বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন: উত্তরাধিকার সংকট ও দুর্বল সম্রাটদের যুগ

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 24, 2026
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন: উত্তরাধিকার সংকট ও দুর্বল সম্রাটদের যুগ
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন

১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন হঠাৎ শুরু হয়নি; বরং তাঁর দীর্ঘ শাসনের শেষভাগেই যে কাঠামোগত সংকটগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো তাঁর মৃত্যুর পর দ্রুত বিস্ফোরিত হতে থাকে। বিশাল দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ সাম্রাজ্যের অর্থ ও সেনাবাহিনীকে ক্লান্ত করে ফেলেছিল, জাগির ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছিল, মারাঠারা পুরোপুরি দমন হয়নি, রাজপুত সম্পর্ক দুর্বল হয়েছিল এবং বহু প্রদেশে স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্র শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। আওরঙ্গজেব জীবিত থাকা পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব এই সমস্যাগুলোকে কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। কিন্তু তিনি মারা যেতেই সেই কেন্দ্রীয় ভারসাম্য ভেঙে পড়ে।

আওরঙ্গজেব মৃত্যুবরণ করেন ১৭০৭ সালের ৩ মার্চ আহমেদনগরের কাছে। তিনি প্রায় ঊনপঞ্চাশ বছর শাসন করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর সময় মুঘল সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিস্তারে ছিল। কিন্তু এই বিশাল সাম্রাজ্য কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। দক্ষিণে দীর্ঘ যুদ্ধ, উত্তর ভারতে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং সাম্রাজ্যের বিপুল সামরিক ব্যয় কেন্দ্রকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আবারও উত্তরাধিকার প্রশ্ন। মুঘল রাজবংশে জ্যেষ্ঠপুত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিংহাসন পেতেন না। ফলে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুয়াজ্জম, আজম শাহ এবং কাম বখশ

শেষ পর্যন্ত মুয়াজ্জম বিজয়ী হয়ে বাহাদুর শাহ প্রথম নামে সিংহাসনে বসেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সে সম্রাট হন এবং রাজত্ব করেন ১৭০৭ থেকে ১৭১২ সাল পর্যন্ত। তাঁর শাসনকাল খুব দীর্ঘ না হলেও তিনি কিছু ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেবের কঠোর নীতির সংশোধনের চেষ্টা করেন এবং রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।

কিন্তু বাহাদুর শাহের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সাম্রাজ্যের বহুমুখী সংকট। শিখ নেতা বান্দা সিংহ বাহাদুরের উত্থান, মারাঠাদের পুনর্গঠন এবং রাজপুতদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি তাঁকে একাধিক দিকে ব্যস্ত রাখে। ফলে কেন্দ্র আবারও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।

১৭১২ সালে বাহাদুর শাহ মারা গেলে আবার উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হয়। এই পুনরাবৃত্তি ছিল মুঘল পতনের অন্যতম মূল লক্ষণ। প্রতিটি সম্রাটের মৃত্যুর সঙ্গে রাজপুত্রেরা সেনাবাহিনী সংগঠিত করতেন, অভিজাতদের কিনে নিতেন এবং সাম্রাজ্যের রাজস্ব গৃহযুদ্ধে ব্যয় হতো। সিংহাসন দখলের প্রতিযোগিতাই রাষ্ট্রের শক্তিকে বারবার নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছিল।

বাহাদুর শাহের পর জাহান্দার শাহ ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু তাঁর শাসন মাত্র প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়। তিনি দরবারি গোষ্ঠীর ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিলেন এবং তাঁর শাসনের সঙ্গে শক্তিশালী অভিজাত জুলফিকার খানের প্রভাব গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এই সময় থেকেই স্পষ্ট হয় যে সম্রাটের ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের বদলে অভিজাত গোষ্ঠীগুলো ক্রমে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে।

জাহান্দার শাহকে পরাজিত করে ফাররুখসিয়ার সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তিনি নিজেও ক্ষমতায় আসেন সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের সহায়তায়—সৈয়দ আবদুল্লাহ খান ও সৈয়দ হুসেন আলি খান। তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই বাড়ে যে তারা পরবর্তী সময়ে ‘কিংমেকার’ হিসেবে পরিচিত হন।

ফাররুখসিয়ার শীঘ্রই তাঁদের প্রভাব কমাতে চান, কিন্তু সফল হননি। ১৭১৯ সালে তাঁকে অপসারণ ও হত্যা করা হয়। এই ঘটনা মুঘল সম্রাটের মর্যাদায় গভীর আঘাত হানে। যে সিংহাসনে আকবর, শাহজাহান বা আওরঙ্গজেব প্রায় সর্বময় কর্তৃত্ব নিয়ে বসেছিলেন, সেই সিংহাসনের অধিকারীকেই এখন শক্তিশালী দরবারি অভিজাতেরা বসাতে ও সরাতে পারছিলেন।

১৭১৯ সালের অল্প সময়ে একাধিক সম্রাট পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ শাহ ক্ষমতায় আসেন। তাঁর দীর্ঘ শাসন ১৭১৯ থেকে ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত চলে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সংস্কৃতি ও রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁর আমলে দিল্লির শিল্প, সংগীত ও দরবারি জীবন আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে।

মুহাম্মদ শাহের সময় অভিজাতদের মধ্যে প্রধানত তুরানি, ইরানি ও হিন্দুস্তানি গোষ্ঠীর প্রতিযোগিতা রাজদরবারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কেন্দ্রের প্রশাসন ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পদ বণ্টনের রাজনীতিতে আটকে পড়ে। দূরবর্তী প্রদেশগুলো এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে শুরু করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে হায়দরাবাদ, বাংলা ও আওধে। এই প্রদেশগুলোর শাসকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সম্রাটের কর্তৃত্ব স্বীকার করলেও বাস্তবে ক্রমশ স্বাধীন হয়ে ওঠেন।

দাক্ষিণাত্যে নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহ ১৭২৪ সালের পর হায়দরাবাদে কার্যত স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মুঘল প্রশাসনের অভিজ্ঞ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, কিন্তু দিল্লির দরবারের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে বিরক্ত হয়ে দাক্ষিণাত্যে নিজের শক্তিকেন্দ্র গড়ে তোলেন।

বাংলায় মুর্শিদ কুলি খান রাজস্ব প্রশাসন শক্তিশালী করে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেন। তাঁর উত্তরসূরিদের সময় বাংলা কার্যত স্বাধীন নবাবি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দিল্লির সম্রাটের নামে আনুষ্ঠানিক খুতবা বা মুদ্রা থাকলেও বাস্তব রাজস্ব, সেনাবাহিনী ও প্রশাসন স্থানীয় নবাবের হাতে চলে যায়।

একইভাবে আওধে সাদাত খান বুরহান-উল-মুলক একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ মুঘল সাম্রাজ্য এক মুহূর্তে ভেঙে যায়নি; বরং তার প্রদেশগুলো ধীরে ধীরে কেন্দ্রের নামমাত্র আনুগত্য রেখে বাস্তবে স্বাধীন হয়ে ওঠে।

এই আঞ্চলিকীকরণের পেছনে রাজস্বব্যবস্থার সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মনসবদারদের বেতন দেওয়ার জন্য যে জাগির ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতো, সেখানে উৎপাদনশীল জমির ওপর চাপ বাড়ছিল। কাগজে নির্ধারিত রাজস্ব ও বাস্তবে আদায়যোগ্য অর্থের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।

দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘ যুদ্ধ বহু অঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। একই সঙ্গে অধিকসংখ্যক মনসবদারের জন্য পর্যাপ্ত লাভজনক জাগির না থাকায় জাগির সংকট তীব্র হয়। মনসবদাররা নিজেদের আয় নিশ্চিত করতে কৃষক ও জমিদারদের ওপর বেশি চাপ দিতে পারতেন, যা আবার স্থানীয় অসন্তোষ বাড়াত।

এই অবস্থায় জমিদার ও আঞ্চলিক প্রধানদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। কেন্দ্র যখন দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে পারছিল না, তখন বহু জমিদার রাজস্ব আটকে রাখতে বা নিজস্ব সশস্ত্র শক্তি গড়তে শুরু করেন। রাজস্ব আদায়ের সংকট সরাসরি সামরিক দুর্বলতায় রূপ নেয়, কারণ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী চালানোর জন্য অর্থ দরকার ছিল।

সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ ছিল মারাঠা শক্তির বিস্তার। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মারাঠারা নতুন করে সংগঠিত হয়। শিবাজীর পৌত্র শাহু এবং তারাবাইয়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত শাহুর পক্ষে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

এই ব্যবস্থায় পেশওয়াদের ক্ষমতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে বালাজি বিশ্বনাথ এবং পরে বাজিরাও প্রথম মারাঠা শক্তিকে দাক্ষিণাত্যের বাইরে নিয়ে যান। তাদের অশ্বারোহী বাহিনী মালওয়া, গুজরাট ও উত্তর ভারতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে।

বাজিরাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠাদের কৌশল ছিল সরাসরি দিল্লি দখল করে স্থির সাম্রাজ্য গড়ার চেয়ে মুঘল রাজস্বব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি এবং চৌথ আদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে মুঘল কেন্দ্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়।

১৭৩০-এর দশকে মারাঠারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তারা কার্যত মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলেও অভিযান চালাতে পারে। ১৭৩৭ সালে বাজিরাওয়ের বাহিনী দিল্লির কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা সাম্রাজ্যের মর্যাদার জন্য বিশাল আঘাত ছিল।

এই সামরিক দুর্বলতার সবচেয়ে নাটকীয় প্রমাণ আসে ১৭৩৯ সালে নাদির শাহের আক্রমণে। পারস্যের শক্তিশালী শাসক নাদির শাহ প্রথমে আফগান সীমান্তের দিকে অগ্রসর হন এবং মুঘল প্রতিরক্ষা সহজেই ভেঙে ফেলেন।

কারনালের যুদ্ধে মুঘল বাহিনী মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়। সংখ্যায় বিশাল হওয়া সত্ত্বেও মুঘল বাহিনীর নেতৃত্ব ও সমন্বয় দুর্বল ছিল। বিভিন্ন অভিজাত নিজস্ব বাহিনী পরিচালনা করতেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় সামরিক পরিকল্পনা কার্যকর ছিল না।

নাদির শাহ এরপর দিল্লিতে প্রবেশ করেন। শহরে উত্তেজনার পর ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠন ঘটে। ময়ূর সিংহাসন এবং বিপুল রাজকীয় ধনসম্পদ পারস্যে নিয়ে যাওয়া হয়। কোহিনূর হীরাও এই লুণ্ঠনের সঙ্গে নাদির শাহের হাতে চলে যায়।

১৭৩৯ সালের দিল্লি লুণ্ঠনের তাৎপর্য শুধু আর্থিক ছিল না। এটি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে দেখিয়ে দেয় যে মুঘল রাজধানী আর অজেয় নয়। সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক মর্যাদা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা আর পুরোপুরি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি।

মুহাম্মদ শাহের মৃত্যুর পর কেন্দ্র আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী কয়েক দশকে আহমদ শাহ দুররানির একাধিক আক্রমণ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ায়। পাঞ্জাব ও দিল্লির ওপর তাঁর অভিযান মুঘল সীমান্ত প্রতিরক্ষার দুর্বলতা স্পষ্ট করে।

এদিকে জাট শক্তি ভরতপুরকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়, শিখ মিসলগুলো পাঞ্জাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে এবং রোহিলা আফগানরাও উত্তর ভারতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে। ফলে দিল্লির মুঘল সম্রাট একটি সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসক থেকে ক্রমে বহু প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে নামমাত্র সার্বভৌম প্রতীকে পরিণত হন।

এই পতনকে শুধু ‘দুর্বল সম্রাটদের কারণে’ ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। আওরঙ্গজেবের পর বেশ কয়েকজন সম্রাট সত্যিই শক্তিশালী ব্যক্তিগত নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হন, কিন্তু সমস্যা ছিল আরও গভীর। সাম্রাজ্যের অতিবিস্তার, রাজস্ব সংকট, মনসবদারি-জাগির ব্যবস্থার চাপ, উত্তরাধিকার যুদ্ধ, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং নতুন সামরিক শক্তির উত্থান একসঙ্গে কাজ করছিল।

অন্যদিকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল। মুঘল রাষ্ট্র শক্তিশালী থাকাকালে ইংরেজ, ফরাসি ও অন্যান্য কোম্পানি মূলত শাসকের অনুমতিনির্ভর বণিক ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হলে তারা প্রাদেশিক রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়।

বিশেষ করে বাংলায় এই পরিবর্তন পরবর্তীকালে নাটকীয় হয়ে উঠবে। বাংলার নবাবেরা দিল্লির কাছ থেকে কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়লেও তাদের বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র ছিল। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এই নতুন যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যদিও তখনও মুঘল সম্রাট আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যমান ছিলেন।

এখানেই মুঘল পতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়—সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পতন তার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির বহু আগে শুরু হয়েছিল। দিল্লির সম্রাটের নামে মুদ্রা বা ফরমান থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তব ক্ষমতা বাংলা, হায়দরাবাদ, আওধ, মারাঠা, জাট, শিখ অথবা ইউরোপীয় কোম্পানির হাতে চলে যেতে পারে।

অতএব ১৭০৭ সালের পর মুঘল ইতিহাসকে ‘একদিন শক্তিশালী, পরদিন ধ্বংস’ ধরনের কাহিনি হিসেবে দেখা যায় না। এটি ছিল কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া। সম্রাটের রাজকোষ দুর্বল হয়, অভিজাতেরা স্বাধীন হয়, প্রদেশগুলো স্বায়ত্তশাসিত হয় এবং নতুন সামরিক শক্তি পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দখল নিতে থাকে।

দুর্বল সম্রাটদের যুগের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল তাদের ব্যক্তিগত অযোগ্যতা নয়, বরং তারা এমন একটি ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন যা ইতোমধ্যে গভীরভাবে চাপগ্রস্ত ছিল। শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হয়তো পতনের গতি কিছুটা ধীর করতে পারতেন, কিন্তু কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান না করে সাম্রাজ্যকে আগের আকবরীয় অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল।

আওরঙ্গজেবের সময় যে বিশাল সেনাবাহিনী দাক্ষিণাত্যে দশকের পর দশক যুদ্ধ করেছিল, তাঁর মৃত্যুর পর সেই রাষ্ট্র আর একইভাবে অর্থ ও জনবল সংগঠিত করতে পারছিল না। একই সময়ে মারাঠারা তুলনামূলকভাবে দ্রুত, নমনীয় ও বিকেন্দ্রীভূত সামরিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে এমন অঞ্চলে প্রবেশ করছিল যেখানে মুঘল প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্রের স্থানান্তর। সপ্তদশ শতাব্দীতে দিল্লি বা আগ্রা থেকে সাম্রাজ্যের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে হায়দরাবাদ, মুর্শিদাবাদ, লখনউ, পুনে, ভরতপুর এবং বিভিন্ন শিখ ক্ষমতাকেন্দ্র নিজস্ব রাজনীতি পরিচালনা করছিল।

তারপরও মুঘল সম্রাটের নাম ও প্রতীক দীর্ঘদিন গুরুত্ব বহন করে। এমনকি শক্তিশালী আঞ্চলিক শাসকেরাও অনেক সময় নিজেদের বৈধতা বাড়ানোর জন্য সম্রাটের কাছ থেকে উপাধি বা ফরমান চাইতেন। এর অর্থ হলো রাজনৈতিক ক্ষমতা দুর্বল হলেও মুঘল সার্বভৌমত্বের প্রতীকী মর্যাদা দ্রুত বিলীন হয়নি।

এই প্রতীকী অস্তিত্ব আরও দেড় শতাব্দীর বেশি সময় টিকে থাকবে। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় বাহাদুর শাহ জাফর আবারও প্রতীকীভাবে ভারতীয় বিদ্রোহীদের কেন্দ্র হয়ে উঠবেন। কিন্তু সেটি আর আকবর বা আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্য ছিল না; তখন মুঘল সম্রাটের বাস্তব ক্ষমতা মূলত দিল্লির লালকেল্লার সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণ তাই কোনো একটি ঘটনা নয়। উত্তরাধিকার যুদ্ধ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভেঙেছে, দরবারি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সম্রাটকে দুর্বল করেছে, জাগির ও রাজস্ব সংকট প্রশাসনের ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, প্রাদেশিক সুবাদাররা স্বাধীন হয়েছে, আর মারাঠা ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি সাম্রাজ্যের সামরিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

১৭০৭ সালে যে সাম্রাজ্য মানচিত্রে তার সর্বোচ্চ বিস্তারে ছিল, কয়েক দশকের মধ্যেই সেটি নিজের প্রদেশ ও সেনাবাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে। এই বৈপরীত্যই মুঘল পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—একটি সাম্রাজ্যের বিশাল ভূখণ্ড তার শক্তির প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু কার্যকর উত্তরাধিকার, স্থিতিশীল রাজস্ব, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং শক্তিশালী প্রশাসন ছাড়া সেই ভূখণ্ড খুব দ্রুত বোঝায় পরিণত হতে পারে।