বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্লাটিপাস এত অদ্ভুত কেন? হাঁসের ঠোঁট, বিষাক্ত কাঁটা ও ডিম পাড়া স্তন্যপায়ীর বিস্ময়

  • Author: Admin
  • September 03, 2026
প্লাটিপাস এত অদ্ভুত কেন? হাঁসের ঠোঁট, বিষাক্ত কাঁটা ও ডিম পাড়া স্তন্যপায়ীর বিস্ময়
প্রকৃতির বিস্ময়কর ডিম পাড়া স্তন্যপায়ী প্লাটিপাস

পৃথিবীর প্রাণিজগতে এমন কিছু প্রাণী আছে, যাদের দেখলে মনে হয় প্রকৃতি যেন প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। প্লাটিপাস সেই বিরল প্রাণীদের অন্যতম। প্রথম দেখায় এর শরীরের বিভিন্ন অংশ যেন বিভিন্ন প্রাণীর কাছ থেকে নেওয়া—চওড়া ও চ্যাপ্টা হাঁসের মতো ঠোঁট, ঘন লোমে ঢাকা স্তন্যপায়ীর দেহ, জালযুক্ত পা এবং চ্যাপ্টা শক্তিশালী লেজ। কিন্তু বাহ্যিক চেহারাই এর সবচেয়ে বড় বিস্ময় নয়। এটি ডিম পাড়ে, অথচ নিজের সন্তানকে দুধ খাওয়ায়। পুরুষ প্লাটিপাসের পেছনের পায়ে থাকে বিষ প্রয়োগের বিশেষ কাঁটা। আবার পানির নিচে চোখ, কান ও নাসারন্ধ্র বন্ধ রেখেও এটি শিকার খুঁজে বের করতে পারে অন্য প্রাণীর শরীর থেকে উৎপন্ন অতি ক্ষীণ বৈদ্যুতিক সংকেত অনুভব করে। এসব বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে প্লাটিপাসকে শুধু অদ্ভুত বললে বরং কম বলা হয়।

প্লাটিপাসের প্রাকৃতিক আবাস অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মিঠাপানির নদী, খাল, হ্রদ ও জলাশয়কেন্দ্রিক পরিবেশে। তাসমানিয়াতেও এদের পাওয়া যায়। এরা মূলত জল ও স্থল—দুই পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত স্তন্যপায়ী। দিনের উল্লেখযোগ্য সময় বিশ্রামে কাটালেও সন্ধ্যা, রাত কিংবা ভোরের দিকে খাদ্যের সন্ধানে পানিতে নামতে পারে। নদীর তীরের মাটিতে সুড়ঙ্গ তৈরি করে আশ্রয় নেওয়ার ক্ষমতা এবং পানির নিচে দক্ষতার সঙ্গে চলাচলের ক্ষমতা—দুটিই তাদের জীবনধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্লাটিপাসের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হলো এর চওড়া ঠোঁট। দূর থেকে দেখলে এটি হাঁসের ঠোঁটের মতো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে দুটির গঠন ও কাজ এক নয়। প্লাটিপাসের ঠোঁট নরম, নমনীয় ও অত্যন্ত সংবেদনশীল চামড়ায় আবৃত। এটি শুধু খাবার ধরার অঙ্গ নয়; বরং পানির নিচে চারপাশের পরিবেশ অনুভব করার অত্যন্ত উন্নত সংবেদনযন্ত্র। ঠোঁটের ভেতরে ও পৃষ্ঠে অসংখ্য বিশেষ সংবেদনগ্রাহী ব্যবস্থা রয়েছে, যার সাহায্যে প্লাটিপাস শিকারের নড়াচড়া এবং শরীর থেকে সৃষ্টি হওয়া ক্ষীণ বৈদ্যুতিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে।

এই ক্ষমতাকে আরও বিস্ময়কর করে তোলে প্লাটিপাসের শিকারের কৌশল। পানিতে ডুব দেওয়ার সময় এটি চোখ বন্ধ করে। একই সঙ্গে কান ও নাসারন্ধ্রও বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ আমরা যেসব ইন্দ্রিয়কে শিকার খোঁজার জন্য অপরিহার্য বলে ভাবি, পানির নিচে প্লাটিপাস সেগুলোর অধিকাংশের ওপর সরাসরি নির্ভর করে না। পরিবর্তে তার ঠোঁট হয়ে ওঠে এক ধরনের জীবন্ত অনুসন্ধানযন্ত্র। পানির নিচের ছোট প্রাণী পেশি সংকোচন করলে যে অতি ক্ষীণ বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়, প্লাটিপাস তা অনুভব করতে পারে।

বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করার এই ক্ষমতা স্তন্যপায়ীদের মধ্যে অত্যন্ত বিরল। প্লাটিপাসের ঠোঁটে বৈদ্যুতিক পরিবর্তন অনুভবকারী সংবেদনগ্রাহীর পাশাপাশি স্পর্শ ও পানির চাপের পরিবর্তন বোঝার ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে শিকার কোথায় আছে তা নির্ণয়ের সময় প্রাণীটি শুধু একটি সংকেতের ওপর নির্ভর করে না। বৈদ্যুতিক সংকেত এবং পানিতে সৃষ্ট যান্ত্রিক পরিবর্তনের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে তার মস্তিষ্ক শিকারের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। ঘোলা পানি কিংবা অন্ধকার নদীতলেও তাই প্লাটিপাস দক্ষ শিকারি।

এর খাদ্যের তালিকায় প্রধানত পানির নিচে বসবাসকারী ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী থাকে। জলজ পোকামাকড়ের শূককীট, কৃমি, ছোট খোলসধারী প্রাণী এবং নদীর তলদেশে পাওয়া অন্যান্য ক্ষুদ্র জীব এটি খায়। খাবার খোঁজার সময় সামনের পা দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে ঠোঁট দিয়ে নদীর তলদেশ অনুসন্ধান করে। শিকার সংগ্রহ করার পর তা সঙ্গে সঙ্গে গিলে না ফেলে মুখের পাশের বিশেষ থলির মতো অংশে জমা করতে পারে। এরপর পানির ওপরে উঠে বা সুবিধাজনক অবস্থায় খাদ্য চূর্ণ করে খায়।

প্রাপ্তবয়স্ক প্লাটিপাসের প্রকৃত দাঁত থাকে না। ছোট বয়সে দাঁতের কিছু গঠন দেখা গেলেও পরে সেগুলো হারিয়ে যায় এবং মুখের ভেতরে শক্ত শৃঙ্গজাতীয় পৃষ্ঠ তৈরি হয়। এই শক্ত অংশ ব্যবহার করে খাবার চূর্ণ করা হয়। নদীর তলদেশ থেকে খাবারের সঙ্গে ছোট পাথর বা কাঁকরও মুখে চলে আসতে পারে, যা শক্ত খাদ্য ভাঙার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। ফলে দাঁত না থাকলেও জলজ ক্ষুদ্র প্রাণী খাওয়ার ক্ষেত্রে প্লাটিপাস কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

পানিতে চলাচলের ক্ষেত্রেও এর শরীর অসাধারণভাবে অভিযোজিত। সামনের পায়ের আঙুলগুলোর মাঝখানে বিস্তৃত জাল রয়েছে। সাঁতার কাটার সময় সামনের পা প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। পেছনের পা এবং চ্যাপ্টা লেজ শরীরের ভারসাম্য ও দিক নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। স্থলে ওঠার পর সামনের পায়ের জালযুক্ত অংশ ভাঁজ হয়ে নখগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়। ফলে একই পা দিয়ে প্রাণীটি যেমন পানিতে সাঁতার কাটতে পারে, তেমনি নদীর তীরে মাটি খুঁড়ে সুড়ঙ্গও তৈরি করতে পারে।

প্লাটিপাসের লেজ দেখলে অনেকের বিভারের কথা মনে পড়ে। তবে এটি শুধু সাঁতারের অঙ্গ নয়। লেজে চর্বি সঞ্চিত থাকতে পারে, যা খাদ্যের অভাবের সময় শক্তির ভাণ্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রী প্লাটিপাস বাসা তৈরির সময় লেজ ব্যবহার করে উদ্ভিদের অংশ ও অন্যান্য উপাদান বহন করতেও পারে। অর্থাৎ দেখতে সাধারণ চ্যাপ্টা লেজ হলেও এটি শরীরের শক্তি ব্যবস্থাপনা থেকে প্রজননকালীন আচরণ পর্যন্ত একাধিক কাজে ব্যবহৃত হয়।

অস্ট্রেলিয়ার জলাশয়ের পানি অনেক সময় যথেষ্ট ঠান্ডা হতে পারে। এমন পরিবেশে শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে প্লাটিপাসের ঘন লোম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর লোমের স্তর শরীরের কাছাকাছি বাতাস আটকে রেখে তাপক্ষয় কমাতে সাহায্য করে। পানিতে ডুব দেওয়ার পরও এই নিরোধক ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। ছোট আকারের উষ্ণ রক্তের প্রাণীর জন্য ঠান্ডা পানিতে দীর্ঘ সময় খাদ্য অনুসন্ধান করা বিপুল শক্তির ব্যাপার। তাই এর ঘন লোম কেবল সৌন্দর্যের বৈশিষ্ট্য নয়, সরাসরি বেঁচে থাকার ব্যবস্থা।

প্লাটিপাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এর ডিম পাড়ার ক্ষমতা। সাধারণভাবে স্তন্যপায়ী প্রাণীর কথা বললে আমরা এমন প্রাণীর কথা ভাবি যারা জীবন্ত সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু প্লাটিপাস সেই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। এটি স্তন্যপায়ীদের একটি অত্যন্ত প্রাচীন শাখার সদস্য, যাদের স্ত্রী প্রাণী ডিম পাড়ে। প্লাটিপাস ছাড়াও একিডনা এই বিশেষ স্তন্যপায়ী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

স্ত্রী প্লাটিপাস প্রজননের সময় নদীতীরের মাটিতে বিশেষ বাসা তৈরির সুড়ঙ্গ খোঁড়ে। সাধারণ বিশ্রামের সুড়ঙ্গের তুলনায় এই প্রজনন সুড়ঙ্গ অনেক বেশি সুরক্ষিত ও জটিল হতে পারে। সুড়ঙ্গের শেষ দিকে বাসার অংশ তৈরি করা হয়। সেখানে ভেজা পাতা, ঘাস ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদান নিয়ে গিয়ে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা হয়। সুড়ঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মাটির বাধার মতো অংশও থাকতে পারে, যা ভেতরের পরিবেশ রক্ষা এবং বাইরের অনুপ্রবেশ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

স্ত্রী সাধারণত খুব অল্পসংখ্যক ডিম পাড়ে। ডিমগুলো পাখির শক্ত খোলসযুক্ত ডিমের মতো নয়; তুলনামূলকভাবে নরম ও চামড়ার মতো আবরণযুক্ত। মা নিজের শরীরের সঙ্গে ডিমগুলো ধরে রেখে উষ্ণতা দেয়। ডিম ফুটে বের হওয়া শিশু প্লাটিপাস অত্যন্ত অপরিণত ও অসহায় অবস্থায় থাকে। এখানেই স্তন্যপায়ী হিসেবে প্লাটিপাসের আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়—ডিম থেকে জন্মালেও শিশু মায়ের দুধ খেয়েই বড় হয়।

কিন্তু স্ত্রী প্লাটিপাসের দৃশ্যমান স্তনবৃন্ত নেই। দুধ বিশেষ স্তন্যগ্রন্থিতে তৈরি হয়ে ত্বকের ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে এবং পেটের লোম ও বিশেষ খাঁজে জমা হয়। শিশু সেখান থেকে দুধ গ্রহণ করে। অর্থাৎ স্তন্যপায়ীর মৌলিক বৈশিষ্ট্য—সন্তানের জন্য দুধ উৎপাদন—প্লাটিপাসের রয়েছে, কিন্তু দুধ সরবরাহের ব্যবস্থা অধিকাংশ পরিচিত স্তন্যপায়ীর তুলনায় একেবারেই আলাদা।

মায়ের দুধ শুধু খাদ্য হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডিম থেকে বের হওয়া অপরিণত শিশুর রোগপ্রতিরোধ এবং জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষার ক্ষেত্রেও মাতৃদুগ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্লাটিপাসের দুধে এমন কিছু জীবাণুরোধী উপাদান পাওয়া গেছে, যেগুলো বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। কারণ এর প্রজননব্যবস্থা এমন যে শিশুদের জীবাণুর সংস্পর্শ থেকে রক্ষার জন্য কার্যকর রাসায়নিক প্রতিরক্ষা বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

প্লাটিপাসের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের তালিকা এখানেই শেষ নয়। পুরুষ প্লাটিপাসের পেছনের পায়ের গোড়ালির কাছে ধারালো কাঁটার মতো একটি বিশেষ গঠন থাকে। এটি বিষগ্রন্থির সঙ্গে যুক্ত। প্রজনন মৌসুমে বিষ উৎপাদনের কার্যক্রম বৃদ্ধি পায় বলে ধারণা করা হয়, যা ইঙ্গিত করে যে প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষের সঙ্গে সংঘর্ষে এই অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই বিষের মূল ভূমিকা শিকার ধরার চেয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।

এই কাঁটার আঘাত মানুষের জন্যও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। প্লাটিপাসের বিষ সাধারণত মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হিসেবে পরিচিত নয়, কিন্তু এটি তীব্র ব্যথা ও উল্লেখযোগ্য ফোলাভাব সৃষ্টি করতে পারে। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। ফলে শান্ত ও নিরীহ চেহারার এই প্রাণীকে হাতে ধরার চেষ্টা মোটেও নিরাপদ নয়। বিশেষ করে পুরুষ প্লাটিপাসকে অযথা বিরক্ত করা বিপজ্জনক হতে পারে।

আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্লাটিপাসের শরীরের অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এমন এক মিশ্রণ দেখা যায় যা স্তন্যপায়ীর বিবর্তন বোঝার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। ডিম পাড়া তার প্রাচীন প্রজনন বৈশিষ্ট্যের স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে দুধ উৎপাদন ও লোম স্তন্যপায়ীর সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য। কাঁধের হাড়ের বিন্যাস এবং প্রজনন ও রেচনতন্ত্রের কিছু দিকেও এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অধিকাংশ আধুনিক স্তন্যপায়ীর তুলনায় আলাদা।

প্লাটিপাসের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বোঝার জন্য এর বিবর্তনীয় অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো হাঁস, বিভার বা সরীসৃপের মিশ্র প্রাণী নয়। আধুনিক প্রাণীদের দেহের অংশ জুড়ে দিয়ে এটি তৈরি হয়নি। বরং স্তন্যপায়ীদের বিবর্তনীয় ইতিহাসের অনেক গভীরে এর বংশের শিকড় রয়েছে। স্তন্যপায়ীদের প্রধান শাখাগুলো বহু কোটি বছর আগে একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে নিজস্ব পথে বিবর্তিত হয়েছে। প্লাটিপাস সেই দীর্ঘ স্বাধীন বিবর্তনের ফল।

এ কারণেই এর শরীরে এমন বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ দেখা যায়, যা মানুষের কাছে পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয়। আমরা বর্তমানের অধিকাংশ স্তন্যপায়ী দেখে স্তন্যপায়ীর একটি পরিচিত ছক তৈরি করেছি—লোম থাকবে, জীবন্ত সন্তান জন্ম দেবে এবং স্তনবৃন্ত থেকে দুধ খাওয়াবে। প্লাটিপাস দেখায় যে স্তন্যপায়ীর বিবর্তন কখনোই এত সরল ছিল না। দুধ উৎপাদন স্তন্যপায়ীদের অত্যন্ত প্রাচীন বৈশিষ্ট্য হলেও জীবন্ত সন্তান প্রসব সব স্তন্যপায়ীর জন্য অপরিহার্য নয়।

প্লাটিপাসের যৌন নির্ধারণ ব্যবস্থাও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। মানুষের ক্ষেত্রে যৌন নির্ধারণে সাধারণত এক জোড়া বিশেষ ক্রোমোজোমের কথা বলা হয়। প্লাটিপাসের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা অনেক বেশি জটিল এবং একাধিক যৌন ক্রোমোজোম এতে যুক্ত। এই অস্বাভাবিক বিন্যাস স্তন্যপায়ীদের যৌন ক্রোমোজোম কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে, সেই ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।

এর দেহের আরেকটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। বিশেষ ধরনের অতিবেগুনি আলোয় প্লাটিপাসের লোম থেকে দৃশ্যমান আলোক বিচ্ছুরণের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর প্রকৃত জৈবিক ভূমিকা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এটি যোগাযোগ, ছদ্মবেশ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট অভিযোজনের অংশ কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তাই প্লাটিপাসকে ঘিরে বৈজ্ঞানিক বিস্ময়ের পাশাপাশি এখনো অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে।

প্লাটিপাস যখন প্রথম ইউরোপীয় প্রকৃতিবিদদের নজরে আসে, তখন প্রাণীটির চেহারা এতটাই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল যে সংরক্ষিত নমুনা দেখে কেউ কেউ সন্দেহ করেছিলেন এটি হয়তো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে। হাঁসের মতো ঠোঁট একটি লোমশ স্তন্যপায়ীর শরীরে বসানো হয়েছে কি না, এমন সন্দেহও তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে, প্রকৃতি সত্যিই এমন প্রাণী সৃষ্টি করেছে। বরং মানুষের পরিচিত প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাই প্লাটিপাসকে প্রথমে অসম্ভব বলে মনে করিয়েছিল।

আজ প্লাটিপাস বিজ্ঞানীদের কাছে বিবর্তনের কোনো ভুল কিংবা অসম্পূর্ণ প্রাণী নয়। বরং এটি অত্যন্ত সফল বিশেষায়িত স্তন্যপায়ী, যার প্রতিটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের পেছনে পরিবেশগত বা বিবর্তনীয় ইতিহাস রয়েছে। হাঁসের মতো দেখতে ঠোঁট আসলে পানির নিচে শিকার শনাক্ত করার সূক্ষ্ম সংবেদনযন্ত্র। জালযুক্ত পা দক্ষ সাঁতারের জন্য অভিযোজিত। ঘন লোম ঠান্ডা পানিতে শরীর উষ্ণ রাখে। চ্যাপ্টা লেজ শক্তি সঞ্চয় ও চলাচলে সহায়তা করে। ডিম পাড়া প্রাচীন স্তন্যপায়ী বংশের উত্তরাধিকার, আর দুধ উৎপাদন তাকে নিঃসন্দেহে স্তন্যপায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

পুরুষের বিষাক্ত কাঁটা আবার দেখায় যে স্তন্যপায়ীদের প্রতিরক্ষা ও প্রতিযোগিতার কৌশলও আমাদের পরিচিত ধারণার তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হতে পারে। বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করার ক্ষমতা প্রমাণ করে, পৃথিবীকে অনুভব করার জন্য দৃষ্টি, শ্রবণ, গন্ধ, স্বাদ ও স্পর্শের পরিচিত জগতের বাইরেও প্রাণীরা অসাধারণ সংবেদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে প্লাটিপাসের অদ্ভুতত্ব আসলে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই প্রাণীর মধ্যে ডিম পাড়া, দুধ উৎপাদন, বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করা, বিষ ব্যবহার, পানির নিচে বিশেষায়িত শিকার, জালযুক্ত পা, ঘন জলরোধী লোম এবং অস্বাভাবিক ক্রোমোজোম ব্যবস্থা—এসবের সমাবেশই তাকে প্রাণিজগতের অন্যতম বিস্ময় করে তুলেছে। প্লাটিপাস যেন জীবন্ত অবস্থায় সংরক্ষিত কোনো প্রাচীন প্রাণী নয়, বরং কোটি কোটি বছরের পরিবর্তন, বিচ্ছিন্নতা ও অভিযোজনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক ও অত্যন্ত বিশেষায়িত স্তন্যপায়ী।

এই প্রাণী আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রকৃতিকে মানুষের তৈরি শ্রেণিবিন্যাসের সহজ বাক্সে সব সময় আটকে রাখা যায় না। আমরা হাঁসের ঠোঁট দেখি, বিভারের মতো লেজ দেখি, ডিম দেখি, বিষাক্ত কাঁটা দেখি এবং স্তন্যপায়ীর লোম ও দুধ দেখি—তাই প্রাণীটিকে বিচিত্র মনে হয়। কিন্তু প্লাটিপাসের নিজের বিবর্তনীয় ইতিহাসে এসবের কোনো বিরোধ নেই। প্রতিটি বৈশিষ্ট্য তার পূর্বপুরুষ, পরিবেশ এবং বেঁচে থাকার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। তাই প্লাটিপাসকে যত গভীরভাবে জানা যায়, ততই বোঝা যায়—প্রকৃতির সবচেয়ে আশ্চর্য সৃষ্টি অনেক সময় সেই প্রাণী, যে আমাদের শেখানো সাধারণ নিয়মগুলোকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।


You may also like