বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের সূচনা: কোয়েকার, আলোকায়ন ও মানবাধিকারের লড়াই

সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস

দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের সূচনা: কোয়েকার, আলোকায়ন ও মানবাধিকারের লড়াই
ধর্মীয় প্রতিবাদ, যুক্তি ও ব্যক্তিগত সাক্ষ্যে গড়ে ওঠে দাসত্ববিরোধী জনমত।

দাসশ্রমের ওপর দাঁড়ানো সমৃদ্ধিকে বৈধ বলার অধিকার কার—আটলান্টিকের দুই তীরে জমে ওঠা এই প্রশ্নই ক্রমে সংগঠিত প্রতিবাদের ভাষা পায়। বন্দি মানুষের বিদ্রোহ ও পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আগে থেকেই ছিল। নতুন পরিবর্তন ঘটল যখন ধর্মীয় বিবেক, মানুষের স্বাভাবিক অধিকারের ধারণা এবং দাসত্বের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্রকাশ্য বিতর্কে একত্র হতে শুরু করল। দাসপ্রথা তখন শুধু নিষ্ঠুর মালিকের আচরণ হিসেবে নয়, অন্যায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রশ্নের মুখে পড়তে থাকে।

এই পরিবর্তন হঠাৎ আসেনি। বহু শতাব্দী ধরে যুদ্ধবন্দিত্ব, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সম্পত্তির অধিকার দিয়ে দাসত্বকে সমর্থন করা হয়েছিল। ইউরোপীয় বাণিজ্য ও উপনিবেশের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ ব্যবস্থা থেকে লাভবান হতেন। ফলে দাসত্বের নিন্দা করা এবং তা বন্ধের দাবি তোলা এক বিষয় ছিল না। কেউ নিষ্ঠুরতা কমাতে চাইতেন, কেউ বাণিজ্য বন্ধ করতে চাইতেন, আবার কেউ মানুষের ওপর মালিকানাই অস্বীকার করতেন। আন্দোলনের শুরুতে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রথম দিকের ধারাবাহিক ধর্মীয় প্রতিবাদের ক্ষেত্রে কোয়েকারদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডে উদ্ভূত এই খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায় প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ঈশ্বরপ্রদত্ত অন্তর্লোকের উপস্থিতিতে বিশ্বাস করত। সেই বিশ্বাস থেকে প্রশ্ন উঠল, একই আধ্যাত্মিক মর্যাদার মানুষকে কেন কেনাবেচা করা যাবে? তবে সব কোয়েকার শুরু থেকেই দাসপ্রথার বিরোধী ছিলেন না। আটলান্টিক উপনিবেশে তাঁদের মধ্যেও দাসমালিক ও দাসবাণিজ্যের সুবিধাভোগী ছিলেন; পরিবর্তন এসেছে দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ বিতর্কের মধ্য দিয়ে।

১৬৮৮ সালে পেনসিলভানিয়ার জার্মানটাউনে চারজন জার্মানভাষী বসতি স্থাপনকারীর উদ্যোগে কোয়েকার সভার কাছে দাসত্ববিরোধী একটি আবেদন পেশ করা হয়। তাঁদের যুক্তি ছিল সরল: নিজেদের অপহরণ ও বিক্রি হওয়া অন্যায় মনে করলে অন্যদের ক্ষেত্রে তা গ্রহণযোগ্য হয় কীভাবে? আবেদনটি তাৎক্ষণিকভাবে বৃহৎ নীতিগত পরিবর্তন আনেনি। তবু এটি দেখায়, উপনিবেশিক সমাজের ভেতর থেকেই মানুষকে সম্পত্তি বানানোর নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিল।

অষ্টাদশ শতকে বেঞ্জামিন লে এই আপত্তিকে তীব্র প্রতিবাদে রূপ দেন। বার্বাডোসে দাসত্বের বাস্তবতা দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর অবস্থানকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি দাসমালিকদের ধর্মীয় ভণ্ডামি প্রকাশ্যে আক্রমণ করেন এবং দাসশ্রমে তৈরি পণ্য এড়ানোর চেষ্টা করেন। তাঁর আচরণ অনেক সমসাময়িকের কাছে অস্বস্তিকর ছিল। কিন্তু সেই অস্বস্তিই প্রতিবাদের উদ্দেশ্য পূরণ করত: সভায় শান্তির কথা বলা মানুষ ঘরে অন্য মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে রাখলে সেই বিরোধ আড়াল করা যাবে না।

জন উলম্যান তুলনামূলকভাবে ধীর, ব্যক্তিগত আলোচনাভিত্তিক পথ অনুসরণ করেন। তিনি দাসমালিক কোয়েকারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের অর্থনৈতিক স্বার্থের নৈতিক মূল্য বিবেচনা করতে বলেন। অ্যান্থনি বেনেজেট লেখালেখি, শিক্ষা ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে আফ্রিকানদের সম্পর্কে প্রচলিত অবমাননাকর ধারণার বিরোধিতা করেন। এই প্রচেষ্টায় দাসমালিকানা ক্রমে সম্প্রদায়ের শৃঙ্খলার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। ১৭৭৬ সালে ফিলাডেলফিয়ার বার্ষিক কোয়েকার সভা দাসমালিক সদস্যদের বিরুদ্ধে সদস্যপদসংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

ধর্মীয় প্রতিবাদের পাশাপাশি আলোকায়নের চিন্তা অন্য ভাষায় দাসত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। যুক্তি, স্বাভাবিক অধিকার এবং শাসনের বৈধতা নিয়ে আলোচনায় প্রশ্ন ওঠে: কোনো মানুষের ওপর অন্য মানুষের সীমাহীন কর্তৃত্বের ভিত্তি কী? মন্টেস্কিয়ে ১৭৪৮ সালের দ্য স্পিরিট অব লজ-এ কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্ব সমর্থনের কিছু যুক্তিকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে উন্মোচন করেন। রুশো মানুষের স্বাধীনতা হস্তান্তর করে সম্পূর্ণ অধীনতায় যাওয়ার ধারণার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এসব আলোচনা প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বকে যুক্তির পরীক্ষায় দাঁড় করায়।

তবে আলোকায়নকে সরলভাবে দাসত্ববিরোধী মতবাদের সমার্থক বলা যাবে না। এর চিন্তাবিদদের অবস্থান এক ছিল না; কারও লেখায় সর্বজনীন অধিকারের পাশাপাশি বর্ণগত শ্রেণিবিন্যাসও ছিল। স্বাধীনতার ভাষা ব্যবহারকারী বহু ব্যক্তি দাসমালিক ছিলেন। মানুষের সমান অধিকার ঘোষণা করা এবং সেই অধিকার আফ্রিকানদের ক্ষেত্রেও কার্যকর করা—এই ব্যবধানই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব হয়ে ওঠে। দাসত্ববিরোধী কর্মীরা নতুন দর্শনকে ব্যবহার করেন, আবার তার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করেন।

এই বিতর্কে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত লেখক ও সংগঠকেরা নিজেদের বক্তব্য নিয়ে প্রবেশ করেন। অটোবা কুগোয়ানো ১৭৮৭ সালে প্রকাশিত লেখায় দাসবাণিজ্য ও দাসত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। ওলাউদাহ ইকুইয়ানোর ১৭৮৯ সালের আত্মজীবনী পাঠকদের সামনে বন্দিত্ব, সমুদ্রযাত্রা, শ্রম এবং মুক্তি অর্জনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। তিনি বইয়ের প্রচার ও জনসংযোগেও সক্রিয় ছিলেন। তাঁদের লেখা দেখায়, দাসত্বে আবদ্ধ মানুষকে নিয়ে বিতর্কে তাঁদের নিজেদের কণ্ঠই অপরিহার্য সাক্ষ্য।

আদালতও জনমত গঠনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। গ্র্যানভিল শার্পের সহায়তায় পরিচালিত জেমস সমারসেটের মামলায় ১৭৭২ সালে ইংল্যান্ডের আদালত সিদ্ধান্ত দেয়, তাঁকে জোর করে বিদেশে পাঠানোর জন্য আটক রাখা বৈধ নয়। রায়টি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সব দাসকে মুক্ত করেনি। কিন্তু মালিকের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। দাসত্ব আইনগতভাবে কোথায় দাঁড়ায় এবং স্বাধীনতার দাবি আদালতে তোলা যায় কি না—সেই প্রশ্ন আরও প্রকাশ্য হয়।

জনমতকে সংগঠিত শক্তিতে পরিণত করতে প্রমাণ সংগ্রহ জরুরি ছিল। টমাস ক্লার্কসন বন্দরে ঘুরে নাবিকদের সাক্ষ্য, জাহাজের পরিস্থিতি এবং বাণিজ্যের নানা তথ্য সংগ্রহ করেন। ১৭৮৭ সালে লন্ডনে দাসবাণিজ্য বিলোপের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠিত হয়, যার সদস্যদের অধিকাংশ ছিলেন কোয়েকার। তাঁরা বৃহত্তর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সহযোগিতা গড়েন। উইলিয়াম উইলবারফোর্স সংসদীয় উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। রাস্তাঘাটের প্রচার এবং সংসদের বিতর্ক পরস্পরকে শক্তি দিতে থাকে।

ছাপাখানা এই সংগঠনের পরিসর বহুগুণ বাড়ায়। পুস্তিকা, সংবাদপত্র, বই এবং জনসভা এমন পাঠকের কাছে পৌঁছায়, যিনি কখনো দাসবাহী জাহাজ দেখেননি। ব্রুকস জাহাজে বন্দিদের গাদাগাদি করে রাখার নকশা বিশেষ প্রভাব ফেলে। সেখানে সংখ্যার পরিবর্তে মানুষের শরীরের জন্য বরাদ্দ সামান্য জায়গা চোখে দেখা যাচ্ছিল। ওয়েজউডের প্রচারিত শৃঙ্খলিত মানুষের প্রতীকও পরিচিত হয়। যদিও তার করুণাপ্রার্থীর ভঙ্গি আফ্রিকানদের সক্রিয় প্রতিরোধের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরত না।

আবেদনপত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহ আন্দোলনকে স্থানীয় সভা থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে যায়। সংসদে ভোট দেওয়ার অধিকারহীন মানুষও নৈতিক দাবি জানাতে পারতেন। নারীরা পণ্য বর্জন, অর্থ সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগে ভূমিকা রাখেন। ১৭৯০-এর দশকের শুরুতে দাসশ্রমে উৎপাদিত চিনি বর্জনের প্রচার পারিবারিক ভোগকে রাজনৈতিক আলোচনায় আনে। চায়ের পেয়ালায় চিনি দেওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে দূরের আখখেতে বাধ্যতামূলক শ্রমের সম্পর্ক বোঝানো হয়।

একই সময়ে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা ও ফরাসি বিপ্লবের অধিকারবিষয়ক ভাষা নতুন সুযোগ এবং প্রবল বিরোধ সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা সর্বজনীন হলে উপনিবেশে তা অস্বীকার করা হবে কেন? মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ, দাসত্ববিরোধী সংগঠক এবং বন্দিত্বে থাকা জনগোষ্ঠী এই প্রশ্ন নিজেদের দাবিতে ব্যবহার করেন। কিন্তু অনেক সংস্কারক তখনও অবিলম্বে দাসমুক্তির বদলে শুধু বাণিজ্য বন্ধের দাবি তুলছিলেন। অর্জিত জনমতের শক্তি তাই বড় হলেও আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়ে ঐকমত্য সম্পূর্ণ ছিল না।

দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের সূচনা কোনো এক মহান ব্যক্তির বিবেকজাগরণের ফল ছিল না। ধর্মীয় আত্মসমালোচনা, যুক্তিবাদী দর্শন, আদালতের লড়াই, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং বন্দি মানুষের প্রতিরোধ একে গড়ে তোলে। জনমত বদলানোর অর্থ ছিল লাভজনক ও রাষ্ট্রসমর্থিত প্রতিষ্ঠানকে অন্যায় হিসেবে চিনতে শেখা। কিন্তু আবেদনপত্র ও পুস্তিকার বাইরেও স্বাধীনতার দাবি বিস্ফোরিত হচ্ছিল উপনিবেশের ভেতরে। ক্যারিবীয় আবাদভূমিতে সেই দাবি শিগগিরই এমন বিপ্লবের রূপ নেবে, যা গোটা আটলান্টিক জগতকে কাঁপিয়ে দেবে।