বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আর্মেনীয় গণহত্যা: অটোমান সাম্রাজ্যে নির্বাসন, হত্যাযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস

Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী

  • Author: Admin
  • August 30, 2026
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আর্মেনীয় গণহত্যা: অটোমান সাম্রাজ্যে নির্বাসন, হত্যাযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আর্মেনীয় গণহত্যা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস সাধারণত ট্রেঞ্চ, কামান, যুদ্ধজাহাজ, বিশাল সেনাবাহিনী এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিবরণে পূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধের আড়ালে বেসামরিক জনগণের ওপর সংঘটিত এমন কিছু বিপর্যয় ছিল, যেগুলোর ক্ষত যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা বহু দূর অতিক্রম করেছে। ১৯১৫ সাল থেকে অটোমান সাম্রাজ্যের আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ব্যাপক নির্বাসন, হত্যাকাণ্ড, অনাহার ও নিপীড়ন ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি। ইতিহাসবিদদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবং বহু রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান এই ঘটনাকে আর্মেনীয় গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নিহত মানুষের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব থাকলেও সাধারণভাবে প্রায় দশ লাখ থেকে পনেরো লাখ আর্মেনীয়ের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায় অনুমান করা হয়।

এই বিপর্যয়ের শিকড় শুধু ১৯১৫ সালে ছিল না। আর্মেনীয়রা বহু শতাব্দী ধরে অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে পূর্ব আনাতোলিয়ায় বসবাস করছিল। তারা প্রধানত খ্রিস্টান ছিল এবং অটোমান সমাজের ধর্মভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে অবস্থান করত। কনস্টান্টিনোপল, স্মিরনা এবং অন্যান্য শহরে আর্মেনীয় ব্যবসায়ী, কারিগর, চিকিৎসক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিল। আবার পূর্ব আনাতোলিয়ার বহু আর্মেনীয় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

উনিশ শতকের শেষভাগে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বলকানে খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে একের পর এক অঞ্চল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সময়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ করতে থাকে। আর্মেনীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর একটি অংশ সংস্কার, নিরাপত্তা ও অধিকারের দাবি তুললে অটোমান নেতৃত্বের মধ্যে সন্দেহ বাড়তে থাকে যে আর্মেনীয় জাতীয়তাবাদও শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদে পরিণত হতে পারে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই ১৮৯৪ থেকে ১৮৯৬ সালের মধ্যে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের শাসনামলে আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা হামিদীয় হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক আর্মেনীয় নিহত হয়। ১৯০৯ সালে আদানা অঞ্চলেও আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সহিংসতা ঘটে। ফলে ১৯১৫ সালের বিপর্যয় সম্পূর্ণ শূন্য থেকে জন্ম নেয়নি; তার আগে কয়েক দশক ধরে সহিংসতা, বৈষম্য, জাতিগত সন্দেহ ও রাজনৈতিক সংকট জমে উঠেছিল।

১৯০৮ সালের ইয়ং তুর্ক বিপ্লব প্রথমদিকে অনেক আর্মেনীয়ের কাছে আশার বার্তা নিয়ে এসেছিল। সাংবিধানিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমঅধিকারের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভূখণ্ড হারানো এবং বিশেষ করে ১৯১২-১৩ সালের বলকান যুদ্ধের বিপর্যয় অটোমান রাজনীতিকে আরও কঠোর জাতীয়তাবাদী পথে নিয়ে যায়। বলকান থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম শরণার্থী আনাতোলিয়ায় চলে আসে এবং সাম্রাজ্যের নেতৃত্বের মধ্যে ভূখণ্ড হারানোর গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়।

১৯১৩ সালের পর কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস কার্যত অটোমান সরকারের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তালাত পাশা, এনভার পাশা ও জামাল পাশা এই নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। ১৯১৪ সালের শেষ দিকে অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানি ও কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করলে পূর্ব আনাতোলিয়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গনে পরিণত হয়। এই যুদ্ধই আর্মেনীয়দের প্রতি আগে থেকে থাকা সন্দেহকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যায়।

রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী ছিল এবং কিছু আর্মেনীয় স্বেচ্ছাসেবক রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। অটোমান সাম্রাজ্যের কিছু আর্মেনীয়ও রুশ অগ্রযাত্রাকে মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছিল। আবার বিপুলসংখ্যক অটোমান আর্মেনীয় তাদের স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাচ্ছিল এবং অনেক আর্মেনীয় পুরুষ অটোমান সেনাবাহিনীতেও নিয়োগ পেয়েছিল। কিন্তু অটোমান নেতৃত্ব ধীরে ধীরে একটি পুরো জাতিগত জনগোষ্ঠীর ওপর সামষ্টিক সন্দেহ আরোপ করতে শুরু করে—যেন আর্মেনীয় পরিচয় নিজেই সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ।

১৯১৪ সালের শেষ এবং ১৯১৫ সালের শুরুতে ককেশাসে অটোমান সামরিক বিপর্যয় পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে। এনভার পাশার নেতৃত্বে পরিচালিত সারিকামিশ অভিযান রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়। তুষার, প্রচণ্ড ঠান্ডা, দুর্বল সরবরাহ ও রুশ প্রতিরোধে অটোমান তৃতীয় সেনাবাহিনী বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে। এই পরাজয়ের পর অটোমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে আর্মেনীয়দের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আরও জোরালো হতে থাকে।

১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অটোমান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বহু আর্মেনীয় সৈন্যকে অস্ত্রহীন করে শ্রম ব্যাটালিয়নে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে তাদের অনেককে হত্যা করা হয়। এর ফলে আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের সামরিক বয়সী পুরুষদের একটি বড় অংশ নিজেদের এবং পরিবারের প্রতিরক্ষার সক্ষমতা হারায়। একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে আর্মেনীয়দের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ এবং তল্লাশি অভিযান পরিচালিত হতে থাকে।

এরপর আসে ২৪ এপ্রিল ১৯১৫—আর্মেনীয় গণহত্যার স্মরণে যে দিনটি আজও কেন্দ্রীয় প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কনস্টান্টিনোপলে অটোমান কর্তৃপক্ষ শত শত আর্মেনীয় বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আরও অনেকে আটক হন। তাদের অনেককে আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরে পাঠানো হয় এবং বহু ব্যক্তি পরে নিহত হন।

একটি সম্প্রদায়কে ব্যাপকভাবে নির্বাসিত করার আগে তার নেতৃত্ব ও সংগঠিত প্রতিরোধের সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই গ্রেপ্তার অভিযান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই ২৪ এপ্রিলকে সাধারণভাবে গণহত্যার সূচনার প্রতীকী তারিখ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

পূর্ব আনাতোলিয়ার ভান অঞ্চলের ঘটনাও অটোমান সরকারের প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে অটোমান বাহিনী ও আর্মেনীয়দের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে এবং আর্মেনীয়রা আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে রুশ বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করে। অটোমান নেতৃত্ব এই ঘটনাকে বৃহত্তর আর্মেনীয় বিদ্রোহ ও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ বা সহযোগিতার ঘটনাকে পুরো আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নির্বিচার ব্যবস্থা নেওয়ার ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

১৯১৫ সালের মে মাসে অটোমান সরকার নির্বাসন কার্যক্রমকে আনুষ্ঠানিক কাঠামো দেয়। তেহচির আইন নামে পরিচিত অস্থায়ী আইনের মাধ্যমে সামরিক কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তরের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। বাস্তবে এর প্রধান শিকার হয়ে ওঠে আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী। আনাতোলিয়ার বহু শহর ও গ্রাম থেকে পরিবারগুলোকে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মানুষকে প্রায়ই খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রস্তুত হতে বলা হতো। তারা যতটুকু বহন করতে পারে, তা নিয়ে যাত্রা শুরু করত। নারী, শিশু, বৃদ্ধ—কাউকেই এই নির্বাসন থেকে সাধারণভাবে রেহাই দেওয়া হয়নি। অনেক অঞ্চলে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের আগেই আলাদা করা হয়েছিল। এরপর নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের দীর্ঘ কাফেলায় দক্ষিণের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

নির্বাসনের ঘোষিত গন্তব্য ছিল মূলত সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল। কিন্তু এই স্থানান্তর কোনো নিরাপদ পুনর্বাসন কর্মসূচি ছিল না। বহু কাফেলাকে শত শত কিলোমিটার হেঁটে যেতে বাধ্য করা হয়। পর্যাপ্ত খাবার, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। গ্রীষ্মের তীব্র তাপ, ক্লান্তি, অনাহার ও রোগে অসংখ্য মানুষ পথে মারা যায়।

আরও ভয়াবহ ছিল সরাসরি হত্যাকাণ্ড ও কাফেলার ওপর আক্রমণ। বিভিন্ন অঞ্চলে আর্মেনীয় পুরুষদের দলবদ্ধভাবে হত্যা করা হয়। নির্বাসিতদের কাফেলা ডাকাত, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং হত্যাকারী ইউনিটের হামলার শিকার হয়। লুটপাট, অপহরণ এবং নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনাও ব্যাপক ছিল। বহু নারী ও শিশুকে জোরপূর্বক অন্য পরিবারে অন্তর্ভুক্ত বা ধর্মান্তরিত করা হয়।

এই সহিংসতায় অটোমান প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের ভূমিকা ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ, প্রাদেশিক কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষ সংগঠন হিসেবে পরিচিত কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক ঐতিহাসিক গবেষণা হয়েছে। সব স্থানীয় কর্মকর্তা একইভাবে আচরণ করেননি। কিছু অটোমান কর্মকর্তা নির্বাসন ও হত্যার নির্দেশের বিরোধিতা করেন বা আর্মেনীয়দের রক্ষার চেষ্টা করেন; কেউ কেউ এর ফলে পদ হারান। কিন্তু সামগ্রিকভাবে নির্বাসন এত বিস্তৃত ও সমন্বিত ছিল যে এটিকে কেবল স্থানীয় বিশৃঙ্খলা বা যুদ্ধের অনিচ্ছাকৃত ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

নির্বাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ গন্তব্যগুলোর একটি ছিল বর্তমান সিরিয়ার দেইর ez-Zor বা দেইর আজ-জোর অঞ্চল। মরুভূমির শিবির ও আশপাশের এলাকায় পৌঁছানোর আগেই অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছিল। যারা পৌঁছেছিল, তাদেরও অনেকের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও আশ্রয় ছিল না। অনাহার, রোগ ও নতুন হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মৃত্যু চলতে থাকে। নির্বাসনের পথ নিজেই কার্যত মৃত্যুর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল।

একই সঙ্গে আর্মেনীয়দের সম্পত্তির ওপরও ব্যাপক হস্তক্ষেপ ঘটে। বাড়ি, দোকান, কৃষিজমি, গবাদিপশু এবং অন্যান্য সম্পদ পরিত্যক্ত বা বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি হিসেবে প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে নেওয়া হয় এবং বহু ক্ষেত্রে অন্যদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এর ফলে শুধু মানুষকে তাদের জন্মভূমি থেকে সরানো হয়নি; শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা একটি সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিও ধ্বংস করা হয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য ছিল না। অটোমান সাম্রাজ্যে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, মিশনারি ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শী নির্বাসন ও হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তখনও যুদ্ধে প্রবেশ করেনি এবং কনস্টান্টিনোপলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি মরগেনথাউ সিনিয়র অটোমান নেতৃত্বের কাছে আর্মেনীয়দের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবাদ জানান। জার্মানি অটোমানদের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও কিছু জার্মান কূটনীতিক ও প্রত্যক্ষদর্শীর নথিতেও ব্যাপক নিপীড়নের বিবরণ পাওয়া যায়।

১৯১৫ সালের মে মাসেই ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া অটোমান সরকারের বিরুদ্ধে আর্মেনীয়দের হত্যার বিষয়ে যৌথ ঘোষণা দেয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করার কথা জানায়। অর্থাৎ ঘটনাগুলোর ব্যাপকতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরে প্রথম আবিষ্কৃত হয়নি; হত্যাযজ্ঞ চলাকালেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর খবর পৌঁছাচ্ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর দায়ীদের বিচারের কিছু প্রচেষ্টা শুরু হয়। অটোমান সামরিক আদালতে কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার পরিচালিত হয় এবং অনুপস্থিত অবস্থায় তালাত, এনভার ও জামাল পাশাসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সাম্রাজ্যের পতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তী তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে ব্যাপক ও স্থায়ী বিচারপ্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বহু অভিযুক্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

গণহত্যায় কত মানুষ নিহত হয়েছিল, তা নির্ধারণে জনসংখ্যার অসম্পূর্ণ হিসাব, যুদ্ধকালীন বিশৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন উৎসের পার্থক্যের কারণে একটি একক সংখ্যা নেই। তবে প্রায় দশ লাখ থেকে পনেরো লাখ আর্মেনীয়ের মৃত্যু হয়েছে—এমন অনুমান বহুল স্বীকৃত। যারা বেঁচে যায়, তাদের বিপুল অংশ আর পুরোনো বাড়িতে ফিরতে পারেনি। সিরিয়া, লেবানন, ইউরোপ, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে নতুন আর্মেনীয় প্রবাসী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে।

আজ ঘটনাটির নামকরণ নিয়েও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে ‘গণহত্যা’ শব্দটির ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুদ্ধকালীন মৃত্যু, আন্তঃসাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাজনিত স্থানান্তরের ওপর জোর দিয়েছে। অন্যদিকে গণহত্যা ও অটোমান ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী মূলধারার ইতিহাসবিদদের বিপুল অংশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত ব্যাপক নিপীড়ন ও ধ্বংসের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে এবং আর্মেনীয় গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বহু দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও আনুষ্ঠানিকভাবে একই স্বীকৃতি দিয়েছে।

এই ইতিহাসের গুরুত্ব শুধু আর্মেনীয় বা অটোমান অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা-আতঙ্ক, জাতীয়তাবাদ এবং একটি জনগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার রাজনীতি কত দ্রুত বিপর্যয়কর পরিণতিতে পৌঁছাতে পারে। বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তির কাজের দায় যখন পুরো জাতিগত সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো হয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেই ধারণাকে নির্বাসন ও সহিংসতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে, তখন বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা দ্রুত বিলীন হয়ে যেতে পারে।

আর্মেনীয় গণহত্যা তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কোনো পার্শ্ববর্তী ঘটনা ছিল না; যুদ্ধের পরিবেশকে ব্যবহার করে অটোমান আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশকে তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি থেকে নির্মূল করার এক বিপর্যয়কর প্রক্রিয়া ছিল। ২৪ এপ্রিলের গ্রেপ্তার, পুরুষদের বিচ্ছিন্ন করা, তেহচির আইনের অধীনে ব্যাপক নির্বাসন, মরুভূমির মৃত্যু-মিছিল, অনাহার, রোগ, হত্যাকাণ্ড এবং সম্পত্তি হারানোর মধ্য দিয়ে আনাতোলিয়ার বহু প্রাচীন আর্মেনীয় সম্প্রদায় কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন সাম্রাজ্যের সীমান্ত বদলে দিচ্ছিল, তখন একই যুদ্ধের আড়ালে একটি জনগোষ্ঠীর বাড়ি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং অসংখ্য জীবনও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল—যার স্মৃতি আজও ইতিহাস, পরিচয় এবং ন্যায়বিচারের আলোচনায় গভীরভাবে জীবিত।


You may also like