বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ডেনমার্কের হস্তক্ষেপ ও ওয়ালেনস্টাইনের উত্থান: ত্রিশ বছরের যুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্টদের ব্যর্থতার ইতিহাস

Series: ত্রিশ বছরের যুদ্ধ: ধর্মীয় সংঘাত থেকে ইউরোপের ক্ষমতার মহাযুদ্ধ

  • Author: Admin
  • September 03, 2026
ডেনমার্কের হস্তক্ষেপ ও ওয়ালেনস্টাইনের উত্থান: ত্রিশ বছরের যুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্টদের ব্যর্থতার ইতিহাস
ডেনমার্কের পরাজয় ও ওয়ালেনস্টাইনের উত্থান

১৬২০ সালের হোয়াইট মাউন্টেনের যুদ্ধের পর ত্রিশ বছরের যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে হ্যাবসবার্গ ও ক্যাথলিক শক্তির অবস্থান দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। বোহেমিয়ান বিদ্রোহ ভেঙে পড়েছে, ফ্রেডেরিক পঞ্চম সিংহাসন হারিয়েছেন এবং তাঁর প্যালাটিনেটও আক্রমণের মুখে পড়েছে। কিন্তু সংঘাত এখানেই থামেনি। বরং ক্যাথলিক বিজয়ের ধারাবাহিকতা উত্তর জার্মানির প্রোটেস্ট্যান্ট রাজ্যগুলোর মধ্যে নতুন আশঙ্কা তৈরি করে। সেই পরিস্থিতিতে ডেনমার্কের রাজা চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান ১৬২৫ সালে যুদ্ধে প্রবেশ করেন। তাঁর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে—যা সাধারণভাবে ড্যানিশ পর্যায় নামে পরিচিত।

চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ানের যুদ্ধে প্রবেশকে শুধু ধর্মীয় সংহতির ফল হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন লুথারান রাজা, তাই জার্মান প্রোটেস্ট্যান্টদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল বাস্তব। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর ছিল সুস্পষ্ট রাজবংশীয়, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। ডেনমার্ক তখন বাল্টিক ও উত্তর সাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। উত্তর জার্মানির বিভিন্ন ধর্মীয় ভূখণ্ডে নিজের পরিবারের প্রভাব বাড়ানো এবং এলবে ও ভেজার নদীসংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থান শক্তিশালী করা ক্রিশ্চিয়ানের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ ছিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান শুধু ডেনমার্কের রাজা ছিলেন না। হলস্টাইনের ডিউক হিসেবে তিনি পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের একজন রাজপুত্রও ছিলেন। ফলে জার্মান রাজনীতিতে তাঁর প্রত্যক্ষ সাংবিধানিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ছিল। হ্যাবসবার্গ ও ক্যাথলিক লীগের শক্তি যদি উত্তর জার্মানি পর্যন্ত বিস্তৃত হতো, তবে সেটি ডেনমার্কের দক্ষিণ সীমান্ত এবং বাল্টিক অঞ্চলে তার প্রভাবের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারত।

এই সময় ইউরোপের অন্য কয়েকটি শক্তিও হ্যাবসবার্গদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। ইংল্যান্ডে ফ্রেডেরিক পঞ্চমের প্যালাটিনেট পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, কারণ তিনি ছিলেন ইংরেজ রাজপরিবারের জামাতা। ডাচ প্রজাতন্ত্র স্পেনের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিল এবং হ্যাবসবার্গ শক্তির বিস্তার তাদের জন্যও বিপজ্জনক। ক্যাথলিক হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্সও হ্যাবসবার্গ রাজবংশের অতিরিক্ত শক্তিবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। ফলে একটি বৃহত্তর হ্যাবসবার্গবিরোধী জোট গড়ার চেষ্টা চলছিল।

কিন্তু কাগজে সম্ভাবনাময় এই জোট বাস্তবে শক্তিশালী সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়নি। উত্তর জার্মানির সব প্রোটেস্ট্যান্ট রাজপুত্র ক্রিশ্চিয়ানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেননি। বিশেষ করে স্যাক্সনি ও ব্র্যান্ডেনবার্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রোটেস্ট্যান্ট শক্তি সতর্ক অবস্থান বজায় রাখে। তারা এমন কোনো যুদ্ধে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে জড়াতে চাইছিল না, যার ফলে তাদের ভূখণ্ড সরাসরি সাম্রাজ্যিক আক্রমণের মুখে পড়তে পারে। ফলে ডেনমার্কের রাজা যে বৃহৎ জার্মান প্রোটেস্ট্যান্ট ঐক্যের আশা করেছিলেন, তা বাস্তবে গড়ে ওঠেনি।

অন্যদিকে সম্রাট দ্বিতীয় ফার্দিনান্দের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল। এতদিন তিনি ক্যাথলিক লীগের সেনাবাহিনী এবং বাভারিয়ার ম্যাক্সিমিলিয়ানের সহযোগিতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছিলেন। লীগের প্রধান সেনাপতি ইয়োহান সেরক্লেস, কাউন্ট অব টিলি দক্ষ সামরিক নেতা হলেও সম্রাট যদি নিজস্ব বৃহৎ সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে না পারেন, তবে বাভারিয়ার ওপর তাঁর নির্ভরতা রাজনৈতিকভাবে সমস্যাজনক হতে পারত।

এই পরিস্থিতিতে আবির্ভূত হন ত্রিশ বছরের যুদ্ধের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যময় সামরিক ব্যক্তিত্ব—আলব্রেখট ফন ওয়ালেনস্টাইন। বোহেমিয়ার এক অভিজাত পরিবার থেকে উঠে আসা ওয়ালেনস্টাইন হোয়াইট মাউন্টেনের পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। তাঁর সামরিক প্রতিভার পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহ, সৈন্য নিয়োগ এবং যুদ্ধকে অর্থায়ন করার অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা তাঁকে ফার্দিনান্দের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান করে তোলে।

ওয়ালেনস্টাইনের প্রস্তাব ছিল যুগান্তকারী। তিনি সম্রাটের জন্য একটি বিশাল সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনী সংগঠিত করবেন, যার সম্পূর্ণ ব্যয় কেন্দ্রীয় রাজকোষকে বহন করতে হবে না। সৈন্যরা যে অঞ্চল দিয়ে চলবে বা যেখানে অবস্থান করবে, সেই অঞ্চল থেকে অর্থ, খাদ্য, পশু ও অন্যান্য সরবরাহ সংগ্রহ করা হবে। এই ব্যবস্থা পরবর্তীকালে ত্রিশ বছরের যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক চরিত্রের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধ ক্রমে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যেখানে সেনাবাহিনী যুদ্ধ চালানোর জন্য ভূখণ্ডকে শোষণ করত এবং সেই শোষণ আবার যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করত।

১৬২৫ সালের পর ওয়ালেনস্টাইন দ্রুত হাজার হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন জাতি ও অঞ্চলের ভাড়াটে সৈন্য ছিল। ধর্মীয় আনুগত্যের চেয়ে নিয়মিত বেতন, লুটের সম্ভাবনা এবং সামরিক পেশাই অনেক সৈন্যের প্রধান প্রেরণা ছিল। এর ফলে ফার্দিনান্দ প্রথমবারের মতো ক্যাথলিক লীগের বাইরে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যিক সামরিক যন্ত্র হাতে পান।

ড্যানিশ ও প্রোটেস্ট্যান্ট পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এখন দুটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কাজ করছিল—টিলির ক্যাথলিক লীগ বাহিনী এবং ওয়ালেনস্টাইনের সাম্রাজ্যিক বাহিনী। এই দ্বৈত চাপই ক্রিশ্চিয়ানের অভিযানের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে।

১৬২৬ সাল ছিল ডেনমার্কের জন্য নির্ণায়ক বছর। প্রোটেস্ট্যান্ট পক্ষের অন্যতম সেনাপতি আর্নস্ট ফন মান্সফেল্ড ওয়ালেনস্টাইনের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। কিন্তু ডেসাউ ব্রিজের যুদ্ধে ওয়ালেনস্টাইন তাঁকে গুরুতরভাবে পরাজিত করেন। এর ফলে প্রোটেস্ট্যান্ট বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ওয়ালেনস্টাইনের সামরিক খ্যাতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

এর কয়েক মাস পর আরও বড় বিপর্যয় ঘটে। ১৬২৬ সালের ২৭ আগস্ট লুটারের যুদ্ধে চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ানের বাহিনী টিলির ক্যাথলিক লীগ সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের পরিস্থিতি ড্যানিশ বাহিনীর জন্য ক্রমেই প্রতিকূল হয়ে ওঠে। দুর্বল সমন্বয়, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি এবং ক্যাথলিক বাহিনীর কার্যকর আক্রমণের ফলে ড্যানিশ সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে। বহু সৈন্য নিহত বা বন্দি হয় এবং বিপুল অস্ত্র ও সরঞ্জাম হারিয়ে যায়।

লুটারের পরাজয় ড্যানিশ হস্তক্ষেপের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও তিনি আর আগের মতো আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরতে পারেননি। বিপরীতে টিলি ও ওয়ালেনস্টাইনের বাহিনী উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৬২৭ সালের মধ্যে সাম্রাজ্যিক ও ক্যাথলিক বাহিনী উত্তর জার্মানির বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং জুটল্যান্ড উপদ্বীপও দখলের মুখে পড়ে

তবে ডেনমার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল তার নৌবাহিনী। সাম্রাজ্যিক বাহিনী স্থলযুদ্ধে শক্তিশালী হলেও সমুদ্রে তাদের সক্ষমতা সীমিত ছিল। ডেনিশ দ্বীপগুলো তাই সরাসরি দখল করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই ওয়ালেনস্টাইনের চিন্তা আরও উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠে। তিনি বাল্টিক উপকূলে সাম্রাজ্যিক প্রভাব বিস্তার এবং একটি সামুদ্রিক শক্তি তৈরির সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেন।

ফার্দিনান্দ তাঁকে মেকলেনবুর্গের ডিউক পদেও উন্নীত করেন, কারণ সেখানকার শাসকেরা ডেনিশ পক্ষকে সমর্থন করেছিল। একজন সামরিক উদ্যোক্তার এভাবে বিশাল ভূখণ্ডের শাসকে পরিণত হওয়া জার্মান রাজপুত্রদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। ওয়ালেনস্টাইন তখন আর শুধু সম্রাটের সেনাপতি নন; তিনি নিজেই ইউরোপীয় রাজনীতির একটি শক্তিশালী ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিলেন।

বাল্টিক উপকূলে তাঁর অগ্রযাত্রা অবশ্য সর্বত্র সফল হয়নি। ১৬২৮ সালে স্ট্রালসুন্ড অবরোধ ওয়ালেনস্টাইনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়ায়। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা এবং ডেনিশ ও সুইডিশ সহায়তার কারণে শহরটি সাম্রাজ্যিক বাহিনীর হাতে পড়েনি। এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ এটি দেখিয়ে দেয় যে বাল্টিক অঞ্চলে হ্যাবসবার্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সহজ হবে না এবং সুইডেনও ক্রমশ এই সংঘাতের দিকে নজর দিচ্ছিল।

তবু সামগ্রিকভাবে ডেনিশ অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। এর পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে। প্রথমত, জার্মান প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্যের অভাব ক্রিশ্চিয়ানকে প্রত্যাশিত শক্তি থেকে বঞ্চিত করে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা একটি স্থিতিশীল যৌথ সামরিক কমান্ডে পরিণত হয়নি। তৃতীয়ত, লুটার ও ডেসাউ ব্রিজের মতো যুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্ট পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী হারায়। চতুর্থত, টিলির অভিজ্ঞ ক্যাথলিক লীগ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ওয়ালেনস্টাইনের বিশাল সাম্রাজ্যিক বাহিনীর আবির্ভাব যুদ্ধের শক্তির ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়।

ওয়ালেনস্টাইনের যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর বিশাল বাহিনীকে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে রাখার জন্য অধিকৃত ও মিত্র উভয় অঞ্চল থেকেই “কনট্রিবিউশন” বা বাধ্যতামূলক অর্থ ও সরবরাহ আদায় করা হতো। ফলে স্থানীয় জনগণকে সৈন্যদের খাদ্য, বাসস্থান ও অর্থ জোগাতে বাধ্য করা হতো। এই ব্যবস্থা সেনাবাহিনীকে তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর করলেও সাধারণ মানুষের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, গ্রাম ও শহর নিঃস্ব হতে থাকে এবং যুদ্ধের সঙ্গে দুর্ভিক্ষ ও রোগের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।

ডেনমার্কের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার পর উভয় পক্ষ আলোচনার দিকে এগোয়। ১৬২৯ সালের লুবেকের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান ত্রিশ বছরের যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ান। তুলনামূলকভাবে তাঁর জন্য শর্তগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক ছিল না। তিনি ডেনিশ রাজ্যের মূল ভূখণ্ড এবং তাঁর অধিকারের অনেক অংশ ফিরে পান, কিন্তু শর্ত ছিল তিনি ভবিষ্যতে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে হস্তক্ষেপ করবেন না।

এই চুক্তির ফলে আপাতদৃষ্টিতে ফার্দিনান্দ দ্বিতীয় তাঁর ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে যান। বোহেমিয়ান বিদ্রোহ দমন হয়েছে, প্যালাটিনেট পরাজিত, ডেনিশ হস্তক্ষেপ ব্যর্থ এবং উত্তর জার্মানিতেও সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনী পৌঁছে গেছে। এই আত্মবিশ্বাসের পরিবেশেই ১৬২৯ সালের এডিক্ট অব রেস্টিটিউশন ঘোষণা করা হয়, যার মাধ্যমে পূর্ববর্তী দশকগুলোতে প্রোটেস্ট্যান্টদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া বহু ক্যাথলিক ধর্মীয় সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু এখানেই হ্যাবসবার্গ বিজয়ের একটি গভীর বৈপরীত্য ছিল। ফার্দিনান্দ যত শক্তিশালী হচ্ছিলেন, তাঁর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের সংখ্যাও তত বাড়ছিল। প্রোটেস্ট্যান্ট রাজপুত্ররা ধর্মীয় সম্পত্তি ও স্বাধীনতা নিয়ে আতঙ্কিত হয়। এমনকি কিছু ক্যাথলিক জার্মান শাসকও ওয়ালেনস্টাইনের বিশাল সেনাবাহিনী এবং সম্রাটের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, সম্রাট যদি নিজস্ব সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে জার্মান রাজপুত্রদের ঐতিহ্যগত স্বাধীনতা সংকুচিত করেন, তবে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের পুরোনো ক্ষমতার ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

ওয়ালেনস্টাইনের সাফল্য তাই একই সঙ্গে তাঁর পতনের বীজও তৈরি করছিল। তাঁর সেনাবাহিনীর নির্মম অর্থ আদায়, বিপুল ব্যক্তিগত ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বন্ধু ও শত্রু উভয় পক্ষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে। ১৬৩০ সালে জার্মান রাজপুত্রদের চাপের মুখে ফার্দিনান্দ তাঁকে সাময়িকভাবে সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হন। অথচ খুব শিগগিরই এমন এক নতুন শত্রু জার্মানিতে প্রবেশ করবে, যার বিরুদ্ধে সম্রাটকে আবারও ওয়ালেনস্টাইনের সাহায্য নিতে হবে—সুইডেনের রাজা গুস্তাভাস অ্যাডলফাস।

ড্যানিশ পর্যায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই। ১৬২৫ সালে চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান যে প্রোটেস্ট্যান্ট প্রতিরোধ পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন, ১৬২৯ সালের মধ্যে তা সামরিকভাবে ব্যর্থ হয়; কিন্তু সেই বিজয় ত্রিশ বছরের যুদ্ধ শেষ করতে পারেনি। বরং ওয়ালেনস্টাইনের উত্থান, সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার বিস্তার এবং এডিক্ট অব রেস্টিটিউশনের মতো পদক্ষেপ ইউরোপে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ডেনমার্কের পরাজয়ের পর যখন মনে হচ্ছিল হ্যাবসবার্গ ও ক্যাথলিক শক্তির বিজয় প্রায় সম্পূর্ণ, ঠিক তখনই বাল্টিকের ওপার থেকে আবির্ভূত হতে যাচ্ছিল আরও শক্তিশালী প্রোটেস্ট্যান্ট সামরিক শক্তি। ডেনমার্ক যেখানে ব্যর্থ হয়েছিল, সুইডেন সেখানে এমনভাবে যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দেবে যে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ আর কখনোই শুধু জার্মান ধর্মীয় সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।