বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

১৯১৮ সালের জার্মান বসন্ত আক্রমণ: পশ্চিম রণাঙ্গনে শেষবারের মতো যুদ্ধ জয়ের মরিয়া চেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী

  • Author: Admin
  • September 02, 2026
১৯১৮ সালের জার্মান বসন্ত আক্রমণ: পশ্চিম রণাঙ্গনে শেষবারের মতো যুদ্ধ জয়ের মরিয়া চেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
১৯১৮ সালের জার্মান বসন্ত আক্রমণ

১৯১৮ সালের শুরুতে জার্মান সামরিক নেতৃত্বের সামনে এক বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পূর্ব রণাঙ্গনে বলশেভিক রাশিয়া যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে গেছে, ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তির মাধ্যমে জার্মানি পূর্বে বিপুল ভূখণ্ড ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে এবং সেখান থেকে বহু ডিভিশন পশ্চিম রণাঙ্গনে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৭ সালে যুদ্ধে প্রবেশ করলেও তখনও তার পূর্ণ সামরিক শক্তি ইউরোপে পৌঁছায়নি। জার্মানির কাছে মনে হচ্ছিল—এখনই যদি পশ্চিমে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে সিদ্ধান্তমূলকভাবে ভেঙে ফেলা যায়, তবে যুদ্ধ জয় করা সম্ভব; কয়েক মাস পরে এই সুযোগ আর থাকবে না। এই হিসাব থেকেই জন্ম নেয় ১৯১৮ সালের জার্মান বসন্ত আক্রমণ, যা ইতিহাসে কাইজারশ্লাখট বা সম্রাটের যুদ্ধ নামেও পরিচিত।

এই আক্রমণের কেন্দ্রীয় মস্তিষ্ক ছিলেন এরিখ লুডেনডর্ফ। তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু কয়েক কিলোমিটার ভূখণ্ড দখল নয়, বরং মিত্রশক্তির ফ্রন্টে এমন ভাঙন সৃষ্টি করা যাতে ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। জার্মান নেতৃত্বের আশা ছিল ব্রিটিশ বাহিনীকে ইংলিশ চ্যানেলের বন্দরগুলোর দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে এবং ফরাসিদের দক্ষিণে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সমস্যা ছিল—জার্মান পরিকল্পনার অপারেশনাল লক্ষ্য স্পষ্ট হলেও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য ছিল অস্পষ্ট। কোথায় আঘাত করলে যুদ্ধ সত্যিই শেষ হবে, তা নিয়ে লুডেনডর্ফের পরিকল্পনা আক্রমণের অগ্রগতির সঙ্গে বদলাতে থাকে।

১৯১৮ সালের জার্মান বাহিনী ১৯১৪ সালের সেনাবাহিনীর মতো ছিল না। চার বছরের যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ সৈন্য হারিয়ে গেছে, খাদ্য ও কাঁচামালের ঘাটতি ছিল গুরুতর এবং ব্রিটিশ নৌ অবরোধ জার্মান অর্থনীতিকে চাপে রেখেছিল। তবু পূর্ব থেকে স্থানান্তরিত সেনাদলের কারণে পশ্চিমে সাময়িক সংখ্যাগত সুবিধা তৈরি হয়। এই সুযোগকে সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে জার্মানরা নতুন ধরনের আক্রমণাত্মক কৌশল উন্নত করে।

এই কৌশলের কেন্দ্রে ছিল স্টর্মট্রুপার বা আক্রমণকারী বিশেষ পদাতিক দল। পুরোনো পদ্ধতিতে শত্রুর প্রতিটি শক্তিশালী অবস্থান সরাসরি দখলের চেষ্টা না করে ছোট, দ্রুতগতির ইউনিটগুলো দুর্বল স্থান দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে, শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান পাশ কাটিয়ে যাবে এবং শত্রুর সদর দপ্তর, কামানের অবস্থান, যোগাযোগকেন্দ্র ও সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত করবে। পিছনের সাধারণ পদাতিক ইউনিট পরে বিচ্ছিন্ন শক্ত ঘাঁটিগুলো পরিষ্কার করবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন ধরনের কামান পরিকল্পনা। জার্মান কর্নেল জর্জ ব্রুখমুলার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঘনীভূত আর্টিলারি প্রস্তুতির ধারণা উন্নত করেন। দীর্ঘদিন গোলাবর্ষণ করে শত্রুকে সতর্ক করার বদলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কমান্ড পোস্ট, কামান, যোগাযোগব্যবস্থা ও সামনের ট্রেঞ্চে বিভিন্ন ধরনের গোলা নিক্ষেপ করা হতো। ধোঁয়া, উচ্চ বিস্ফোরক এবং গ্যাসের গোলা ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করার চেষ্টা করা হতো।

২১ মার্চ ১৯১৮ ভোরে অপারেশন মাইকেল শুরু হয়। উত্তর ফ্রান্সের সাঁ-কাঁতাঁ অঞ্চলসহ বিস্তৃত ফ্রন্টে হাজার হাজার জার্মান কামান একযোগে গোলাবর্ষণ শুরু করে। ঘন কুয়াশা আক্রমণকারী সৈন্যদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা এনে দেয়। ব্রিটিশ পঞ্চম সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর জার্মান আঘাত বিশেষভাবে শক্তিশালী ছিল।

প্রথম দিনেই জার্মান বাহিনী বহু স্থানে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ভেঙে দেয়। ১৯১৬-১৭ সালের পশ্চিম রণাঙ্গনে যেখানে কয়েক মাস লড়াই করেও কয়েক কিলোমিটার অগ্রগতি কঠিন ছিল, সেখানে ১৯১৮ সালের বসন্তে জার্মান বাহিনী কয়েক দিনের মধ্যে বহু কিলোমিটার সামনে এগিয়ে যায়। বহু ব্রিটিশ সৈন্য বন্দি হয়, কামান ও সরঞ্জাম জার্মানদের হাতে পড়ে এবং কিছু এলাকায় মিত্রবাহিনীর ফ্রন্ট ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

ব্রিটিশ পঞ্চম সেনাবাহিনী দ্রুত পশ্চাদপসরণ করে। জার্মানরা পুরোনো সোম যুদ্ধক্ষেত্র অতিক্রম করে পশ্চিমের দিকে এগোতে থাকে। ১৯১৬ সালে যে ভূখণ্ডের জন্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করেছিল, সেই অঞ্চল কয়েক দিনের মধ্যে আবার জার্মানদের হাতে চলে যায়।

জার্মান অগ্রযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর একটি হয়ে ওঠে আমিয়েঁ। শহরটি ছিল ব্রিটিশ ও ফরাসি যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রেলকেন্দ্র। আমিয়েঁ দখল করা গেলে ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীর মধ্যে সংযোগ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। এই কারণেই জার্মান অগ্রযাত্রা শুরুতে অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে হচ্ছিল।

কিন্তু সাফল্যের মধ্যেই দুর্বলতা তৈরি হচ্ছিল। স্টর্মট্রুপাররা দ্রুত এগিয়ে শত্রুর অবস্থান ভাঙতে সক্ষম হলেও তাদের পেছনে ভারী কামান, খাদ্য, গোলাবারুদ এবং রিজার্ভ একই গতিতে এগোতে পারছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেনাবাহিনী এখনও ব্যাপকভাবে ঘোড়া ও রেলপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক, শেল ক্রেটার এবং পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্রের বিধ্বস্ত অবকাঠামো জার্মান সরবরাহকে ধীর করে দেয়।

আরও একটি সমস্যা ছিল জার্মান সৈন্যদের শারীরিক অবস্থা। দীর্ঘ অবরোধ ও খাদ্যসংকটে জার্মান সেনাবাহিনীর রেশন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অগ্রসরমান সৈন্যরা যখন ব্রিটিশ সরবরাহ ডিপো দখল করে সেখানে উন্নত খাদ্য, মদ ও অন্যান্য সামগ্রী দেখতে পায়, তখন অনেক ইউনিটের অগ্রগতি সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এটি শুধু শৃঙ্খলার সমস্যা নয়; দুই পক্ষের অর্থনৈতিক অবস্থার পার্থক্যের একটি নির্মম প্রতিফলন ছিল।

অপারেশন মাইকেলের আরেকটি বড় সমস্যা ছিল, অগ্রগতি যত বাড়ছিল, আক্রমণের দিক তত বদলাচ্ছিল। লুডেনডর্ফ কখনো ব্রিটিশদের বিচ্ছিন্ন করার দিকে, কখনো ফরাসি রিজার্ভ আঘাত করার দিকে এবং কখনো সুযোগ পাওয়া এলাকায় আরও ভূখণ্ড দখলের দিকে মনোযোগ দিচ্ছিলেন। অপারেশনাল সাফল্যকে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তমূলক কৌশলগত লক্ষ্যে কেন্দ্রীভূত করা যায়নি।

মিত্রশক্তির জন্য এই সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পরিবর্তনও ঘটায়। এতদিন ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ একক সর্বাধিনায়ক ছিল না। জার্মান আক্রমণের বিপদের মধ্যে ফার্দিনান্দ ফশকে মিত্রবাহিনীর সামগ্রিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং পরে তিনি সর্বোচ্চ মিত্র কমান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই একীভূত নেতৃত্ব ফরাসি ও ব্রিটিশ রিজার্ভকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।

মার্চের শেষ নাগাদ জার্মানরা বিশাল ভূখণ্ড দখল করলেও আমিয়েঁ নিতে পারেনি। ভিলের-ব্রেতোন্যুর অঞ্চলে ব্রিটিশ ও অস্ট্রেলীয় বাহিনীর প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জার্মান আক্রমণের গতি কমতে থাকে। সৈন্যরা ক্লান্ত, রসদ পিছিয়ে এবং মিত্রবাহিনী নতুন প্রতিরক্ষা লাইন তৈরি করছে।

অপারেশন মাইকেল এপ্রিলের প্রথমদিকে কার্যত থেমে যায়। কিন্তু লুডেনডর্ফ অভিযান শেষ করেননি। তিনি এবার ফ্ল্যান্ডার্সে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন আঘাতের সিদ্ধান্ত নেন। ৯ এপ্রিল শুরু হয় অপারেশন জর্জেট, যা লিস নদীর যুদ্ধ নামেও পরিচিত।

এবার লক্ষ্য ছিল ইপ্র অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ভেঙে উত্তর ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল বন্দরগুলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া। জার্মানরা আবারও উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করে। পর্তুগিজ বাহিনীর কিছু অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জার্মানরা মেসিন রিজসহ বিভিন্ন এলাকায় অগ্রসর হয়।

কিন্তু এখানেও একই সমস্যা দেখা দেয়। যুদ্ধক্ষেত্র সংকীর্ণ, সরবরাহ দুর্বল এবং ব্রিটিশ-ফরাসি রিজার্ভ দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হাজেব্রুক ও গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ জার্মানদের নাগালের বাইরে থেকে যায়। এপ্রিলের শেষ নাগাদ লিস আক্রমণও থেমে যায়।

এরপর লুডেনডর্ফ দক্ষিণে নতুন আক্রমণ চালান। ২৭ মে অপারেশন ব্ল্যুশার-ইয়র্ক শুরু হয় আইনের নদীর অঞ্চলে। এখানেও জার্মান গোলাবর্ষণ ও অনুপ্রবেশ কৌশল বিস্ময়কর সাফল্য আনে। মিত্রবাহিনীর প্রতিরক্ষা দ্রুত ভেঙে পড়ে এবং জার্মান সৈন্যরা কয়েক দিনের মধ্যে মার্ন নদীর দিকে এগিয়ে যায়।

জার্মানরা আবার প্যারিসের প্রায় ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যায়। ১৯১৪ সালের মার্ন সংকটের স্মৃতি ফিরে আসে। প্যারিসে জার্মান দূরপাল্লার কামানের গোলাও পড়ছিল। কিন্তু বাহিনীর এই বিশাল অগ্রগতি আবারও এমন একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ড সৃষ্টি করে, যেটিকে সামরিক ভাষায় বিপজ্জনক স্যালিয়েন্ট বলা হয়—তিন দিক থেকে শত্রুর আঘাতের সম্ভাবনাযুক্ত একটি অগ্রবর্তী অংশ।

এই সময় আমেরিকান সৈন্যদের উপস্থিতি ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। বেলো উড, শাতো-থিয়েরি এবং অন্যান্য সংঘর্ষে মার্কিন ইউনিটগুলো ফরাসিদের পাশে লড়াই করে। সংখ্যায় তখনও তারা মিত্রবাহিনীর প্রধান অংশ ছিল না, কিন্তু প্রতিদিন নতুন মার্কিন সৈন্য ইউরোপে পৌঁছাচ্ছিল। জার্মান নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় আশঙ্কাটি বাস্তবে পরিণত হচ্ছিল—সময় তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে।

জুনে জার্মানি আরেকটি আক্রমণ চালায় এবং জুলাইয়ে আসে শেষ বড় প্রচেষ্টা। ১৫ জুলাই ১৯১৮ দ্বিতীয় মার্নের যুদ্ধের অংশ হিসেবে জার্মান আক্রমণ শুরু হয়। কিন্তু এবার মিত্রবাহিনী জার্মান কৌশল সম্পর্কে অনেক বেশি প্রস্তুত ছিল। গোয়েন্দা তথ্য থেকে আক্রমণের সময় ও অঞ্চল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গিয়েছিল এবং ফরাসিরা কিছু এলাকায় সামনের লাইন ইচ্ছাকৃতভাবে হালকা রেখে গভীর প্রতিরক্ষায় জার্মানদের টেনে আনে।

১৮ জুলাই ফরাসি, আমেরিকান ও অন্যান্য মিত্রবাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। রেনো এফটি-সহ বিপুল ট্যাংক, কামান ও বিমান সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়। জার্মান বাহিনী অপ্রত্যাশিত চাপের মুখে পড়ে এবং মার্ন অঞ্চলের অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এখানেই বসন্ত আক্রমণের কৌশলগত ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে যায়। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত জার্মানি অসাধারণ ভূখণ্ডগত সাফল্য অর্জন করেছিল। ১৯১৪ সালের পর পশ্চিম রণাঙ্গনে এত বড় অগ্রযাত্রা আর দেখা যায়নি। কিন্তু ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়নি, ফরাসিরা যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যায়নি, প্যারিস দখল হয়নি, আমিয়েঁ নেওয়া যায়নি এবং মিত্রশক্তির জোটও ভাঙেনি।

বরং জার্মানি তার সবচেয়ে মূল্যবান সৈন্যদের বিপুলসংখ্যক হারিয়েছিল। স্টর্মট্রুপার ইউনিটগুলোতে সাধারণত অভিজ্ঞ, শারীরিকভাবে সক্ষম ও উদ্যোগী সৈন্য নির্বাচন করা হতো। এগুলোই আক্রমণের প্রথম সারিতে থাকায় ক্ষয়ক্ষতির হার ছিল অত্যন্ত বেশি। জার্মানি এমন অভিজ্ঞ সৈন্য হারাচ্ছিল, যাদের দ্রুত প্রতিস্থাপন করা সম্ভব ছিল না।

বসন্ত আক্রমণে জার্মান হতাহতের সংখ্যা বিভিন্ন হিসাবে ভিন্ন হলেও কয়েক মাসে কয়েক লক্ষ সৈন্য নিহত, আহত, নিখোঁজ বা বন্দি হয়। মিত্রবাহিনীরও বিপুল ক্ষতি হয়েছিল, কিন্তু তাদের পেছনে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান জনশক্তি এবং বিশাল শিল্পক্ষমতা রয়েছে। জার্মানির ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি পূরণের সুযোগ ক্রমে কমছিল।

জার্মান অর্থনীতির অবস্থাও সংকটজনক ছিল। ব্রিটিশ অবরোধ খাদ্য ও কাঁচামালের সংকট বাড়িয়েছিল। বেসামরিক জনগণের মধ্যে অপুষ্টি ও যুদ্ধক্লান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। শিল্পে শ্রমিকসংকট এবং দীর্ঘ যুদ্ধের চাপ সমাজকে দুর্বল করে তুলেছিল। সামরিক অভিযানে দ্রুত বিজয় না এলে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তি জার্মানির জন্য ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ছিল।

অন্যদিকে ১৯১৮ সালের মধ্যে মিত্রশক্তি প্রযুক্তি ও কৌশলের সমন্বয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছিল। ট্যাংক, বিমান, কামান, পদাতিক এবং উন্নত যোগাযোগকে একসঙ্গে ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়ছিল। জার্মান বসন্ত আক্রমণ অনুপ্রবেশ কৌশলের কার্যকারিতা দেখিয়েছিল, কিন্তু গভীর অগ্রযাত্রাকে দীর্ঘস্থায়ী করার মতো পর্যাপ্ত মোটর পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা তখন জার্মানির ছিল না।

এই পার্থক্য পরবর্তী পর্যায়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৮ আগস্ট ১৯১৮ আমিয়েঁ অঞ্চলে মিত্রশক্তির বিশাল আক্রমণ শুরু হবে, যেখানে ট্যাংক, বিমান ও কামানের ঘনিষ্ঠ সমন্বয় জার্মান প্রতিরক্ষায় বড় ভাঙন সৃষ্টি করবে। লুডেনডর্ফ সেই দিনটিকে পরে জার্মান সেনাবাহিনীর ‘কালো দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর শুরু হবে শত দিনের আক্রমণ, যা শেষ পর্যন্ত জার্মানিকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করবে।

বসন্ত আক্রমণের ব্যর্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল জার্মান উচ্চ নেতৃত্বের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। লুডেনডর্ফ যুদ্ধক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হলে সেখানে আরও বাহিনী ঢেলে দিতেন, কিন্তু প্রতিটি অভিযান শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক বা সামরিক ফল অর্জন করবে—সেই প্রশ্নে পর্যাপ্ত স্থিরতা ছিল না। একটি বিশাল যুদ্ধ জিততে শুধু শত্রুর ট্রেঞ্চ ভাঙা যথেষ্ট নয়; সেই ভাঙনকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হয়, যেখানে শত্রুর যুদ্ধক্ষমতা বা রাজনৈতিক ইচ্ছাই ধ্বংস হয়ে যায়।

জার্মান বসন্ত আক্রমণ ঠিক এই জায়গাতেই ব্যর্থ হয়। তারা ফ্রন্ট ভেঙেছিল, কিন্তু মিত্রবাহিনীকে ধ্বংস করতে পারেনি। তারা বিশাল ভূখণ্ড নিয়েছিল, কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক যোগাযোগকেন্দ্র দখল করতে পারেনি। তারা মিত্রশক্তিকে ভয়াবহ ক্ষতি করেছিল, কিন্তু নিজের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সৈন্যদেরও এমনভাবে ক্ষয় করেছিল যে পরবর্তী মিত্র পাল্টা আক্রমণের সময় প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল সময়। ১৯১৮ সালের শুরুতে জার্মানির একটি সাময়িক সুযোগ ছিল; গ্রীষ্মের শেষে সেই সুযোগ বিলীন হয়ে যায়। প্রতিমাসে আরও বেশি আমেরিকান সৈন্য ফ্রান্সে পৌঁছাচ্ছিল। ব্রিটেন ও ফ্রান্স বিশাল ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষমতা ধরে রেখেছিল। জার্মানির মিত্র অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়াও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছিল।

১৯১৮ সালের বসন্তে জার্মান সৈন্যরা এমন গতিতে পশ্চিমে এগিয়েছিল, যা চার বছরের ট্রেঞ্চ যুদ্ধের পরে প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই নাটকীয় সাফল্যই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধজয় এনে দিতে পারেনি। বসন্ত আক্রমণ ছিল জার্মানির শেষ বৃহৎ জুয়া—রাশিয়ার পতনের পর অর্জিত সাময়িক সুবিধা ব্যবহার করে আমেরিকার পূর্ণ শক্তি আসার আগেই পশ্চিমে যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা। জুলাইয়ের মধ্যে যখন সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলো, তখন জার্মানি শুধু বিজয়ের সুযোগই হারায়নি; তার রিজার্ভ, অভিজ্ঞ সৈন্য এবং আক্রমণাত্মক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশও নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর আর প্রশ্ন ছিল না জার্মানি পশ্চিমে সিদ্ধান্তমূলক বিজয় অর্জন করতে পারবে কি না—প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, মিত্রশক্তির পাল্টা আঘাতের সামনে সে আর কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।