বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হরপ্পা: সিন্ধু সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া মহানগরীর অজানা ইতিহাস

Series: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

  • Author: Admin
  • September 02, 2026
হরপ্পা: সিন্ধু সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া মহানগরীর অজানা ইতিহাস
হরপ্পা: সিন্ধু সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া মহানগরীর অজানা ইতিহাস

বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব অঞ্চলে রাভি নদীর পুরোনো প্রবাহের কাছে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি বিশাল প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবি প্রথম দেখায় হয়তো কোনো হারিয়ে যাওয়া মহানগরীর চিহ্ন বলে মনে হবে না। অথচ এই মাটির নিচেই লুকিয়ে ছিল এমন এক নগরসভ্যতার ইতিহাস, যা মিশরের পিরামিড নির্মাতা ও মেসোপটেমিয়ার নগরবাসীদের সমসাময়িক। শহরটির আধুনিক নাম হরপ্পা। আর এই শহরের নাম থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন নগরসভ্যতা আজ হরপ্পা সভ্যতা নামেও পরিচিত। বিস্ময়কর বিষয় হলো, হাজার হাজার বছর ধরে শহরটির পরিচয় হারিয়ে গিয়েছিল; এমনকি আধুনিক যুগে এর প্রাচীন ইট তুলে রেলপথ নির্মাণে ব্যবহার করার সময়ও কেউ বুঝতে পারেনি যে ধ্বংস করা হচ্ছে মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল।

হরপ্পার ইতিহাস শুধু একটি শহরের ইতিহাস নয়। এটি এমন একটি সভ্যতার প্রবেশদ্বার, যার বিস্তার বর্তমান পাকিস্তান ও ভারতের বিশাল অঞ্চলজুড়ে ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে পরিণত হরপ্পা সভ্যতা প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম নগর সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু হরপ্পার বসতির ইতিহাস এরও আগে শুরু হয়েছিল এবং পরিণত নগরব্যবস্থা শেষ হওয়ার পরও এখানে মানুষের উপস্থিতি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়নি।

হরপ্পার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—‘হরপ্পা’ শহরটির প্রাচীন নাম ছিল কি না আমরা জানি না। আধুনিক প্রত্নস্থলের কাছাকাছি বর্তমান গ্রামের নাম থেকেই এই নাম এসেছে। শহরের বাসিন্দারা নিজেদের নগরকে কী নামে ডাকত, নিজেদের রাজ্য বা জনগোষ্ঠীকে কী বলত—সেসব তথ্য আজও অজানা।

এর প্রধান কারণ সিন্ধু লিপি এখনো পাঠোদ্ধার করা যায়নি। হরপ্পা থেকে পাওয়া ছোট সিলমোহর, মৃৎপাত্র এবং অন্যান্য বস্তুর ওপর রহস্যময় চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু এসব লেখা সাধারণত খুব সংক্ষিপ্ত। কোনো দীর্ঘ শিলালিপি, রাজকীয় ইতিহাস বা দ্বিভাষিক দলিল এখনো পাওয়া যায়নি, যার সাহায্যে ভাষাটি সহজে পাঠ করা সম্ভব।

ফলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমরা হরপ্পার মানুষের তৈরি ইটের মাপ জানি, তাদের ওজন ব্যবস্থার নিদর্শন পাই, তাদের গয়না ও পাত্র দেখতে পাই—কিন্তু তাদের কোনো রাজা, ব্যবসায়ী বা সাধারণ নাগরিকের নিশ্চিত নাম পর্যন্ত জানি না।

হরপ্পায় নগরজীবন একদিনে তৈরি হয়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরগুলো দেখায়, এখানে দীর্ঘ সময় ধরে বসতি বিকশিত হয়েছে। ছোট আঞ্চলিক বসতি থেকে ধীরে ধীরে বৃহৎ ও সংগঠিত নগরব্যবস্থা তৈরি হয়। পরিণত পর্যায়ে এসে শহরটি একাধিক উঁচু ঢিবি ও আবাসিক অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।

হরপ্পার স্থাপত্যে পোড়ানো ও কাঁচা ইট দুটিই ব্যবহৃত হতো। সিন্ধু সভ্যতার অন্যান্য নগরের মতো এখানেও নির্দিষ্ট অনুপাতের ইট ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। শত শত কিলোমিটার দূরের নগরেও একই ধরনের মান অনুসরণ করার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এটি কি কোনো কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যের নির্দেশে হতো? নাকি বিভিন্ন নগরের নির্মাতারা একই সাংস্কৃতিক ও কারিগরি মান অনুসরণ করতেন? নিশ্চিত উত্তর নেই। কিন্তু ইট, ওজন, সিল ও বিভিন্ন বস্তুগত সংস্কৃতির বিস্ময়কর সামঞ্জস্য প্রমাণ করে যে হরপ্পা একটি বৃহৎ আন্তঃআঞ্চলিক ব্যবস্থার অংশ ছিল।

হরপ্পার নগর কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল উঁচু প্ল্যাটফর্ম ও প্রাচীরঘেরা বিভিন্ন অংশ। অতীতে এগুলোর কিছু এলাকাকে সরাসরি ‘সিটাডেল’ বা দুর্গ হিসেবে বর্ণনা করা হতো। আধুনিক গবেষণায় এই শব্দ ব্যবহারে বেশি সতর্কতা দেখা যায়, কারণ এগুলো সত্যিই সামরিক দুর্গ ছিল কি না তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়।

শহরে আবাসিক ভবন, রাস্তা, নিকাশিব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের কর্মশালার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মহেঞ্জোদারোর মতো হরপ্পাতেও পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি গুরুত্ব ছিল। সিন্ধু নগরজীবনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল দৈনন্দিন অবকাঠামোকে সংগঠিতভাবে পরিচালনা করা।

হরপ্পার কিছু বৃহৎ ইটের কাঠামোকে অতীতে ‘শস্যাগার’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। ধারণা ছিল, এখানে রাষ্ট্র বা নগর কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ শস্য জমা রাখত। কিন্তু সরাসরি শস্য সংরক্ষণের যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায় এই ব্যাখ্যা বর্তমানে নিশ্চিত হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। কাঠামোগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

এই উদাহরণটি হরপ্পা গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখায়। প্রাথমিক প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অনেক সময় মেসোপটেমিয়া বা মিশরের পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তুলনা করে সিন্ধু স্থাপনাগুলোর নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু হরপ্পা সমাজকে অন্য সভ্যতার ছাঁচে ফেলে বোঝার চেষ্টা করলে ভুল সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

কারণ এই সভ্যতার রাজনৈতিক চেহারাই ছিল অস্বাভাবিক। এখানে মিশরের মতো বিশাল ফেরাউন-মূর্তি নেই, মেসোপটেমিয়ার মতো রাজাদের বিজয়লিপি নেই এবং নিশ্চিত বিশাল রাজপ্রাসাদও এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি। অথচ বিশাল অঞ্চলজুড়ে মানসম্মত পণ্য ও নগর সংস্কৃতি ছিল।

তাহলে হরপ্পা কে শাসন করত?

সম্ভবত রাজা বা শক্তিশালী শাসকগোষ্ঠী ছিল। আবার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বণিক, ভূমির মালিক, ধর্মীয় অভিজাত বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করা থাকতে পারে। লিখিত ভাষা পড়তে না পারা পর্যন্ত হরপ্পার শাসনব্যবস্থা প্রাচীন ইতিহাসের বড় রহস্য হিসেবেই থাকবে।

তবে তাদের অর্থনৈতিক সংগঠন সম্পর্কে প্রত্নতত্ত্ব অনেক বেশি তথ্য দেয়। হরপ্পায় পাওয়া মানসম্মত ঘনাকৃতির ওজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মাপের এসব ওজন একটি নিয়মিত পরিমাপব্যবস্থার অংশ ছিল। বাণিজ্য, কাঁচামাল বিতরণ কিংবা উৎপাদিত পণ্য পরিমাপের জন্য এগুলো ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।

কারুশিল্পেও হরপ্পাবাসীরা অত্যন্ত দক্ষ ছিল। কার্নেলিয়ানসহ বিভিন্ন পাথরের পুঁতি, শাঁখের অলংকার, মৃৎপাত্র, তামা ও ব্রোঞ্জের বস্তু এবং বিভিন্ন ধরনের সিল পাওয়া গেছে। বিশেষায়িত কারিগরদের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায় যে শহরের অর্থনীতি শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল না।

কৃষি অবশ্য নগরটির অস্তিত্বের মূল ভিত্তি ছিল। গম, যব, ডালসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হতো এবং গবাদিপশু পালন করা হতো। রাভি ও বৃহত্তর সিন্ধু নদীব্যবস্থার উর্বর সমভূমি কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছিল।

হরপ্পার বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিস্তৃত ছিল। সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন নগরের মধ্যে পণ্য চলাচলের পাশাপাশি পশ্চিমের অঞ্চলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। মেসোপটেমীয় নথিতে ‘মেলুহহা’ নামে একটি দূরবর্তী অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে, যাকে অধিকাংশ গবেষক সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করেন।

মেসোপটেমিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সিন্ধু ধরনের সিল, পুঁতি এবং অন্যান্য বস্তু পাওয়া গেছে। আবার সিন্ধু অঞ্চলেও দূরবর্তী উৎস থেকে আসা কাঁচামালের প্রমাণ রয়েছে। এর অর্থ হরপ্পার মতো নগরগুলো এমন এক বাণিজ্যব্যবস্থার অংশ ছিল, যা আরব সাগর ও পারস্য উপসাগর পেরিয়ে পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

হরপ্পার সবচেয়ে পরিচিত প্রত্নবস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে ছোট সিলমোহর। অনেক সিলে তথাকথিত ‘ইউনিকর্ন’ নামে পরিচিত একশৃঙ্গ প্রাণীর চিত্র দেখা যায়। এটি বাস্তব কোনো প্রাণীর প্রতিরূপ, পৌরাণিক প্রতীক, কোনো গোষ্ঠীর পরিচয় নাকি প্রশাসনিক চিহ্ন—তা জানা যায়নি।

সিলের ওপর কয়েকটি রহস্যময় লিখিত চিহ্ন থাকে। এগুলো মালিকের নাম, পেশা, প্রতিষ্ঠান, পণ্যের পরিচয় বা ধর্মীয় বার্তা নির্দেশ করতে পারে। কিন্তু সিন্ধু লিপি অপঠিত থাকায় এসব ব্যাখ্যা এখনো অনুমানের পর্যায়ে।

হরপ্পার আরেকটি অসাধারণ তথ্যসূত্র হলো এর সমাধিক্ষেত্র। বিশেষ করে ‘সেমেট্রি আর-৩৭’ নামে পরিচিত এলাকায় মানুষের কঙ্কাল ও সমাধিসামগ্রী পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন থেকে মানুষের শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক পরিচয় এবং মৃত্যুর পরের আচারের কিছু ধারণা পাওয়া যায়।

হরপ্পার সমাধিগুলো মিশরের রাজকীয় সমাধির মতো বিপুল সম্পদে পূর্ণ নয়। সাধারণত মৃতদেহের সঙ্গে মৃৎপাত্র, অলংকার বা সীমিত ব্যক্তিগত সামগ্রী পাওয়া যায়। এতে সামাজিক বৈষম্য ছিল না—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না, তবে অভিজাতদের ক্ষমতা প্রদর্শনের ধরন মিশর বা মেসোপটেমিয়ার তুলনায় ভিন্ন ছিল বলে মনে হয়।

হরপ্পার ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায় শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৯০০ সালের পর, যখন পরিণত সিন্ধু সভ্যতার নগরব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। মানসম্মত সিল ও ওজনের ব্যবহার কমে, দূরপাল্লার বাণিজ্যে পরিবর্তন আসে এবং বৃহৎ নগরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব হ্রাস পায়।

হরপ্পাও এই পরিবর্তনের বাইরে ছিল না। তবে এখানে ‘একদিনে শহর ধ্বংস’ হওয়ার কোনো পরিষ্কার গল্প নেই। শহরের নগর চরিত্র ধীরে ধীরে বদলে যায়। পরিণত হরপ্পা সংস্কৃতির পরবর্তী পর্যায়ে নতুন ধরনের মৃৎপাত্র, সমাধি ও বস্তুগত সংস্কৃতি দেখা যায়।

একসময় সিন্ধু সভ্যতার পতন ব্যাখ্যা করতে আর্য আক্রমণ তত্ত্ব অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ধারণা করা হতো উত্তর-পশ্চিম থেকে আগত ইন্দো-আর্য যোদ্ধারা হরপ্পা নগরগুলো ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে হরপ্পা ও অন্যান্য প্রধান নগরে এমন একটি সর্বব্যাপী সামরিক ধ্বংসস্তর পাওয়া যায়নি, যা এই সরল তত্ত্বকে সমর্থন করে।

বরং এখন পতনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সমন্বিত ফল হিসেবে দেখা হয়। বিশেষভাবে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের দুর্বলতা এবং নদীব্যবস্থার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সিন্ধু সভ্যতার কৃষি বিভিন্ন অঞ্চলে নদী, মৌসুমি বৃষ্টি ও স্থানীয় জলব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। দীর্ঘমেয়াদে বর্ষা দুর্বল হলে কিছু অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের ধরন বদলাতে হয়। বড় শহরের জন্য যে বিপুল খাদ্য উদ্বৃত্ত দরকার, তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

একই সময়ে নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হচ্ছিল। হরপ্পা রাভি নদীব্যবস্থার কাছাকাছি গড়ে উঠেছিল। নদীর প্রবাহ ও বন্যার ধরনে পরিবর্তন নগরের কৃষি, পানি এবং পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

পরিবেশের পরিবর্তন মানেই সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতার মৃত্যু নয়। মানুষ সাধারণত নিজেদের জীবনযাত্রা পরিবর্তন করে। হরপ্পা সভ্যতার ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটিই ঘটেছিল। বড় নগরে বসবাসের পরিবর্তে জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ছোট গ্রাম ও নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

দূরপাল্লার বাণিজ্যের পরিবর্তনও এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে। বিশেষায়িত কারিগর ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল বড় নগরগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন ঘটছিল।

ফলে হরপ্পার ‘পতন’কে মানুষের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়, নগরব্যবস্থার রূপান্তর হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। হরপ্পা সংস্কৃতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত রূপে পরবর্তী আঞ্চলিক সমাজে অব্যাহত থাকে।

তবু শহরটি শেষ পর্যন্ত তার পুরোনো মহানগরীয় গুরুত্ব হারায়। বিশাল নগরব্যবস্থা আর আগের মতো পরিচালিত হয় না। সিল, লিখন, মানসম্মত ওজন এবং বৃহৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার অনেক বৈশিষ্ট্য অদৃশ্য হয়ে যায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, সিন্ধু লিপিও ব্যবহার থেকে হারিয়ে যায়।

তারপর শতাব্দী পেরিয়ে সহস্রাব্দ চলে যায়। হরপ্পার প্রকৃত পরিচয় মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। বিশাল প্রাচীন ইটের ঢিবি থেকে স্থানীয়ভাবে ইট নেওয়া হতো। উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে রেলপথ নির্মাণের সময়ও হরপ্পার প্রাচীন পোড়ানো ইট বিপুল পরিমাণে তুলে নিয়ে রেললাইনের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হয়।

এটি প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ঘটনা। যে সভ্যতার উন্নত ইট নির্মাণ হাজার হাজার বছর টিকে ছিল, সেই ইটের একটি অংশ আধুনিক রেলপথ তৈরির জন্য ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল—তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝার আগেই।

উনিশ শতকে আলেকজান্ডার কানিংহামসহ গবেষকেরা হরপ্পার নিদর্শনের প্রতি আগ্রহ দেখান। কিন্তু শহরটির প্রকৃত বয়স তখনো বোঝা যায়নি। বড় পরিবর্তন আসে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে।

দয়ারাম সাহনির নেতৃত্বে ১৯২০-এর দশকের শুরুতে হরপ্পায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালিত হয়। একই সময়ে মহেঞ্জোদারোতেও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার সামনে আসে। এরপর জন মার্শাল ঘোষণা করেন যে ভারতীয় উপমহাদেশে মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সমসাময়িক একটি অজানা ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা ছিল।

এই আবিষ্কার দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসকে আমূল বদলে দেয়। আগে যেখানে উপমহাদেশের প্রাচীন নগর ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা অনেক পরে শুরু হতো, সেখানে হরপ্পা প্রমাণ করল যে সাড়ে চার হাজার বছর আগেই এই অঞ্চলে বৃহৎ, পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত নগরসমাজ ছিল।

আধুনিক গবেষণা হরপ্পাকে আরও জটিলভাবে দেখতে শিখিয়েছে। এটি শুধু কয়েকটি বিখ্যাত ধ্বংসাবশেষের শহর নয়; এর বিভিন্ন অংশে আবাসিক এলাকা, উৎপাদনকেন্দ্র, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘ সময়ের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের চিহ্ন রয়েছে। নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানুষের হাড়, প্রাণীর অবশেষ, উদ্ভিদ, মাটি এবং বিভিন্ন কাঁচামালের উৎস বিশ্লেষণ করে শহরের জীবন পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।

তারপরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। হরপ্পার শাসক কারা ছিলেন? তাদের রাষ্ট্রের প্রকৃতি কী ছিল? তারা কোন ভাষায় কথা বলত? সিলের রহস্যময় চিহ্নগুলোতে কী লেখা আছে? শহরের বিভিন্ন অংশ কে পরিচালনা করত?

এ কারণেই হরপ্পার ইতিহাসে একটি অসাধারণ বৈপরীত্য রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এর মানুষের ব্যবহৃত ওজন হাতে নিতে পারেন, তাদের তৈরি পুঁতি পরীক্ষা করতে পারেন, তাদের সমাধি বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং তাদের বাড়ির দেয়াল পর্যন্ত অনুসরণ করতে পারেন—কিন্তু তাদের নিজেদের লেখা একটি বাক্যও নিশ্চিতভাবে পড়তে পারেন না।

হরপ্পা তাই হারিয়ে যাওয়া মানুষের শহর নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া একটি নগরব্যবস্থার শহর। এর বাসিন্দারা কোনো এক রহস্যময় দিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। পরিবেশ, নদী, কৃষি, বাণিজ্য এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সঙ্গে তারা নিজেদের জীবনযাত্রা বদলেছিল, নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং নতুন সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে গিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গিয়েছিল বিশাল ইটের নগর, মানসম্মত সিল ও ওজনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং সেই রহস্যময় লিখিত ভাষা। আর কয়েক হাজার বছর পরে যখন হরপ্পার মাটি আবার খোঁড়া হলো, তখন পৃথিবী আবিষ্কার করল এমন একটি সভ্যতাকে, যার অস্তিত্বই দীর্ঘকাল ভুলে যাওয়া হয়েছিল।

হরপ্পার সবচেয়ে বড় রহস্য তাই এর ধ্বংস নয়, বরং এর নীরবতা। এত সংগঠিত একটি মহানগর হাজার হাজার প্রত্নবস্তু রেখে গেছে, অথচ তার শাসক, ভাষা, রাজনীতি এবং নিজের নাম পর্যন্ত আমাদের জানায়নি। সেই কারণেই হরপ্পার পোড়ানো ইট, অপঠিত সিল এবং পরিত্যক্ত নগরস্তর আজও দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অমীমাংসিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে রয়েছে।