রুশ বিপ্লব ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: জারের পতন, বলশেভিকদের উত্থান ও ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তিতে রাশিয়ার যুদ্ধত্যাগ
Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
- Author: Admin
- September 02, 2026
রুশ বিপ্লব ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় রুশ সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্রগুলোর একটি এবং জনসংখ্যার বিচারে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের সরকার যুদ্ধকে জাতীয় ঐক্যের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল এবং ১৯১৪ সালে বহু রুশ নাগরিকও দেশরক্ষার আবেগে যুদ্ধকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু মাত্র তিন বছরের মধ্যে সেই যুদ্ধই সাম্রাজ্যের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতাকে এমনভাবে উন্মোচিত করে যে ১৯১৭ সালে তিন শতাব্দীর রোমানভ শাসনের পতন ঘটে, বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে এবং ১৯১৮ সালের ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যায়।
রাশিয়ার বিপর্যয়ের সূচনা যুদ্ধের প্রথম বছরেই দৃশ্যমান ছিল। বিশাল জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর সংগঠন, রেলপথ, অস্ত্র সরবরাহ এবং যোগাযোগব্যবস্থা জার্মানির তুলনায় দুর্বল ছিল। ১৯১৪ সালের ট্যানেনবার্গের যুদ্ধে রুশ দ্বিতীয় সেনাবাহিনীর ধ্বংস সামরিক নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রকাশ করে। যদিও গ্যালিসিয়ায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে রাশিয়া সাফল্য পেয়েছিল, তবু পূর্ব রণাঙ্গনে যুদ্ধ ক্রমে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সংঘাতে পরিণত হয়।
১৯১৫ সালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির গর্লিৎসে-টারনভ আক্রমণের পর রুশ বাহিনী বিশাল পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া এবং পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড কেন্দ্রীয় শক্তির হাতে চলে যায়। এই পশ্চাদপসরণের সময় বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিহত, আহত বা বন্দি হয় এবং লক্ষ লক্ষ বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
রুশ সেনাবাহিনীর সরবরাহসংকট কখনো এত তীব্র হয়েছিল যে নতুন সৈন্যদের পর্যাপ্ত রাইফেল দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও ১৯১৬ নাগাদ অস্ত্র উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, প্রথম দুই বছরের অভিজ্ঞতা সেনাদের মনোবলে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের জনশক্তি ছিল বিপুল, কিন্তু সেই মানুষকে কার্যকর আধুনিক সেনাবাহিনীতে পরিণত করার প্রশাসনিক সক্ষমতা ছিল সীমিত।
১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জার দ্বিতীয় নিকোলাস একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়। তিনি সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব নিজ হাতে নেন এবং রাজধানী ছেড়ে সামরিক সদর দপ্তরে অবস্থান শুরু করেন। এর ফলে সামরিক সাফল্যের কৃতিত্ব যেমন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হতে পারত, তেমনি পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির দায়ও সরাসরি জারের ওপর এসে পড়ে।
রাজধানী পেত্রোগ্রাদে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রা এবং রহস্যময় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব গ্রিগরি রাসপুতিনের প্রভাব নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও গুজব বাড়তে থাকে। আলেকজান্দ্রা জার্মান বংশোদ্ভূত হওয়ায় যুদ্ধের সময় তাঁর প্রতি অবিশ্বাস আরও তীব্র হয়। রাসপুতিনের রাজপরিবারের ওপর প্রভাব নিয়ে সংবাদ, গুজব এবং রাজনৈতিক প্রচারণা রাজতন্ত্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
কিন্তু জারতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু কোনো ব্যক্তি নয়—দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ। রাশিয়ার কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়নি, কিন্তু পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছিল। রেলপথকে সামরিক পরিবহনে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শহরে খাদ্য ও জ্বালানি পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছিল। মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়ে এবং শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে যায়।
পেত্রোগ্রাদের মতো শিল্পশহরে মানুষের দীর্ঘ খাদ্যের সারি সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়। শীতের মধ্যে কয়লা ও রুটির ঘাটতি জনঅসন্তোষ বাড়ায়। কারখানার শ্রমিকদের ওপর কাজের চাপ বেড়েছিল, অথচ তাদের জীবনযাত্রার মান কমছিল। একই সময়ে গ্রামের অসংখ্য পরিবার যুদ্ধক্ষেত্রে পুত্র, স্বামী বা ভাই হারাচ্ছিল।
১৯১৬ সালের ব্রুসিলভ আক্রমণ রুশ সেনাবাহিনীর শেষ বড় সামরিক সাফল্যগুলোর একটি হলেও যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ থামাতে পারেনি। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ওপর বিশাল ক্ষতি চাপানো হয়েছিল, কিন্তু রাশিয়ার নিজের হতাহতের সংখ্যাও ছিল বিপুল। দেশের জন্য প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—আর কত দিন এবং কী উদ্দেশ্যে এই যুদ্ধ চালানো হবে?
১৯১৭ সালের শুরুতে পরিস্থিতি বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত ছিল। মার্চের শুরুতে, রাশিয়ায় ব্যবহৃত তৎকালীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে, পেত্রোগ্রাদে খাদ্যসংকট ও শ্রমিক অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। এ কারণেই ঘটনাটি ইতিহাসে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত, যদিও আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এটি মার্চ মাসে ঘটেছিল।
৮ মার্চ ১৯১৭ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পেত্রোগ্রাদের বহু নারী শ্রমিক রুটি ও শান্তির দাবিতে রাস্তায় নামে। দ্রুত শিল্পশ্রমিকদের ধর্মঘট এবং বৃহত্তর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এতে যুক্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যে লক্ষাধিক মানুষ রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসে।
জার সরকার সেনাবাহিনীকে বিক্ষোভ দমনের নির্দেশ দেয়। প্রথমদিকে গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটে। কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক পরিবর্তন আসে যখন পেত্রোগ্রাদ গ্যারিসনের সৈন্যরা বিদ্রোহ করে এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়। যে সেনাবাহিনীর ওপর জার শাসন রক্ষার জন্য নির্ভর করছিলেন, রাজধানীতে তারই একটি বড় অংশ সরকারের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে।
এই মুহূর্তে রাজতন্ত্র কার্যত নিয়ন্ত্রণ হারায়। রাশিয়ার আইনসভা ডুমার নেতারা একটি অস্থায়ী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে শ্রমিক ও সৈন্য প্রতিনিধিদের পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বিপ্লবের পর রাশিয়ায় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাকে প্রায়ই দ্বৈত ক্ষমতা বলা হয়—একদিকে অস্থায়ী সরকার, অন্যদিকে সোভিয়েত।
১৫ মার্চ ১৯১৭ জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন। তাঁর ভাই গ্র্যান্ড ডিউক মিখাইলও পরের দিন কার্যত মুকুট গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। এর মাধ্যমে ১৬১৩ সাল থেকে রাশিয়া শাসন করা রোমানভ রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে।
কিন্তু জারের পতন রাশিয়াকে যুদ্ধ থেকে বের করে দেয়নি। এটিই পরবর্তী বিপ্লবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্থায়ী সরকারের নেতারা জারতন্ত্রের অবসান ঘটালেও ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পাশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, রাশিয়া যুদ্ধ থেকে সরে গেলে আন্তর্জাতিক মর্যাদা, মিত্রদের আস্থা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধোত্তর সুবিধা হারাবে।
সাধারণ সৈন্য ও শ্রমিকের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত ক্রমে অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা দুর্বল হচ্ছিল। সৈন্য কমিটি গড়ে উঠছিল এবং অফিসারদের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। অনেক সৈন্য যুদ্ধ শেষ করে বাড়িতে ফিরে জমির প্রশ্ন সমাধান করতে চাইছিল।
এই সময় রুশ রাজনীতিতে নাটকীয়ভাবে ফিরে আসেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। তিনি নির্বাসনে সুইজারল্যান্ডে ছিলেন। জার্মান কর্তৃপক্ষ তাঁকে এবং অন্য কয়েকজন বিপ্লবীকে জার্মান ভূখণ্ড অতিক্রম করে রাশিয়ায় ফিরতে দেয়, কারণ বার্লিন আশা করেছিল রুশ বিপ্লবীরা যুদ্ধবিরোধী অস্থিরতা বাড়িয়ে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতা দুর্বল করবে।
এপ্রিল ১৯১৭-তে পেত্রোগ্রাদে ফিরে লেনিন তাঁর বিখ্যাত এপ্রিল থিসিস উপস্থাপন করেন। তিনি অস্থায়ী সরকারকে সমর্থন প্রত্যাখ্যান করেন, যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী সংঘাত হিসেবে নিন্দা করেন এবং ক্ষমতা সোভিয়েতগুলোর হাতে দেওয়ার আহ্বান জানান। বলশেভিকদের রাজনৈতিক বার্তার কেন্দ্রে আসে “শান্তি, জমি ও রুটি”—যুদ্ধক্লান্ত সমাজে যা দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে।
তবু ১৯১৭ সালের বসন্তেই বলশেভিকরা ক্ষমতা দখলের অবস্থানে ছিল না। অস্থায়ী সরকারের প্রতি এখনও উল্লেখযোগ্য সমর্থন ছিল এবং সোভিয়েতের মধ্যেও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ও মেনশেভিকদের প্রভাব শক্তিশালী ছিল। পরিস্থিতি বদলায় যখন সরকার আবার সামরিক আক্রমণের চেষ্টা করে।
জুনের শেষ ও জুলাইয়ে যুদ্ধমন্ত্রী আলেকজান্ডার কেরেনস্কির নামে পরিচিত রুশ আক্রমণ পূর্ব রণাঙ্গনে শুরু হয়। প্রথমদিকে কিছু অগ্রগতি হলেও দ্রুত অভিযান ভেঙে পড়ে। সৈন্যদের মনোবল দুর্বল ছিল এবং কেন্দ্রীয় শক্তির পাল্টা আক্রমণে রুশ বাহিনী পশ্চাদপসরণ করে।
কেরেনস্কি আক্রমণের ব্যর্থতা অস্থায়ী সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় হয়ে ওঠে। জনগণকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে যে সামরিক সাফল্যের আশা দেখানো হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং নতুন হতাহতের খবর রাজধানীতে ক্ষোভ বাড়ায়।
জুলাই মাসে পেত্রোগ্রাদে সশস্ত্র শ্রমিক ও সৈন্যদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘটে, যা জুলাই ডেজ নামে পরিচিত। সরকার আন্দোলন দমন করে এবং বলশেভিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। লেনিন আত্মগোপনে চলে যান। সাময়িকভাবে মনে হয়েছিল বলশেভিকদের উত্থান থেমে গেছে।
কিন্তু সেপ্টেম্বরে ঘটে কর্নিলভ ঘটনা। রুশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল লাভর কর্নিলভের বাহিনী পেত্রোগ্রাদের দিকে এগোতে শুরু করলে প্রধানমন্ত্রী কেরেনস্কি এটিকে সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে দেখেন। সরকার শহর রক্ষায় বলশেভিকসহ শ্রমিক ও সোভিয়েতের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে।
সংকট শেষ পর্যন্ত বড় সংঘর্ষ ছাড়াই থেমে গেলেও রাজনৈতিক বিজয়ী হয় বলশেভিকরা। তারা নিজেদের বিপ্লব ও রাজধানীর রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয় এবং শ্রমিক ও সৈন্যদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সেপ্টেম্বর নাগাদ পেত্রোগ্রাদ ও মস্কোর সোভিয়েতে বলশেভিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
অক্টোবর নাগাদ লেনিন সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ক্ষমতা দখলের সময় এসেছে। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ নভেম্বর ১৯১৭, কিন্তু পুরোনো রুশ ক্যালেন্ডারে ২৫ অক্টোবর, বলশেভিক নেতৃত্বাধীন রেড গার্ড, বিপ্লবী সৈন্য ও নাবিকরা পেত্রোগ্রাদের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র, সেতু এবং সরকারি স্থাপনা দখল করতে শুরু করে।
অস্থায়ী সরকারের সদস্যরা উইন্টার প্যালেসে অবস্থান করছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেটিও বলশেভিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে এবং অধিকাংশ মন্ত্রীকে আটক করা হয়। কেরেনস্কি শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। এই ঘটনাই ইতিহাসে অক্টোবর বিপ্লব নামে পরিচিত।
ক্ষমতা দখলের পর বলশেভিক সরকারের অন্যতম প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল যুদ্ধ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া। ডিক্রি অন পিস প্রকাশ করে তারা যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে কোনো ভূখণ্ড দখল বা ক্ষতিপূরণ ছাড়া শান্তির আহ্বান জানায়। কিন্তু ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর ছিল এবং জার্মানি রাশিয়ার দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে বাস্তব ভূখণ্ডগত সুবিধা অর্জন করতে চাইছিল।
ডিসেম্বর ১৯১৭-তে কেন্দ্রীয় শক্তি ও বলশেভিক সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয় এবং বর্তমান বেলারুশের ব্রেস্ট-লিটভস্কে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। সোভিয়েত প্রতিনিধিদলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন ছিলেন লিওন ট্রটস্কি, যিনি তখন পররাষ্ট্রবিষয়ক পিপলস কমিসার।
সমস্যা ছিল জার্মানির দাবি অত্যন্ত কঠোর। রাশিয়াকে পোল্যান্ড, বাল্টিক অঞ্চল, ইউক্রেনসহ পশ্চিমের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে হবে। বলশেভিকদের জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে অপমানজনক ছিল। তারা সাম্রাজ্যবাদী গোপন চুক্তি নিন্দা করে ক্ষমতায় এসেছে; এখন নিজেরাই বিশাল ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার মুখে।
ট্রটস্কি একটি অদ্ভুত নীতি গ্রহণ করেন—“না যুদ্ধ, না শান্তি”। অর্থাৎ রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করবে এবং সেনাবাহিনী ভেঙে দেবে, কিন্তু জার্মানির কঠোর শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। তিনি আশা করেছিলেন জার্মানি হয়তো আবার যুদ্ধ শুরু করবে না অথবা ইউরোপীয় শ্রমিক বিপ্লব পরিস্থিতি বদলে দেবে।
এই হিসাব ব্যর্থ হয়।
১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯১৮ জার্মান ও কেন্দ্রীয় শক্তির বাহিনী আবার অগ্রসর হওয়া শুরু করে। ভেঙে পড়া রুশ সেনাবাহিনী কার্যকর প্রতিরোধ করতে পারেনি। কয়েক দিনের মধ্যে জার্মান বাহিনী বিশাল ভূখণ্ড দখল করে দ্রুত এগিয়ে যায়। পেত্রোগ্রাদ পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ে।
লেনিন তখন বলশেভিক নেতৃত্বকে যুক্তি দেন যে কঠোর শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তাঁর মতে, বিপ্লবী সরকারকে বাঁচানোই প্রথম কাজ; ভবিষ্যতে ইউরোপীয় পরিস্থিতি বদলালে চুক্তিও টিকবে না। দলের ভেতরে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁর অবস্থান গৃহীত হয়।
৩ মার্চ ১৯১৮ ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর শর্ত রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত কঠোর ছিল। রাশিয়া পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, বাল্টিক অঞ্চল এবং ইউক্রেনসহ বিশাল পশ্চিমাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা দাবি হারায়। ককেশাসের কিছু ভূখণ্ডও অটোমান সাম্রাজ্যের পক্ষে ছেড়ে দিতে হয়।
এই অঞ্চলগুলোতে রুশ সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা, কৃষিজমি, কয়লা, শিল্প ও রেলসম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল। একটি চুক্তির মাধ্যমে বলশেভিক রাশিয়া সাবেক সাম্রাজ্যের বিশাল ভূখণ্ড ও অর্থনৈতিক সম্পদ হারায়। রাজনৈতিকভাবে বলশেভিকদের জন্য এটি ছিল তীব্র অপমান।
কিন্তু লেনিনের মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়—রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যায়। বলশেভিকরা এখন নিজেদের টিকে থাকা এবং দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা রুশ গৃহযুদ্ধের দিকে মনোযোগ দিতে পারে। জার্মানিও পূর্ব রণাঙ্গনে বিপুলসংখ্যক সৈন্যের প্রয়োজন থেকে মুক্ত হয়ে তাদের একটি অংশ পশ্চিমে স্থানান্তরের সুযোগ পায়।
এই পরিবর্তন ১৯১৮ সালের পশ্চিম রণাঙ্গনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সৈন্য পুরোপুরি পৌঁছানোর আগেই যুদ্ধ শেষ করার আশায় জার্মানি পূর্ব থেকে স্থানান্তরিত ডিভিশন ব্যবহার করে বসন্ত আক্রমণ শুরু করে। অর্থাৎ ব্রেস্ট-লিটভস্ক শুধু রুশ ইতিহাসের ঘটনা নয়; এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছরের কৌশলগত ভারসাম্যেও সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল।
তবে জার্মানির এই বিশাল পূর্বাঞ্চলীয় সাফল্য স্থায়ী হয়নি। নভেম্বর ১৯১৮-তে জার্মানি পশ্চিমে পরাজিত হয়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তি কার্যত বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু রুশ সাম্রাজ্য আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড এবং বাল্টিক অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয় এবং পূর্ব ইউরোপ বহু বছরের যুদ্ধ ও বিপ্লবের মধ্যে প্রবেশ করে।
জার দ্বিতীয় নিকোলাসের ভাগ্যও এর মধ্যে চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে যায়। সিংহাসন ত্যাগের পর রাজপরিবারকে আটক রাখা হয় এবং পরে উরাল অঞ্চলের ইয়েকাতেরিনবুর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯১৮ সালের জুলাইয়ে নিকোলাস, আলেকজান্দ্রা এবং তাঁদের সন্তানসহ রাজপরিবারের সদস্যদের বলশেভিক কর্তৃপক্ষের অধীনে হত্যা করা হয়। এর মাধ্যমে রোমানভ শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে প্রতীকীভাবে শেষ করে দেওয়া হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কি একাই রুশ বিপ্লব ঘটিয়েছিল? না। জারতন্ত্রের রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র, কৃষিজমির প্রশ্ন, দ্রুত শিল্পায়নের সামাজিক বৈষম্য, শ্রমিক অসন্তোষ, ১৯০৫ সালের বিপ্লবের অসম্পূর্ণ সংস্কার এবং জাতিগত সমস্যাগুলো যুদ্ধের বহু আগে থেকেই ছিল। কিন্তু যুদ্ধ সেই দুর্বলতাগুলোকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যুদ্ধ ছাড়া ১৯১৭ সালের বিপ্লব কখন এবং কীভাবে ঘটত, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়; কিন্তু ১৯১৪–১৭ সালের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি, খাদ্য ও পরিবহন সংকট এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারানো বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল—এ নিয়ে খুব কম সন্দেহ রয়েছে।
রুশ বিপ্লব এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাই পরস্পরকে বদলে দেওয়া দুটি ইতিহাস। যুদ্ধ জারতন্ত্রকে পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল; জারের পতনের পরও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অস্থায়ী সরকারকে দুর্বল করেছিল; যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি বলশেভিকদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছিল; আর ক্ষমতায় এসে বলশেভিকরা ব্রেস্ট-লিটভস্কের অপমানজনক শর্ত মেনে নিয়েও যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যায়।
১৯১৪ সালে জার দ্বিতীয় নিকোলাস যে যুদ্ধকে রুশ সাম্রাজ্যের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, ১৯১৮ সালের মধ্যে সেই যুদ্ধই তাঁর সাম্রাজ্য, সিংহাসন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। ব্রেস্ট-লিটভস্কের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শুধু রাশিয়ার প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়নি; একই সঙ্গে পুরোনো সাম্রাজ্যিক রাশিয়ার মৃত্যুর ওপর সিলমোহর পড়েছিল এবং শুরু হয়েছিল বলশেভিক বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ ও পরবর্তী সোভিয়েত রাষ্ট্রের এক সম্পূর্ণ নতুন যুগ।
সিন্ধু সভ্যতার পতন: জলবায়ু, নদীর গতিপথ নাকি অন্য কোনো কারণ?
সিন্ধু লিপির রহস্য: হাজার চেষ্টা করেও যে প্রাচীন লেখা আজও পড়া যায়নি
ধোলাভিরা: মরুভূমির মাঝে সিন্ধু সভ্যতার বিস্ময়কর জলনগরী
হরপ্পা: সিন্ধু সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া মহানগরীর অজানা ইতিহাস
হোয়াইট মাউন্টেনের যুদ্ধ: ১৬২০ সালে বোহেমিয়ার পরাজয় ও হ্যাবসবার্গ-ক্যাথলিক আধিপত্যের উত্থান
বোহেমিয়ান বিদ্রোহ ও ফ্রেডেরিক পঞ্চম: হ্যাবসবার্গবিরোধী সংঘাত যেভাবে ইউরোপীয় যুদ্ধে রূপ নেয়