্থলচর সাপও পানিতে চলতে পারে। বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যার সুবিধার জন্য কয়েকটি প্রধান চলনপদ্ধতির নাম দিলেও বাস্তবে তাদের ভেতরে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে। একই সাপ পরিস্থিতি বদলালে চলার ধরন বদলাতে পারে।

সাপের চলাচল তাই একটি অঙ্গের কাজ নয়, সম্পূর্ণ শরীরের সমন্বিত দক্ষতা। পেশি শক্তি দেয়, মেরুদণ্ড বাঁক তৈরি করতে সাহায্য করে, আঁশ পৃষ্ঠের সঙ্গে সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিবেশ সেই বলকে অগ্রগতিতে পরিণত করে। পা না থাকা এখানে কেবল সীমাবদ্ধতা নয়; লম্বা শরীর ব্যবহার করে সরু পথ ও জটিল পরিবেশে চলার সুযোগও। একটি সাপকে এগিয়ে যেতে দেখলে আমরা আসলে শরীর, ঘর্ষণ ও পরিবেশের মধ্যে অসাধারণ সমন্বয় দেখতে পাই।