বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সারাটোগার যুদ্ধ ও ফ্রান্সের প্রবেশ: যে বিজয় আমেরিকান বিপ্লবকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত করেছিল

সিরিজ: আমেরিকান বিপ্লব: স্বাধীনতার সংগ্রাম ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম

সারাটোগার যুদ্ধ ও ফ্রান্সের প্রবেশ: যে বিজয় আমেরিকান বিপ্লবকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত করেছিল
সারাটোগার বিজয় থেকে ফরাসি জোটের পথে

১৭৭৭ সালের শুরুতে আমেরিকান বিপ্লবের ভবিষ্যৎ তখনও অনিশ্চিত। ট্রেন্টন ও প্রিন্সটনে জর্জ ওয়াশিংটনের সাফল্য বিপ্লবকে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল, কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি অটুট ছিল। নিউইয়র্ক শহর ব্রিটিশদের দখলে, তাদের নৌবাহিনী আটলান্টিক উপকূলে বিশাল সুবিধা ভোগ করছে এবং কন্টিনেন্টাল আর্মি অর্থ, অস্ত্র ও সরবরাহের সংকটে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ নেতৃত্ব এমন একটি অভিযান পরিকল্পনা করে, যার উদ্দেশ্য ছিল বিদ্রোহের অন্যতম শক্তিশালী অঞ্চল নিউ ইংল্যান্ডকে অন্য উপনিবেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা। কিন্তু সেই পরিকল্পনার ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত আমেরিকানদের এমন একটি বিজয় এনে দেয়, যা যুদ্ধের আন্তর্জাতিক চরিত্র আমূল বদলে দেয়।

ব্রিটিশ পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন জেনারেল জন বার্গয়েন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী কানাডা থেকে একটি বড় বাহিনী লেক শ্যামপ্লেইন ও হাডসন নদীর পথ ধরে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে অ্যালবানি পর্যন্ত পৌঁছাবে। পশ্চিম দিক থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্যারি সেন্ট লেজারের বাহিনী মোহক উপত্যকা দিয়ে এগিয়ে আসবে। ব্রিটিশদের প্রত্যাশা ছিল নিউইয়র্ক অঞ্চলে এই অভিযান সফল হলে নিউ ইংল্যান্ডের বিদ্রোহী কেন্দ্রগুলো দক্ষিণ ও মধ্য উপনিবেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

পরিকল্পনাটি মানচিত্রে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে ছিল অত্যন্ত জটিল। উত্তর নিউইয়র্কের বন, নদী, জলাভূমি ও সীমিত সড়ক দিয়ে একটি বিশাল বাহিনী এবং তার সরবরাহ বহন করা কঠিন ছিল। বার্গয়েনের সঙ্গে ব্রিটিশ নিয়মিত সৈন্যের পাশাপাশি জার্মান সৈন্য, কামান এবং বিপুল পরিমাণ রসদ ছিল। তাঁর বাহিনী যত দক্ষিণে এগোতে থাকে, কানাডায় অবস্থিত সরবরাহঘাঁটি থেকে দূরত্ব তত বাড়তে থাকে এবং যোগাযোগ রক্ষা তত কঠিন হয়ে ওঠে।

অভিযানের শুরু অবশ্য ব্রিটিশদের জন্য আশাব্যঞ্জক ছিল। ১৭৭৭ সালের জুলাইয়ে ফোর্ট টিকনডেরোগা বার্গয়েনের বাহিনীর সামনে টিকতে পারেনি। ব্রিটিশরা নিকটবর্তী উচ্চভূমিতে কামান স্থাপনের সুযোগ তৈরি করলে আমেরিকানরা দুর্গ ছেড়ে চলে যায়। ১৭৭৫ সালে যে টিকনডেরোগা দখল আমেরিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল, সেটি এত দ্রুত হারানো উপনিবেশগুলোতে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

কিন্তু দুর্গ দখলের পরই বার্গয়েনের সমস্যাগুলো প্রকট হতে থাকে। আমেরিকানরা তাঁর অগ্রযাত্রার পথে গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করে, সেতু ধ্বংস করে এবং পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত করে। প্রতিটি মাইল অগ্রসর হতে ব্রিটিশদের মূল্যবান সময় ব্যয় হচ্ছিল। একই সঙ্গে স্থানীয় মিলিশিয়ারা সংগঠিত হতে শুরু করে। ব্রিটিশ বাহিনী যত গভীরে প্রবেশ করছিল, ততই তার সরবরাহপথ দীর্ঘ এবং দুর্বল হয়ে পড়ছিল।

খাদ্য, ঘোড়া ও অন্যান্য সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ করতে বার্গয়েন একটি বাহিনীকে বর্তমান ভারমন্টের বেনিংটন অঞ্চলে পাঠান। কিন্তু ১৬ আগস্ট ১৭৭৭ সেখানে ব্রিটিশ ও জার্মান বাহিনী বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। জেনারেল জন স্টার্কের নেতৃত্বাধীন নিউ হ্যাম্পশায়ার মিলিশিয়া এবং অন্যান্য আমেরিকান বাহিনী তাদের আক্রমণ করে। ব্রিটিশ পক্ষের শত শত সৈন্য নিহত বা বন্দী হয়। বিশেষ করে ঘোড়া ও সরবরাহ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিচালিত অভিযানটি উল্টো বার্গয়েনের শক্তি আরও কমিয়ে দেয়।

একই সময়ে পশ্চিম দিকের অভিযানও ব্যর্থ হতে থাকে। সেন্ট লেজারের বাহিনী ফোর্ট স্ট্যানউইক্স অবরোধ করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে পিছু হটতে হয়। ফলে বার্গয়েন যে বহুমুখী সমন্বিত চাপ আশা করেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি কার্যত ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন।

এখানে ব্রিটিশ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল সমন্বয়ের অভাব। নিউইয়র্কে অবস্থানরত জেনারেল উইলিয়াম হাও একই সময়ে তাঁর প্রধান বাহিনী নিয়ে হাডসন নদীপথ ধরে বার্গয়েনের দিকে অগ্রসর না হয়ে ফিলাডেলফিয়া দখলের অভিযান পরিচালনা করেন। হাওয়ের সিদ্ধান্ত তাঁর অনুমোদিত কৌশলগত স্বাধীনতার মধ্যেই ছিল, কিন্তু লন্ডন ও উত্তর আমেরিকার ব্রিটিশ কমান্ডের অস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেখানে বার্গয়েন প্রত্যাশিত মাত্রায় দক্ষিণ থেকে সহায়তা পাননি।

আমেরিকান পক্ষ meanwhile দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছিল। উত্তরাঞ্চলের প্রধান কন্টিনেন্টাল বাহিনীর কমান্ড দেওয়া হয় মেজর জেনারেল হোরেশিও গেটসকে। তাঁর অধীনে নিয়মিত কন্টিনেন্টাল সৈন্যের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মিলিশিয়া এসে যোগ দিতে থাকে। বার্গয়েনের অগ্রযাত্রা এবং বেনিংটনের সাফল্য স্থানীয় জনগণকে আরও সক্রিয় করে। আমেরিকান বাহিনীর সংখ্যা বাড়তে থাকে, অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনী প্রতিটি সংঘর্ষ ও সরবরাহ সমস্যায় দুর্বল হচ্ছিল।

আমেরিকানরা বেমিস হাইটস অঞ্চলে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরি করে। হাডসন নদীর পাশের এই ভূখণ্ড দক্ষিণমুখী ব্রিটিশ অগ্রযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পোলিশ সামরিক প্রকৌশলী তাদেউশ কোশচিউশকো প্রতিরক্ষা অবস্থান নির্বাচনে ও নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ভূপ্রকৃতি এমন ছিল যে বার্গয়েনের পক্ষে আমেরিকান অবস্থান এড়িয়ে সহজে অ্যালবানির দিকে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

১৯ সেপ্টেম্বর ১৭৭৭ প্রথম বড় সংঘর্ষ ঘটে ফ্রিম্যানস ফার্মে। বার্গয়েন আমেরিকান প্রতিরক্ষা অবস্থানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। যুদ্ধটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হয়। ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হলেও তাদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল গুরুতর। বিপরীতে আমেরিকান বাহিনীর পেছনে নতুন সৈন্য ও মিলিশিয়া এসে যোগ দিচ্ছিল। তাই কৌশলগতভাবে সময় বার্গয়েনের বিপক্ষে কাজ করছিল।

এই যুদ্ধে বেনেডিক্ট আর্নল্ডের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের পক্ষে চলে যাওয়ার কারণে তাঁর নাম আমেরিকান ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে উঠলেও ১৭৭৭ সালে তিনি ছিলেন কন্টিনেন্টাল আর্মির অন্যতম সাহসী ও আক্রমণাত্মক সেনাপতি। ফ্রিম্যানস ফার্মের যুদ্ধে তাঁর অধীনস্থ বাহিনী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করে। কিন্তু গেটস ও আর্নল্ডের মধ্যে কৌশল, কৃতিত্ব এবং কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ ক্রমেই তীব্র হয়।

ফ্রিম্যানস ফার্মের পর বার্গয়েন অপেক্ষা করতে থাকেন। তিনি আশা করছিলেন দক্ষিণ দিক থেকে ব্রিটিশ সহায়তা পৌঁছাবে। নিউইয়র্ক থেকে স্যার হেনরি ক্লিনটন হাডসন নদীর দিকে সীমিত অভিযান চালালেও তা সময়মতো বার্গয়েনকে উদ্ধার করার মতো ছিল না। অন্যদিকে তাঁর নিজের সরবরাহ দ্রুত কমছিল এবং আমেরিকান বাহিনী ক্রমাগত বড় হচ্ছিল।

৭ অক্টোবর ১৭৭৭ বার্গয়েন আমেরিকান অবস্থানের দুর্বলতা খুঁজতে প্রায় ১,৫০০ সৈন্য নিয়ে একটি অনুসন্ধানমূলক অভিযান চালান। এর ফলেই শুরু হয় সারাটোগা অভিযানের দ্বিতীয় প্রধান যুদ্ধ—বেমিস হাইটসের যুদ্ধ। আমেরিকানরা দ্রুত আক্রমণ করে এবং ব্রিটিশ অবস্থানের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে।

এই পর্যায়ে বেনেডিক্ট আর্নল্ডের ভূমিকা আবারও নাটকীয় হয়ে ওঠে। গেটসের সঙ্গে বিরোধের কারণে তাঁর আনুষ্ঠানিক কমান্ড সীমিত হয়ে গিয়েছিল, তবু যুদ্ধের সময় তিনি ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এবং বিভিন্ন আমেরিকান ইউনিটকে আক্রমণে উৎসাহিত করেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্রেম্যান রিডাউট দখলের লড়াইয়ে তিনি নেতৃত্ব দেন এবং গুরুতরভাবে পায়ে আহত হন। সারাটোগায় আর্নল্ডের সামরিক অবদান তাঁর পরবর্তী বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসের কারণে আড়াল হয়ে গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বেমিস হাইটসের পর বার্গয়েনের অবস্থান কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়ে। তিনি উত্তরে পশ্চাদপসরণের চেষ্টা করেন, কিন্তু আমেরিকান বাহিনী তাঁর চারপাশের পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। খাদ্য ও সরবরাহ কমে আসে, সৈন্যদের অবস্থা খারাপ হয় এবং কার্যকরভাবে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

অবশেষে ১৭ অক্টোবর ১৭৭৭ বার্গয়েন তাঁর বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। প্রায় ৫,৮০০ ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্য অস্ত্র সমর্পণ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি একটি আত্মসমর্পণ চুক্তি বা Convention of Saratoga হিসেবে পরিচিত হয়েছিল। পুরো একটি ব্রিটিশ অভিযাত্রী বাহিনীর পতন আমেরিকান বিপ্লবের সামরিক ইতিহাসে অভূতপূর্ব সাফল্য।

কিন্তু সারাটোগার প্রকৃত গুরুত্ব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল না। এর সবচেয়ে বড় ফল ঘটেছিল আটলান্টিকের অপর পারে—ফ্রান্সে।

ফ্রান্স ও ব্রিটেন বহুদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। মাত্র কয়েক বছর আগে সাত বছরের যুদ্ধে ফ্রান্স ব্রিটেনের কাছে গুরুতর পরাজয় বরণ করেছিল এবং উত্তর আমেরিকায় তার বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য হারিয়েছিল। ফলে আমেরিকান বিদ্রোহ ব্রিটেনকে দুর্বল করার একটি আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করেছিল। ফরাসি সরকার যুদ্ধের শুরু থেকেই গোপনে আমেরিকানদের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সাহায্য দেওয়ার পথ খুঁজছিল।

আমেরিকান কূটনীতির কেন্দ্রে ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। ১৭৭৬ সালের শেষদিকে তিনি ফ্রান্সে পৌঁছে দ্রুত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শার্ল গ্রাভিয়ে, কম্ত দ্য ভার্জেন আমেরিকান বিদ্রোহকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও একটি বড় প্রশ্ন ছিল—এই নতুন রাষ্ট্র কি সত্যিই ব্রিটেনের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে?

ফ্রান্স যদি প্রকাশ্যে আমেরিকাকে সমর্থন করত, তাহলে ব্রিটেনের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি ছিল। তাই শুধু রাজনৈতিক সহানুভূতি যথেষ্ট ছিল না। ফরাসি নেতৃত্বকে বিশ্বাস করতে হতো যে আমেরিকান বিদ্রোহ সামরিকভাবে বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখে। সারাটোগায় একটি সম্পূর্ণ ব্রিটিশ বাহিনীর আত্মসমর্পণ সেই প্রমাণ এনে দেয়।

সারাটোগার খবর ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর কূটনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ব্রিটেনও আমেরিকানদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে—এই আশঙ্কা ফরাসিদের সিদ্ধান্ত আরও ত্বরান্বিত করে। অবশেষে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৭৭৮ ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করে—Treaty of Amity and Commerce এবং Treaty of Alliance। প্রথমটি যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে; দ্বিতীয়টি ব্রিটেনের বিরুদ্ধে সামরিক জোটের ভিত্তি তৈরি করে।

এখানেই আমেরিকান বিপ্লবের চরিত্র মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তেরো উপনিবেশের বিদ্রোহ এখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যকার আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হলো। ফ্রান্স শুধু অর্থ বা অস্ত্র পাঠাবে না; তার সেনাবাহিনী ও বিশেষ করে শক্তিশালী নৌবাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে।

ফরাসি নৌবাহিনীর প্রবেশ ব্রিটেনের জন্য বিশেষভাবে গুরুতর ছিল। এর আগে রয়্যাল নেভি আমেরিকার উপকূলে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারত। এখন ব্রিটেনকে উত্তর আমেরিকার পাশাপাশি ক্যারিবীয় অঞ্চল, আটলান্টিক, ভূমধ্যসাগর এবং অন্যান্য সাম্রাজ্যিক অঞ্চলেও ফরাসি শক্তির মোকাবিলা করতে হবে। যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর দ্রুত বিস্তৃত হয়ে যায়।

১৭৭৯ সালে স্পেন ফ্রান্সের মিত্র হিসেবে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করে, যদিও স্পেন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মিত্র হিসেবে একইভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়নি। ১৭৮০ সালে ডাচ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গেও ব্রিটেনের যুদ্ধ শুরু হয়। ফলে যে সংঘর্ষ ১৭৭৫ সালে ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটন ও কনকর্ডে শুরু হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যে তা উত্তর আমেরিকার সীমানা অতিক্রম করে একটি বৃহৎ বৈশ্বিক সাম্রাজ্যিক যুদ্ধে পরিণত হয়।

এই পরিবর্তনের ফলে ব্রিটেনের কৌশলগত সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। আগে তারা আমেরিকায় বিপুল সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে পারত। এখন তাদের ক্যারিবীয় অঞ্চলের মূল্যবান চিনির দ্বীপ, ইউরোপীয় জলসীমা, ভূমধ্যসাগরীয় ঘাঁটি এবং বিশ্বের বিভিন্ন বাণিজ্যপথ রক্ষা করতে হচ্ছিল। আমেরিকান বিপ্লবীদের জন্য ফরাসি জোটের সবচেয়ে বড় সুবিধা শুধু অতিরিক্ত সৈন্য নয়; এটি ব্রিটেনকে একই সঙ্গে বহু অঞ্চলে তার সামরিক সম্পদ ভাগ করতে বাধ্য করেছিল।

ফরাসি সাহায্যের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত ১৭৮১ সালের ইয়র্কটাউন অভিযানে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। জেনারেল রোশাম্বোর ফরাসি সৈন্য এবং অ্যাডমিরাল দ্য গ্রাসের নৌবহর ছাড়া কর্নওয়ালিসকে ইয়র্কটাউনে বিচ্ছিন্ন করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা অত্যন্ত কঠিন হতো। অর্থাৎ সারাটোগা থেকে ফরাসি জোট এবং ফরাসি জোট থেকে ইয়র্কটাউন—আমেরিকান বিজয়ের ইতিহাসে একটি সরাসরি কৌশলগত ধারাবাহিকতা রয়েছে।

তবে সারাটোগাকে শুধু হোরেশিও গেটসের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে দেখা সরলীকরণ হবে। এতে গেটসের নেতৃত্বের পাশাপাশি আর্নল্ডের যুদ্ধক্ষেত্রের ভূমিকা, ড্যানিয়েল মরগানের রাইফেলম্যান, কোশচিউশকোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, নিউ ইংল্যান্ড ও নিউইয়র্কের মিলিশিয়া এবং বার্গয়েনের নিজস্ব সরবরাহ ও কৌশলগত সমস্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একইভাবে ব্রিটিশ পরাজয়ও একটি মাত্র ভুলের ফল নয়; দুর্বল সমন্বয়, কঠিন ভূগোল, দীর্ঘ সরবরাহপথ, আমেরিকান প্রতিরোধ এবং সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকা শত্রুবাহিনী মিলেই বার্গয়েনকে ফাঁদে ফেলেছিল।

সারাটোগা তাই আমেরিকান বিপ্লবের প্রকৃত মোড় ঘোরানো ঘটনাগুলোর একটি। ট্রেন্টন ও প্রিন্সটন বিপ্লবকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছিল; সারাটোগা প্রমাণ করেছিল যে আমেরিকানরা একটি বড় ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারে। আর সেই প্রমাণই ফ্রান্সকে প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত আস্থা দেয়।

১৭৭৭ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্কের সারাটোগায় বার্গয়েন যখন অস্ত্র সমর্পণ করেন, তখন তিনি শুধু একটি অভিযান হারাননি। সেই আত্মসমর্পণ আটলান্টিকের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়। কয়েক মাস পর ফ্রান্সের প্রবেশের সঙ্গে ব্রিটেনকে আর শুধু বিদ্রোহী আমেরিকানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়নি; তাকে নিজের পুরোনো ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধেও সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ করতে হয়েছে। এই কারণেই সারাটোগার বিজয় শুধু আমেরিকান যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য নয়—এটি সেই মুহূর্তগুলোর একটি, যখন আমেরিকান স্বাধীনতার সংগ্রাম একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহ থেকে বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে