উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয় অনুসন্ধান: ক্যাবট, কার্তিয়ে ও ড্রেকের অভিযান
সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান
আটলান্টিকের মৎস্যক্ষেত্র, সেন্ট লরেন্স নদী ও প্রশান্ত উপকূল ঘিরে গড়ে ওঠে নতুন সাম্রাজ্যিক দাবি।
আজটেক ও ইনকা সাম্রাজ্যের পতনের পর স্পেন আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসন ও সম্পদ আহরণের ব্যবস্থা গড়ে তুলছিল। কিন্তু আটলান্টিকের উত্তরাংশে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সও সুযোগ খুঁজছিল। তাদের আগ্রহের মধ্যে ছিল এশিয়ায় যাওয়ার বিকল্প পথ, মাছ, পশম এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বাণিজ্যে আঘাত হানা। এই উদ্যোগের শিকড় স্প্যানিশ বিজয়ের আগেও পৌঁছায়। জন ক্যাবট, জ্যাক কার্তিয়ে ও ফ্রান্সিস ড্রেকের অভিযান তিনটি ভিন্ন উপায়ে উত্তর আমেরিকাকে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
টরডেসিলাস চুক্তিতে স্পেন ও পর্তুগাল নিজেদের দাবিক্ষেত্র ভাগ করলেও ইংরেজ ও ফরাসি রাজতন্ত্র সেই ব্যবস্থাকে নিজেদের জন্য বাধ্যতামূলক মনে করেনি। তবে তাদের প্রথম অভিযানগুলোকে পরবর্তী সুসংগঠিত উপনিবেশের সঙ্গে এক করে দেখা ভুল। উপকূল দেখা, রাজকীয় দাবি তোলা, বাণিজ্য শুরু করা এবং স্থায়ী বসতি প্রতিষ্ঠা ছিল পৃথক ধাপ। অভিযাত্রীরা প্রায়ই যে উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন, বাস্তব ফল তার চেয়ে ভিন্ন হয়েছিল।
ইংল্যান্ডের পক্ষে অভিযানে নামেন ইতালীয় বংশোদ্ভূত জন ক্যাবট, যিনি জোভান্নি কাবোতো নামেও পরিচিত। ব্রিস্টলের বণিক ও নাবিকদের আটলান্টিক অভিজ্ঞতা তাঁর উদ্যোগের ভিত্তি হয়। রাজা সপ্তম হেনরির অনুমতিতে তিনি পশ্চিমে এশিয়ার পথ খুঁজতে চেয়েছিলেন। উত্তর দিক দিয়ে যাত্রা করলে দূরত্ব কম হতে পারে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কলম্বাসের মতো তাঁরও সামনে আমেরিকা একটি পৃথক মহাদেশ হিসেবে সম্পূর্ণ পরিচিত ছিল না।
১৪৯৭ সালে ম্যাথিউ নামের ছোট জাহাজে ক্যাবট ব্রিস্টল থেকে যাত্রা করেন। জুনে তিনি উত্তর আমেরিকার আটলান্টিক উপকূলে পৌঁছান। সুনির্দিষ্ট অবতরণস্থল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে; নিউফাউন্ডল্যান্ড, ল্যাব্রাডর ও কেপ ব্রেটন অঞ্চলের বিভিন্ন স্থান প্রস্তাব করা হয়েছে। তাই একটি আধুনিক স্থানকে নিশ্চিতভাবে তাঁর প্রথম অবতরণস্থল বলা ঠিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর প্রত্যাবর্তন ইংল্যান্ডে উত্তর আটলান্টিকের ওপারের ভূখণ্ড সম্পর্কে নতুন আগ্রহ তৈরি করে।
ক্যাবটের অভিযানের অর্থনৈতিক তাৎপর্য বিশেষভাবে প্রকাশ পায় সমৃদ্ধ কড মাছের ক্ষেত্রের সংবাদে। ইউরোপে সংরক্ষিত মাছের চাহিদা ছিল ব্যাপক। উত্তর-পশ্চিম আটলান্টিকের মৎস্যসম্পদ তাই এশিয়ার সোনা-মসলার বিকল্প বাস্তব সুযোগ এনে দেয়। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ, ফরাসি, পর্তুগিজ ও বাস্ক মৎস্যজীবীরা এই অঞ্চলে সক্রিয় হন। মৌসুমি মাছধরা, উপকূলে মাছ শুকানো এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থায়ী উপনিবেশের আগেই আটলান্টিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে।
ক্যাবট ১৪৯৮ সালে আরেকটি অভিযান পরিচালনা করেন, কিন্তু তাঁর শেষ পরিণতি নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তাঁর যাত্রা সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ বসতি প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং অভিযানের স্মৃতি ও রাজকীয় অনুমতি পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের ভূখণ্ড দাবির যুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। ক্যাবটের গুরুত্ব ছিল সম্ভাবনার দরজা খোলায়, কোনো সম্পূর্ণ উপনিবেশিক প্রশাসন গড়ে তোলায় নয়। ইংরেজ স্থায়ী বসতি স্থাপনের জন্য আরও বহু দশক অপেক্ষা করতে হয়।
ফরাসি উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ব্রেতানির সাঁ-মালো বন্দরের নাবিক জ্যাক কার্তিয়ে। রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ১৫৩৪ সালে উত্তর আটলান্টিক অতিক্রম করেন। উদ্দেশ্য ছিল মূল্যবান সম্পদ এবং এশিয়ামুখী জলপথ অনুসন্ধান। নিউফাউন্ডল্যান্ডের আশপাশ ও সেন্ট লরেন্স উপসাগরে তাঁর অভিযান ফরাসিদের নতুন ভৌগোলিক তথ্য দেয়। গাসপেতে ক্রুশ স্থাপন করে দাবি ঘোষণার ঘটনায় স্থানীয় নেতা দোনাকোনার আপত্তি দেখায়, আগন্তুকদের প্রতীকী কর্তৃত্ব সবাই মেনে নেয়নি।
কার্তিয়ে দোনাকোনার দুই পুত্রকে ফ্রান্সে নিয়ে যান। পরের অভিযানে তাঁরা দোভাষী ও পথনির্দেশক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৫৩৫ সালে কার্তিয়ে সেন্ট লরেন্স নদী ধরে স্তাদাকোনায়, বর্তমান কুইবেক শহরের কাছে, পৌঁছান; পরে হোশেলাগায় যান, যার অবস্থান বর্তমান মন্ট্রিয়লের এলাকায়। নদীটি তাঁকে মহাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ দেয়। কিন্তু সামনে জলপ্রপাত ও প্রবল স্রোত এশিয়ার দিকে সহজ নৌপথের প্রত্যাশায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এই অভিযানে স্থানীয় জ্ঞান ছিল অপরিহার্য। শীতকালে ফরাসিরা স্কার্ভিতে বিপর্যস্ত হলে আদিবাসীদের শেখানো একটি গাছের পাতা ও ছাল দিয়ে প্রস্তুত পানীয় উপকার করে। গাছটির সুনির্দিষ্ট আধুনিক পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ঘটনাটি দেখায়, ইউরোপীয় নৌপ্রযুক্তি থাকলেও অপরিচিত পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য স্থানীয় চিকিৎসা ও খাদ্যজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একই সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও বলপ্রয়োগও বাড়ছিল।
১৫৩৬ সালে ফেরার সময় কার্তিয়ে দোনাকোনাসহ কয়েকজনকে ধরে ফ্রান্সে নিয়ে যান; তাঁদের অধিকাংশ আর দেশে ফিরতে পারেননি। ১৫৪১ সালে নতুন অভিযানে স্থায়ী বসতির চেষ্টা শুরু হয়, বৃহত্তর উদ্যোগটির নেতৃত্বে ছিলেন রবেরভাল। কিন্তু কঠোর পরিবেশ, রসদের সমস্যা এবং স্থানীয় সম্পর্কের অবনতি পরিকল্পনাকে দুর্বল করে। কার্তিয়ের সংগ্রহ করা কথিত সোনা ও হীরাও মূল্যহীন খনিজ বলে প্রমাণিত হয়। প্রথম ফরাসি উপনিবেশিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও নদীপথের জ্ঞান হারিয়ে যায়নি।
পরবর্তী ফরাসি সম্প্রসারণে সেন্ট লরেন্স হয়ে ওঠে প্রধান প্রবেশপথ। পশমবাণিজ্য, আদিবাসী মিত্রতা এবং নদীভিত্তিক যোগাযোগের ওপর নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৬০৮ সালে শঁপ্লাঁর কুইবেক প্রতিষ্ঠা এই পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে কার্তিয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া সেন্ট লরেন্স ইরোকোয়ান সমাজ এবং শঁপ্লাঁর সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ছিল না। মাঝের দশকগুলোতে রোগ, যুদ্ধ, স্থানান্তর ও আঞ্চলিক পরিবর্তন ঘটেছিল।
অন্যদিকে ফ্রান্সিস ড্রেকের ১৫৭৭–১৫৮০ সালের অভিযান মূলত স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আঘাত এবং লাভজনক সামুদ্রিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইংরেজদের চোখে তিনি রাজসমর্থিত সমুদ্রযোদ্ধা; স্প্যানিশদের কাছে জলদস্যু। দক্ষিণ আমেরিকার পাশ দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করে তিনি স্প্যানিশ জাহাজ ও বন্দর আক্রমণ করেন। ফলে তাঁর উত্তর আমেরিকা অভিযানকে ক্যাবট বা কার্তিয়ের মতো একই ধরনের অনুসন্ধান হিসেবে দেখা যায় না।
১৫৭৯ সালে ড্রেক উত্তর আমেরিকার প্রশান্ত উপকূল ধরে উত্তরে যান। কত দূর পৌঁছেছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। পরে তিনি বর্তমান উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে জাহাজ মেরামতের জন্য অবস্থান করেন বলে সাধারণভাবে ধরা হয়, যদিও নির্দিষ্ট স্থান সর্বসম্মত নয়। অঞ্চলটির নাম দেন ‘নোভা অ্যালবিয়ন’, অর্থাৎ নতুন ব্রিটেনের ইঙ্গিতবাহী নাম। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎকে ইংরেজ বিবরণে আনুগত্য হিসেবে দেখানো হলেও তা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়।
ড্রেক সেখানে স্থায়ী উপনিবেশ রেখে যাননি। প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে এশিয়া, তারপর আফ্রিকা ঘুরে ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি বিশ্বপরিক্রমা সম্পন্ন করেন। তাঁর অভিযানের গুরুত্ব ছিল স্পেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তার দুর্বলতা প্রকাশ এবং ইংরেজ নৌউদ্যোগের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর দাবি এবং পরবর্তী ইংরেজ আটলান্টিক উপনিবেশের মধ্যে সরাসরি ধারাবাহিক শাসন ছিল না, তবে বিশ্বব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা শক্ত হয়েছিল।
এই তিন অভিযাত্রীর উত্তরাধিকার তাই আলাদা: ক্যাবট উত্তর আটলান্টিকের সম্ভাবনা, কার্তিয়ে মহাদেশের নদীপথ এবং ড্রেক প্রশান্ত উপকূলে ইংরেজ উপস্থিতির দাবি সামনে আনেন। তাঁদের যাত্রা আদিবাসী সমাজের পরিচিত ভূখণ্ডকে ইউরোপীয় মানচিত্র ও সাম্রাজ্যিক পরিকল্পনায় যুক্ত করে। মাছ, পশম, সমুদ্রপথ ও নৌসামরিক প্রতিযোগিতা মিলেই ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিস্তারের ভিত্তি গড়ে ওঠে। পরবর্তী বসতি, রোগের বিস্তার, জমির দাবি ও যুদ্ধ সেই প্রাথমিক যোগাযোগকে আরও গভীর এবং সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কে রূপ দেবে।
লিংকনের নির্বাচন ও কনফেডারেসি গঠন: বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পটভূমি: দাসপ্রথা ও উত্তর-দক্ষিণের বিরোধ
ম্যাগেলান ও এলকানোর বিশ্বপরিক্রমা: ১৫১৯–১৫২২ সালের ঐতিহাসিক অভিযান
বালবোয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর: ১৫১৩ সালের পানামা অভিযানের ইতিহাস
পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য: গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজ দখলের ইতিহাস