লুসিটানিয়া থেকে জিমারম্যান টেলিগ্রাম: নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্র কেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে যোগ দিয়েছিল?
Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
- Author: Admin
- September 02, 2026
নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্র কেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে যোগ দিয়েছিল?
১৯১৪ সালের আগস্টে ইউরোপ যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুনে জড়িয়ে পড়ল, তখন আটলান্টিকের অপর পাশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তাঁর দেশকে সেই সংঘাত থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। ইউরোপের সাম্রাজ্য, জোট ও ভূখণ্ড নিয়ে সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই—এমন মনোভাব মার্কিন সমাজের বড় অংশে ছিল। উইলসন আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেন এবং আমেরিকানদের “চিন্তা ও কাজে নিরপেক্ষ” থাকার আহ্বান জানান। অথচ মাত্র তিন বছরেরও কম সময় পরে, ৬ এপ্রিল ১৯১৭ যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কীভাবে এত বড় পরিবর্তন ঘটল, তার উত্তর শুধু লুসিটানিয়া ডুবি বা জিমারম্যান টেলিগ্রামের কোনো একক ঘটনায় নেই। বরং সাবমেরিন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক সংকট, জনমতের পরিবর্তন এবং জার্মান নেতৃত্বের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার পেছনে শক্তিশালী ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল। দেশটি দীর্ঘদিন ইউরোপের ক্ষমতার রাজনীতিতে স্থায়ী সামরিক জোট থেকে দূরে থাকার নীতি অনুসরণ করেছিল। পাশাপাশি মার্কিন সমাজ নিজেই ছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূতদের পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ জার্মান ও আইরিশ বংশোদ্ভূত আমেরিকান ছিল। আইরিশদের অনেকেই ব্রিটিশ শাসনের কারণে ব্রিটেনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না। ফলে সরাসরি কোনো এক পক্ষকে সমর্থন করা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারত।
নিরপেক্ষতা অবশ্য অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বোঝায়নি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মার্কিন ব্যবসায়ীরা যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারত। কিন্তু ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির সমুদ্র অবরোধের কারণে জার্মানির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বাণিজ্য দ্রুত সংকুচিত হয়। অন্যদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স আমেরিকা থেকে খাদ্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ, কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য বিপুল পরিমাণে কিনতে শুরু করে।
মার্কিন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ধীরে ধীরে মিত্রশক্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়, যাতে তারা আমেরিকান পণ্য কিনতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে তখনই যুদ্ধে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, মার্কিন অর্থনীতি ও মিত্রশক্তির অর্থনৈতিক সম্পর্ক তত গভীর হতে থাকে।
এই সময় জার্মানির সামনে ছিল একটি মৌলিক সমস্যা। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর তুলনায় জার্মান হাই সিজ ফ্লিট দুর্বল অবস্থানে ছিল এবং ব্রিটিশ অবরোধ সরাসরি ভাঙা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু জার্মানির কাছে এমন একটি অস্ত্র ছিল, যা ব্রিটেনের সামুদ্রিক সরবরাহব্যবস্থাকে অন্যভাবে আঘাত করতে পারত—ইউ-বোট বা সাবমেরিন।
ব্রিটেন একটি দ্বীপরাষ্ট্র এবং তার খাদ্য ও কাঁচামালের বড় অংশ সমুদ্রপথে আসত। জার্মান পরিকল্পনাকারীদের ধারণা ছিল, ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ধ্বংস করতে পারলে দেশটির অর্থনীতি ও যুদ্ধক্ষমতা ভেঙে পড়বে। কিন্তু সাবমেরিন যুদ্ধের সঙ্গে নিরপেক্ষ দেশের অধিকার এবং বেসামরিক যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত ছিল।
১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানি ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের জলসীমাকে যুদ্ধাঞ্চল ঘোষণা করে। এরপর আসে এমন একটি ঘটনা, যা মার্কিন জনমনে গভীর ছাপ ফেলবে।
৭ মে ১৯১৫ ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জাহাজ আরএমএস লুসিটানিয়া আয়ারল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের কাছে জার্মান সাবমেরিন ইউ-২০-এর টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যায়। নিউইয়র্ক থেকে লিভারপুলগামী জাহাজটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে সমুদ্রে তলিয়ে যায়। প্রায় ১,২০০ মানুষ প্রাণ হারায়, যাদের মধ্যে ১২৮ জন মার্কিন নাগরিক ছিল।
জার্মানি যুক্তি দেয় যে লুসিটানিয়া ব্রিটিশ জাহাজ এবং সেটি যুদ্ধসামগ্রী বহন করছিল। বাস্তবেও জাহাজে গোলাবারুদসহ সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্য ছিল। জার্মান দূতাবাস যাত্রার আগেই মার্কিন সংবাদপত্রে সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছিল যে ব্রিটিশ পতাকাবাহী জাহাজে যুদ্ধাঞ্চলে যাত্রা বিপজ্জনক।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে মূল প্রশ্ন ছিল অন্য। একটি যাত্রীবাহী জাহাজকে সতর্কতা ও যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছাড়া টর্পেডো করা কি গ্রহণযোগ্য? লুসিটানিয়ার বিপুল বেসামরিক প্রাণহানি জার্মানির ভাবমূর্তিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—লুসিটানিয়া ডুবির পর যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯১৫ সালের মে মাসে; মার্কিন যুদ্ধ ঘোষণা আসে প্রায় দুই বছর পরে। উইলসন তখনও কূটনৈতিক সমাধান চাইছিলেন। তাঁর প্রশাসন জার্মানির কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং মার্কিন নাগরিকদের অধিকার রক্ষার দাবি করে।
পরবর্তী কয়েক মাসে আরও জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির সম্পর্ক বারবার সংকটে পড়ে। ১৯১৬ সালের মার্চে ইংলিশ চ্যানেলে ফরাসি যাত্রীবাহী ফেরি সাসেক্স জার্মান সাবমেরিনের টর্পেডোতে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়। মার্কিন নাগরিকরাও আহত হয়।
উইলসন সতর্ক করেন যে জার্মানি সাবমেরিন যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ না করলে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় জার্মানি তথাকথিত সাসেক্স অঙ্গীকার দেয়। তারা নির্দিষ্ট শর্ত ছাড়া যাত্রীবাহী ও বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়ে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানি সংঘাত প্রশমিত হয়।
এদিকে ১৯১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলসনের সমর্থকেরা তাঁর শান্তি রক্ষার ভূমিকার ওপর জোর দেয়। জনপ্রিয় রাজনৈতিক বার্তার সারমর্ম ছিল—তিনি আমেরিকাকে যুদ্ধের বাইরে রেখেছেন। উইলসন পুনর্নির্বাচিত হন। তখনও অধিকাংশ আমেরিকানের কাছে ইউরোপে বিশাল সেনাবাহিনী পাঠানোর ধারণা জনপ্রিয় ছিল না।
কিন্তু ১৯১৭ সালের শুরুতে জার্মান সামরিক নেতৃত্ব এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরিস্থিতি আমূল বদলে দেয়। পশ্চিম রণাঙ্গনের অচলাবস্থা এবং ব্রিটিশ অবরোধের চাপের মধ্যে জার্মানি হিসাব করে যে পূর্ণমাত্রার সাবমেরিন অভিযান চালালে ব্রিটেনকে কয়েক মাসের মধ্যে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হবে।
১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৭ থেকে জার্মানি পুনরায় অনিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন যুদ্ধ শুরু করে। নির্দিষ্ট যুদ্ধাঞ্চলে শত্রু বা নিরপেক্ষ—বিভিন্ন ধরনের জাহাজ সতর্কতা ছাড়াই আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। জার্মান নেতৃত্ব জানত এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনতে পারে। কিন্তু তাদের ধারণা ছিল, আমেরিকা যুদ্ধ ঘোষণা করলেও পর্যাপ্ত মার্কিন সৈন্য ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই ব্রিটেন পরাজিত হবে।
এই হিসাব শেষ পর্যন্ত জার্মানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভুলগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
উইলসন ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১৭ জার্মানির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরপর জার্মান ইউ-বোট মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবাতে শুরু করলে যুদ্ধের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। ঠিক এই সময় প্রকাশ্যে আসে আরেকটি বিস্ফোরক ঘটনা—জিমারম্যান টেলিগ্রাম।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জিমারম্যান ১৯১৭ সালের জানুয়ারিতে মেক্সিকোতে জার্মান রাষ্ট্রদূতের উদ্দেশে একটি সাংকেতিক বার্তা পাঠান। বার্তায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে জার্মানি মেক্সিকোকে একটি সামরিক জোটের প্রস্তাব দেবে। মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিলে জার্মানি তাকে আর্থিক সহায়তা দেবে এবং টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে।
এই অঞ্চলগুলো উনিশ শতকে মেক্সিকোর অংশ ছিল, পরে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরিকল্পনায় জাপানকেও জোটে আনার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু বার্তাটি গোপন থাকেনি। ব্রিটিশ নৌ গোয়েন্দা বিভাগের রুম ফোরটি জার্মান যোগাযোগ আটক করে সাংকেতিক বার্তাটি পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ব্রিটিশদের সামনে একটি সমস্যা ছিল—তারা যদি সরাসরি জানায় কীভাবে বার্তাটি পেয়েছে, তাহলে জার্মানরা বুঝতে পারে তাদের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাই গোয়েন্দা তথ্যের উৎস গোপন রেখে বার্তাটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
১৯১৭ সালের মার্চের শুরুতে জিমারম্যান টেলিগ্রামের বিষয়বস্তু মার্কিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রথমে অনেকে সন্দেহ করেছিল এটি হয়তো ব্রিটিশ প্রচারণা। কিন্তু জিমারম্যান নিজেই পরে বার্তাটির সত্যতা স্বীকার করেন।
মার্কিন জনমতের জন্য এর মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব ছিল বিশাল। ইউরোপের দূরবর্তী যুদ্ধ এবার আর শুধু আটলান্টিকের ওপারের সংঘাত বলে মনে হচ্ছিল না। জার্মান সরকার সরাসরি মেক্সিকোকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা করেছিল এবং মার্কিন ভূখণ্ড হারানোর সম্ভাবনাও সেই প্রস্তাবের অংশ ছিল।
তবে বাস্তবে মেক্সিকোর পক্ষে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। দেশটি তখন নিজস্ব বিপ্লব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সফল যুদ্ধ পরিচালনার মতো সামরিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য মেক্সিকোর ছিল না। মেক্সিকান সরকারও শেষ পর্যন্ত জার্মান প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। জিমারম্যান টেলিগ্রামের গুরুত্ব তাই বাস্তব সামরিক জোটের চেয়ে মার্কিন জনমত ও কূটনৈতিক সংকটে অনেক বেশি ছিল।
এদিকে আটলান্টিকে ইউ-বোট অভিযান চলছিল। মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উইলসনের সামনে প্রশ্নটি ক্রমে পরিষ্কার হয়ে ওঠে—নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কি যুক্তরাষ্ট্র তার সমুদ্রপথের অধিকার রক্ষা করতে পারবে?
আরেকটি বিষয়ও উইলসনের রাজনৈতিক যুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯১৭ সালের মার্চে রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে জার দ্বিতীয় নিকোলাসের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটে। ফলে মিত্রশক্তির প্রধান রাষ্ট্রগুলোকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে সংগ্রামরত শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক সহজ হয়, যদিও বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্যই আরও জটিল ছিল।
২ এপ্রিল ১৯১৭ প্রেসিডেন্ট উইলসন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানান। তিনি অনিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন যুদ্ধকে মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মতো হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং ঘোষণা করেন যে বিশ্বকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করতে হবে। তাঁর বক্তব্য পরবর্তী মার্কিন যুদ্ধ প্রচারণার অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়।
সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে বিতর্কের পর কংগ্রেস যুদ্ধের পক্ষে ভোট দেয়। ৬ এপ্রিল ১৯১৭ যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যে দেশ ১৯১৪ সালে নিরপেক্ষতার ঘোষণা দিয়েছিল, সেটি এখন মিত্রশক্তির সঙ্গে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচলিত জোটের সদস্য হওয়ার পরিবর্তে মিত্রশক্তির ‘সহযোগী শক্তি’ হিসেবে যুদ্ধ করে।
যুদ্ধে প্রবেশের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত সেনাবাহিনী ইউরোপের বিশাল বাহিনীগুলোর তুলনায় ছোট ছিল। ফলে সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মার্কিন সৈন্য পশ্চিম রণাঙ্গনে উপস্থিত হয়নি। সিলেক্টিভ সার্ভিস অ্যাক্ট চালু করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিবন্ধনের মাধ্যমে বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলা শুরু হয়। জেনারেল জন জে. পারশিংয়ের নেতৃত্বে আমেরিকান এক্সপেডিশনারি ফোর্স ইউরোপে পাঠানো হয়।
১৯১৭ সালের মধ্যে মার্কিন আর্থিক, শিল্প ও নৌ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও বৃহৎ সংখ্যায় মার্কিন স্থলসৈন্যের প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয় ১৯১৮ সালে। তখন প্রতি মাসে বিপুলসংখ্যক নতুন আমেরিকান সৈন্য ইউরোপে পৌঁছাতে থাকে। জার্মানির জন্য এর অর্থ ছিল একটি ভয়াবহ কৌশলগত বাস্তবতা—ব্রিটেন ও ফ্রান্স চার বছরের যুদ্ধে ক্লান্ত হলেও তাদের পেছনে এখন নতুন জনশক্তি, শিল্প ও অর্থনৈতিক সম্পদের বিশাল উৎস যুক্ত হয়েছে।
জার্মানি ঠিক এই পরিস্থিতি এড়াতে চেয়েছিল। ১৯১৮ সালের বসন্তে রাশিয়া যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পশ্চিম রণাঙ্গনে স্থানান্তরিত সৈন্য ব্যবহার করে জার্মানি বিশাল স্প্রিং অফেনসিভ শুরু করবে। লক্ষ্য ছিল আমেরিকান শক্তি পুরোপুরি মোতায়েন হওয়ার আগেই ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে সিদ্ধান্তমূলকভাবে পরাজিত করা। প্রাথমিক বড় অগ্রগতির পরও সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ শুধু নতুন সৈন্য যোগ করেনি; যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি হিসাবও বদলে দিয়েছিল। জার্মান নেতৃত্ব জানত, সময় এখন তাদের বিপক্ষে। যত বেশি সময় যুদ্ধ চলবে, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পক্ষমতা, ঋণ, খাদ্য, অস্ত্র এবং ক্রমবর্ধমান সেনাবাহিনী মিত্রশক্তির পক্ষে ভারসাম্য আরও শক্তিশালী করবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কেন যুদ্ধে প্রবেশ করেছিল—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুধু একটি কারণ বেছে নেওয়া বিভ্রান্তিকর। লুসিটানিয়া ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, কিন্তু তাৎক্ষণিক যুদ্ধের কারণ নয়। জিমারম্যান টেলিগ্রাম জনমতকে ক্ষুব্ধ করেছিল, কিন্তু সেটিও একা যুদ্ধ ঘোষণা ঘটায়নি। মিত্রশক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু কেবল ঋণ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে প্রবেশ করেছিল—এমন ব্যাখ্যাও অত্যন্ত সরলীকৃত।
সবচেয়ে সরাসরি সংকট তৈরি করেছিল জার্মানির ১৯১৭ সালের অনিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া, জিমারম্যান টেলিগ্রাম, কয়েক বছরের কূটনৈতিক বিরোধ এবং জার্মান সামরিক নীতির প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস একত্রিত হয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখাকে উইলসন প্রশাসনের কাছে ক্রমশ অসম্ভব করে তোলে।
এখানেই জার্মান কৌশলের বড় বৈপরীত্য ছিল। ইউ-বোট অভিযান এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছিল যাতে যুক্তরাষ্ট্র কার্যকরভাবে যুদ্ধে নামার আগেই ব্রিটেনকে পরাজিত করা যায়। কিন্তু ব্রিটিশ কনভয় ব্যবস্থা ও সাবমেরিনবিরোধী প্রতিরক্ষা সেই লক্ষ্য ব্যর্থ করে দেয়। ব্রিটেন যুদ্ধ থেকে বের হয়নি, অথচ যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করেছে।
১৯১৫ সালের লুসিটানিয়া থেকে ১৯১৭ সালের জিমারম্যান টেলিগ্রাম পর্যন্ত ঘটনাগুলো তাই একটি দেশের জনমত কীভাবে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছিল, তার ধারাবাহিক ইতিহাস। প্রথমে ছিল ইউরোপের যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এরপর আসে সমুদ্রে মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু, সাবমেরিন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক সংঘর্ষ, আটলান্টিকে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য জোটের গোপন জার্মান প্রস্তাব।
৬ এপ্রিল ১৯১৭-এর যুদ্ধ ঘোষণা সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম রণাঙ্গনের যুদ্ধ শেষ করেনি, কিন্তু যুদ্ধের শক্তির ভারসাম্য মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছিল। জার্মানি সাবমেরিন দিয়ে ব্রিটেনকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল; পরিবর্তে তার নীতি আটলান্টিকের অপর পাশের এক বিশাল শিল্পশক্তিকে শত্রুতে পরিণত করেছিল। আর সেই সিদ্ধান্তই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় শক্তির সামনে এমন একটি জনশক্তি ও অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের পক্ষে মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
সিন্ধু সভ্যতার পতন: জলবায়ু, নদীর গতিপথ নাকি অন্য কোনো কারণ?
সিন্ধু লিপির রহস্য: হাজার চেষ্টা করেও যে প্রাচীন লেখা আজও পড়া যায়নি
ধোলাভিরা: মরুভূমির মাঝে সিন্ধু সভ্যতার বিস্ময়কর জলনগরী
হরপ্পা: সিন্ধু সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া মহানগরীর অজানা ইতিহাস
হোয়াইট মাউন্টেনের যুদ্ধ: ১৬২০ সালে বোহেমিয়ার পরাজয় ও হ্যাবসবার্গ-ক্যাথলিক আধিপত্যের উত্থান
বোহেমিয়ান বিদ্রোহ ও ফ্রেডেরিক পঞ্চম: হ্যাবসবার্গবিরোধী সংঘাত যেভাবে ইউরোপীয় যুদ্ধে রূপ নেয়