মধ্যযুগে ব্ল্যাক ডেথের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: প্লেগ ডাক্তার থেকে কোয়ারেন্টাইন
সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি
মধ্যযুগের অসহায় চিকিৎসাচেষ্টা থেকে সংগঠিত মহামারি প্রতিরোধের সূচনা।
১৩৪৮ সালের ইউরোপে প্লেগের রোগীর পাশে দাঁড়ানো একজন চিকিৎসক জ্বর, বেদনাদায়ক ফোলা এবং দ্রুত মৃত্যুর লক্ষণ দেখতে পেতেন। কিন্তু কী কারণে রোগ হচ্ছে, তা বোঝার উপায় তাঁর ছিল না। জীবাণু শনাক্ত করার যন্ত্র, কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা সংক্রমণের আধুনিক ব্যাখ্যা তখন অনুপস্থিত। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে চিকিৎসক, ধর্মযাজক ও নগরকর্তৃপক্ষ নিজেদের জ্ঞান অনুযায়ী বিপর্যয় ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। ব্ল্যাক ডেথের চিকিৎসার ইতিহাস তাই ভুল ধারণার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ, পরিচর্যা এবং সংগঠিত প্রতিরোধ শেখার ইতিহাসও। তবে সব ব্যবস্থা একই সময়ে তৈরি হয়নি, কিংবা সমান ফলও দেয়নি।
মধ্যযুগীয় ইউরোপের শিক্ষিত চিকিৎসকদের চিন্তায় গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আরবি ও লাতিন চিকিৎসাসাহিত্যের মাধ্যমেও এই জ্ঞান বিস্তৃত হয়েছিল। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, শরীরের চার ধরনের রসের ভারসাম্য নষ্ট হলে অসুস্থতা দেখা দেয়। রোগীর খাবার, বয়স, ঋতু ও জীবনযাত্রার সঙ্গে চিকিৎসা মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলত। কিন্তু প্লেগের ক্ষেত্রে এই কাঠামো জীবাণুর কার্যক্রম ব্যাখ্যা করতে পারত না। রোগের প্রকৃত কারণ অজানা থাকায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতেও কার্যকর নিরাময়ের উপায় সীমিত ছিল।
চিকিৎসার পরিচিত পদ্ধতিগুলোর একটি ছিল রক্তমোক্ষণ, অর্থাৎ শরীর থেকে কিছু রক্ত বের করে দেওয়া। এর উদ্দেশ্য ছিল ক্ষতিকর বা অতিরিক্ত রসের ভারসাম্য সংশোধন করা। পাশাপাশি বমন বা পায়খানা করানোর ওষুধ, ভেষজ মিশ্রণ এবং মধুর সঙ্গে প্রস্তুত ওষুধ ব্যবহৃত হতো। সব চিকিৎসক অবশ্য একই নির্দেশ দিতেন না; রোগের পর্যায় ও রোগীর অবস্থা নিয়ে মতভেদ ছিল। আধুনিক দৃষ্টিতে রক্তক্ষরণ বা অতিরিক্ত তরল হারানো গুরুতর অসুস্থ মানুষকে আরও দুর্বল করতে পারে। এসব পদ্ধতি প্লেগের ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে কাজ করত না।
ফোলা লসিকাগ্রন্থি বা বিউবো নিয়েও নানা চিকিৎসাচেষ্টা হতো। কেউ প্রলেপ দিয়ে ফোলা পাকানোর চেষ্টা করতেন, কেউ কেটে পুঁজ বের করার কথা বলতেন। স্থানীয় ক্ষত চিকিৎসার অভিজ্ঞতা এখানে প্রয়োগ করা হলেও প্লেগ শুধু বাইরের ফোলার সমস্যা ছিল না। জীবাণু রক্তপ্রবাহ বা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়লে একটি গুটি কেটে দেওয়া রোগের সামগ্রিক বিপদ দূর করতে পারত না। দৃশ্যমান লক্ষণকে চিকিৎসা করা এবং সংক্রমণের মূল প্রক্রিয়া থামানো আলাদা বিষয়—মধ্যযুগীয় চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা এই পার্থক্যেই স্পষ্ট হয়।
আভিনিয়ঁতে কর্মরত চিকিৎসক ও শল্যবিদ গি দ্য শোলিয়াকের অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ১৩৪৮ সালের মহামারিতে রক্তকাশিসহ অসুস্থতা এবং ফোলা গ্রন্থিসহ রোগের ভিন্ন প্রকাশ বর্ণনা করেছিলেন। নিজে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার কথাও লিখেছেন। তাঁর কিছু ব্যাখ্যা ভুল হলেও লক্ষণ পর্যবেক্ষণের মূল্য ছিল। একই সঙ্গে তাঁর মতো মানুষের পরিচর্যা দেখায়, সব চিকিৎসক রোগী ফেলে পালিয়ে যাননি। চিকিৎসকদেরও মৃত্যু হচ্ছিল; ফলে দক্ষ লোকের অভাব বাড়ত এবং অসুস্থ মানুষের পাশে থাকার সামর্থ্য আরও কমে যেত।
প্রতিরোধের আরেক ভিত্তি ছিল মিয়াজমা বা দূষিত বাতাসের ধারণা। পচা বস্তু, দুর্গন্ধ কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে রোগ ছড়ায় বলে অনেকে বিশ্বাস করতেন। তাই সুগন্ধি ভেষজ, ধূপ, ধোঁয়া ও আগুন ব্যবহার করে বাতাস শোধনের চেষ্টা হতো। কোনো কোনো পরামর্শে খাবার, ব্যায়াম ও মানসিক অবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়। দুর্গন্ধ কমলে মানুষ স্বস্তি পেতে পারত, কিন্তু সুগন্ধি দিয়ে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিসের সংক্রমণ বন্ধ হয় না। তবু পরিবেশ পরিষ্কারের কিছু প্রচেষ্টা অন্যভাবে উপকারী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
প্লেগ ডাক্তারের কথা উঠলেই বর্তমানে লম্বা ঠোঁটওয়ালা মুখোশের ছবি মনে আসে। কিন্তু এই পরিচিত মুখোশকে ১৩৪৭–১৩৫৩ সালের ব্ল্যাক ডেথের সাধারণ পোশাক হিসেবে দেখানো ঐতিহাসিকভাবে ভুল। এর পরিচিত প্রমাণ মূলত সপ্তদশ শতকের ইতালি ও ফ্রান্সের সঙ্গে যুক্ত। মুখোশের ঠোঁটের অংশে সুগন্ধি উপাদান রাখা হতো, যাতে শ্বাসের সঙ্গে আসা ক্ষতিকর বাতাস ঠেকানো যায় বলে ধারণা ছিল। পরবর্তী যুগের এই দৃশ্য জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এত শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান প্রায়ই হারিয়ে যায়।
মধ্যযুগে মহামারির সময় নগরকর্তৃপক্ষ চিকিৎসক নিয়োগ বা তাঁদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারত। তবে সব শহরে একই ধরনের সংগঠিত চিকিৎসাসেবা ছিল না। ধনী মানুষ ব্যক্তিগত চিকিৎসা ও শহর ছাড়ার সুযোগ বেশি পেতেন; দরিদ্র মানুষের পক্ষে কাজ, বাড়ি ও পরিবার রেখে চলে যাওয়া কঠিন ছিল। পরিচর্যার বড় অংশ সামলাতেন পরিবারের সদস্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সাহায্যকারীরা। কার্যকর ওষুধ না থাকলেও খাবার, পানি ও দৈনন্দিন যত্নের ব্যবস্থা মানবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু পরিচর্যাকারীরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তেন।
ধর্ম ছিল বিপর্যয় বোঝা ও সহ্য করার প্রধান আশ্রয়। অনেক খ্রিস্টান প্লেগকে পাপের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করতেন। বিশেষ প্রার্থনা, অনুশোচনা, উপবাস এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে ঈশ্বরের করুণা চাওয়া হতো। এসব আচার মানুষকে সান্ত্বনা, সামাজিক সংহতি ও সাহায্যের সংগঠন দিতে পারত। কিন্তু ধর্মীয় আচার নিজে জীবাণুর সংক্রমণ বন্ধ করার উপায় ছিল না। বড় সমাবেশ ও বিভিন্ন জনপদের মধ্যে চলাচল কিছু পরিস্থিতিতে রোগ বিস্তারের সুযোগও বাড়াতে পারত, যদিও প্রতিটি শোভাযাত্রার ভূমিকা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
১৩৪৮–১৩৪৯ সালে আত্মপ্রহারকারী ফ্ল্যাজেল্যান্টদের আন্দোলন বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়। তাঁরা প্রকাশ্যে নিজেদের চাবুক মেরে অনুশোচনা করতেন এবং বিভিন্ন শহরে ঘুরতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই আত্মদণ্ড ঐশী ক্রোধ প্রশমিত করতে পারে। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষও আন্দোলনটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে; পোপ ষষ্ঠ ক্লেমেন্ট ১৩৪৯ সালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। একই সময়ে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কুয়ায় বিষ দেওয়ার মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড ঘটে। এসব অভিযোগের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না; ভয় ও বিদ্বেষ মহামারির সঙ্গে অতিরিক্ত মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছিল।
ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি মানুষ লক্ষ্য করেছিল যে আক্রান্ত স্থান থেকে আসা যাত্রী ও জাহাজের পর নতুন এলাকায় রোগ দেখা দিতে পারে। ফলে কিছু বন্দর সন্দেহজনক জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়া বা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। শহর ছেড়ে যাওয়াও ব্যক্তিগত প্রতিরোধ হিসেবে পরিচিত ছিল, যদিও সবাই তা করতে পারতেন না এবং যাত্রীরা অন্যত্র সংক্রমণ নিয়ে পৌঁছাতে পারতেন। জীবাণুর পরিচয় না জেনেও চলাচল ও রোগের মধ্যে সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী নিয়মতান্ত্রিক প্রতিরোধের ভিত্তি তৈরি করে।
সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ১৩৭৭ সালের রাগুসা, বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার দুব্রোভনিক। শহরের কর্তৃপক্ষ প্লেগপ্রবণ এলাকা থেকে আসা আগন্তুকদের প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট স্থানে ৩০ দিন পৃথক থাকার নিয়ম করে। এটি প্রথম ব্ল্যাক ডেথের ঢেউয়ের কয়েক দশক পরের ব্যবস্থা। উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষার সময় রোগের লক্ষণ দেখা দেয় কি না পর্যবেক্ষণ করা এবং শহরের সঙ্গে সংস্পর্শ কমানো। পৃথক স্থানে যাওয়া ও খাদ্য সরবরাহ নিয়েও বিধিনিষেধ ছিল। বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ না করে ঝুঁকি সামলানোর চেষ্টা এখানে স্পষ্ট।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বন্দরে অপেক্ষার মেয়াদ ৪০ দিনে গড়ায়। ইতালীয় ভাষায় চল্লিশ বোঝানো শব্দ থেকেই ‘কোয়ারেন্টাইন’ নামের উৎপত্তি। ১৪২৩ সালে ভেনিসে দ্বীপভিত্তিক স্থায়ী প্লেগ হাসপাতাল স্থাপন এই ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে অসুস্থ ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং আপাতসুস্থ কিন্তু সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকা আগন্তুককে পর্যবেক্ষণে রাখা এক নয়। মধ্যযুগীয় ব্যবস্থায় আজকের এই পার্থক্য সব সময় পরিষ্কার ছিল না, এবং বিভিন্ন শহরে নিয়ম ও বাস্তব প্রয়োগও আলাদা ছিল।
কোয়ারেন্টাইনও নিশ্চয়তাপূর্ণ প্রতিরক্ষা হয়ে ওঠেনি। গোপন চলাচল, ব্যবসায়িক চাপ, অপর্যাপ্ত খাদ্য ও আশ্রয়, এবং প্রাণী ও পরজীবীর ভূমিকা না বোঝা এর কার্যকারিতা সীমিত করত। তবু সংস্পর্শ কমানোর মাধ্যমে এটি বাস্তব উপকার করতে পারত। তাই মধ্যযুগের সব প্রচেষ্টাকে একসঙ্গে ব্যর্থ বলা ঠিক নয়। রক্তমোক্ষণ ও সুগন্ধি দিয়ে রোগ সারানোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেই পৃথকবাস, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের ধারণা বিকশিত হয়েছিল। ব্ল্যাক ডেথ থামানো যায়নি, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা মহামারি প্রতিরোধকে ব্যক্তিগত চিকিৎসার বাইরে জনসমাজের সংগঠিত দায়িত্বে পরিণত করতে সাহায্য করেছিল।
অ্যাসিরীয় রাজবংশ: দুর্ধর্ষ সামরিক সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের কারণ
ঝৌ রাজবংশ: চীনের দীর্ঘতম রাজবংশ ও ক্ষমতার নতুন ধারণার ইতিহাস
হিট্টাইট রাজবংশ: আনাতোলিয়ার সাম্রাজ্যের উত্থান ও রহস্যময় পতন
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ও দাসপ্রথার অবসান: লিংকনের মুক্তির ঘোষণা থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী
যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন: ডগলাস, টাবম্যান ও আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথার বিলুপ্তি: ১৮৩৩ সালের আইন থেকে ১৮৩৮ সালের মুক্তি