বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বাদুড় অন্ধ নয়—অন্ধকারে প্রতিধ্বনির সাহায্যে তারা পথ খুঁজে পায় কীভাবে?

  • Author: Admin
  • September 03, 2026
বাদুড় অন্ধ নয়—অন্ধকারে প্রতিধ্বনির সাহায্যে তারা পথ খুঁজে পায় কীভাবে?
প্রতিধ্বনি শুনেই অন্ধকারের মানচিত্র তৈরি করে বাদুড়

“বাদুড় অন্ধ”—কথাটি এত বেশি প্রচলিত যে অনেকেই একে বৈজ্ঞানিক সত্য বলে ধরে নেন। অথচ বাস্তবতা ঠিক উল্টো। বাদুড়ের চোখ আছে, তারা দেখতে পায় এবং অনেক প্রজাতির বাদুড়ের দৃষ্টিশক্তি রাতের পরিবেশে যথেষ্ট কার্যকর। অন্ধকারে তাদের অসাধারণ চলাচলের রহস্য চোখ না থাকা বা চোখ অকেজো হয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়। বরং তাদের বিশেষ ক্ষমতার মূল হলো দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে অত্যন্ত উন্নত শ্রবণব্যবস্থা, প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে পরিবেশ বোঝার কৌশল, স্থানিক স্মৃতি এবং দ্রুত স্নায়বিক বিশ্লেষণের সমন্বয়।

রাতের আকাশে একটি ছোট বাদুড়কে উড়তে দেখলে তার কাজটি কত কঠিন, তা সহজে বোঝা যায় না। তাকে দ্রুতগতিতে উড়তে হয়, গাছের ডাল এড়াতে হয়, দেয়াল বা পাথরের সঙ্গে সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে হয়, একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উড়ন্ত পতঙ্গ শনাক্ত করতে হয়। কখনো সম্পূর্ণ অন্ধকার গুহার মধ্যেও তাকে একই কাজ করতে হয়। মানুষের চোখ যেখানে প্রায় কোনো কার্যকর তথ্যই সংগ্রহ করতে পারে না, সেখানে অনেক বাদুড় শব্দের সাহায্যে চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধারণা তৈরি করতে পারে।

এই ক্ষমতার ভিত্তি হলো প্রতিধ্বনি নির্ভর অবস্থান নির্ণয়। বাদুড় খুব উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে এবং সেই শব্দ আশপাশের বস্তুতে আঘাত করে ফিরে এলে তার প্রতিধ্বনি শোনে। মূল শব্দ বের হওয়া এবং প্রতিধ্বনি ফিরে আসার মধ্যবর্তী সময়, শব্দের তীব্রতার পরিবর্তন, কম্পাঙ্কের পরিবর্তন এবং দুই কানে পৌঁছানোর সূক্ষ্ম সময়গত পার্থক্য বিশ্লেষণ করে বাদুড় বুঝতে পারে সামনে কী রয়েছে এবং সেটি কোথায় রয়েছে।

মানুষের শ্রবণসীমার ঊর্ধ্বে থাকা শব্দকে সাধারণভাবে অতিশব্দ বলা হয়। মানুষের শ্রবণক্ষমতা সাধারণত প্রায় বিশ হাজার হার্টজ পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও বহু বাদুড় এর চেয়ে অনেক বেশি কম্পাঙ্কের শব্দ ব্যবহার করতে পারে। প্রজাতিভেদে তাদের ব্যবহৃত কম্পাঙ্কের পরিসর ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। ফলে একটি বাদুড় আমাদের চারপাশে অসংখ্য তীক্ষ্ণ শব্দসংকেত পাঠালেও আমরা সাধারণত সেগুলো শুনতে পাই না।

এই শব্দ সব বাদুড় একইভাবে তৈরি করে না। অনেক প্রজাতি মুখ দিয়ে শব্দ বের করে, আবার কিছু প্রজাতি নাকের বিশেষ গঠনের মাধ্যমে শব্দ ছড়ায়। নাক দিয়ে প্রতিধ্বনি নির্ভর সংকেত পাঠানো কিছু বাদুড়ের মুখমণ্ডলে জটিল পাতার মতো মাংসল গঠন দেখা যায়। এগুলোকে শুধু অদ্ভুত বাহ্যিক সৌন্দর্য ভাবলে ভুল হবে; নির্দিষ্ট প্রজাতিতে এসব গঠন শব্দকে কাঙ্ক্ষিত দিকে ছড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ধরা যাক, একটি বাদুড়ের সামনে একটি পোকা উড়ছে। বাদুড় একটি শব্দসংকেত পাঠাল। শব্দটি বাতাসের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে পোকার শরীরে আঘাত করল এবং তার সামান্য অংশ প্রতিফলিত হয়ে বাদুড়ের দিকে ফিরে এল। বাদুড়ের মস্তিষ্ক জানে কখন শব্দটি পাঠানো হয়েছিল এবং কখন তার প্রতিধ্বনি ফিরে এসেছে। শব্দের গতি জানা থাকায় এই সময়ের ব্যবধান থেকে শিকারের দূরত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত দ্রুত ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বিষয়টি শুধু দূরত্ব নির্ণয়েই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিধ্বনি কোন দিক থেকে আসছে, সেটিও বাদুড় শনাক্ত করতে পারে। একটি প্রতিধ্বনি দুই কানে পৌঁছাতে অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময়ের ব্যবধান হতে পারে। শব্দের তীব্রতাতেও দুই কানের মধ্যে সামান্য পার্থক্য তৈরি হয়। বাদুড়ের শ্রবণব্যবস্থা এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণ করে বস্তুটি ডানে, বামে, ওপরে বা নিচে কোথায় রয়েছে তার ধারণা তৈরি করতে পারে।

অনেক বাদুড়ের বড় ও জটিল আকৃতির কান তাই কেবল বেশি শব্দ শোনার জন্য নয়। কানের বাইরের অংশ বিভিন্ন দিক থেকে আসা শব্দ গ্রহণ এবং তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। প্রতিধ্বনি কোন উচ্চতা বা দিক থেকে এসেছে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও কানের গঠন সহায়ক হতে পারে। কিছু প্রজাতির কানের আকৃতি এতটাই বিশেষায়িত যে তা তাদের শিকারের ধরন ও বাসস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

শিকার যদি স্থির না থেকে উড়তে থাকে, তখন কাজটি আরও জটিল হয়। চলমান পতঙ্গ থেকে প্রতিফলিত শব্দে কম্পাঙ্কের পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে কিছু বাদুড় শিকারটি নিজের তুলনায় কীভাবে চলাচল করছে সে সম্পর্কে তথ্য পায়। অর্থাৎ বাদুড় শুধু “সামনে কিছু আছে” বুঝছে না; বরং বস্তুটির অবস্থান, গতিবিধি এবং কখনো তার প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা তৈরি করছে।

প্রতিধ্বনির বৈশিষ্ট্য থেকে বস্তুর আকার ও পৃষ্ঠ সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়। বড় পাথর, পাতলা ডাল, গাছের পাতা, পানির পৃষ্ঠ এবং একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ একই ধরনের প্রতিধ্বনি তৈরি করে না। শব্দ বিভিন্ন পৃষ্ঠ থেকে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত ও ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে বাদুড়ের শ্রবণ ও স্নায়ুতন্ত্র এসব পার্থক্য বিশ্লেষণে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখা যায় বাদুড় যখন কোনো শিকারের খুব কাছে পৌঁছে যায়। দূরে থাকা অবস্থায় তুলনামূলক বিরতিতে শব্দসংকেত পাঠালেও শিকারের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রজাতি দ্রুততর হারে সংকেত পাঠাতে শুরু করে। শেষ মুহূর্তে সংকেতের হার এত বেড়ে যেতে পারে যে পরপর অত্যন্ত দ্রুত শব্দ উৎপন্ন হয়। এর ফলে বাদুড় শিকারের অবস্থান সম্পর্কে ঘন ঘন নতুন তথ্য পায় এবং শেষ মুহূর্তে উড়ানের গতিপথ সংশোধন করতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—বাদুড় নিজেই যদি এত তীব্র শব্দ তৈরি করে, তবে নিজের শব্দে তার শ্রবণব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না কেন? এর উত্তরও তাদের বিশেষায়িত শারীরবৃত্তে লুকিয়ে আছে। শব্দ উৎপাদন, কান এবং শ্রবণসংক্রান্ত স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সমন্বিত থাকে। নিজের সংকেত পাঠানো এবং ফিরে আসা দুর্বল প্রতিধ্বনি গ্রহণের মধ্যকার সময়গত পার্থক্য কাজে লাগিয়ে শ্রবণব্যবস্থা প্রয়োজনীয় তথ্য আলাদা করতে পারে।

আরও বড় সমস্যা হলো পরিবেশের অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় প্রতিধ্বনি। একটি গুহায় শব্দ পাঠালে শুধু কাঙ্ক্ষিত পোকা থেকেই প্রতিধ্বনি ফিরে আসে না। ছাদ, দেয়াল, পাথর এবং আশপাশের অন্যান্য বস্তু থেকেও প্রতিফলিত শব্দ আসে। জঙ্গলে একই সঙ্গে পাতা, ডালপালা ও অসংখ্য বস্তু শব্দ প্রতিফলিত করে। এই জটিল শব্দজগতের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত শনাক্ত করা বাদুড়ের মস্তিষ্কের অন্যতম অসাধারণ কাজ।

বাদুড়ের মস্তিষ্ক এই তথ্যগুলোকে মানুষের চোখে দেখা ছবির মতো কোনো দৃশ্য বানায়—এভাবে বলা পুরোপুরি যথাযথ নয়। বরং বলা ভালো, শব্দের মাধ্যমে সে চারপাশের একটি অত্যন্ত কার্যকর স্থানিক ধারণা তৈরি করে। কোন দিকে খোলা জায়গা, কোথায় বাধা, কোন বস্তু নড়ছে, শিকার কত দূরে এবং তার দিকে কীভাবে এগোতে হবে—এসব তথ্য দ্রুত স্নায়বিক প্রক্রিয়ায় একত্রিত হয়। এর ভিত্তিতেই মুহূর্তের মধ্যে ডানার নড়াচড়া পরিবর্তিত হয়।

তবে এখানেই “বাদুড় অন্ধ” ধারণাটির সবচেয়ে বড় ভুল ধরা পড়ে। বাদুড় প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে বলে তার চোখের প্রয়োজন নেই—এমন নয়। বিভিন্ন প্রজাতির দৃষ্টিশক্তিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। বহু বাদুড় কম আলোতে কার্যকরভাবে দেখতে পারে। বিশেষ করে যেসব বাদুড় ফল, ফুলের মধু বা অন্য উদ্ভিজ্জ খাদ্যের ওপর নির্ভর করে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি পরিবেশ শনাক্ত ও খাদ্য খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিছু ফলখেকো বাদুড়ের চোখ তুলনামূলক বড়। তারা সন্ধ্যার আলো, চাঁদের আলো এবং রাতের স্বল্প আলো ব্যবহার করে গাছ, বনভূমি ও দূরের ভূদৃশ্য চিনতে পারে। কিছু প্রজাতি রং সম্পর্কিত তথ্যও গ্রহণ করতে সক্ষম। ফলে সব বাদুড়কে একই ধরনের ইন্দ্রিয়ব্যবস্থার প্রাণী হিসেবে দেখাও বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল।

প্রতিধ্বনি নির্ভর অবস্থান নির্ণয় বিশেষভাবে কার্যকর হয় খুব কাছের বস্তু শনাক্ত করতে। অন্যদিকে দৃষ্টিশক্তি তুলনামূলক দূরের ভূদৃশ্য, আকাশের আলো, দিগন্ত এবং বড় স্থানিক বৈশিষ্ট্য বোঝাতে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ চোখ ও কান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবস্থা নয়; পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা একে অপরকে সম্পূরক করতে পারে।

এ কারণেই বাদুড়ের রাতের চলাচলকে শুধু “শব্দ দিয়ে দেখা” বললে বিষয়টি অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে তারা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় থেকে পাওয়া তথ্য একত্রিত করে। দৃষ্টি, শ্রবণ, শরীরের ভারসাম্যবোধ এবং পূর্বপরিচিত স্থানের স্মৃতি—সব মিলিয়ে একটি কার্যকর দিকনির্দেশ ব্যবস্থা তৈরি হয়। কিছু প্রজাতির দীর্ঘ দূরত্বের চলাচলে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সংকেত ব্যবহারের প্রমাণও গবেষণায় পাওয়া গেছে।

স্থানিক স্মৃতিও বাদুড়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একই গুহা থেকে বেরিয়ে একই এলাকার খাদ্যস্থলে যাওয়া বাদুড়কে প্রতিটি মুহূর্তে সম্পূর্ণ নতুন করে পৃথিবী আবিষ্কার করতে হয় না। পরিচিত গাছ, পথ, আশ্রয় এবং খাদ্যসমৃদ্ধ এলাকা সম্পর্কে তাদের স্মৃতি থাকতে পারে। প্রতিধ্বনি তখন চলমান অবস্থায় তাৎক্ষণিক বাধা ও শিকারের অবস্থান নির্ণয়ে বিশেষভাবে কার্যকর হয়।

অন্ধকার গুহার ভেতরে এই ব্যবস্থা আরও নাটকীয়ভাবে কাজ করে। সেখানে কার্যকর আলো প্রায় নেই। গুহার ছাদ থেকে হাজার হাজার বাদুড় একসঙ্গে বের হলে প্রত্যেকের শব্দ ও প্রতিধ্বনি মিলিয়ে অত্যন্ত জটিল শব্দপরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবু তারা সেই পরিবেশে চলাচল করতে সক্ষম। তবে অন্য বাদুড়ের সংকেতের কারণে হস্তক্ষেপের সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং বিভিন্ন প্রজাতি বা পরিস্থিতিতে তা সামলানোর কৌশলও ভিন্ন হতে পারে।

সব বাদুড় আবার প্রতিধ্বনি নির্ভর অবস্থান নির্ণয়ের ওপর সমানভাবে নির্ভরশীল নয়। পৃথিবীতে বাদুড়ের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বিপুল। তাদের খাদ্যাভ্যাসও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কেউ পতঙ্গ খায়, কেউ ফল, কেউ ফুলের মধু, কেউ মাছ বা ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণী শিকার করে। এই খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের সঙ্গে তাদের ইন্দ্রিয়ব্যবস্থার বিশেষায়নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

পতঙ্গভুক বাদুড়ের ক্ষেত্রে প্রতিধ্বনি নির্ভর শিকার কৌশল বিশেষভাবে বিস্ময়কর। রাতের আকাশে কয়েক মিলিমিটার বা কয়েক সেন্টিমিটার আকারের একটি পতঙ্গ দ্রুত দিক পরিবর্তন করছে। বাদুড় নিজেও উড়ছে। ফলে তাকে নিজের গতিবেগ, শিকারের গতিবেগ, দূরত্ব এবং দিকের পরিবর্তন ক্রমাগত হিসাব করতে হয়। মস্তিষ্ক ও পেশির এই সমন্বয় এত দ্রুত ঘটে যে মানুষের সচেতন গণনার সঙ্গে এর তুলনা চলে না।

শিকারও অবশ্য সম্পূর্ণ অসহায় নয়। দীর্ঘ বিবর্তনীয় প্রতিযোগিতায় কিছু পতঙ্গ বাদুড়ের অতিশব্দ শনাক্ত করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। বাদুড়ের সংকেত বুঝতে পারলে তারা হঠাৎ দিক পরিবর্তন, নিচে পড়ে যাওয়া বা অন্য ধরনের পালানোর আচরণ করতে পারে। কিছু পতঙ্গ আবার নিজেরাও শব্দ তৈরি করে বাদুড়কে বিভ্রান্ত করা বা আক্রমণ নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করে। ফলে রাতের আকাশে বাদুড় ও পতঙ্গের মধ্যে চলতে থাকা শিকারি-শিকারের সম্পর্ক আসলে এক জটিল বিবর্তনীয় প্রতিযোগিতা।

বাদুড়ের ডানাও এই ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। পাখির পালকের ডানার পরিবর্তে বাদুড়ের ডানা মূলত দীর্ঘায়িত আঙুলের হাড়ের ওপর বিস্তৃত পাতলা ঝিল্লি দিয়ে তৈরি। এই নমনীয় ডানা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আকার পরিবর্তন করতে পারে। প্রতিধ্বনি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাদুড় মুহূর্তের মধ্যে ডানার অবস্থান বদলে তীক্ষ্ণ বাঁক নিতে, গতি কমাতে বা শিকারের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

বাদুড়ের শরীরে স্পর্শসংবেদনও গুরুত্বপূর্ণ। ডানার ঝিল্লিতে থাকা সংবেদনশীল গঠন বাতাসের প্রবাহ এবং ডানার ওপর তৈরি হওয়া পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। ফলে উড়ান নিয়ন্ত্রণ শুধু কান থেকে পাওয়া প্রতিধ্বনির ওপর নির্ভর করে না। বাদুড়ের মস্তিষ্ক একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সংবেদনশীল তথ্য সমন্বয় করে উড়ানের সিদ্ধান্ত নেয়।

আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, বাদুড় মানুষের চুলে এসে জড়িয়ে যায় কারণ তারা দেখতে পায় না। বাস্তবে বাদুড়ের সূক্ষ্ম প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করার ক্ষমতা এত উন্নত যে সাধারণ পরিস্থিতিতে মানুষের মাথা তাদের কাছে বিশাল একটি সহজে শনাক্তযোগ্য বাধা। কোনো বাদুড় মানুষের খুব কাছে দিয়ে উড়ে গেলে সেটি আশপাশের পতঙ্গ ধরতে, নিরাপদ পথ অনুসরণ করতে অথবা হঠাৎ পরিস্থিতির পরিবর্তনে দিক বদলাতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের চুলে ঢুকে পড়া তাদের স্বাভাবিক আচরণ নয়।

মানুষ বাদুড়ের প্রতিধ্বনি নির্ভর অবস্থান নির্ণয়ের ধারণা থেকে প্রযুক্তিগতভাবেও অনুপ্রাণিত হয়েছে। শব্দ পাঠিয়ে তার প্রতিফলন বিশ্লেষণ করে দূরের বস্তু বা পানির নিচের কাঠামো শনাক্ত করার নীতির সঙ্গে বাদুড়ের প্রাকৃতিক ব্যবস্থার মৌলিক মিল রয়েছে। তবে জীবন্ত বাদুড়ের ব্যবস্থা অত্যন্ত ক্ষুদ্র শরীরের মধ্যে কাজ করে এবং একই সঙ্গে শব্দ উৎপাদন, প্রতিধ্বনি গ্রহণ, স্নায়বিক বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিক উড়ান নিয়ন্ত্রণ সম্পন্ন করে।

প্রকৃতিতে বাদুড়ের এই দক্ষতার গুরুত্ব শুধু তাদের নিজেদের বেঁচে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অসংখ্য পতঙ্গভুক বাদুড় রাতে বিপুল পরিমাণ পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ফলখেকো বাদুড় বীজ ছড়াতে সাহায্য করে এবং ফুলের মধু খাওয়া অনেক বাদুড় পরাগায়নে অংশ নেয়। অর্থাৎ রাতের আকাশে যে প্রাণীটিকে মানুষ কখনো রহস্যময় বা ভয়ের প্রতীক হিসেবে দেখে, বাস্তবে সেটি বহু বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাদুড়ের বিবর্তন আমাদের আরও একটি গভীর বিষয় শেখায়। কোনো প্রাণীর একটি ইন্দ্রিয় বিশেষভাবে উন্নত হলেই অন্য ইন্দ্রিয়টি অকার্যকর—এমন ধারণা ঠিক নয়। বাদুড় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাদের চোখ কাজ করে, কান অসাধারণ সূক্ষ্ম শব্দ বিশ্লেষণ করতে পারে, মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুত স্থানিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে এবং ডানা সেই তথ্যের ভিত্তিতে মুহূর্তের মধ্যে গতিপথ বদলাতে পারে।

তাই পরেরবার রাতের আকাশে কোনো বাদুড়কে দ্রুত উড়ে যেতে দেখলে তাকে অন্ধকারে দিশেহারা কোনো প্রাণী ভাবার কারণ নেই। তার চোখ হয়তো রাতের আলো দেখছে, কান শুনছে আমাদের শ্রবণসীমার বাইরের সংকেতের ফিরে আসা প্রতিধ্বনি, মস্তিষ্ক সেই প্রতিধ্বনি থেকে দূরত্ব ও দিক নির্ণয় করছে, আর স্মৃতি পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে নতুন তথ্য মিলিয়ে নিচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে ঠিক করে ফেলছে কোথায় বাঁক নিতে হবে, কোন বাধা এড়াতে হবে এবং কোথায় তার পরবর্তী শিকারটি উড়ছে।

বাদুড় তাই অন্ধকারকে মানুষের মতো দেখে না বলেই অন্ধ নয়। বরং বিবর্তন তাকে এমন এক অতিরিক্ত তথ্যব্যবস্থা দিয়েছে, যার সাহায্যে আলো প্রায় অনুপস্থিত হলেও চারপাশের জগত সম্পর্কে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধারণা তৈরি করা সম্ভব। আমাদের কাছে যেখানে অন্ধকার মানে তথ্যের অভাব, একটি প্রতিধ্বনি নির্ভর বাদুড়ের কাছে সেই একই রাত ভরে থাকে শব্দ, প্রতিফলন, দূরত্ব, গতি ও দিকের সংকেতে। অন্ধকার তার জন্য শূন্যতা নয়—বরং প্রতিধ্বনিতে আঁকা এক জীবন্ত মানচিত্র।


You may also like