প্রুশিয়ানদের আগমন ও ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন: ওয়েলিংটন ও ব্লুশার কীভাবে ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন?
Series: ওয়াটারলুর যুদ্ধ: নেপোলিয়নের শেষ লড়াই ও এক যুগের অবসান
- Author: Admin
- August 30, 2026
প্রুশিয়ানদের আগমন ও ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন
১৮১৫ সালের ১৮ জুন সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে ওয়াটারলুর যুদ্ধক্ষেত্রে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এমন এক সামরিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যার সমাধান করার মতো সময়, সৈন্য এবং সুযোগ—তিনটিই দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। সারাদিন ধরে ডিউক অব ওয়েলিংটনের অ্যাংলো-মিত্র বাহিনী মঁ-সাঁ-জঁ রিজে প্রচণ্ড ফরাসি আক্রমণ সহ্য করেও অবস্থান ধরে রেখেছিল। হুগোমোঁ দখল করা যায়নি, বিশাল অশ্বারোহী আক্রমণ মিত্র পদাতিক স্কোয়ার ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে এবং লা হে সাঁত দখলের পরও ওয়েলিংটনের কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েনি। কিন্তু নেপোলিয়নের জন্য আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটছিল পূর্বদিকে। লিনিতে মাত্র দুই দিন আগে তার হাতে পরাজিত প্রুশিয়ান সেনাবাহিনী আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসছিল।
ওয়াটারলুর ফল বুঝতে হলে ১৬ জুনের লিনির যুদ্ধের পর প্রুশিয়ানদের পশ্চাদপসরণ বোঝা জরুরি। নেপোলিয়ন আশা করেছিলেন ব্লুশারের পরাজিত বাহিনী পূর্বদিকে সরে যাবে এবং ওয়েলিংটনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু প্রুশিয়ানরা উত্তরের দিকে ওয়াভরের দিকে সরে গিয়ে নিজেদের পুনর্গঠন করে। এতে তাদের ওয়েলিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় থাকে। আহত হওয়া সত্ত্বেও ফিল্ড মার্শাল গেবহার্ড লেবেরেখট ফন ব্লুশার দ্রুত আবার নেতৃত্বে ফিরে আসেন এবং ওয়েলিংটনকে সাহায্য করার ব্যাপারে দৃঢ় থাকেন।
নেপোলিয়ন এই বিপদ ঠেকাতে মার্শাল এমমানুয়েল দ্য গ্রুশির অধীনে প্রায় ৩৩ হাজার সৈন্য প্রুশিয়ানদের অনুসরণে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রুশি মূল প্রুশিয়ান বাহিনীকে ওয়েলিংটনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেননি। ১৮ জুন তিনি ওয়াভরের দিকে প্রুশিয়ান পশ্চাৎরক্ষীদের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন, অথচ ব্লুশারের সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিমধ্যে পশ্চিমদিকে ওয়াটারলুর উদ্দেশে অগ্রসর হচ্ছিল। ফলে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে, আর তার পরাজিত শত্রুর একটি বড় অংশ ঠিক বিপরীত দিকে—ওয়াটারলুর দিকে—অগ্রসর হচ্ছিল।
প্রুশিয়ানদের যাত্রাও সহজ ছিল না। আগের দিনের প্রবল বৃষ্টিতে রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছিল। কামান, গোলাবারুদের গাড়ি ও সৈন্যদের সরু পথে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হচ্ছিল। অনেক সৈন্য লিনির যুদ্ধের ক্লান্তি বহন করছিল। তারপরও ব্লুশার ও তার অধিনায়কেরা অগ্রযাত্রা চালিয়ে যান। এই দৃঢ়তার পেছনে ছিল মিত্রবাহিনীর কৌশলগত সহযোগিতা—ওয়েলিংটন মঁ-সাঁ-জঁতে অবস্থান ধরে রাখবেন এবং প্রুশিয়ানরা সম্ভব হলে তার ডান দিকে এসে ফরাসিদের ওপর আঘাত করবে।
দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেপোলিয়নের সদর দপ্তর পূর্বদিকে সৈন্য চলাচলের লক্ষণ দেখতে পায়। প্রথমে তাদের পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যায় যে তারা গ্রুশির ফরাসি সৈন্য নয়। প্রুশিয়ান জেনারেল ফ্রিডরিখ ভিলহেল্ম ফন বিউলোর চতুর্থ কোর যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে আসছিল। এই মুহূর্ত থেকে নেপোলিয়নের যুদ্ধ আর শুধু ওয়েলিংটনের বিরুদ্ধে থাকল না। তাকে একই সঙ্গে সামনে ও পূর্ব দিকের দুটি হুমকি মোকাবিলা করতে হলো।
প্রুশিয়ান অগ্রযাত্রার প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হয়ে ওঠে প্লঁসেনোয়া। গ্রামটি ফরাসি ডান ও পশ্চাৎভাগের কাছে অবস্থিত ছিল। এটি প্রুশিয়ানদের হাতে গেলে নেপোলিয়নের যোগাযোগ ও পশ্চাদপসরণের পথ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারত। তাই নেপোলিয়ন প্রথমে জেনারেল লোবোর ষষ্ঠ কোরকে পূর্বদিকে পাঠান। এর অর্থ ছিল ওয়েলিংটনের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য ফরাসি শক্তির একটি অংশকে মূল যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নিতে হচ্ছে।
বিউলোর সৈন্যরা লোবোর ওপর চাপ বাড়াতে থাকলে প্লঁসেনোয়াকে ঘিরে প্রচণ্ড সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রুশিয়ানরা সংখ্যায় ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছিল এবং ফরাসিদের পিছিয়ে যেতে বাধ্য করছিল। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যে নেপোলিয়ন ইয়াং গার্ডের ইউনিট পাঠাতে বাধ্য হন। তারা পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি উদ্ধার করলেও প্রুশিয়ান চাপ থামেনি। পরবর্তীতে গার্ডের আরও অভিজ্ঞ ইউনিট পাঠিয়ে প্লঁসেনোয়ার কিছু অংশ পুনর্দখল করা হয়।
এই লড়াইয়ের তাৎপর্য শুধু একটি গ্রামের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। প্রুশিয়ানরা নেপোলিয়নের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—তার রিজার্ভ—ক্ষয় করতে শুরু করেছিল। যে ইম্পেরিয়াল গার্ডকে তিনি ওয়েলিংটনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাতের জন্য অক্ষত রাখতে চাইতেন, তার অংশবিশেষ এখন পূর্বদিকে পাঠাতে হচ্ছিল। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ফরাসি সৈন্যরা বুঝতে শুরু করেছিল নতুন একটি শত্রুবাহিনী তাদের ডান দিকে এসে পৌঁছেছে।
তবু বিকেলের শেষভাগে ফরাসিদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর লা হে সাঁত ফরাসিদের হাতে পড়ে। এর ফলে নে ওয়েলিংটনের কেন্দ্রের অত্যন্ত কাছে সৈন্য ও কামান আনতে সক্ষম হন। মিত্রবাহিনীর বহু ইউনিট তখন সারাদিনের যুদ্ধের পর ক্লান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত। ওয়েলিংটনের কেন্দ্রের কিছু অংশে পরিস্থিতি সত্যিই সংকটজনক হয়ে ওঠে। নে আরও সৈন্য চাইছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করছিলেন দ্রুত নতুন আঘাত দিলে মিত্রবাহিনীর কেন্দ্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব।
কিন্তু নেপোলিয়ন একই সময়ে প্লঁসেনোয়ার সংকট মোকাবিলা করছিলেন। সামনে ওয়েলিংটন, ডান দিকে প্রুশিয়ানরা—দুই দিকের চাপের মধ্যে তাকে রিজার্ভ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। ওয়াটারলুর শেষ পর্যায়ের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ছিল, নেপোলিয়নের হাতে আর পর্যাপ্ত সময় ছিল না। সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে ওয়েলিংটনকে পরাজিত না করতে পারলে আরও প্রুশিয়ান সৈন্য এসে পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ অসম্ভব করে তুলবে।
শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ন তার সবচেয়ে বিখ্যাত সামরিক সম্পদ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন—ইম্পেরিয়াল গার্ড। নেপোলিয়নের দীর্ঘ সামরিক জীবনে গার্ড শুধু অভিজাত সৈন্যদল ছিল না; এটি ছিল সম্রাটের ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং ফরাসি সেনাবাহিনীর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত গার্ড সাধারণত সবচেয়ে সংকটপূর্ণ মুহূর্তের জন্য সংরক্ষিত থাকত। তাদের যুদ্ধে প্রবেশ মানে ছিল নেপোলিয়ন সিদ্ধান্তমূলক ফল চাইছেন।
সন্ধ্যার দিকে গার্ডের নির্বাচিত ব্যাটালিয়নগুলো মঁ-সাঁ-জঁ রিজের দিকে অগ্রসর হয়। তারা সম্পূর্ণ গার্ড নয়; মিডল গার্ড হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অভিজ্ঞ ইউনিট মূল আক্রমণে অংশ নেয়, আর ওল্ড গার্ডের কিছু অংশ রিজার্ভ ও পশ্চাৎরক্ষী হিসেবে থেকে যায়। ফরাসি লাইনের অন্য অংশেও আক্রমণ চালানো হয়, যাতে ওয়েলিংটনের প্রতিরক্ষা ব্যস্ত থাকে। নেপোলিয়নের আশা ছিল গার্ডের আঘাত মিত্রবাহিনীর ক্লান্ত কেন্দ্রকে শেষ পর্যন্ত ভেঙে দেবে।
গার্ড ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। তাদের সামনে কামানের গোলা ও মাস্কেটের গুলি আসছিল, কিন্তু অভিজ্ঞ সৈন্যরা শৃঙ্খলা বজায় রেখে অগ্রসর হয়। ধোঁয়ায় দৃশ্যমানতা সীমিত ছিল এবং রিজের বিপরীত ঢালে ওয়েলিংটনের কিছু ইউনিট ফরাসিদের চোখের আড়ালে ছিল। ফলে গার্ডের সৈন্যরা ওপরে উঠে এমন প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়, যা নিচ থেকে পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
ওয়েলিংটনের কৌশলের অন্যতম শক্তি ছিল সৈন্যদের রিজের আড়ালে রাখা। গার্ডের কিছু ইউনিট সামনে এগিয়ে এলে মিত্র পদাতিকরা কাছাকাছি দূরত্ব থেকে প্রচণ্ড গুলি চালায়। ব্রিটিশ গার্ড ইউনিট এবং অন্যান্য মিত্র সৈন্য ফরাসিদের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করে। অন্য এলাকাতেও গার্ডের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। ফরাসিরা পুনর্গঠনের চেষ্টা করলেও মিত্রদের প্রতিরোধ ক্রমেই শক্তিশালী হয়।
তারপর ঘটে সেই ঘটনা, যা নেপোলিয়নিক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত মুহূর্ত। ইম্পেরিয়াল গার্ডের আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং তাদের কিছু ব্যাটালিয়ন পিছিয়ে যেতে শুরু করে। গার্ড সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়নি এবং অনেক সৈন্য শৃঙ্খলাবদ্ধভাবেই পশ্চাদপসরণ করেছিল, কিন্তু সাধারণ ফরাসি সৈন্যদের কাছে দৃশ্যটির মানসিক প্রভাব ছিল বিপর্যয়কর। যে গার্ডকে শেষ ভরসা হিসেবে দেখা হতো, তারাও যদি শত্রুর লাইন ভাঙতে না পারে, তাহলে বিজয়ের আর কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
“গার্ড পিছিয়ে যাচ্ছে”—এই উপলব্ধি ফরাসি লাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সারাদিনের ক্লান্তি, প্রুশিয়ানদের আগমন, ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যর্থ আক্রমণের পর সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। অনেক ইউনিট সংগঠিত পশ্চাদপসরণের পরিবর্তে বিশৃঙ্খলভাবে পিছিয়ে যেতে শুরু করে। গার্ডের সামরিক ব্যর্থতার চেয়েও তার প্রতীকী পতন ছিল বেশি ধ্বংসাত্মক।
ওয়েলিংটন বুঝতে পারেন মুহূর্তটি এসে গেছে। তিনি নিজের অবস্থান থেকে মিত্রবাহিনীকে সাধারণ অগ্রযাত্রার নির্দেশ দেন। এতক্ষণ যারা রিজ ধরে প্রতিরক্ষা করছিল, তারা এবার সামনে এগিয়ে আসে। একই সময়ে প্রুশিয়ানরা পূর্ব দিক থেকে আরও শক্তিশালী আক্রমণ চালাচ্ছিল। ফলে নেপোলিয়নের বাহিনী দুই দিকের চাপের মধ্যে পড়ে যায়।
প্লঁসেনোয়ায় পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যায়। আরও প্রুশিয়ান ইউনিট এসে পৌঁছালে ফরাসিদের পক্ষে গ্রাম ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তীব্র ঘর-থেকে-ঘর লড়াইয়ের পর প্রুশিয়ানরা প্লঁসেনোয়া দখল করে। এর ফলে ফরাসি পশ্চাদপসরণের পথের ওপর চাপ আরও বাড়ে। নেপোলিয়নের যে পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ওয়েলিংটন ও ব্লুশারকে আলাদা করে পৃথকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে, তার শেষ দৃশ্যে ঠিক সেই দুই সেনাপতির বাহিনী দুই দিক থেকে তার সেনাবাহিনীকে চেপে ধরছিল।
ফরাসি বাহিনীর অধিকাংশ অংশ ভেঙে পড়লেও ইম্পেরিয়াল গার্ডের কিছু ইউনিট শেষ পর্যন্ত শৃঙ্খলা বজায় রাখে। তারা স্কোয়ার গঠন করে পশ্চাদপসরণকারী সেনাবাহিনীকে কিছুটা আড়াল দেওয়ার চেষ্টা করে। নেপোলিয়নও একসময় গার্ডের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র উদ্ধার করার আর কোনো উপায় ছিল না। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ফরাসি সেনাবাহিনীর পশ্চাদপসরণ ব্যাপক বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়।
এখানে ব্লুশারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়েলিংটনের সৈন্যরা সকাল থেকে দীর্ঘ সময় নেপোলিয়নের প্রধান বাহিনীর আক্রমণ সহ্য করেছিল। প্রুশিয়ানরা না এলে যুদ্ধের ফল কী হতো, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের আগমন নেপোলিয়নকে তার ডান দিকে হাজার হাজার সৈন্য এবং মূল্যবান গার্ড ইউনিট পাঠাতে বাধ্য করে। অন্যদিকে ওয়েলিংটনও নিজের অবস্থান ধরে রেখে প্রুশিয়ানদের পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় সৃষ্টি করেছিলেন। ওয়াটারলুর বিজয় তাই একজন সেনাপতির একক কৃতিত্বের চেয়ে ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের কার্যকর সামরিক সহযোগিতার ফল হিসেবে বোঝা অধিক সঠিক।
প্রুশিয়ানদের অবদান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও থামেনি। ক্লান্ত অ্যাংলো-মিত্র বাহিনীর পরিবর্তে প্রুশিয়ানরা রাতের অন্ধকারে পশ্চাদপসরণরত ফরাসিদের অনুসরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এতে নেপোলিয়নের পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি দ্রুত সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফরাসি সৈন্য, কামান ও সরঞ্জাম বিভিন্ন পথে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন নিয়েও পরবর্তীকালে বহু কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে। গার্ডের শেষ সৈন্যরা নাকি আত্মসমর্পণ প্রত্যাখ্যান করে বিখ্যাত কোনো বাক্য উচ্চারণ করেছিল—এ ধরনের গল্প জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে শক্তিশালী হলেও সবগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত নয়। বাস্তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গার্ডের সব ইউনিট একইভাবে ধ্বংস হয়নি; কিন্তু তাদের আক্রমণের ব্যর্থতা ফরাসি সেনাবাহিনীর সামগ্রিক পতনের সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সামরিক ইতিহাসে প্রতীক কখনো কখনো বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির মতোই শক্তিশালী, এবং ওয়াটারলুতে গার্ডের পশ্চাদপসরণ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
নেপোলিয়নের জন্য পরাজয়ের রাজনৈতিক ফল ছিল তাৎক্ষণিক। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্যারিসে ফিরে তিনি নতুন সেনাবাহিনী সংগঠিত করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুঁজেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর তার পেছনে পূর্ণভাবে দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিল না। ২২ জুন ১৮১৫ তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ফরাসি সিংহাসন ত্যাগ করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের নাটকীয় অধ্যায় শেষ হয়ে যায়।
ওয়াটারলুর শেষ কয়েক ঘণ্টা তাই পুরো অভিযানের সারাংশের মতো। লিনিতে পরাজিত ব্লুশার ফিরে এসেছিলেন; ওয়েলিংটন দিনের পর দিন নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৃঢ়ভাবে অবস্থান ধরে রেখেছিলেন; প্রুশিয়ান চাপ নেপোলিয়নের রিজার্ভ বিভক্ত করেছিল; লা হে সাঁতের সাফল্য সময়মতো কাজে লাগানো যায়নি; এবং শেষ পর্যন্ত সম্রাটের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সৈন্যদের আক্রমণও মিত্র প্রতিরক্ষা ভাঙতে পারেনি। যখন ইম্পেরিয়াল গার্ড পিছিয়ে গেল, তখন শুধু একটি অভিজাত বাহিনীর আক্রমণ ব্যর্থ হয়নি—নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর বিজয়ের শেষ বিশ্বাসটিও ভেঙে পড়েছিল।
এই কারণেই প্রুশিয়ানদের আগমন এবং ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতনকে আলাদা দুটি ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। একটি নেপোলিয়নকে সময় ও রিজার্ভ থেকে বঞ্চিত করেছিল, অন্যটি তার সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। সামনে ওয়েলিংটনের প্রতিরোধ এবং পাশে ব্লুশারের ক্রমবর্ধমান চাপ শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেখান থেকে নেপোলিয়নের আর বেরিয়ে আসার পথ ছিল না। ১৮ জুন ১৮১৫-এর সন্ধ্যায় মঁ-সাঁ-জঁর রিজ ও প্লঁসেনোয়ার জ্বলন্ত বাড়িগুলোর মাঝখানে তাই শুধু একটি যুদ্ধের ফল নির্ধারিত হয়নি। সেখানেই নেপোলিয়নের শেষ সামরিক প্রত্যাবর্তন ভেঙে পড়ে এবং ইউরোপের ইতিহাসে নেপোলিয়নিক যুগের চূড়ান্ত সমাপ্তির দরজা খুলে যায়।
লিনি ও কোয়াত্র-ব্রার যুদ্ধ: ওয়াটারলুর দুই দিন আগে নেপোলিয়নের বিজয় কীভাবে হারানো সুযোগে পরিণত হয়েছিল?
সপ্তম জোট ও বেলজিয়াম অভিযান: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারকে আলাদা করে ধ্বংস করার নেপোলিয়নের শেষ সামরিক পরিকল্পনা
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও ‘হান্ড্রেড ডেজ’: নেপোলিয়ন কীভাবে আবার ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করে ইউরোপকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন?
ভার্দুনের যুদ্ধ: ১৯১৬ সালের দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ফ্রান্সকে রক্তশূন্য করার জার্মান পরিকল্পনা