বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের ইতিহাস: আফ্রিকার বন্দি মানুষ ও আমেরিকার দাসশ্রমের অর্থনীতি

সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস

আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের ইতিহাস: আফ্রিকার বন্দি মানুষ ও আমেরিকার দাসশ্রমের অর্থনীতি
আটলান্টিকের দুই তীরে সমৃদ্ধির আড়ালে ছিল বন্দি মানুষের শ্রম ও প্রাণহানি।

মানুষকে সম্পত্তিতে পরিণত করার পুরোনো ব্যবস্থা যখন ইউরোপীয় সমুদ্রবিস্তার ও ঔপনিবেশিক কৃষির সঙ্গে যুক্ত হলো, তখন দাসত্ব এক নতুন মাত্রা পেল। আগে যুদ্ধবন্দি বা অপহৃত মানুষ আঞ্চলিক বাজারে বিক্রি হতেন; এবার একটি মহাসাগর পেরিয়ে তাঁদের পাঠানো হতে লাগল অন্য মহাদেশে। আফ্রিকার অভ্যন্তরের সংঘাত, উপকূলের বন্দিশালা, ইউরোপের বাণিজ্যিক পুঁজি এবং আমেরিকার আবাদভূমি মিলিয়ে গড়ে উঠল আটলান্টিক দাসবাণিজ্য—মানব ইতিহাসের বৃহত্তম জোরপূর্বক আন্তমহাদেশীয় স্থানান্তরগুলোর একটি।

পঞ্চদশ শতকে পর্তুগিজ নাবিক ও ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলে অভিযানের মাধ্যমে বন্দি মানুষ সংগ্রহ ও বেচাকেনা বাড়াতে থাকে। প্রথমদিকে তাঁদের ইউরোপ ও আটলান্টিকের দ্বীপগুলোতে নেওয়া হতো। মাদেইরা ও পরে সাও তোমের মতো দ্বীপে চিনি উৎপাদনের বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় আবাদ, চিনিকল, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বাধ্যতামূলক শ্রমের সংযোগ সেখানে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যা পরে ব্রাজিল ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে আরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়।

আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের পর জমি দখল করা গেলেও উৎপাদন চালানোর শ্রমশক্তি নিয়ে সংকট দেখা দেয়। আদিবাসীদের ওপর যুদ্ধ, উচ্ছেদ, বাধ্যতামূলক শ্রম ও মহামারি বিপর্যয় নামিয়ে আনে। উপনিবেশকারীরা আদিবাসী শ্রম শোষণের পাশাপাশি আফ্রিকা থেকে বন্দি মানুষ আনা বাড়ায়। তাঁদের নির্বাচন কোনো স্বাভাবিক শ্রমবাজারের ফল ছিল না। রাষ্ট্রের অনুমোদন, বাণিজ্যিক চাহিদা ও সংগঠিত সহিংসতা মিলে মানুষ আমদানির বাজার তৈরি করেছিল।

আফ্রিকায় বন্দি সংগ্রহের পদ্ধতি অঞ্চল ও সময়ভেদে ভিন্ন ছিল। যুদ্ধবন্দিত্ব, গ্রামে হামলা, অপহরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে বিচারিক শাস্তির মাধ্যমে মানুষ দাসবাণিজ্যে ঢুকে পড়তেন। আফ্রিকান শাসক, ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের একাংশ এই বাণিজ্যে অংশ নেয়; অন্য জনগোষ্ঠী আক্রমণের শিকার হয় বা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুরো আফ্রিকাকে এক পক্ষ হিসেবে দেখা তাই ভুল। ইউরোপীয় ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও পণ্যের সরবরাহ বিদ্যমান সংঘাতকে অনেক অঞ্চলে আরও লাভজনক ও ধ্বংসাত্মক করে তোলে।

সব বন্দিকে ইউরোপীয়রা নিজেরা অভ্যন্তরভাগ থেকে ধরত না। বহু ক্ষেত্রে তাঁরা উপকূলে স্থানীয় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের কাছ থেকে মানুষ কিনত। কাপড়, ধাতব সামগ্রী, আগ্নেয়াস্ত্র, মদসহ বিভিন্ন পণ্য বিনিময়ে ব্যবহৃত হতো। বন্দিদের দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে উপকূলে আনা হতো; যাত্রাপথেই অনেকে অসুস্থ হতেন বা মারা যেতেন। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাঁদের সামনে অপেক্ষা করত উপকূলীয় ঘের, দুর্গ বা অস্থায়ী বন্দিশালায় অনিশ্চিত অপেক্ষা।

আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার এই পর্যায় পরিচিত হয় মিডল প্যাসেজ নামে। জাহাজের নিচের সংকীর্ণ অংশে মানুষকে গাদাগাদি করে রাখা হতো; প্রায়ই শৃঙ্খল পরানো থাকত। বাতাসের অভাব, অপর্যাপ্ত পানি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং আমাশয়সহ নানা রোগ মৃত্যুর কারণ হতো। যাত্রা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারত। জাহাজের হিসাবখাতায় যাঁদের পণ্য হিসেবে গণনা করা হতো, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবার, ভাষা, স্মৃতি ও নিজস্ব জীবনসম্পন্ন মানুষ।

বর্তমান ঐতিহাসিক পুনর্গঠনের বহুল ব্যবহৃত হিসাবে, ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ আফ্রিকানকে আটলান্টিকগামী জাহাজে তোলা হয়েছিল; প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ জীবিত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছান। অর্থাৎ সমুদ্রযাত্রাতেই প্রায় ১৮ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই হিসাবের বাইরে রয়েছে বন্দি হওয়ার সময়, অভ্যন্তরীণ যাত্রাপথে এবং উপকূলীয় বন্দিত্বে মৃত্যু। তাই জাহাজের সংখ্যাতথ্য পুরো মানবিক ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করে না।

এই স্থানান্তরের অধিকাংশ মানুষকে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছিল—এমন ধারণা ভুল। সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল ব্রাজিল; ক্যারিবীয় উপনিবেশগুলোও বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রহণ করে। ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকা এবং পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি পৌঁছানো মানুষের অংশ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। পর্তুগিজ ও ব্রাজিলীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ব্রিটিশ, ফরাসি, ডাচ, স্প্যানিশ এবং অন্য ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। বাণিজ্যের কেন্দ্র ও প্রাধান্য শতাব্দী ধরে বদলেছে।

আমেরিকায় পৌঁছানোর পর বন্দিদের বিক্রি, পরীক্ষা এবং নতুন মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হতো। পরিচিত মানুষদের আলাদা করে দেওয়া ছিল সাধারণ বিপর্যয়। অনেকের নাম বদলে ফেলা হতো; নতুন ভাষা ও কঠোর শ্রমের নিয়ম চাপানো হতো। ইউরোপীয় উপনিবেশগুলো ধীরে ধীরে এমন আইন তৈরি করে, যাতে আফ্রিকান বংশপরিচয় ও দাসত্ব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। বহু অঞ্চলে সন্তানের অবস্থান মায়ের দাসত্ব অনুসারে নির্ধারিত হওয়ায় বন্দিত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে চলতে থাকা একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

ব্রাজিল ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চিনি ছিল এই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। আখ লাগানো, আগাছা পরিষ্কার, কাটা এবং দ্রুত চিনিকলে পৌঁছানো—সব পর্যায়ে কঠোর শ্রম লাগত। আখ কাটার মৌসুমে কল ও ফুটন্ত রসের চুল্লিতে দীর্ঘ সময় কাজ চলত। দুর্ঘটনা, অপুষ্টি, রোগ এবং নির্মম শাস্তি মানুষের জীবন ক্ষয় করত। বহু চিনি উপনিবেশে মৃত্যুহার এত বেশি ছিল যে শ্রমশক্তি ধরে রাখতে নতুন বন্দি আমদানির ওপর নির্ভরতা বজায় থাকত।

দাসশ্রম শুধু চিনিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তামাক, ধান, কফি, নীল এবং খনিতেও এর ব্যবহার হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে তুলা উৎপাদনের বিস্তার দাসশ্রমের চাহিদা বাড়ায়। তুলার বীজ ছাড়ানোর যন্ত্র প্রক্রিয়াকরণ সহজ করলেও খেতে তুলা ফলানো ও তোলার কাজ শ্রমনির্ভর ছিল। জমি সম্প্রসারণের সঙ্গে শ্রমের চাহিদা বাড়ে। ফলে প্রযুক্তির উন্নতি এখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি আনেনি; উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ দাসত্বের বিস্তারকে আরও উৎসাহ দিয়েছিল।

১৮০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশ থেকে দাস আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ার পরও দেশের অভ্যন্তরে মানুষের কেনাবেচা চলতে থাকে। পুরোনো দাসপ্রধান অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষকে গভীর দক্ষিণের তুলার এলাকায় পাঠানো হয়। পরিবার বিচ্ছিন্নতা এই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেরও কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। আটলান্টিকের জাহাজযাত্রা বন্ধ করা এবং দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা যে আলাদা বিষয়, এই অভিজ্ঞতা তা স্পষ্ট করে। আমদানির নিষেধাজ্ঞা মানুষের ওপর মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ করেনি।

এই ব্যবস্থার লাভ শুধু আবাদমালিকেরা পেতেন না। জাহাজ নির্মাতা, বন্দর ব্যবসায়ী, ঋণদাতা, বিমাকারী, চিনি পরিশোধনাগার ও বস্ত্র উৎপাদকদের একাংশও যুক্ত ছিল। ইউরোপ থেকে পণ্য আফ্রিকায়, বন্দি মানুষ আমেরিকায় এবং উপনিবেশের পণ্য ইউরোপে যাওয়ার সম্পর্ককে প্রায়ই ত্রিভুজ বাণিজ্য বলা হয়। কিন্তু প্রতিটি জাহাজ একই ত্রিভুজাকার পথ অনুসরণ করত না। বাস্তবে এটি ছিল বহু বন্দর, সরাসরি সমুদ্রপথ এবং জটিল ঋণ ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক।

বন্দি মানুষেরা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে গেছেন। জাহাজে বিদ্রোহ, পালিয়ে স্বাধীন বসতি গড়া, কাজের গতি কমানো এবং প্রকাশ্য অভ্যুত্থান ছিল তার বিভিন্ন রূপ। ভাষা, ধর্ম, সংগীত ও পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষাও মানুষ হিসেবে নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখার উপায় হয়ে ওঠে। দাসশ্রমের ওপর দাঁড়ানো সম্পদের বিপরীতে এই প্রতিরোধ একটি প্রশ্নকে ক্রমে অনিবার্য করে তোলে: যে সমৃদ্ধির জন্য মানুষকে সম্পত্তি বানাতে হয়, সেই সমৃদ্ধিকে বৈধ বলার অধিকার কার?