বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সমুদ্রসৈকতের বালি কেন গোলাপি, সবুজ বা কালো হয়? রঙিন সৈকতের পেছনের ভূতাত্ত্বিক রহস্য

সমুদ্রসৈকতের বালি কেন গোলাপি, সবুজ বা কালো হয়? রঙিন সৈকতের পেছনের ভূতাত্ত্বিক রহস্য
প্রবাল, খনিজ ও আগ্নেয় শিলার কণাই তৈরি করে পৃথিবীর বিস্ময়কর রঙিন সৈকত।

আমাদের পরিচিত অধিকাংশ সমুদ্রসৈকতের বালি সাদা, ধূসর, হালকা বাদামি কিংবা সোনালি। তাই কোনো সৈকতে গিয়ে যদি চোখের সামনে গোলাপি, জলপাই-সবুজ অথবা গভীর কালো বালির বিস্তীর্ণ তট দেখা যায়, প্রথম দর্শনে সেটিকে প্রায় অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু এই অস্বাভাবিক রঙের পেছনে কোনো রহস্যময় রাসায়নিক রং বা মানুষের তৈরি পরিবর্তন নেই। সৈকতের বালি আসলে সেই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, আশপাশের শিলা, আগ্নেয়গিরি, সামুদ্রিক জীব, প্রবালপ্রাচীর, স্রোত এবং ঢেউয়ের সম্মিলিত কাজের একটি দৃশ্যমান দলিল। বালির প্রতিটি ক্ষুদ্র কণা কোথা থেকে এসেছে, তার রাসায়নিক ও খনিজ গঠন কী এবং সমুদ্র তাকে কীভাবে বাছাই ও জমা করেছে—এসবের ওপর নির্ভর করেই একটি সৈকতের রং তৈরি হয়।

প্রথমে বোঝা দরকার, সমুদ্রসৈকতের বালি কোনো একক পদার্থ নয়। আমরা যাকে একসঙ্গে বালি বলি, তার মধ্যে থাকতে পারে কোয়ার্টজের ক্ষুদ্র দানা, ফেল্ডস্পার, আগ্নেয় শিলার টুকরো, লোহাসমৃদ্ধ খনিজ, প্রবালের ভাঙা অংশ, ঝিনুকের খোলস, সামুদ্রিক প্রাণীর কঙ্কালের অংশ এবং আরও অসংখ্য খনিজ ও জৈব পদার্থ। কোনো অঞ্চলে কোন উপাদান বেশি রয়েছে, সেটিই মূলত বালির সামগ্রিক রং নির্ধারণ করে। এ কারণেই পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুটি সৈকতের বালির দানার আকার একই হলেও তাদের রং সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

সাধারণ হালকা রঙের সৈকতে প্রায়ই কোয়ার্টজের আধিক্য দেখা যায়। কোয়ার্টজ খুব শক্ত এবং রাসায়নিক ক্ষয়ের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে প্রতিরোধী। পাহাড় ও শিলা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বৃষ্টি, তাপমাত্রার পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ক্ষয় হতে হতে ছোট কণায় পরিণত হয়। নদী সেই কণা সমুদ্র পর্যন্ত নিয়ে আসে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল খনিজগুলো পথে ভেঙে বা রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেলেও কোয়ার্টজের অনেক দানা টিকে থাকে। পরে ঢেউ ও স্রোত সেগুলোকে সৈকতে জমা করে। কিন্তু গোলাপি, সবুজ কিংবা কালো সৈকতের ক্ষেত্রে এই পরিচিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিশেষ ধরনের জৈব পদার্থ বা খনিজের আধিক্য যুক্ত হয়।

গোলাপি বালির সৈকত সম্ভবত রঙিন সৈকতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এর রং সাধারণত কোনো উজ্জ্বল গোলাপি খনিজের বিশাল স্তর থেকে আসে না। বরং সাদা বা হালকা বালির সঙ্গে লালচে কিংবা গোলাপি রঙের অত্যন্ত ক্ষুদ্র জৈব কণা মিশে এই কোমল গোলাপি আভা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উষ্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলের কিছু গোলাপি সৈকতের ক্ষেত্রে এককোষী সামুদ্রিক জীবের খোলস বা কঙ্কালের ক্ষুদ্র অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীবগুলোর মধ্যে কিছু চুনজাতীয় পদার্থ দিয়ে শক্ত আবরণ তৈরি করে। তাদের কোনো কোনো প্রজাতির আবরণে লাল বা গোলাপি রঞ্জকতা থাকে। জীবগুলো মারা যাওয়ার পর তাদের ক্ষুদ্র আবরণ সমুদ্রতলে জমা হয়। ঢেউ, প্রবালপ্রাচীরের ক্ষয় এবং সামুদ্রিক স্রোতের মাধ্যমে এগুলো ভেঙে আরও ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে উপকূলে পৌঁছায়। সেখানে সাদা প্রবাল, ঝিনুক ও অন্যান্য চুনজাতীয় কণার সঙ্গে লালচে কণা মিশলে পুরো সৈকতটি কোমল গোলাপি দেখাতে শুরু করে।

বাহামার হারবার দ্বীপের গোলাপি বালির সৈকত এই ধরনের ভূদৃশ্যের বিখ্যাত উদাহরণ। সেখানে বালির মধ্যে প্রবাল ও সামুদ্রিক জীব থেকে আসা হালকা কণার পাশাপাশি লালচে আভাযুক্ত ক্ষুদ্র জৈব কণার উপস্থিতি গোলাপি রং তৈরিতে ভূমিকা রাখে। সূর্যের আলো, বালি ভেজা না শুকনো এবং দেখার কোণের কারণে এই গোলাপি রং কখনো খুব স্পষ্ট, আবার কখনো ফিকে মনে হতে পারে। অর্থাৎ সৈকতের প্রকৃত উপাদানের পাশাপাশি আলোও আমাদের চোখে রঙের তীব্রতা বদলে দেয়।

ইন্দোনেশিয়ার কোমোদো অঞ্চলেও বিখ্যাত গোলাপি বালির সৈকত রয়েছে। সেখানে লালচে প্রবালজাত কণা সাদা বালির সঙ্গে মিশে গোলাপি আভা তৈরি করতে পারে। প্রবালপ্রাচীরের ক্ষুদ্র অংশ ঢেউয়ের আঘাতে ক্রমাগত ভেঙে যায়। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের কার্যকলাপও প্রবালজাত পদার্থকে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত করতে সাহায্য করে। পরে ঢেউ সেই কণাগুলো তীরে এনে জমা করে। ফলে গোলাপি সৈকতকে শুধু সুন্দর একটি দৃশ্য হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না; এটি কাছাকাছি সামুদ্রিক প্রতিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি উপকূলীয় প্রক্রিয়ারও ফল।

সবুজ বালির সৈকত আরও বিরল। কারণ এমন একটি সৈকত তৈরির জন্য শুধু বিশেষ রঙের খনিজ থাকলেই হয় না; সেই খনিজকে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপকূলে জমাও হতে হয়। সবুজ বালির অন্যতম প্রধান উৎস হলো অলিভিন নামের একটি খনিজ। বাংলায় একে জলপাই-সবুজ খনিজ হিসেবে বোঝানো যায়। এর রং সাধারণত হলুদাভ সবুজ থেকে গভীর জলপাই-সবুজ পর্যন্ত হতে পারে। ম্যাগনেশিয়াম ও লোহাসমৃদ্ধ এই খনিজ পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরের শিলায় প্রচুর থাকলেও ভূপৃষ্ঠে এসে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা সবসময় সহজ নয়।

অলিভিন বিশেষ করে কিছু আগ্নেয় শিলার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত লাভা ঠান্ডা হয়ে ব্যাসল্টজাতীয় শিলা তৈরি করলে তার মধ্যে অলিভিনের স্ফটিক থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে ঢেউ, বৃষ্টি, বাতাস এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনে সেই শিলা ক্ষয় হতে থাকে। অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ও দুর্বল অংশ ভেঙে সরে গেলে অলিভিনের সবুজ দানাগুলো মুক্ত হয়ে উপকূলে জমতে পারে। যথেষ্ট পরিমাণে এই দানা জমা হলে সৈকতের বালি সবুজ দেখায়।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পাপাকোলেয়া সৈকত পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত সবুজ বালির সৈকতগুলোর একটি। এর চারপাশের আগ্নেয় ভূপ্রকৃতিই সবুজ বালির মূল উৎস। পুরোনো আগ্নেয় গঠনের ক্ষয়ের ফলে অলিভিনসমৃদ্ধ পদার্থ বেরিয়ে এসে সৈকতে জমা হয়েছে। অলিভিনের ঘনত্ব সাধারণ বালির অনেক উপাদানের তুলনায় বেশি হওয়ায় ঢেউয়ের বাছাই প্রক্রিয়াও কিছু ক্ষেত্রে এর ঘনীভবনে সহায়তা করতে পারে। হালকা কণা সহজে সরে যায়, আর তুলনামূলক ভারী খনিজের দানা নির্দিষ্ট অংশে বেশি জমে থাকতে পারে।

সবুজ সৈকতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর রং স্থায়ীভাবে একই থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যদি আশপাশের আগ্নেয় শিলা থেকে নতুন অলিভিন সরবরাহ কমে যায় অথচ ঢেউ বিদ্যমান সবুজ কণা ক্রমাগত সরিয়ে নিতে থাকে, তাহলে দীর্ঘ সময়ে সৈকতের সবুজ বালির পরিমাণ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ এমন সৈকতকে একটি স্থির ভূদৃশ্যের বদলে চলমান ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। প্রতিটি ঢেউ সেখানে কিছু কণা নিয়ে আসে, কিছু কণা সরিয়ে নেয় এবং ধীরে ধীরে সৈকতের গঠন বদলে দেয়।

কালো বালির সৈকতের জন্ম আবার অন্য ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে। এগুলো বিশেষ করে সক্রিয় বা অতীতে সক্রিয় আগ্নেয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসা গাঢ় রঙের লাভা ঠান্ডা হয়ে ব্যাসল্টের মতো শিলা তৈরি করে। এই শিলায় সাধারণত হালকা রঙের কোয়ার্টজের আধিক্য থাকে না; বরং গাঢ় রঙের লোহা ও ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খনিজের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ফলে শিলাটি ভেঙে বালিতে পরিণত হলে সেই বালিও কালো বা গাঢ় ধূসর দেখায়।

কখনো কালো সৈকত তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত নাটকীয় হতে পারে। আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা সরাসরি সমুদ্রে প্রবেশ করলে ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে দ্রুত তাপ হারায়। তীব্র তাপমাত্রার পার্থক্য, বিস্ফোরণ এবং যান্ত্রিক ভাঙনের ফলে লাভা অসংখ্য ছোট টুকরোয় ভেঙে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে ঢেউ সেই টুকরোগুলোকে বারবার আঘাত করে আরও ক্ষুদ্র ও গোলাকার কণায় পরিণত করে। এভাবে তুলনামূলক অল্প ভূতাত্ত্বিক সময়ের মধ্যেও নতুন কালো বালির সৈকত তৈরি হতে পারে।

আইসল্যান্ডের বহু কালো সৈকত এই আগ্নেয় ভূপ্রকৃতির অসাধারণ উদাহরণ। দেশটির ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে সেখানে ব্যাপক আগ্নেয় কার্যকলাপ ঘটেছে এবং ব্যাসল্টজাতীয় গাঢ় শিলা অত্যন্ত সাধারণ। সেই শিলার ক্ষয় থেকে তৈরি কালো কণা উপকূলে জমে নাটকীয় কালো সৈকত সৃষ্টি করেছে। একই ধরনের দৃশ্য হাওয়াই, নিউজিল্যান্ড এবং অন্যান্য আগ্নেয় অঞ্চলেও দেখা যায়।

কালো বালির মধ্যে শুধু ব্যাসল্টের ক্ষুদ্র টুকরোই থাকে না। ম্যাগনেটাইটের মতো লোহাসমৃদ্ধ ভারী খনিজও কোনো কোনো সৈকতের গাঢ় রং তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ম্যাগনেটাইট প্রায় কালো রঙের এবং তুলনামূলক ভারী। নদী ও ঢেউ যখন বিভিন্ন ঘনত্বের বালিকণা বহন করে, তখন প্রাকৃতিক বাছাইয়ের মাধ্যমে ভারী খনিজগুলো নির্দিষ্ট স্থানে বেশি ঘনীভূত হতে পারে। এ কারণে কোনো সৈকতে কালো বালির সরু রেখা বা বিশেষ অংশ দেখা যায়, যদিও পুরো সৈকতটি কালো নয়।

এখানেই ঢেউয়ের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র শুধু শিলা ভাঙা কণা গ্রহণ করে সৈকতে ফেলে রাখে না; এটি যেন একটি বিশাল প্রাকৃতিক বাছাইযন্ত্রের মতো কাজ করে। ঢেউ যখন তীরে আছড়ে পড়ে এবং পানি আবার সমুদ্রে ফিরে যায়, তখন বিভিন্ন আকার, আকৃতি ও ঘনত্বের কণা ভিন্নভাবে স্থানান্তরিত হয়। হালকা কণা তুলনামূলক সহজে ভেসে বা গড়িয়ে দূরে চলে যেতে পারে, অন্যদিকে ভারী খনিজের দানা নির্দিষ্ট অঞ্চলে জমা হতে পারে। হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ বার এই প্রক্রিয়া ঘটতে ঘটতে কোনো বিশেষ খনিজের ঘনত্ব এত বেড়ে যেতে পারে যে সেটিই সৈকতের প্রধান রং নির্ধারণ করতে শুরু করে।

বালির রং বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি সৈকতের উৎস সবসময় তার ঠিক পাশেই থাকে না। নদী বহু দূরের পাহাড় থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা বহন করে সমুদ্রে আনতে পারে। উপকূলীয় স্রোত সেই বালি আবার কয়েক দশক বা শত কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে কোনো দ্বীপে নদীর ভূমিকা খুব কম হলেও প্রবালপ্রাচীর, ঝিনুক, সামুদ্রিক জীব এবং স্থানীয় আগ্নেয় শিলাই বালির প্রধান উৎস হতে পারে। ফলে একটি মুঠো বালির মধ্যে কখনো পাহাড়, আগ্নেয়গিরি এবং সমুদ্রের জীবজগতের ইতিহাস একসঙ্গে লুকিয়ে থাকতে পারে।

বালির দানার আকারও রঙের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। খুব সূক্ষ্ম কণার ওপর আলো একভাবে ছড়ায়, আবার মোটা ও স্বচ্ছ খনিজকণার ওপর অন্যভাবে প্রতিফলিত হয়। শুকনো বালির ফাঁকে বাতাস থাকে বলে সেটি সাধারণত হালকা দেখায়। একই বালি ভিজে গেলে পানির কারণে আলোর প্রতিফলন ও বিচ্ছুরণের ধরন বদলে যায় এবং রং আরও গাঢ় মনে হয়। এ কারণেই কালো সৈকত ভেজা অবস্থায় প্রায় কয়লার মতো গাঢ় দেখাতে পারে, আবার শুকিয়ে গেলে ধূসর আভা নিতে পারে। একইভাবে গোলাপি বালির রং দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তীব্রতার মনে হতে পারে।

সূর্যের অবস্থানও দৃশ্যমান রং বদলে দেয়। দুপুরের তীব্র আলোতে সবুজ অলিভিনের দানা ঝকঝকে জলপাই বা সোনালি-সবুজ দেখাতে পারে। সূর্য নিচে নেমে গেলে একই বালি অনেক গাঢ় মনে হয়। গোলাপি সৈকতে ভোর বা বিকেলের উষ্ণ আলো বালির লালচে আভাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। ফলে পর্যটকের ছবিতে যে সৈকত অত্যন্ত উজ্জ্বল গোলাপি বা সবুজ দেখায়, বাস্তবে সব সময় তার রং ঠিক ততটা তীব্র নাও হতে পারে।

রঙিন সৈকত সম্পর্কে আরেকটি ভুল ধারণা হলো, সৈকতের প্রতিটি বালিকণাই বুঝি একই রঙের। বাস্তবে সাধারণত তা নয়। এক মুঠো গোলাপি বালি খুব কাছ থেকে দেখলে সাদা, স্বচ্ছ, লালচে, গোলাপি ও বাদামি নানা ধরনের ক্ষুদ্র কণা দেখা যেতে পারে। দূর থেকে এই ভিন্ন রঙের অসংখ্য দানা একসঙ্গে আমাদের চোখে গোলাপি হিসেবে ধরা পড়ে। সবুজ সৈকতেও সব দানা অলিভিন নয়; সবুজ খনিজের সঙ্গে কালো আগ্নেয় কণা এবং অন্যান্য উপাদান মিশে থাকতে পারে। কালো সৈকতেও বিভিন্ন গাঢ় খনিজ ও আগ্নেয় শিলার টুকরোর মিশ্রণ থাকে।

এই বৈচিত্র্য বিজ্ঞানীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বালির খনিজ গঠন বিশ্লেষণ করে কোনো অঞ্চলের শিলার প্রকৃতি, ক্ষয়ের ধরন, আগ্নেয় ইতিহাস এবং পলি পরিবহনের পথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। দানার আকৃতি দেখে বোঝা যায় সেটি কতটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। খুব ধারালো কণা তুলনামূলকভাবে কাছের উৎসের ইঙ্গিত দিতে পারে, আর দীর্ঘদিন ঢেউ বা নদীর মধ্যে ঘুরতে থাকা দানা ক্রমে মসৃণ ও গোলাকার হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ সৈকত শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া পড়ার একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র।

রঙিন সৈকত অত্যন্ত সুন্দর হলেও এগুলো অনেক ক্ষেত্রে ভঙ্গুর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। পর্যটকেরা স্মারক হিসেবে বারবার বালি নিয়ে গেলে ছোট সৈকতে তার প্রভাব জমতে পারে। বিশেষ করে বিরল সবুজ বা গোলাপি সৈকতে যে খনিজ বা জৈব কণা জমতে হাজার হাজার বছর লেগেছে, মানুষের পক্ষে তা দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে উপকূলীয় নির্মাণ, প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি, বালু উত্তোলন, ঝড় এবং স্রোতের পরিবর্তন সৈকতে নতুন বালির সরবরাহ ও পুরোনো বালির ক্ষয়ের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে এসব সৈকতের আকৃতি ও অবস্থান বদলে দিতে পারে। একটি সৈকত আসলে স্থায়ী ভূমিখণ্ড নয়; এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত পলির ভাণ্ডার। ঝড়ের সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল বালি সমুদ্রে চলে যেতে পারে, আবার শান্ত মৌসুমে তার কিছু অংশ ফিরে আসতে পারে। প্রবালনির্ভর সৈকতের ক্ষেত্রে সুস্থ প্রবালপ্রাচীর নতুন চুনজাতীয় কণার উৎস হিসেবে কাজ করে। আগ্নেয় সৈকতে আবার নতুন অগ্ন্যুৎপাত সম্পূর্ণ নতুন উপকূল তৈরি করে দিতে পারে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, গোলাপি, সবুজ ও কালো সৈকত দেখতে সম্পূর্ণ আলাদা হলেও তাদের জন্মের মৌলিক নিয়ম একই—উৎস, ক্ষয়, পরিবহন, বাছাই এবং সঞ্চয়। গোলাপি সৈকতে সামুদ্রিক জীব ও প্রবালজাত লালচে-সাদা কণা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; সবুজ সৈকতে আগ্নেয় শিলা থেকে আসা অলিভিনের ঘনীভবন প্রধান ভূমিকা নিতে পারে; আর কালো সৈকত সাধারণত ব্যাসল্ট, আগ্নেয় শিলার কণা এবং গাঢ় ভারী খনিজের উপস্থিতির ফল। এরপর ঢেউ ও স্রোত এসব কণাকে বারবার সাজিয়ে সৈকতের বর্তমান চেহারা তৈরি করে।

তাই কোনো রঙিন সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আমরা আসলে শুধু অস্বাভাবিক রঙের বালি দেখি না। গোলাপি বালির মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে প্রবালপ্রাচীর ও অতি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীবের ইতিহাস, সবুজ বালির প্রতিটি ঝিকিমিকি দানায় থাকতে পারে পৃথিবীর গভীর থেকে উঠে আসা আগ্নেয় পদার্থের চিহ্ন, আর কালো সৈকত মনে করিয়ে দেয় এমন অগ্ন্যুৎপাতের কথা, যেখানে উত্তপ্ত লাভা একসময় সমুদ্রের ঠান্ডা পানির মুখোমুখি হয়েছিল। একটি সৈকতের রং তাই প্রকৃতির অলংকারমাত্র নয়; সেটি পৃথিবীর শিলা, জীবজগৎ, আগ্নেয়গিরি এবং সমুদ্রের মধ্যে চলতে থাকা দীর্ঘ সম্পর্কের দৃশ্যমান ইতিহাস।


আপনার পছন্দ হতে পারে