ইতালির প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ ও আইসোনজোর যুদ্ধ: আল্পসের দুর্গম রণাঙ্গনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ইতিহাস
Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
- Author: Admin
- August 30, 2026
ইতালির প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ ও আইসোনজোর যুদ্ধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ইতালি ইউরোপের একটি বড় সামরিক শক্তি হলেও ১৯১৪ সালের আগস্টে সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইতালি তখন জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সঙ্গে ট্রিপল অ্যালায়েন্সের সদস্য ছিল। কাগজে-কলমে তাকে কেন্দ্রীয় শক্তির সম্ভাব্য সহযোগী মনে হওয়া স্বাভাবিক। অথচ ১৯১৫ সালের মে মাসে ইতালি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গিয়ে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে অস্বাভাবিক রণাঙ্গনগুলোর একটি—আল্পসের তুষারঢাকা পর্বত, খাড়া পাথুরে ঢাল এবং আইসোনজো নদীর উপত্যকাজুড়ে এমন এক যুদ্ধ, যেখানে শত্রুর গুলির পাশাপাশি পাহাড়, বরফ, ঠান্ডা ও তুষারধসও সৈন্যদের হত্যা করত।
১৮৮২ সালে ইতালি জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সঙ্গে ট্রিপল অ্যালায়েন্সে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু এই জোটের মধ্যেই একটি মৌলিক বৈপরীত্য ছিল। ইতালীয় জাতীয়তাবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির নিয়ন্ত্রণাধীন এমন কিছু অঞ্চল দাবি করছিল, যেখানে উল্লেখযোগ্য ইতালীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ছিল বা যেগুলোকে ইতালীয় জাতীয় ঐক্যের অসম্পূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হতো। বিশেষ করে ত্রেন্তিনো ও ত্রিয়েস্তে ইতালীয় জাতীয়তাবাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলগুলোকে অনেক জাতীয়তাবাদী ইতালিয়া ইররেদেন্তা বা ‘অমুক্ত ইতালি’র অংশ বলত।
ফলে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি একই সঙ্গে ইতালির আনুষ্ঠানিক মিত্র এবং ঐতিহাসিক ভূখণ্ডগত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ১৯১৪ সালের জুলাই সংকটের পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে ইতালি যুক্তি দেয় যে ট্রিপল অ্যালায়েন্স মূলত প্রতিরক্ষামূলক জোট। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি নিজেই আক্রমণাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছে বলে ইতালি সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য নয়। ২ আগস্ট ১৯১৪ ইতালি নিরপেক্ষতা ঘোষণা করে।
কিন্তু এই নিরপেক্ষতা নিষ্ক্রিয় ছিল না। ইতালীয় সরকার দ্রুত বুঝতে পারে যে যুদ্ধ তার জন্য ভূখণ্ড লাভের একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও সালান্দ্রা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিদনি সোনিনো উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—ইতালির যুদ্ধে প্রবেশের বিনিময়ে কে বেশি ভূখণ্ড দিতে প্রস্তুত?
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কিছু ছাড় নিয়ে আলোচনা করলেও ইতালির দাবির পুরোটা মেনে নিতে অনিচ্ছুক ছিল। অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মিত্রশক্তি ইতালিকে নিজেদের পক্ষে আনতে আরও উদার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২৬ এপ্রিল ১৯১৫ গোপন লন্ডন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর অধীনে ইতালিকে যুদ্ধের পর ত্রেন্তিনো, দক্ষিণ টাইরলের ব্রেনার পর্যন্ত অঞ্চল, ত্রিয়েস্তে, ইস্ত্রিয়ার বড় অংশ এবং অ্যাড্রিয়াটিক অঞ্চলের আরও কিছু ভূখণ্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
চুক্তিটি ইতালীয় সাধারণ জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। দেশের ভেতরে যুদ্ধে প্রবেশ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জিওভান্নি জিওলিত্তিসহ বহু রাজনীতিক নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বড় অংশও যুদ্ধবিরোধী ছিল। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী, হস্তক্ষেপপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং গাব্রিয়েলে দানুনৎসিওর মতো ব্যক্তিরা যুদ্ধকে ইতালীয় জাতীয় ঐক্য সম্পূর্ণ করার সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
শেষ পর্যন্ত রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল এবং সালান্দ্রা সরকারের অবস্থান প্রাধান্য পায়। ২৩ মে ১৯১৫ ইতালি অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ২৪ মে থেকে সামরিক অভিযান শুরু হয়। তবে ইতালি তখনই জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি; জার্মানির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ইতালীয় যুদ্ধ ঘোষণা আসে ১৯১৬ সালের আগস্টে।
ইতালির যুদ্ধে প্রবেশ কেন্দ্রীয় শক্তির জন্য নতুন একটি দীর্ঘ রণাঙ্গন তৈরি করে। সুইস সীমান্তের কাছ থেকে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ইতালি-অস্ট্রিয়া সীমান্তের বড় অংশই ছিল আল্পস পর্বতমালার মধ্যে। কোথাও সৈন্যদের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থান করতে হয়েছে। কিন্তু ইতালীয় প্রধান সেনাপতি জেনারেল লুইজি কাদোর্নার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণপথ ছিল পূর্বদিকে আইসোনজো নদীর অঞ্চল।
আইসোনজো—বর্তমানে স্লোভেনিয়ায় সোচা নামে পরিচিত—আল্পস থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে অ্যাড্রিয়াটিকের দিকে গেছে। নদীর পূর্বদিকে ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় উচ্চভূমি ও প্রতিরক্ষা অবস্থান। ইতালীয় পরিকল্পনার বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল গোরিৎসিয়া দখল করে কারসো মালভূমির ওপর দিয়ে ত্রিয়েস্তে এবং সম্ভব হলে আরও পূর্বে অগ্রসর হওয়া। মানচিত্রে পথটি আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবে এটি আক্রমণকারীর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।
উচ্চভূমি অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়দের হাতে থাকায় তারা নিচ থেকে উঠে আসা ইতালীয় সৈন্যদের পর্যবেক্ষণ ও গুলি করার বিশাল সুবিধা পেত। চুনাপাথরের পাথুরে ভূমিতে ট্রেঞ্চ খোঁড়াও কঠিন ছিল। বিস্ফোরিত কামানের গোলা পাথরের অসংখ্য ধারালো টুকরো ছড়িয়ে দিয়ে আঘাতের ভয়াবহতা বাড়াত। নদী পার হওয়ার পর আক্রমণকারী সৈন্যদের খাড়া ঢাল বেয়ে কাঁটাতার, মেশিনগান ও কামানের সামনে এগোতে হতো।
১৯১৫ সালের জুনে শুরু হয় আইসোনজোর প্রথম যুদ্ধ। কাদোর্না সংখ্যাগত সুবিধা ব্যবহার করে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় প্রতিরক্ষা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ভারী কামান ও কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষার কারণে ইতালীয় বাহিনী বড় সাফল্য পায়নি। জুলাইয়ে দ্বিতীয় আইসোনজো যুদ্ধেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। প্রচণ্ড আক্রমণ ও বিপুল হতাহতের পরও অর্জিত ভূখণ্ড ছিল সীমিত।
অক্টোবর ও নভেম্বর ১৯১৫-তে তৃতীয় ও চতুর্থ আইসোনজো যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতালীয় কামানের শক্তি বাড়লেও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় প্রতিরক্ষা পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। ১৯১৫ সালের শেষ নাগাদ চারটি বড় আইসোনজো যুদ্ধ হয়ে গেছে, হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে, অথচ কৌশলগত মানচিত্রে পরিবর্তন ছিল সামান্য। পশ্চিম রণাঙ্গনের মতো এখানেও আধুনিক প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র আক্রমণকারীর জন্য ভয়াবহ মূল্য তৈরি করছিল।
তবে ইতালীয় রণাঙ্গনের জীবন পশ্চিম ফ্রন্টের ট্রেঞ্চের চেয়েও কিছু ক্ষেত্রে কঠিন ছিল। ডলোমাইট ও আল্পসের উঁচু অবস্থানগুলোতে সৈন্যদের বরফ কেটে আশ্রয় বানাতে হতো। পাহাড়ের ভেতর সুড়ঙ্গ খোঁড়া, পাথরের দেয়ালে অবস্থান তৈরি এবং রশি ও সিঁড়ি ব্যবহার করে অস্ত্র ও খাদ্য ওপরে তুলতে হতো। বিভিন্ন স্থানে কেবলওয়ে নির্মাণ করে গোলাবারুদ, খাবার ও সরঞ্জাম দুর্গম উচ্চতায় পৌঁছানো হয়।
শীত এলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠত। প্রচণ্ড ঠান্ডা, তুষারঝড় এবং বরফে সৈন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়ত। পাহাড়ি অঞ্চলে তুষারধস ছিল একটি প্রাণঘাতী অস্ত্রের মতো। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরের ভয়াবহ তুষারধসে উভয় পক্ষের হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয় বলে অনুমান করা হয়। কোনো কোনো অবস্থানে শত্রুর কামানের চেয়ে প্রকৃতিই বেশি মানুষ হত্যা করেছে।
এই পাহাড়ি যুদ্ধে বিশেষ দক্ষ বাহিনীর গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। ইতালির আল্পিনি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পর্বতযুদ্ধে প্রশিক্ষিত ইউনিটগুলো দুর্গম উচ্চতায় লড়াই করত। কখনো একটি পাহাড়ের চূড়া বা রিজ দখলের জন্য দুই পক্ষ পাথরের ভেতর সুড়ঙ্গ খুঁড়ে শত্রু অবস্থানের নিচে বিস্ফোরক স্থাপন করেছে। পাহাড় নিজেই যেন একটি বিশাল দুর্গে পরিণত হয়েছিল, যার প্রতিটি চূড়া ও গিরিপথের সামরিক মূল্য ছিল।
১৯১৬ সালের মার্চে পঞ্চম আইসোনজো যুদ্ধ সীমিত আকারে পরিচালিত হয়। কিন্তু কিছুদিন পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি নিজেই ত্রেন্তিনো অঞ্চল থেকে একটি বড় আক্রমণ শুরু করে। মে মাসে শুরু হওয়া এই অভিযানকে ইতালীয়রা স্ট্রাফএক্সপেডিশন বা শাস্তিমূলক অভিযান নামে জানত। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় বাহিনী আসিয়াগো মালভূমিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে এবং ইতালীয় সমভূমির দিকে হুমকি সৃষ্টি করে।
কিন্তু অস্ট্রিয়ার আক্রমণ শেষ পর্যন্ত থেমে যায়। পূর্ব রণাঙ্গনে রাশিয়ার ব্রুসিলভ আক্রমণ অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে মারাত্মক চাপের মুখে ফেলে এবং ইতালীয় ফ্রন্ট থেকে বাহিনী সরানোর প্রয়োজন তৈরি হয়। কাদোর্না সুযোগ নিয়ে আবার আইসোনজোর দিকে মনোযোগ দেন।
১৯১৬ সালের আগস্টে আইসোনজোর ষষ্ঠ যুদ্ধ ইতালির জন্য এই ধারাবাহিক সংঘর্ষের প্রথম বড় সাফল্য এনে দেয়। শক্তিশালী কামান প্রস্তুতির পর ইতালীয় বাহিনী সাবোতিনো ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে এবং শেষ পর্যন্ত গোরিৎসিয়া শহর অধিকার করে। দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার পর এই বিজয় ইতালীয় জনমনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় বাহিনী পূর্বদিকে নতুন প্রতিরক্ষা লাইন তৈরি করে, ফলে প্রত্যাশিত বড় ধরনের ভাঙন ঘটেনি।
এরপর আবার শুরু হয় একই চক্র। ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরে সপ্তম, অষ্টম ও নবম আইসোনজো যুদ্ধ পরিচালিত হয়। ১৯১৭ সালে দশম এবং পরে একাদশ আইসোনজো যুদ্ধ হয়। প্রতিবার ইতালীয় কামান পাহাড়ে আঘাত করত, পদাতিক সৈন্য সামনে এগোত, কয়েকটি অবস্থান দখল হতো, তারপর অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় প্রতিরোধ আক্রমণের গতি থামিয়ে দিত।
বিশেষ করে ১৯১৭ সালের একাদশ আইসোনজো যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত বড়। ইতালীয় বাহিনী বাইন্সিৎসা মালভূমিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় প্রতিরক্ষার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু ইতালীয় ক্ষয়ক্ষতিও ছিল বিপুল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির নেতৃত্ব বুঝতে পারে যে আরেকটি একই মাত্রার ইতালীয় আক্রমণ প্রতিরক্ষা ভেঙে দিতে পারে। তাই জার্মানির সহায়তা চাওয়া হয়।
আইসোনজো যুদ্ধগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কাদোর্নার কঠোর নেতৃত্ব। তিনি শৃঙ্খলা ও সরাসরি আক্রমণের ওপর অত্যন্ত জোর দিতেন এবং ব্যর্থতার জন্য অধস্তন কমান্ডারদের দ্রুত সরিয়ে দিতেন। ইতালীয় সেনাবাহিনীতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছিল কঠোর। সামনের সারির সৈন্যদের ওপর বারবার এমন অবস্থানে আক্রমণের নির্দেশ আসত, যেখানে সামান্য ভূখণ্ড অর্জনের সম্ভাবনার বিপরীতে হতাহতের ঝুঁকি ছিল অসাধারণ বেশি।
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির অবস্থাও সহজ ছিল না। বহুজাতিক সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী একই সঙ্গে রাশিয়া, ইতালি এবং বলকানের বিভিন্ন রণাঙ্গনে চাপের মুখে ছিল। আইসোনজোতে প্রতিরক্ষাকারীরা ভূখণ্ডগত সুবিধা পেলেও তাদের জনশক্তি ও রসদের সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রতিটি ইতালীয় আক্রমণ প্রতিহত করার মূল্য অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সেনাবাহিনীকেও ক্রমে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।
১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে আইসোনজো নদীর আশপাশে এগারোটি ইতালীয় আক্রমণাত্মক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এরপর ১৯১৭ সালের অক্টোবরে দ্বাদশ আইসোনজো যুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেবে—যা ইতিহাসে কাপোরেত্তোর যুদ্ধ নামে বেশি পরিচিত। সেখানে জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় বাহিনী নতুন অনুপ্রবেশমূলক কৌশল, গ্যাস ও কেন্দ্রীভূত আক্রমণ ব্যবহার করে ইতালীয় প্রতিরক্ষা ভেঙে দেবে এবং ইতালীয় সেনাবাহিনীকে বিপর্যয়কর পশ্চাদপসরণে বাধ্য করবে।
তবু আইসোনজোর প্রথম এগারো যুদ্ধের ইতিহাস নিজেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শিল্পায়িত যুদ্ধের এক নির্মম উদাহরণ। ইতালি যুদ্ধের মাধ্যমে দ্রুত সেই অঞ্চলগুলো অর্জন করতে চেয়েছিল, যেগুলোকে জাতীয় ঐক্যের অসম্পূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হতো। বাস্তবে প্রতিটি পাহাড়, রিজ, গ্রাম এবং নদী পারাপারের জন্য তাকে বিপুল জীবন দিতে হয়েছে। ১৯১৫ সালে দ্রুত অগ্রযাত্রার আশা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়।
ইতালির যুদ্ধে প্রবেশের বৃহত্তর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে নতুন একটি দীর্ঘ ফ্রন্টে বিপুল সেনাবাহিনী আটকে রাখতে হয়। ফলে রাশিয়া ও বলকান ফ্রন্টে তার সামরিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একই সঙ্গে ইতালি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সঙ্গে একটি প্রধান মিত্রশক্তিতে পরিণত হয় এবং ভূমধ্যসাগর ও অ্যাড্রিয়াটিক অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে যায়।
কিন্তু সাধারণ ইতালীয় ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সৈন্যের কাছে এই বৃহৎ কূটনৈতিক হিসাবের অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের যুদ্ধক্ষেত্র ছিল বরফে ঢাকা সরু পাহাড়ি পথ, পাথরের মধ্যে খোঁড়া ট্রেঞ্চ, মাথার ওপর তুষারধসের আশঙ্কা এবং নিচে গভীর খাদ। পশ্চিম রণাঙ্গনে যেখানে কয়েকশ মিটার কাদাময় জমির জন্য মানুষ মরছিল, ইতালীয় রণাঙ্গনে কখনো একটি নির্জন পাথুরে চূড়ার কয়েক মিটার উচ্চতার জন্যও শত শত জীবন হারানো হয়েছে।
ইতালির প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ তাই শুধু একটি দেশের জোট পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি জাতীয়তাবাদ, ভূখণ্ডের আকাঙ্ক্ষা এবং গোপন কূটনীতির সিদ্ধান্ত কীভাবে সাধারণ সৈন্যদের অবিশ্বাস্য কঠিন যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে, তার ইতিহাস। আইসোনজোর ধারাবাহিক যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে আল্পসের উচ্চভূমিতে সাহস ও বিপুল জনশক্তি দিয়েও আধুনিক কামান, মেশিনগান, কাঁটাতার এবং সুবিধাজনক প্রতিরক্ষা অবস্থান সহজে পরাস্ত করা যায় না। ইতালি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধজয়ী রাষ্ট্রগুলোর একটি হবে, কিন্তু সেই বিজয়ের পথে আইসোনজো ও আল্পসের পাথুরে পাহাড়ে যে মূল্য দিতে হয়েছিল, তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও কঠোর অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ইতিহাসে থেকে গেছে।
ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন: দ্বিতীয়বার সিংহাসন ত্যাগ, সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন ও ইউরোপে এক যুগের অবসান
প্রুশিয়ানদের আগমন ও ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন: ওয়েলিংটন ও ব্লুশার কীভাবে ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন?
ওয়াটারলুর যুদ্ধ ১৮১৫: হুগোমোঁ, লা হে সাঁত, ফরাসি অশ্বারোহী আক্রমণ ও নেপোলিয়নের শেষ লড়াইয়ের পূর্ণ ইতিহাস
লিনি ও কোয়াত্র-ব্রার যুদ্ধ: ওয়াটারলুর দুই দিন আগে নেপোলিয়নের বিজয় কীভাবে হারানো সুযোগে পরিণত হয়েছিল?
সপ্তম জোট ও বেলজিয়াম অভিযান: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারকে আলাদা করে ধ্বংস করার নেপোলিয়নের শেষ সামরিক পরিকল্পনা
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও ‘হান্ড্রেড ডেজ’: নেপোলিয়ন কীভাবে আবার ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করে ইউরোপকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন?