সপ্তম জোট ও বেলজিয়াম অভিযান: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারকে আলাদা করে ধ্বংস করার নেপোলিয়নের শেষ সামরিক পরিকল্পনা
Series: ওয়াটারলুর যুদ্ধ: নেপোলিয়নের শেষ লড়াই ও এক যুগের অবসান
- Author: Admin
- August 30, 2026
সপ্তম জোট ও বেলজিয়াম অভিযান
১৮১৫ সালের মার্চে এলবা থেকে ফিরে নেপোলিয়ন যখন আবার ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল সিংহাসন ধরে রাখা নয়—বরং ইউরোপের সম্মিলিত সামরিক শক্তির হাত থেকে ফ্রান্সকে রক্ষা করা। ব্রিটেন, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলো তাকে আবার ইউরোপীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করেছিল। ২৫ মার্চ ১৮১৫ সালে প্রধান শক্তিগুলো নতুন করে সামরিক জোটবদ্ধ হয়, যা ইতিহাসে সপ্তম জোট নামে পরিচিত। নেপোলিয়ন দ্রুত বুঝেছিলেন, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাকে এমন একটি দ্রুত, সাহসী এবং সিদ্ধান্তমূলক অভিযান চালাতে হবে, যাতে শত্রুর পূর্ণ শক্তি একত্রিত হওয়ার আগেই তাদের একটি অংশকে ধ্বংস করা যায়।
সপ্তম জোটের সম্ভাব্য সামরিক শক্তি ছিল বিপুল। অস্ট্রিয়া ও রাশিয়া বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করছিল, জার্মান রাজ্যগুলোও সৈন্য সংগ্রহ করছিল এবং ব্রিটেন অর্থ ও সেনা দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছিল। সব বাহিনী একসঙ্গে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে নেপোলিয়নের পক্ষে তাদের মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই তার কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। দূরবর্তী রুশ ও অস্ট্রিয়ান বাহিনী পশ্চিম ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই তাকে নিকটবর্তী শত্রুদের পরাজিত করে রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিতে হতো।
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি অবস্থান করছিল ফ্রান্সের উত্তর সীমান্তের ওপারে বর্তমান বেলজিয়ামে। সেখানে দুটি বৃহৎ মিত্রবাহিনী ছিল। প্রথমটি ছিল ডিউক অব ওয়েলিংটনের নেতৃত্বাধীন অ্যাংলো-মিত্র বাহিনী, যার মধ্যে ব্রিটিশদের পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস, হ্যানোভার, ব্রান্সউইক ও নাসাউয়ের সৈন্য ছিল। দ্বিতীয়টি ছিল ফিল্ড মার্শাল গেবহার্ড লেবেরেখট ফন ব্লুশারের নেতৃত্বাধীন প্রুশিয়ান বাহিনী। সম্মিলিতভাবে তাদের শক্তি নেপোলিয়নের উত্তরাঞ্চলীয় ফরাসি বাহিনীর তুলনায় অনেক বড় ছিল।
তবে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা ছিল—দুটি বাহিনী একই স্থানে কেন্দ্রীভূত ছিল না। ওয়েলিংটনের সৈন্যরা ব্রাসেলসসহ পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম বেলজিয়ামের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিল, অন্যদিকে প্রুশিয়ান বাহিনী আরও পূর্বদিকে অবস্থান করছিল। তাদের যোগাযোগের প্রধান সংযোগ অঞ্চলগুলোর মধ্যে কোয়াত্র-ব্রা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নেপোলিয়ন এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাকেই নিজের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল সীমান্ত অতিক্রম করে দ্রুত দুই বাহিনীর মাঝখানে ঢুকে পড়া, তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং এক বাহিনী অন্য বাহিনীকে সাহায্য করার আগেই পৃথকভাবে আঘাত করা।
এটি নেপোলিয়নের সামরিক জীবনের পরিচিত একটি নীতির পুনঃপ্রয়োগ। সংখ্যায় বড় কিন্তু বিচ্ছিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে তিনি বারবার কেন্দ্রীয় অবস্থান ব্যবহার করেছিলেন। মূল ধারণাটি ছিল সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন—নিজের সম্পূর্ণ বাহিনীকে শত্রুর একটি অংশের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত করে স্থানীয় সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব সৃষ্টি করা, তাকে পরাজিত করা, তারপর দ্রুত অন্য বাহিনীর দিকে ঘুরে দাঁড়ানো। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়ন আবার সেই কৌশলের ওপর নিজের সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ বাজি ধরেছিলেন।
নেপোলিয়ন তার প্রধান আক্রমণকারী বাহিনীর নাম দেন আর্মি অব দ্য নর্থ। এতে প্রায় ১২০ থেকে ১২৫ হাজারের কাছাকাছি সৈন্য ছিল। বাহিনীটিকে বিভিন্ন কোরে বিভক্ত করা হয় এবং তাদের এমনভাবে সীমান্তের দিকে আনা হয়, যাতে মিত্রদের কাছে ফরাসি আক্রমণের সঠিক স্থান ও সময় গোপন থাকে। নেপোলিয়ন নিজে কেন্দ্রীয় অংশের নেতৃত্ব নেন। বাম দিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় মার্শাল মিশেল নে-কে এবং ডান দিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পান মার্শাল এমমানুয়েল দ্য গ্রুশি। লক্ষ্য ছিল শার্লেরোয়া হয়ে বেলজিয়ামের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের মধ্যবর্তী যোগাযোগব্যবস্থা ছিন্ন করা।
১৫ জুন ১৮১৫ সালে ফরাসি বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে। আক্রমণটি মিত্রদের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল না, কিন্তু এর গতি ও মূল আঘাতের অবস্থান তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করে। ফরাসিরা সামব্র নদী পার হয়ে শার্লেরোয়া দখল করে এবং দ্রুত উত্তরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। নেপোলিয়নের প্রথম বড় সাফল্য ছিল কৌশলগত—তিনি কার্যত দুই মিত্রবাহিনীর মাঝখানের অঞ্চলে ঢুকে পড়েছিলেন। এখন তার প্রয়োজন ছিল সেই সুবিধাকে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রের সিদ্ধান্তমূলক বিজয়ে রূপান্তর করা।
ওয়েলিংটনের সমস্যা ছিল তার বাহিনী বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা। তিনি প্রথমে নিশ্চিত ছিলেন না নেপোলিয়নের মূল লক্ষ্য কী—ব্রাসেলস, তার যোগাযোগপথ, নাকি প্রুশিয়ানদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ। ফলে বাহিনী কেন্দ্রীভূত করতে কিছুটা সময় লাগে। অন্যদিকে ব্লুশার তুলনামূলক দ্রুত নিজের প্রুশিয়ান কোরগুলোকে একত্রিত করে নেপোলিয়নের মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। এর ফলে ১৬ জুন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ প্রায় একই সময়ে শুরু হয়—লিনি এবং কোয়াত্র-ব্রা।
লিনিতে নেপোলিয়ন নিজে ব্লুশারের প্রুশিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ করেন। তার উদ্দেশ্য শুধু প্রুশিয়ানদের পিছিয়ে দেওয়া ছিল না; তিনি এমনভাবে তাদের পরাজিত করতে চেয়েছিলেন যাতে তারা আর ওয়েলিংটনের সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে। প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর ফরাসিরা লিনি গ্রামের আশপাশে প্রুশিয়ান অবস্থান ভেঙে দেয়। সন্ধ্যার দিকে নেপোলিয়নের আক্রমণ প্রুশিয়ান কেন্দ্রে গুরুতর আঘাত হানে। লিনির যুদ্ধ নেপোলিয়নের সামরিক জীবনের শেষ বিজয় হিসেবে পরিচিত। ব্লুশার নিজেও যুদ্ধের সময় ঘোড়া থেকে পড়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি রক্ষা পান।
কিন্তু এই বিজয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ততটা সিদ্ধান্তমূলক ছিল না। প্রুশিয়ান বাহিনী ধ্বংস হয়নি। তাদের পশ্চাদপসরণের পথও নেপোলিয়নের প্রত্যাশামতো পূর্বদিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। প্রুশিয়ান চিফ অব স্টাফ অগুস্ট ফন গনাইজেনাউ বাহিনীকে এমনভাবে পশ্চাদপসরণ করান যাতে ওয়েলিংটনের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগের সম্ভাবনা বজায় থাকে। এই সিদ্ধান্ত কয়েক দিনের মধ্যে ইউরোপের ইতিহাস পাল্টে দেবে।
একই সময়ে কোয়াত্র-ব্রায় মার্শাল নে ওয়েলিংটনের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। কোয়াত্র-ব্রা ছিল গুরুত্বপূর্ণ সড়কসংযোগস্থল। এটি দ্রুত দখল করতে পারলে ফরাসিরা ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের যোগাযোগ আরও কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারত। কিন্তু নে যথেষ্ট দ্রুত সেখানে পূর্ণ শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে পারেননি। দিনের শুরুতে এলাকাটি দুর্বলভাবে সুরক্ষিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিত্রবাহিনীর নতুন ইউনিট এসে পৌঁছায়। ফলে ফরাসিরা সুযোগ হারায় এবং প্রচণ্ড সংঘর্ষের পরও কোয়াত্র-ব্রা ওয়েলিংটনের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।
এই দুই যুদ্ধের মাঝখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখা দেয়—দারলনের প্রথম কোরের বিভ্রান্তিকর চলাচল। নেপোলিয়ন চেয়েছিলেন জঁ-বাতিস্ত দারলনের শক্তিশালী কোর প্রুশিয়ান বাহিনীর পাশ বা পশ্চাৎভাগে আঘাত করে লিনির বিজয়কে সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করুক। কিন্তু নে একই বাহিনীকে কোয়াত্র-ব্রায় নিজের সহায়তায় চাইছিলেন। পরস্পরবিরোধী নির্দেশের কারণে দারলনের হাজার হাজার সৈন্য দুই যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে যাতায়াত করে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধেই সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা রাখতে পারেনি। ১৮১৫ সালের অভিযানে ফরাসি কমান্ড ব্যবস্থার দুর্বলতার অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ ছিল এই ঘটনা।
১৬ জুনের রাত শেষে পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে নেপোলিয়নের পক্ষে ছিল। তিনি লিনিতে প্রুশিয়ানদের পরাজিত করেছেন এবং ওয়েলিংটনও কোয়াত্র-ব্রা থেকে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু নেপোলিয়নের মূল পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি—দুটি মিত্রবাহিনীকে স্থায়ীভাবে আলাদা করা যায়নি। ব্লুশারের বাহিনী ধ্বংস না হয়ে উত্তরের দিকে ওয়াভরের দিকে সরে যাচ্ছিল, যেখানে থেকে তারা আবার ওয়েলিংটনের দিকে অগ্রসর হতে পারত।
১৭ জুন নেপোলিয়ন প্রুশিয়ানদের অনুসরণের জন্য গ্রুশির অধীনে প্রায় ৩৩ হাজার সৈন্য পাঠান। গ্রুশির কাজ ছিল ব্লুশারের বাহিনীকে অনুসরণ করা, তাদের পুনর্গঠন ব্যাহত করা এবং সর্বোপরি তাদের যেন ওয়েলিংটনের সঙ্গে যুক্ত হতে না দেওয়া। অন্যদিকে নেপোলিয়ন প্রধান বাহিনী নিয়ে ওয়েলিংটনের পিছু নেন। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে ফরাসিরা উত্তরের দিকে অগ্রসর হয় এবং ওয়েলিংটন ব্রাসেলসের দক্ষিণে মঁ-সাঁ-জঁ রিজের কাছে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেন। কাছেই ছিল ওয়াটারলু নামের ছোট একটি জনপদ।
এখানেই নেপোলিয়নের পরিকল্পনার সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করতে শুরু করে একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর—প্রুশিয়ানরা কোথায়? নেপোলিয়নের ধারণা ছিল লিনির পর তারা গুরুতরভাবে বিপর্যস্ত এবং গ্রুশি তাদের দূরে রাখতে পারবেন। বাস্তবে ব্লুশার ও তার অধিনায়কেরা ওয়েলিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওয়েলিংটনও মঁ-সাঁ-জঁ অবস্থানে যুদ্ধ গ্রহণ করেছিলেন এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে যে প্রুশিয়ানরা সম্ভব হলে তার সহায়তায় আসবে।
এই পরিস্থিতি নেপোলিয়নের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য প্রকাশ করে। তিনি অভিযান শুরু করেছিলেন দুই শত্রুবাহিনীকে আলাদা করার জন্য; কিন্তু চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রাক্কালে সেই দুই বাহিনী আবার একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছিল। অন্যদিকে ফরাসি বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রুশির সঙ্গে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে অবস্থান করছিল। অর্থাৎ যে কেন্দ্রীভূত শক্তির মাধ্যমে নেপোলিয়ন শত্রুর বিভক্ত বাহিনীকে পরাজিত করতে চেয়েছিলেন, অভিযানের শেষ পর্যায়ে তার নিজের শক্তিই কার্যত বিভক্ত হয়ে যায়।
তারপরও ১৮ জুন সকালে পরিস্থিতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ওয়েলিংটনের সামনে নেপোলিয়নের শক্তিশালী বাহিনী ছিল এবং প্রুশিয়ানরা পৌঁছানোর আগে ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব হলে পুরো অভিযান আবার ফরাসিদের পক্ষে ঘুরে যেতে পারত। তাই ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—ওয়েলিংটনের সেনাবাহিনীকে দ্রুত ভেঙে ফেলতে হবে, ব্লুশার যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর আগেই।
সপ্তম জোটের বিরুদ্ধে বেলজিয়াম অভিযান তাই শুধু কয়েকটি যুদ্ধের ধারাবাহিকতা ছিল না; এটি ছিল নেপোলিয়নের সমগ্র সামরিক দর্শনের শেষ বড় পরীক্ষা। দ্রুত বাহিনী কেন্দ্রীভূত করা, শত্রুর মাঝখানে প্রবেশ করা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, পৃথক বাহিনীকে একে একে পরাজিত করা এবং সংখ্যাগত দুর্বলতাকে গতিশীলতার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা—তার বিখ্যাত যুদ্ধকৌশলের প্রায় সব উপাদানই এখানে উপস্থিত ছিল। ১৫ জুনের সীমান্ত অতিক্রম থেকে ১৬ জুনের লিনি পর্যন্ত পরিকল্পনাটি উল্লেখযোগ্যভাবে সফলও হয়েছিল। কিন্তু কোয়াত্র-ব্রা দখলে ব্যর্থতা, দারলনের কোরের অপচয়, প্রুশিয়ান বাহিনীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে না পারা এবং তাদের পশ্চাদপসরণের প্রকৃত দিক যথাসময়ে উপলব্ধি করতে না পারা সেই সাফল্যকে অসম্পূর্ণ রেখে দেয়।
১৮ জুন ১৮১৫-এর সকালে তাই বেলজিয়ামের ভেজা মাঠে দাঁড়িয়ে নেপোলিয়ন শুধু ওয়েলিংটনের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন না। তিনি চেষ্টা করছিলেন পুরো বেলজিয়াম অভিযানের অসম্পূর্ণ পরিকল্পনাকে একটি শেষ সিদ্ধান্তমূলক বিজয়ের মাধ্যমে উদ্ধার করতে। তার সামনে ছিল ওয়েলিংটন, দূরে এগিয়ে আসছিল ব্লুশার, আর পেছনে অপেক্ষা করছিল সমগ্র সপ্তম জোট। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াটারলুর যুদ্ধ নির্ধারণ করবে নেপোলিয়নের শেষ সামরিক পরিকল্পনা ইতিহাসের আরেকটি অসাধারণ বিজয় হবে, নাকি তার সাম্রাজ্য ও যুদ্ধজীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তির পথ খুলে দেবে।
ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন: দ্বিতীয়বার সিংহাসন ত্যাগ, সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন ও ইউরোপে এক যুগের অবসান
প্রুশিয়ানদের আগমন ও ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন: ওয়েলিংটন ও ব্লুশার কীভাবে ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন?
ওয়াটারলুর যুদ্ধ ১৮১৫: হুগোমোঁ, লা হে সাঁত, ফরাসি অশ্বারোহী আক্রমণ ও নেপোলিয়নের শেষ লড়াইয়ের পূর্ণ ইতিহাস
ভার্দুনের যুদ্ধ: ১৯১৬ সালের দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ফ্রান্সকে রক্তশূন্য করার জার্মান পরিকল্পনা