ভার্দুনের যুদ্ধ: ১৯১৬ সালের দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ফ্রান্সকে রক্তশূন্য করার জার্মান পরিকল্পনা
Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
- Author: Admin
- August 30, 2026
ভার্দুনের যুদ্ধ
১৯১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল। উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের ভার্দুন অঞ্চলে হঠাৎ এমন এক গোলাবর্ষণ শুরু হলো, যার তীব্রতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞ সৈন্যদের কাছেও ছিল স্তম্ভিত করার মতো। জার্মান ভারী কামান ফরাসি ট্রেঞ্চ, দুর্গ, রাস্তা, বন ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর একের পর এক গোলা ফেলতে থাকে। বিস্ফোরণে গাছ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, মাটি উল্টে বিশাল গর্ত তৈরি হচ্ছে, টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং পুরো ভূদৃশ্য ধোঁয়া ও ধুলোর নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার এই গোলাবর্ষণ ছিল এমন একটি যুদ্ধের সূচনা, যা পরবর্তী প্রায় দশ মাস ধরে চলবে এবং ফরাসি ও জার্মান বাহিনী মিলিয়ে সাত লক্ষেরও বেশি হতাহত সৃষ্টি করবে। ইতিহাসে এটি পরিচিত হবে ভার্দুনের যুদ্ধ নামে—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রতীকী সংঘর্ষগুলোর একটি।
ভার্দুন কোনো আকস্মিকভাবে বেছে নেওয়া লক্ষ্য ছিল না। মিউজ নদীর তীরে অবস্থিত এই অঞ্চল ফ্রান্সের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের প্রতিরক্ষায় ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৮৭০-৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পর ফ্রান্স সীমান্ত প্রতিরক্ষার জন্য ভার্দুনকে ঘিরে শক্তিশালী দুর্গব্যবস্থা গড়ে তোলে। দুওমঁ, ভো, সুভিলসহ বহু দুর্গ ভার্দুনের চারপাশে একটি প্রতিরক্ষামূলক বলয় তৈরি করেছিল। এর পাশাপাশি ফরাসি জাতীয় স্মৃতিতেও অঞ্চলটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
১৯১৫ সালের শেষ নাগাদ পশ্চিম রণাঙ্গনের পরিস্থিতি জার্মান সামরিক নেতৃত্বকে নতুন কৌশল নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। দ্রুত ফ্রান্স জয়ের ১৯১৪ সালের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। মার্নের পর যুদ্ধ ট্রেঞ্চের অচলাবস্থায় আটকে গেছে। জার্মান জেনারেল স্টাফের প্রধান এরিখ ফন ফালকেনহাইন বুঝতে পারছিলেন, পশ্চিমে একটি সাধারণ ভূখণ্ড দখলের অভিযান দিয়ে সিদ্ধান্তমূলক বিজয় অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
ফালকেনহাইনের উদ্দেশ্য নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু বিতর্ক রয়েছে। যুদ্ধের পরে তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল এমন একটি স্থান আক্রমণ করা, যেটি ফ্রান্স জাতীয় ও সামরিক কারণে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করবে। সেখানে জার্মান কামানের সামনে ক্রমাগত ফরাসি সৈন্য পাঠাতে বাধ্য হলে ফ্রান্সের সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই ধারণাই পরবর্তীকালে ফ্রান্সকে ‘রক্তশূন্য করে দেওয়ার’ পরিকল্পনা হিসেবে বিখ্যাত হয়। তবে যুদ্ধের শুরু থেকেই এটি কতটা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল, তা নিয়ে গবেষকদের মতভেদ রয়েছে।
যাই হোক, জার্মানরা ভার্দুনের বিরুদ্ধে বিশাল প্রস্তুতি নেয়। আক্রমণক্ষেত্রের পেছনে গোপনে বিপুলসংখ্যক কামান, গোলাবারুদ ও সৈন্য জড়ো করা হয়। ভারী হাউইটজারসহ শত শত আর্টিলারি অস্ত্র প্রস্তুত ছিল। জার্মান পঞ্চম সেনাবাহিনীর নামমাত্র নেতৃত্বে ছিলেন জার্মান ক্রাউন প্রিন্স ভিলহেল্ম, যদিও অপারেশন পরিচালনায় তাঁর স্টাফের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ফরাসিদের জন্য বিপজ্জনক বিষয় ছিল, যুদ্ধের আগে ভার্দুনের কিছু দুর্গের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়েছিল। ১৯১৪ সালে জার্মান ভারী কামান বেলজিয়ামের শক্তিশালী দুর্গগুলো ধ্বংস করার পর ফরাসি নেতৃত্ব স্থায়ী দুর্গের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। ভার্দুনের দুর্গগুলো থেকে কিছু কামান ও সৈন্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে জার্মান আক্রমণ শুরু হওয়ার মুহূর্তে ভার্দুনের প্রতিরক্ষা তার পুরোনো খ্যাতির তুলনায় দুর্বল ছিল।
২১ ফেব্রুয়ারির ব্যাপক গোলাবর্ষণের পর জার্মান পদাতিক বাহিনী অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু দ্রুত দৌড়ে ফরাসি লাইনে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়; বরং কামানের ধ্বংসযজ্ঞের পর ছোট ছোট দল ব্যবহার করে প্রতিরোধের অবশিষ্ট কেন্দ্রগুলো দখল করা। প্রথম কয়েক দিনে ফরাসি প্রতিরক্ষা গুরুতর চাপে পড়ে। কিছু ইউনিট প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় এবং জার্মানরা গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড দখল করতে থাকে।
এরপর ঘটে অভিযানের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাগুলোর একটি। ২৫ ফেব্রুয়ারি জার্মান সৈন্যরা ফোর্ট দুওমঁ প্রায় অবিশ্বাস্য সহজতায় দখল করে। ভার্দুন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গগুলোর একটি তখন তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক ফরাসি সৈন্যের হাতে ছিল। জার্মানদের একটি ছোট দল দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করে এবং বড় ধরনের সরাসরি লড়াই ছাড়াই সেটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।
দুওমঁর পতন ফ্রান্সে প্রবল মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে। বিশাল দুর্গটি জার্মানদের হাতে চলে যাওয়া যেন ভার্দুনের পতনের পূর্বাভাস মনে হচ্ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফরাসি নেতৃত্ব জেনারেল ফিলিপ পেতাঁকে ভার্দুনের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেয়। পেতাঁ দ্রুত বুঝতে পারেন যে শুধু সৈন্যের সাহস দিয়ে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখা যাবে না; ভার্দুনে নিয়মিত মানুষ, কামানের গোলা, খাদ্য ও অস্ত্র পৌঁছানোর একটি কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা অপরিহার্য।
এই সরবরাহের প্রাণরেখা হয়ে ওঠে বার-ল্য-দুক থেকে ভার্দুনের দিকে যাওয়া একটি রাস্তা, যা পরে ‘ভোয়া সাক্রে’ বা ‘পবিত্র পথ’ নামে বিখ্যাত হয়। দিনরাত ট্রাকের দীর্ঘ সারি এই রাস্তা দিয়ে চলতে থাকে। গোলাবারুদ ও খাদ্য সামনে নিয়ে যাওয়া হতো, ফেরার পথে আহত সৈন্যদের সরিয়ে আনা হতো। রাস্তা সচল রাখতে হাজার হাজার শ্রমিক ক্রমাগত মেরামত করত। ভার্দুনে ফরাসি প্রতিরোধ শুধু ট্রেঞ্চে নয়, এই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থার ওপরও দাঁড়িয়ে ছিল।
পেতাঁ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফরাসি ইউনিটগুলোকে দীর্ঘ সময় একই স্থানে রেখে সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার বদলে পর্যায়ক্রমে ভার্দুনে পাঠানো এবং সরিয়ে নেওয়া হতে থাকে। এর ফলে ফরাসি সেনাবাহিনীর বিপুল অংশ কোনো না কোনো সময় ভার্দুনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। ভার্দুন তাই একটি নির্দিষ্ট বাহিনীর যুদ্ধ না থেকে প্রায় পুরো ফরাসি সেনাবাহিনীর সম্মিলিত জাতীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
জার্মান আক্রমণ প্রথমদিকে মিউজ নদীর পূর্ব তীরে কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু ফরাসি কামান পশ্চিম তীরের উচ্চভূমি থেকে জার্মান বাহিনীর ওপর আঘাত করতে পারছিল। ফলে মার্চে জার্মানরা পশ্চিম তীরেও অভিযান সম্প্রসারণ করে। লে মর-ওম বা ‘মৃত মানুষের পাহাড়’ এবং কোট ৩০৪ অঞ্চলকে ঘিরে ভয়াবহ লড়াই শুরু হয়। একটি পাহাড়ের সামান্য অংশ দখলের জন্য বারবার কামানের গোলাবর্ষণ ও পদাতিক আক্রমণ চলতে থাকে।
এই পর্যায়ে ভার্দুনের যুদ্ধের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি আর দ্রুত দুর্গ দখলের অভিযান নয়; বরং ক্ষয়যুদ্ধ। শত্রুর ওপর যতটা সম্ভব বেশি ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়া এবং নিজের বাহিনীকে সেই ক্ষয় সহ্য করার ক্ষমতা ধরে রাখা হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় বিষয়। কিন্তু ফ্রান্সকে রক্তশূন্য করতে গিয়ে জার্মান সেনাবাহিনীও একই যুদ্ধযন্ত্রের মধ্যে আটকে পড়ে। প্রতিটি নতুন পাহাড় বা ট্রেঞ্চ দখলের জন্য জার্মানদেরও বিপুল জীবন দিতে হচ্ছিল।
ভার্দুনের ভূদৃশ্য ক্রমে এমনভাবে ধ্বংস হয় যে আগের পৃথিবীকে চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বনভূমি কামানের গোলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, গ্রামের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং অসংখ্য শেল ক্রেটার পুরো ভূমিকে বিকৃত করে দেয়। ফ্লুরি-দ্যভঁ-দুওমঁর মতো কিছু গ্রাম এতটাই ধ্বংস হয়েছিল যে যুদ্ধের পর আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। আজও সেগুলো ফ্রান্সে ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষিত।
জুন মাসে জার্মানরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ ফোর্ট ভো আক্রমণ করে। মেজর সিলভাঁ-ইউজেন রেনালের নেতৃত্বে ফরাসি প্রতিরক্ষাকারীরা দুর্গের ভেতরে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ভূগর্ভস্থ করিডোরে কাছাকাছি লড়াই চলে, পানি ও সরবরাহ দ্রুত ফুরিয়ে আসে। কয়েক দিনের প্রতিরোধের পর ৭ জুন দুর্গটি জার্মানদের হাতে চলে যায়। ফোর্ট ভোর প্রতিরোধ ফরাসি জনমনে বীরত্বের আরেকটি প্রতীকে পরিণত হয়।
জার্মান বাহিনী এখন ভার্দুনের আরও কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। জুনে তারা ফসজিন গ্যাসের সহায়তায় ফরাসি অবস্থানে বড় আক্রমণ চালায় এবং ফোর্ট সুভিলের দিকে অগ্রসর হয়। কোনো কোনো পর্যায়ে জার্মান বাহিনী ভার্দুন শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে যায়। মনে হচ্ছিল, কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ের পরও হয়তো শহরটি শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে পারে।
কিন্তু তখন বৃহত্তর যুদ্ধ পরিস্থিতি জার্মানদের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করে। পূর্ব রণাঙ্গনে জুন ১৯১৬-তে রাশিয়া ব্রুসিলভ আক্রমণ শুরু করে, যা অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে গুরুতর সংকটে ফেলে। এরপর ১ জুলাই ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী পশ্চিম রণাঙ্গনে সোমের যুদ্ধ শুরু করে। জার্মানিকে এখন একই সঙ্গে একাধিক রণাঙ্গনে বিশাল চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ভার্দুনে জার্মান আক্রমণের শক্তি ধীরে ধীরে কমে আসে। একই সময়ে ফরাসি কমান্ডেও পরিবর্তন ঘটে। পেতাঁকে বৃহত্তর দায়িত্বে সরিয়ে দেওয়ার পর রবার্ট নিভেল ভার্দুন অঞ্চলের কমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁর অধীনে ফরাসিরা ক্রমে আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরে আসে। জেনারেল শার্ল মঁজাঁর মতো কমান্ডাররা পাল্টা আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯১৬ সালের অক্টোবরে ফরাসিরা ব্যাপক কামান প্রস্তুতির পর শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ২৪ অক্টোবর ফোর্ট দুওমঁ পুনর্দখল করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যার পতন ফরাসিদের জন্য অপমানজনক ধাক্কা ছিল, সেই দুর্গ ফিরে পাওয়া বিশাল প্রতীকী বিজয় হয়ে ওঠে। কয়েক দিনের মধ্যে ফোর্ট ভোও জার্মানরা খালি করে দেয় এবং ফরাসিরা সেটি পুনর্দখল করে।
ডিসেম্বরে আরেকটি ফরাসি আক্রমণ জার্মান বাহিনীকে আরও পেছনে ঠেলে দেয়। ১৮ ডিসেম্বর ১৯১৬ নাগাদ ভার্দুনের প্রধান যুদ্ধপর্ব কার্যত শেষ হয়। দশ মাসের যুদ্ধের পর জার্মানরা ভার্দুন দখল করতে পারেনি এবং তাদের প্রথম দিকের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগত সাফল্যও হারিয়ে গেছে।
কিন্তু এই ফলাফলকে সাধারণ বিজয়-পরাজয়ের ভাষায় বোঝা কঠিন। বিভিন্ন হিসাব কিছুটা ভিন্ন হলেও সাধারণভাবে ফরাসি ও জার্মান বাহিনী মিলিয়ে প্রায় সাত লক্ষ বা তারও বেশি সৈন্য নিহত, আহত কিংবা নিখোঁজ হয়েছিল বলে ধরা হয়। নিহতের সংখ্যা ছিল কয়েক লক্ষ। লক্ষ লক্ষ কামানের গোলা ভার্দুন অঞ্চলে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যুদ্ধের পরও বিপুল অবিস্ফোরিত গোলা ও বিষাক্ত যুদ্ধসামগ্রী মাটির নিচে থেকে যায়।
ভার্দুনের সঙ্গে বিখ্যাত হয়ে ওঠে ফরাসি প্রতিরোধের একটি স্লোগান—“তারা পার হতে পারবে না” অর্থাৎ “ইল ন পাসরঁ পা”। যদিও এই বাক্যের ব্যবহার ও জনপ্রিয়তার ইতিহাস বিভিন্ন পর্যায়ে গড়ে উঠেছে, এটি শেষ পর্যন্ত ভার্দুনের ফরাসি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে যায়। ফ্রান্সের কাছে যুদ্ধটি শুধু একটি শহর রক্ষার অভিযান ছিল না; এটি জাতীয় সহনশীলতা ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
ফালকেনহাইনের কৌশলের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যও এখানেই। যদি উদ্দেশ্য সত্যিই ফ্রান্সকে এমন স্থানে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়ে থাকে যেখানে তার সেনাবাহিনী রক্তশূন্য হয়ে যাবে, তাহলে জার্মান বাহিনী নিজেও সেই একই ক্ষয়যুদ্ধের শিকার হয়েছিল। ভার্দুন ফ্রান্সকে ভয়াবহ মূল্য দিতে বাধ্য করেছিল, কিন্তু জার্মানিও এমন ক্ষতি সহ্য করে যা সহজে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত ফালকেনহাইন জার্মান জেনারেল স্টাফের প্রধানের পদ হারান এবং তাঁর স্থানে হিন্ডেনবুর্গ ও লুডেনডর্ফের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভার্দুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কামানের আধিপত্য। সৈন্যদের স্মৃতিতে মেশিনগান ও রাইফেল গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত আতঙ্কের কেন্দ্রে ছিল আর্টিলারি। দিনের পর দিন গোলাবর্ষণের মধ্যে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে বসে থাকা, কখন পরবর্তী গোলাটি নিজের অবস্থানে পড়বে তা না জানা এবং সহযোদ্ধাদের মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যেতে দেখা সৈন্যদের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলেছিল। ভার্দুনে মানুষ শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, শিল্পযুদ্ধের এক বিশাল যান্ত্রিক ধ্বংসক্ষমতার বিরুদ্ধেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল।
এই যুদ্ধ ফরাসি সেনাবাহিনীর পরবর্তী ইতিহাসেও গভীর প্রভাব ফেলে। ইউনিট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভার্দুনে পাঠানোর কারণে বিপুলসংখ্যক ফরাসি সৈন্য এই রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। ফলে ভার্দুনের স্মৃতি পুরো সেনাবাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৭ সালে ফরাসি সেনাবাহিনীতে যখন ব্যাপক বিদ্রোহ ও শৃঙ্খলাজনিত সংকট দেখা দেয়, তখন আগের বছরের এই অসীম ক্ষয়যুদ্ধের স্মৃতিও সৈন্যদের মানসিক অবস্থার পটভূমিতে ছিল।
ভার্দুনের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোনো বিশাল ভূখণ্ড পরিবর্তন করেনি। কোনো রাজধানী দখল হয়নি, কোনো সাম্রাজ্য সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেনি এবং মানচিত্রে বিজয়ের রেখাও নাটকীয়ভাবে বদলায়নি। অথচ এখানেই যুদ্ধটির ভয়াবহ তাৎপর্য। কয়েক কিলোমিটার ভূখণ্ডের জন্য দুই আধুনিক শিল্পরাষ্ট্র প্রায় দশ মাস ধরে মানুষ, কামান, গোলাবারুদ ও সম্পদ এমন মাত্রায় ব্যবহার করেছিল, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়যুদ্ধের প্রকৃত চরিত্রকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে।
ভার্দুন তাই শুধু ১৯১৬ সালের একটি যুদ্ধ নয়; এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থহীন বলে মনে হওয়া পুনরাবৃত্ত আক্রমণ, শিল্পায়িত হত্যাশক্তি এবং মানুষের অসাধারণ সহনশীলতার অন্যতম স্থায়ী প্রতীক। জার্মানি ফ্রান্সকে রক্তশূন্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভার্দুন শেষ পর্যন্ত দুই সেনাবাহিনীকেই রক্তাক্ত করেছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত দুওমঁ, ভো, ফ্লুরি এবং মিউজের পাহাড়গুলো সেই সত্যের সাক্ষী হয়ে থাকে—আধুনিক যুদ্ধে কখনো একটি স্থান দখলের সামরিক মূল্য তার জন্য উৎসর্গ করা মানুষের জীবনের তুলনায় ভয়াবহভাবে ক্ষুদ্র হয়ে যেতে পারে।
ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন: দ্বিতীয়বার সিংহাসন ত্যাগ, সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন ও ইউরোপে এক যুগের অবসান
প্রুশিয়ানদের আগমন ও ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন: ওয়েলিংটন ও ব্লুশার কীভাবে ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন?
ওয়াটারলুর যুদ্ধ ১৮১৫: হুগোমোঁ, লা হে সাঁত, ফরাসি অশ্বারোহী আক্রমণ ও নেপোলিয়নের শেষ লড়াইয়ের পূর্ণ ইতিহাস
লিনি ও কোয়াত্র-ব্রার যুদ্ধ: ওয়াটারলুর দুই দিন আগে নেপোলিয়নের বিজয় কীভাবে হারানো সুযোগে পরিণত হয়েছিল?
সপ্তম জোট ও বেলজিয়াম অভিযান: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারকে আলাদা করে ধ্বংস করার নেপোলিয়নের শেষ সামরিক পরিকল্পনা
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও ‘হান্ড্রেড ডেজ’: নেপোলিয়ন কীভাবে আবার ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করে ইউরোপকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন?