দাসপ্রথার উৎপত্তি ও বিস্তার: প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও রোম থেকে আধুনিক যুগ
সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস
যুদ্ধবন্দিত্ব থেকে বংশগত দাসত্ব—মানুষকে সম্পত্তিতে পরিণত করার ইতিহাস।
কোনো মানুষ জন্মগতভাবে অন্য মানুষের সম্পত্তি নয়। অথচ ইতিহাসের দীর্ঘ সময়জুড়ে যুদ্ধের পরাজয়, অনাদায়ী ঋণ কিংবা মায়ের সামাজিক অবস্থানই নির্ধারণ করেছে একজন মানুষ স্বাধীন থাকবেন, নাকি বিক্রিযোগ্য বস্তুতে পরিণত হবেন। দাসপ্রথার ইতিহাস তাই শুধু শিকল ও বাজারের ইতিহাস নয়; এটি আইন, রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ইতিহাস। দাসপ্রথা বিলুপ্তির সংগ্রাম বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হয়, মানুষকে দাস বানানোর ব্যবস্থাটি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
দাসপ্রথা ঠিক কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট উত্তর নেই। লিখিত ইতিহাসের আগেও বন্দিত্ব ও জবরদস্তিমূলক শ্রম থাকতে পারে। তবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার নথিতে দাস কেনাবেচা, মালিকানা ও মুক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। কৃষির প্রসার, উদ্বৃত্ত খাদ্য এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন কিছু সমাজকে অন্যের শ্রম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। যুদ্ধবন্দিদের হত্যা করার পরিবর্তে কাজে লাগানো লাভজনক হয়ে ওঠে। তবে কৃষিভিত্তিক প্রতিটি সমাজে একইভাবে দাসপ্রথা গড়ে ওঠেনি; স্থানীয় ক্ষমতা ও সামাজিক সম্পর্কের পার্থক্য ছিল।
মানুষকে দাসে পরিণত করার অন্যতম প্রধান পথ ছিল যুদ্ধবন্দিত্ব। বিজয়ী বাহিনী পরাজিত জনপদের পুরুষ, নারী ও শিশুদের ধরে নিয়ে যেত। তাঁদের কেউ রাজপ্রাসাদে, কেউ মন্দিরে, কেউ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে কাজ করতেন। পরিবারের সদস্যদের আলাদা করে বিক্রি করা সম্ভব ছিল। অপহরণ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অভিযানও বন্দি সংগ্রহের উপায় হয়ে ওঠে। একটি অঞ্চলে সংঘটিত সহিংসতা এভাবে বহু দূরের শহরে সস্তা শ্রমের জোগান দিতে পারত; ব্যবসায়ীরা এই দূরত্বকে বাণিজ্যের সুযোগে পরিণত করেছিল।
প্রাচীন মিশরে বন্দি শ্রমিক, দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ, স্বাধীন কৃষক এবং রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমদানকারী জনগোষ্ঠী পাশাপাশি ছিল। বিশেষত নতুন রাজ্যের সামরিক অভিযানে বিদেশি বন্দিদের মিশরে আনা হতো। তাঁদের রাজসম্পত্তি, মন্দির বা গৃহস্থালির কাজে নিয়োগ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু মিশরের সব শ্রমিককে দাস বলা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। রাষ্ট্রের নির্দেশে নির্দিষ্ট সময় কাজ করা কৃষক এবং কেনাবেচাযোগ্য মানুষের অবস্থান এক ছিল না। দীর্ঘ মিশরীয় ইতিহাসে এসব সম্পর্কের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে।
পিরামিড নির্মাণ নিয়ে প্রচলিত ধারণায় এই পার্থক্য প্রায়ই হারিয়ে যায়। গিজার পিরামিডের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকবসতি, খাদ্য সরবরাহ ও সমাধির প্রমাণ থেকে সংগঠিত শ্রমশক্তির পরিচয় মেলে। সেখানে দক্ষ কর্মী এবং পালাক্রমে কাজ করা শ্রমিক ছিলেন। ফলে চাবুকের নিচে অসংখ্য শৃঙ্খলিত দাস পিরামিড তুলছে—এমন দৃশ্যকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। মিশরে দাসত্ব ছিল, কিন্তু তার অস্তিত্ব দিয়ে প্রতিটি বৃহৎ নির্মাণের শ্রমব্যবস্থা ব্যাখ্যা করা যায় না।
দাসত্বের আরেকটি পথ ছিল ঋণ। ফসল নষ্ট হওয়া, করের চাপ কিংবা জীবিকার সংকটে মানুষ ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে ব্যর্থ হতেন। কিছু সমাজে ঋণগ্রহীতা বা তাঁর পরিবারের সদস্যকে পাওনাদারের অধীনে শ্রম দিতে হতো। কখনো নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকত, কখনো মুক্তির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হতো। ঋণবন্ধন এবং স্থায়ী দাসত্ব সব ক্ষেত্রে অভিন্ন ছিল না, কিন্তু উভয় ব্যবস্থায় দুর্বল মানুষের শ্রমের ওপর ক্ষমতাশালীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারত।
প্রাচীন গ্রিসে, বিশেষ করে এথেন্সে, নাগরিক স্বাধীনতার পাশাপাশি দাসত্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। যুদ্ধ, জলদস্যুতা ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বাইরের অঞ্চল থেকে মানুষ আনা হতো। গৃহস্থালি, কর্মশালা, কৃষিকাজ এবং খনিতে তাঁদের ব্যবহার করা হতো। স্বাধীন নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার ছিল, কিন্তু দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের সেই অধিকার ছিল না। এথেন্সের গণতন্ত্র তাই সবার গণতন্ত্র ছিল না; নাগরিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জগতের বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ অন্যের কর্তৃত্বে জীবন কাটাতেন।
এথেন্সের লরিয়নের রৌপ্যখনিতে শ্রম ছিল বিশেষভাবে কঠিন। সংকীর্ণ ভূগর্ভস্থ পথে কাজ, ধুলা ও বিপজ্জনক পরিবেশ শ্রমিকদের জীবনকে দুর্বিষহ করত। অন্যদিকে কিছু দাস দোকান পরিচালনা বা দক্ষ কারিগরির কাজ করতেন। কাজের ধরন আলাদা হলেও তাঁদের স্বাধীনতা মালিকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করত। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শুরুতে সোলনের সংস্কার এথেনীয়দের ঋণের কারণে দাসে পরিণত করার প্রথা বন্ধ করে। নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া হলেও বিদেশি দাসদের শোষণ বন্ধ হয়নি।
স্পার্টার হেলটদের অবস্থান আবার এথেন্সের বাজারে কেনাবেচা হওয়া দাসদের মতো পুরোপুরি ছিল না। বিশেষত মেসেনিয়ার অধীনস্থ জনগোষ্ঠী কৃষিশ্রম করে স্পার্টান সমাজকে খাদ্য জোগাত। তাঁদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতা চলত। কিন্তু হেলটদের ভূমি ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বলে তাঁদের ব্যবস্থাকে সাধারণ ব্যক্তিমালিকানাধীন দাসত্বের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। একই গ্রিক জগতের মধ্যেই শ্রমদাসত্বের একাধিক রূপ ছিল—এটি সেই পার্থক্যের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
রোম সামরিক বিস্তারের মাধ্যমে দাসত্বকে আরও বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যায়। বিজিত অঞ্চল থেকে বন্দিদের বাজারে পাঠানো হতো; ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য তাঁদের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিত। কৃষিখামার, খনি, বাড়ি ও কর্মশালার পাশাপাশি প্রশাসনিক এবং শিক্ষাদানের কাজেও দাসদের ব্যবহার করা হতো। শিক্ষিত গ্রিক বন্দি শিক্ষক হতে পারতেন, আবার অন্য বন্দিকে বিপজ্জনক খনিতে পাঠানো হতো। দক্ষতার পার্থক্য জীবনযাপনে প্রভাব ফেললেও মানুষের ওপর মালিকানার মূল সম্পর্কটি অক্ষুণ্ণ থাকত।
রোমান ব্যবস্থায় সাধারণভাবে দাসত্বে থাকা মায়ের সন্তানও দাস হিসেবে জন্মাত। ফলে প্রতিবার যুদ্ধ না করেও মালিকেরা নতুন শ্রমশক্তি পেতেন। পরিবারের স্বীকৃতি ও স্থায়িত্ব ছিল অনিরাপদ; বিক্রির মাধ্যমে সম্পর্ক ছিন্ন হতে পারত। শাস্তি, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন শোষণের ঝুঁকিও ছিল। কোনো মালিক সদয় হলেই এই ব্যবস্থার চরিত্র বদলে যেত না, কারণ ব্যক্তিগত আচরণের নিচে আইনসমর্থিত অধীনতা বজায় থাকত।
তবু দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। পালানো, কাজে প্রতিরোধ, অর্থ সঞ্চয় কিংবা বিদ্রোহের মাধ্যমে তাঁরা সুযোগ খুঁজতেন। রোমে মালিকের অনুমতি বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মুক্তিলাভের ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু মুক্ত মানুষ হওয়ার পরও সাবেক মালিকের প্রতি কিছু দায়বদ্ধতা থাকতে পারত। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩–৭১ সালের স্পার্টাকাসের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিখ্যাত দৃষ্টান্ত। তার পরাজয় দেখায়, শ্রমের এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্র কত শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত ছিল।
পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে দাসপ্রথা সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি। ভূমধ্যসাগর ও অন্যান্য অঞ্চলে মানুষের কেনাবেচা চলেছে। পাশাপাশি বহু কৃষক ভূমিদাসত্বের অধীনে চলে যান। ভূমিদাসের চলাচল ও শ্রমের স্বাধীনতা সীমিত থাকলেও তাঁর অবস্থান সাধারণত জমি এবং প্রথাগত দায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। দাস, ভূমিদাস ও বাধ্যতামূলক শ্রমিক—এই পরিচয়গুলো আলাদা, যদিও বাস্তবে প্রত্যেক ব্যবস্থাতেই মানুষের স্বাধীনতার গুরুতর সংকোচন ঘটতে পারত।
মধ্যযুগে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও দাসবাণিজ্যের বিভিন্ন পথ সক্রিয় ছিল। যুদ্ধ, অভিযান, অপহরণ এবং স্থানীয় বাজার এসব পথকে যুক্ত করত। গৃহস্থালি, কৃষি, সামরিক ও প্রশাসনিক কাজে দাসদের ব্যবহার করা হতো। ধর্মীয় বিধান কখনো মুক্তিদানকে উৎসাহ দিয়েছে বা বন্দিত্বের সীমা নির্ধারণ করেছে, কিন্তু সর্বত্র দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেনি। এই ইতিহাস কোনো এক জাতি বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিভিন্ন সমাজ নিজস্ব নিয়মে মানুষের অধীনতা বজায় রেখেছে।
পঞ্চদশ শতক থেকে ইউরোপীয় সমুদ্রবিস্তার দাসবাণিজ্যের নতুন পর্ব তৈরি করে। আটলান্টিক দ্বীপপুঞ্জ ও পরে আমেরিকায় চিনি উৎপাদনসহ বৃহৎ আবাদব্যবস্থার বিস্তার শ্রমের চাহিদা বাড়ায়। আফ্রিকার যুদ্ধ ও বন্দি সংগ্রহের সঙ্গে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক যুক্ত হয়। ক্রমে আফ্রিকান বংশপরিচয়কে বংশগত দাসত্বের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। মানুষকে সম্পত্তি বানানোর পুরোনো পদ্ধতি এবার সমুদ্রপথ, ঔপনিবেশিক আইন ও বিশাল বাজারের শক্তি পায়। সেই সম্প্রসারণের ভেতর থেকেই জন্ম নেবে প্রতিরোধের নতুন ইতিহাস এবং মানুষের মালিকানা নিষিদ্ধ করার দীর্ঘ সংগ্রাম।
ব্ল্যাক ডেথের লক্ষণ ও মৃত্যুর কারণ: প্লেগের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
ব্ল্যাক ডেথের বিস্তার: ১৩৪৭–১৩৫৩ সালে ইউরোপে কোটি মানুষের মৃত্যু
কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ
ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তি: এশিয়া থেকে ইউরোপে প্লেগ ছড়ানোর ইতিহাস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য, নারী ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা
ভিকসবার্গ অবরোধ: গ্রান্ট কীভাবে কনফেডারেসিকে দুই ভাগ করেছিলেন?