শিবাজী ও মুঘল সাম্রাজ্য: আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে মারাঠা শক্তির উত্থানের ইতিহাস
Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 24, 2026
শিবাজী ও মুঘল সাম্রাজ্য
সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মুঘল সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। শাহজাহানের শেষ যুগ এবং আওরঙ্গজেবের শাসনের শুরুতে এর বিপুল রাজস্ব, বিশাল সেনাবাহিনী এবং বিস্তৃত প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কোনো আঞ্চলিক শক্তির জন্য সহজ ছিল না। অথচ পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিবাজী ভোঁসলে এমন এক মারাঠা শক্তির ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সমস্যাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
শিবাজীর উত্থানকে শুধু আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। তাঁর রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠেছিল দাক্ষিণাত্যের বহুস্তরীয় রাজনৈতিক পরিবেশে, যেখানে মুঘল, বিজাপুরের আদিলশাহী, গোলকোন্ডার কুতুবশাহী, স্থানীয় জমিদার, দেশমুখ এবং বিভিন্ন মারাঠা সামরিক পরিবার পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছিল। এই বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশকেই শিবাজী নিজের স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরির সুযোগে পরিণত করেন।
শিবাজীর জন্ম সাধারণভাবে ১৬৩০ সালে শিবনেরি দুর্গে হয়েছে বলে গ্রহণ করা হয়। তাঁর পিতা শাহজি ভোঁসলে ছিলেন দাক্ষিণাত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিজাত, যিনি বিভিন্ন সময়ে আহমদনগর ও বিজাপুরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শাহজির সামরিক ও জমিদারি স্বার্থ বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকলেও শিবাজীর শৈশব মূলত পুনে অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তাঁর মা জিজাবাই শিবাজীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিলেন। পুনে অঞ্চলে শাহজির সম্পত্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থ পরিচালনার সঙ্গে দাদোজি কোন্ডদেবের নামও ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। তবে শিবাজীর পরবর্তী সাফল্যকে কোনো এক ব্যক্তির শিক্ষার ফল হিসেবে না দেখে পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের সামাজিক, সামরিক ও ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মুঘল সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। শাহজাহানের শেষ যুগ এবং আওরঙ্গজেবের শাসনের শুরুতে এর বিপুল রাজস্ব, বিশাল সেনাবাহিনী এবং বিস্তৃত প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কোনো আঞ্চলিক শক্তির জন্য সহজ ছিল না। অথচ পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিবাজী ভোঁসলে এমন এক মারাঠা শক্তির ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সমস্যাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
শিবাজীর উত্থানকে শুধু আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। তাঁর রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠেছিল দাক্ষিণাত্যের বহুস্তরীয় রাজনৈতিক পরিবেশে, যেখানে মুঘল, বিজাপুরের আদিলশাহী, গোলকোন্ডার কুতুবশাহী, স্থানীয় জমিদার, দেশমুখ এবং বিভিন্ন মারাঠা সামরিক পরিবার পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছিল। এই বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশকেই শিবাজী নিজের স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরির সুযোগে পরিণত করেন।
শিবাজীর জন্ম সাধারণভাবে ১৬৩০ সালে শিবনেরি দুর্গে হয়েছে বলে গ্রহণ করা হয়। তাঁর পিতা শাহজি ভোঁসলে ছিলেন দাক্ষিণাত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিজাত, যিনি বিভিন্ন সময়ে আহমদনগর ও বিজাপুরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শাহজির সামরিক ও জমিদারি স্বার্থ বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকলেও শিবাজীর শৈশব মূলত পুনে অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তাঁর মা জিজাবাই শিবাজীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিলেন। পুনে অঞ্চলে শাহজির সম্পত্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থ পরিচালনার সঙ্গে দাদোজি কোন্ডদেবের নামও ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। তবে শিবাজীর পরবর্তী সাফল্যকে কোনো এক ব্যক্তির শিক্ষার ফল হিসেবে না দেখে পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের সামাজিক, সামরিক ও ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
শিবাজীর শক্তির মূল কেন্দ্র ছিল সহ্যাদ্রি বা পশ্চিমঘাটের পাহাড়ি অঞ্চল। এই অঞ্চলের দুর্গগুলো সামরিকভাবে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত দুর্গ থেকে আশপাশের গিরিপথ, বাজার, কৃষিজ এলাকা ও যোগাযোগপথ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। বৃহৎ সেনাবাহিনী ও ভারী কামান নিয়ে এসব দুর্গ আক্রমণ করা ছিল কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।
কৈশোর পেরোনোর পর থেকেই শিবাজী স্থানীয় দুর্গগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে শুরু করেন। তোরণা দুর্গ দখল তাঁর প্রাথমিক উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এরপর রাজগড়সহ আরও কয়েকটি দুর্গ তাঁর হাতে আসে। কখনো সামরিক শক্তি, কখনো স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতা এবং কখনো রাজনৈতিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের এলাকা বাড়াতে থাকেন।
প্রথমদিকে তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল মুঘল নয়, বিজাপুরের আদিলশাহী সুলতানাত। বিজাপুর কর্তৃপক্ষ শিবাজীর ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতাকে বিপজ্জনক হিসেবে দেখতে শুরু করে। তাঁকে দমন করার জন্য পাঠানো হয় অভিজ্ঞ সেনাপতি আফজল খানকে।
১৬৫৯ সালের প্রতাপগড়ের ঘটনা শিবাজীর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। আফজল খান ও শিবাজী সীমিত অনুচর নিয়ে সাক্ষাৎ করতে সম্মত হন। সাক্ষাতের সময় সংঘর্ষ ঘটে এবং আফজল খান নিহত হন। এরপর অপেক্ষমাণ মারাঠা বাহিনী বিজাপুরের সেনাদের ওপর আক্রমণ করে বড় সাফল্য অর্জন করে।
প্রতাপগড়ের বিজয় শিবাজীর মর্যাদা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। তিনি শুধু স্থানীয় দুর্গের অধিপতি নন—এখন তিনি বিজাপুরের মতো প্রতিষ্ঠিত সুলতানাতকে সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম নেতা হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর হাতে নতুন অস্ত্র, ঘোড়া, সম্পদ ও এলাকা আসে।
এই সময়েই মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আওরঙ্গজেব তখন দিল্লির সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন এবং দাক্ষিণাত্যের পরিস্থিতি তাঁর নজরে আসে। শিবাজী মুঘল অধিকৃত অঞ্চল ও বাণিজ্যপথেও অভিযান শুরু করলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
আওরঙ্গজেব তাঁর মামা শায়েস্তা খানকে দাক্ষিণাত্যে পাঠান। শায়েস্তা খান ছিলেন অভিজ্ঞ মুঘল অভিজাত এবং বিশাল বাহিনী নিয়ে পুনে অঞ্চলে প্রবেশ করেন। তিনি পুনে দখল করেন এবং শিবাজীর পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল, মুঘল সামরিক শক্তির সামনে মারাঠাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কিন্তু ১৬৬৩ সালের এপ্রিল মাসে শিবাজী পুনেতে এক অসাধারণ আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করেন। রাতের অন্ধকারে নির্বাচিত যোদ্ধাদের নিয়ে তিনি শহরে প্রবেশ করে লালমহলে অবস্থানরত শায়েস্তা খানের ওপর হামলা চালান। শায়েস্তা খান আহত হন এবং তাঁর আঙুলের অংশ হারান; তাঁর এক পুত্র নিহত হন।
সামরিক ক্ষতির তুলনায় এই আক্রমণের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল অনেক বেশি। সাম্রাজ্যের একজন উচ্চপদস্থ সেনাপতিকে মুঘল-নিয়ন্ত্রিত শহরের ভেতরে আক্রমণ করে শিবাজী দেখিয়ে দিলেন যে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা কোনো ক্ষুদ্র বিদ্রোহী বাহিনী হিসেবে তাঁকে অবহেলা করা যাবে না। আওরঙ্গজেব পরে শায়েস্তা খানকে বাংলা সুবায় পাঠিয়ে দেন।
পরের বছর শিবাজী আরও সাহসী লক্ষ্য বেছে নেন—সুরাট। গুজরাটের এই বন্দর ছিল মুঘল ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আরব, পারস্য, আর্মেনীয়, ভারতীয় ও ইউরোপীয় বণিকদের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক এখানে সক্রিয় ছিল এবং শহরে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত ছিল।
১৬৬৪ সালে শিবাজীর বাহিনী সুরাটে অভিযান চালিয়ে বিপুল সম্পদ সংগ্রহ করে। এটি কোনো সাধারণ সীমান্ত আক্রমণ ছিল না। মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম ধনী বাণিজ্যিক শহরে আঘাত করে শিবাজী অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি সম্রাটের মর্যাদাতেও আঘাত করেন।
আওরঙ্গজেব এবার আরও শক্তিশালী ও কৌশলী প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি আম্বরের বিখ্যাত রাজপুত সেনাপতি মির্জা রাজা জয় সিংহকে শিবাজীর বিরুদ্ধে পাঠান। জয় সিংহ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতি ছিলেন না; তিনি কূটনীতি, অবরোধ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।
১৬৬৫ সালে জয় সিংহ মারাঠা দুর্গগুলোর ওপর সুপরিকল্পিত চাপ সৃষ্টি করেন। বিশেষ করে পুরন্দর দুর্গের অবরোধ শিবাজীকে কঠিন অবস্থায় ফেলে। মুঘল বাহিনীর শক্তিশালী অবরোধের মুখে তিনি বুঝতে পারেন যে সরাসরি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক।
ফলে ১৬৬৫ সালের পুরন্দর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী শিবাজী তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন বহু দুর্গ মুঘলদের হাতে ছেড়ে দিতে সম্মত হন এবং কিছু দুর্গ নিজের কাছে রাখেন। তাঁর পুত্র সম্ভাজিকে মুঘল মনসবদারি ব্যবস্থায় যুক্ত করার ব্যবস্থাও হয়।
এটি আপাতদৃষ্টিতে শিবাজীর বড় পরাজয় ছিল। কিন্তু তিনি পুরোপুরি ধ্বংস হননি। বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে সাময়িক সমঝোতার মাধ্যমে নিজের মূল শক্তির একটি অংশ রক্ষা করেন। শিবাজীর রাজনৈতিক দক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—প্রয়োজনে যুদ্ধ, প্রয়োজনে চুক্তি এবং সুযোগ এলে আবার সম্প্রসারণ।
পুরন্দর চুক্তির পর জয় সিংহ শিবাজীকে মুঘল সম্রাটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করেন। এর ফলেই ১৬৬৬ সালে শিবাজী আগ্রায় আওরঙ্গজেবের দরবারে উপস্থিত হন।
এই সাক্ষাৎ মুঘল-মারাঠা সম্পর্কের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাগুলোর একটি। শিবাজী আশা করেছিলেন তাঁকে তাঁর মর্যাদার উপযোগী সম্মান দেওয়া হবে। কিন্তু দরবারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানবিন্যাসে তিনি নিজেকে প্রত্যাশার তুলনায় নিচু মর্যাদায় দেখতে পান। এতে তিনি প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
আওরঙ্গজেবের দরবারে মর্যাদা শুধু সম্মানের বিষয় ছিল না। কে কোথায় দাঁড়াবে, কার মনসব কত এবং সম্রাটের কত কাছে অবস্থান করবে—এসবই রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসের প্রকাশ। ফলে শিবাজীর প্রতিক্রিয়া ছিল তাঁর সার্বভৌম মর্যাদার দাবির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এরপর তাঁকে আগ্রায় কড়া নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। তিনি আনুষ্ঠানিক কারাগারে ছিলেন কি না তা নিয়ে বর্ণনায় পার্থক্য থাকলেও বাস্তবে তাঁর স্বাধীন চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল—মুঘল রাজধানীর কাছে তিনি কার্যত আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণে।
তারপর ঘটে তাঁর বিখ্যাত পলায়ন। ১৬৬৬ সালের আগস্টে শিবাজী ও তাঁর পুত্র সম্ভাজি নজরদারি এড়িয়ে আগ্রা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। মিষ্টি বা উপহারের ঝুড়ির মধ্যে লুকিয়ে পালানোর জনপ্রিয় গল্পটি অত্যন্ত বিখ্যাত, যদিও ঘটনার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি নিরাপদে দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন। আগ্রা থেকে তাঁর পলায়ন মুঘলদের জন্য রাজনৈতিক বিব্রতকর ঘটনা এবং শিবাজীর কিংবদন্তি মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
আগ্রা থেকে ফেরার পর কিছু সময় মুঘল-মারাঠা সম্পর্ক তুলনামূলক শান্ত ছিল। কিন্তু এই বিরতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৬৭০ সাল থেকে শিবাজী দ্রুত হারানো দুর্গ ও ভূখণ্ড পুনর্দখল করতে শুরু করেন। পুরন্দর চুক্তিতে মুঘলদের হাতে যাওয়া বহু দুর্গ আবার মারাঠাদের নিয়ন্ত্রণে আসে।
এই পর্যায়ের অন্যতম বিখ্যাত ঘটনা কোন্ধানা দুর্গের যুদ্ধ, যা পরে সিংহগড় নামে পরিচিত হয়। মারাঠা সেনাপতি তানাজি মালুসারে অভিযানে নিহত হলেও দুর্গটি মারাঠাদের হাতে আসে। এই ধরনের দুর্গ পুনর্দখল শিবাজীর সামরিক শক্তি আবারও প্রতিষ্ঠা করে।
একই বছর তিনি দ্বিতীয়বার সুরাটে অভিযান পরিচালনা করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পুনরায় আঘাত করতে পারা দেখিয়ে দেয় যে ১৬৬৫ সালের সামরিক চাপ শিবাজীর শক্তিকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করতে পারেনি।
শিবাজীর সামরিক সাফল্যের পেছনে শুধু তথাকথিত ‘গেরিলা যুদ্ধ’ ছিল না। তাঁর কৌশল ছিল আরও বহুমাত্রিক। দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনী, দুর্গের নেটওয়ার্ক, গোয়েন্দা তথ্য, স্থানীয় ভূগোল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, আকস্মিক আক্রমণ এবং শত্রুর রসদপথে আঘাত—সবকিছু একসঙ্গে ব্যবহৃত হতো।
মারাঠা দুর্গগুলো ছিল এই ব্যবস্থার কেন্দ্র। একটি দুর্গ হারালেও পুরো শক্তি ভেঙে পড়ত না। অন্য দুর্গ থেকে প্রতিরোধ চালানো যেত। মুঘলরা একটি পাহাড়ি দুর্গ অবরোধ করতে বিপুল সেনা ও সময় ব্যয় করলে মারাঠা বাহিনী অন্য অঞ্চলে আক্রমণ করতে পারত।
শিবাজী নৌবাহিনী গড়ে তোলার গুরুত্বও উপলব্ধি করেছিলেন। পশ্চিম উপকূলে পর্তুগিজ, সিদ্দি এবং অন্যান্য সামুদ্রিক শক্তির উপস্থিতির কারণে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা তাঁর রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি উপকূলীয় দুর্গ নির্মাণ ও নৌবহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
রাজনৈতিকভাবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আসে ১৬৭৪ সালে রায়গড়ে রাজ্যাভিষেকের মাধ্যমে। বিশাল আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তিনি ছত্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হন। এই অনুষ্ঠান তাঁর ক্ষমতাকে শুধু সামরিক দখল থেকে একটি বৈধ রাজতান্ত্রিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল।
রাজ্যাভিষেকের মাধ্যমে শিবাজী ঘোষণা করেন যে তিনি বিজাপুর বা মুঘলদের অধীন কোনো স্থানীয় জমিদার নন, বরং নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্রের শাসক। প্রশাসনিক পদ, রাজস্বব্যবস্থা, দুর্গ পরিচালনা এবং সামরিক কাঠামোকে আরও সংগঠিত করার মাধ্যমে এই রাষ্ট্রকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
শিবাজীর শাসনের সঙ্গে অষ্টপ্রধান নামে পরিচিত মন্ত্রীপরিষদের ধারণা যুক্ত। পেশওয়া, অমাত্য, সচিবসহ বিভিন্ন পদ প্রশাসনের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করত। তবে আধুনিক মন্ত্রিসভার মতো স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটিকে দেখা ঠিক হবে না; চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাজার হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল।
রাজস্ব সংগ্রহেও শিবাজীর প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং সরাসরি রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পরে মারাঠা রাজনৈতিক অর্থনীতিতে চৌথ ও সরদেশমুখী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও এগুলোর বৃহৎ আন্তঃআঞ্চলিক ব্যবস্থা মূলত পরবর্তী মারাঠা সম্প্রসারণের সময় পূর্ণতা লাভ করে।
শিবাজীকে ঘিরে আধুনিক যুগে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন অত্যন্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। তিনি নিঃসন্দেহে হিন্দু রাজকীয় পরিচয় ও সংস্কৃত রাজনৈতিক প্রতীককে গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং তাঁর রাজ্যাভিষেকেও তা স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্রকে শুধু একটি সরল ধর্মীয় সংঘর্ষের কাঠামোয় ব্যাখ্যা করলে সপ্তদশ শতাব্দীর বাস্তবতা হারিয়ে যায়।
শিবাজীর প্রশাসন ও সামরিক ব্যবস্থায় মুসলিম ব্যক্তিরাও কাজ করতেন, আবার তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষদের মধ্যে বিজাপুর ও মুঘল উভয়ই ছিল মুসলিম শাসিত রাষ্ট্র। একই সময়ে মুঘল সেনাবাহিনীতে জয় সিংহের মতো শক্তিশালী হিন্দু রাজপুত অভিজাত শিবাজীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ সংঘর্ষটি মূলত রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড, রাজস্ব ও ক্ষমতার প্রশ্নে পরিচালিত হচ্ছিল।
আওরঙ্গজেব ও শিবাজীর মধ্যে পার্থক্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রের আকার ও যুদ্ধের ধরন। আওরঙ্গজেব এমন একটি সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করতেন যার সম্পদ ও সেনাবাহিনী অসাধারণ বড়। শিবাজীর পক্ষে সেই সাম্রাজ্যকে খোলা সমতলে বিশাল সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধে পরাজিত করা বাস্তবসম্মত ছিল না।
তাই শিবাজী যুদ্ধক্ষেত্রকে নিজের সুবিধামতো বদলে দেন। পাহাড়, দুর্গ, সংকীর্ণ গিরিপথ এবং দ্রুত চলাচল তাঁর শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি মুঘল সেনাবাহিনীকে যেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী, সেখানে নিয়মিত মোকাবিলা না করে যেখানে সাম্রাজ্যিক বাহিনী সবচেয়ে ধীর ও দুর্বল, সেখানে আঘাত করতেন।
তবে শিবাজী সব যুদ্ধে জয়ী হননি এবং তাঁর রাষ্ট্র কখনো আওরঙ্গজেবের পুরো সাম্রাজ্যের সমকক্ষ ছিল না। পুরন্দর চুক্তি দেখায় যে শক্তিশালী ও দক্ষ মুঘল অভিযান তাঁকে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারত। কিন্তু মুঘলদের মূল ব্যর্থতা ছিল সেই সামরিক সাফল্যকে স্থায়ী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপ দিতে না পারা।
শিবাজী ১৬৭৬ সালের পর দক্ষিণ ভারতে বড় অভিযান পরিচালনা করেন। কর্ণাটকের দিকে তাঁর অভিযান মারাঠা প্রভাবকে পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের সীমার বাইরে নিয়ে যায়। জিঞ্জিসহ দক্ষিণের কিছু দুর্গ ও অঞ্চল পরবর্তী সময়ে মারাঠাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ শিবাজীর মৃত্যুর বহু বছর পর আওরঙ্গজেব যখন মারাঠাদের প্রধান কেন্দ্রগুলো দখল করতে শুরু করবেন, তখন জিঞ্জি দুর্গই শিবাজীর পুত্র রাজারামের বিকল্প প্রতিরোধকেন্দ্রে পরিণত হবে। অর্থাৎ শিবাজীর জীবদ্দশার দক্ষিণ অভিযান ভবিষ্যৎ মারাঠা প্রতিরোধের জন্যও কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করেছিল।
১৬৮০ সালের এপ্রিল মাসে রায়গড়ে শিবাজীর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স তখন পঞ্চাশের কাছাকাছি। তিনি এমন সময় মারা যান যখন আওরঙ্গজেব এখনো ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বিশাল দাক্ষিণাত্য অভিযান শুরু করেননি। তাই আওরঙ্গজেবের সঙ্গে শিবাজীর সংঘর্ষকে ১৬৮১-১৭০৭ সালের পরবর্তী দীর্ঘ মুঘল-মারাঠা যুদ্ধের সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখা উচিত নয়।
শিবাজীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সম্ভাজি ক্ষমতায় আসেন। আওরঙ্গজেব ১৬৮১ সালে নিজেই দাক্ষিণাত্যে চলে এলে সংঘর্ষ নতুন মাত্রা লাভ করে। ১৬৮৯ সালে সম্ভাজি বন্দি ও নিহত হলেও মারাঠা প্রতিরোধ শেষ হয়নি। রাজারাম এবং পরে তারাবাই সেই যুদ্ধ চালিয়ে যান।
এখানেই শিবাজীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট। তিনি শুধু নিজের জীবদ্দশায় কিছু দুর্গ ও অঞ্চল দখল করেননি; এমন একটি রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন যা তাঁর মৃত্যুর পরও টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। নেতৃত্ব বদলালেও দুর্গ, স্থানীয় অভিজাত, অশ্বারোহী বাহিনী এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিচয়ের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
আওরঙ্গজেব শেষ পর্যন্ত বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করেন এবং মারাঠাদের বিরুদ্ধে বিশাল সামরিক শক্তি ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ মুঘল অর্থনীতি ও প্রশাসনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এক অর্থে শিবাজীর তৈরি সমস্যাটিই আওরঙ্গজেবের জীবনের শেষ ২৬ বছরের প্রধান সামরিক সংকটে পরিণত হয়।
শিবাজীর উত্তরাধিকার অবশ্য তাঁর মৃত্যুর পর আরও বিস্তৃত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পেশওয়াদের অধীনে মারাঠা শক্তি দাক্ষিণাত্যের সীমানা অতিক্রম করে মধ্য ও উত্তর ভারতে প্রবেশ করে। মালওয়া, গুজরাট, বুন্দেলখণ্ড এবং দিল্লির রাজনীতিতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে।
ফলে ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে একটি গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়। শিবাজীর জীবনের শুরুতে মুঘল সাম্রাজ্য ছিল অপরিমেয় শক্তিশালী, আর মারাঠা ক্ষমতা ছিল পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের কয়েকটি দুর্গকেন্দ্রিক আঞ্চলিক শক্তি। কিন্তু তাঁর তৈরি রাষ্ট্রের উত্তরসূরিরাই পরবর্তী শতাব্দীতে দুর্বল হয়ে পড়া মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করবে।
শিবাজী ও আওরঙ্গজেবের সংঘর্ষ তাই শুধু দুই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব নয়; এটি ছিল দুই ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির মুখোমুখি হওয়া। একদিকে ছিল বিপুল রাজস্ব, বিশাল সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীভূত প্রশাসনের মুঘল সাম্রাজ্য; অন্যদিকে ছিল পাহাড়ি দুর্গ, দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনী, স্থানীয় নেটওয়ার্ক এবং সুযোগসন্ধানী যুদ্ধকৌশলের ওপর দাঁড়ানো উদীয়মান মারাঠা রাষ্ট্র।
শায়েস্তা খানের ওপর আকস্মিক হামলা, সুরাট অভিযান, পুরন্দর চুক্তির পরও টিকে থাকা, আগ্রায় আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণ থেকে পালিয়ে আসা এবং রায়গড়ে স্বাধীন ছত্রপতি হিসেবে রাজ্যাভিষেক—প্রতিটি ঘটনাই শিবাজীর আঞ্চলিক নেতা থেকে সার্বভৌম শাসকে পরিণত হওয়ার একেকটি ধাপ। তাঁর জীবদ্দশায় মারাঠারা মুঘল সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করেনি; কিন্তু শিবাজী এমন একটি শক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, যাকে দমন করতে গিয়ে আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্য কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ করবে—এবং শেষ পর্যন্ত যে মারাঠা শক্তিই অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।
নূরজাহান: মুঘল সাম্রাজ্যের পর্দার আড়ালে থাকা সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর ইতিহাস
ইসাবেলা প্রথম: যে স্প্যানিশ রানি ইউরোপ ও আমেরিকার ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিলেন
জোয়ান অব আর্ক: কিশোরী কৃষককন্যা কীভাবে ফ্রান্সের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন?
আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা দখল: শাহজাহানকে বন্দি করে কীভাবে মুঘল সিংহাসন জয় করেছিলেন?
দারা শিকোহ বনাম আওরঙ্গজেব: শাহজাহানের চার পুত্রের রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধ
মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ও বাণিজ্য: কৃষি, বস্ত্রশিল্প, বাংলা ও ইউরোপীয় বণিকদের আগমন