লিংকনের নির্বাচন ও কনফেডারেসি গঠন: বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস
সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
লিংকনের নির্বাচনের পর বিভক্ত আমেরিকা
দাসপ্রথা নিয়ে কয়েক দশকের বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছিল। ১৮৬০ সালের ২০ ডিসেম্বর সাউথ ক্যারোলাইনার বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা সেই সংকটকে নতুন রূপ দেয়। প্রথমবারের মতো একটি রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল, সে আর যুক্তরাষ্ট্রের অংশ থাকতে চায় না। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয়েছিল তার কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন আমেরিকার ভোটাররা নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন।
১৮৬০ সালের নির্বাচনের সময় দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দাসপ্রথার প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিমের নতুন ভূখণ্ডে দাসপ্রথা চালু হবে কি না, তা নিয়ে একমত হওয়া ক্রমেই কঠিন হচ্ছিল। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উত্তর ও দক্ষিণের নেতারা যৌথ প্রার্থী মনোনীত করতে ব্যর্থ হন। ফলে একটি জাতীয় নির্বাচনে চারজন প্রধান প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ছিলেন ইলিনয়ের সাবেক কংগ্রেসম্যান আব্রাহাম লিংকন। তাঁর দল নতুন ভূখণ্ডে দাসপ্রথার বিস্তারের বিরোধিতা করছিল। উত্তরের ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী স্টিফেন ডগলাস চাইতেন ভূখণ্ডগুলোর শ্বেতাঙ্গ বসতি স্থাপনকারীরা নিজেরাই দাসপ্রথার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করুক। দক্ষিণের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন সি. ব্রেকিনরিজ ভূখণ্ডগুলোতে দাসমালিকদের অধিকারের ফেডারেল সুরক্ষা সমর্থন করতেন। আর কনস্টিটিউশনাল ইউনিয়ন পার্টির জন বেল দাসপ্রথা প্রশ্নে বিভেদ এড়িয়ে ইউনিয়ন ও সংবিধান রক্ষার ওপর জোর দেন।
৬ নভেম্বরের নির্বাচনে লিংকন জাতীয় জনপ্রিয় ভোটের প্রায় ৪০ শতাংশ পান। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্যগুলোতে তাঁর ব্যাপক সমর্থন তাঁকে ইলেকটোরাল কলেজে ৩০৩ ভোটের মধ্যে ১৮০টি এনে দেয়—জয়ের জন্য যথেষ্ট। দক্ষিণের অধিকাংশ রাজ্যে তাঁর নাম ব্যালটেই ছিল না এবং তিনি গভীর দক্ষিণের কোনো ইলেকটোরাল ভোট পাননি। ফলে দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাপন্থী নেতাদের কাছে ফলাফলটি ছিল এক অশুভ সংকেত: তাঁদের সমর্থন ছাড়াই একজন দাসপ্রথার বিস্তারবিরোধী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন।
লিংকন যেখানে দাসপ্রথা আগে থেকেই বৈধ ছিল, সেখানে অবিলম্বে তা বিলুপ্ত করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেননি। কিন্তু তিনি নতুন ফেডারেল ভূখণ্ডে দাসপ্রথার বিস্তার ঠেকাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। দক্ষিণের দাসমালিক ও রাজনীতিবিদদের অনেকেই আশঙ্কা করতেন, দাসপ্রথা নতুন এলাকায় ছড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে দাসপ্রথাসমর্থিত রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা কমবে এবং প্রতিষ্ঠানটি একসময় বিপদের মুখে পড়বে।
তখনকার নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে পরের বছরের মার্চে দায়িত্ব নিতে হতো। ফলে লিংকনের বিজয় ও অভিষেকের মাঝখানে প্রায় চার মাস সময় ছিল। ওই সময় প্রেসিডেন্ট জেমস বুকানন ক্ষমতায় থাকলেও বিচ্ছিন্নতার ঢেউ থামাতে পারেননি। তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিধাগ্রস্ত: তিনি রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার অস্বীকার করেন, কিন্তু ফেডারেল সরকার শক্তি প্রয়োগ করে তাদের ইউনিয়নে রাখতে পারে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন।
লিংকনের বিজয়ের পর সাউথ ক্যারোলাইনার আইনসভা বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে একটি বিশেষ সম্মেলন ডাকে। প্রতিনিধিরা প্রথমে কলাম্বিয়ায় মিলিত হন; পরে বসন্তরোগের আশঙ্কায় সম্মেলন চার্লস্টনে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে ২০ ডিসেম্বর প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতভাবে বিচ্ছিন্নতার অধ্যাদেশ গ্রহণ করেন। রাজ্যটি ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্ক শেষ।
সাউথ ক্যারোলাইনার পর মিসিসিপি ৯ জানুয়ারি, ফ্লোরিডা ১০ জানুয়ারি, আলাবামা ১১ জানুয়ারি, জর্জিয়া ১৯ জানুয়ারি এবং লুইজিয়ানা ২৬ জানুয়ারি ১৮৬১ সালে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দেয়। টেক্সাসের সম্মেলন ১ ফেব্রুয়ারি বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ভোট দেয়; পরে গণভোটে সিদ্ধান্তটি অনুমোদিত হয় এবং ২ মার্চ তা কার্যকর হয়। এভাবে লিংকনের অভিষেকের আগেই সাতটি দাসপ্রথাসমর্থিত রাজ্য যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিচ্ছিন্নতার পক্ষে দক্ষিণী নেতারা প্রায়ই রাজ্যগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ফেডারেল হস্তক্ষেপের কথা বলতেন। তবে তাঁদের নিজেদের ঘোষণাপত্রে দাসপ্রথা রক্ষার উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল। মিসিসিপির ঘোষণায় রাজ্যটির অবস্থানকে দাসপ্রথার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে বর্ণনা করা হয়। সাউথ ক্যারোলাইনা অভিযোগ করে, উত্তরের কিছু রাজ্য পলাতক দাসদের ফিরিয়ে দেওয়া বাধাগ্রস্ত করছে এবং দাসপ্রথার বিরোধিতাকে উৎসাহ দিচ্ছে।
দক্ষিণের সব মানুষ অবশ্য একইভাবে বিচ্ছিন্নতা সমর্থন করেননি। কিছু শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণী মনে করতেন, ইউনিয়নের ভেতরে থেকেই তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব। অন্যদিকে দাসত্বে আবদ্ধ লাখো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনো কণ্ঠ দেওয়া হয়নি। তাঁরা এমন একটি সমাজে বাস করছিলেন, যেখানে মানুষের ওপর মালিকানাকে নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল।
বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোর নেতারা দ্রুত একটি কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে এগিয়ে আসেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৬১ সালে আলাবামার মন্টগোমেরিতে প্রথমে ছয়টি রাজ্যের প্রতিনিধিরা মিলিত হন। টেক্সাস তখনও তার বিচ্ছিন্নতার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় ছিল; পরে সে নতুন রাষ্ট্রে যোগ দেয়। প্রতিনিধিরা একটি অস্থায়ী সংবিধান তৈরি করেন এবং নতুন দেশের নাম দেন কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা, সংক্ষেপে কনফেডারেসি।
মন্টগোমেরি হয় নতুন রাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী। প্রতিনিধিরা মিসিসিপির সাবেক মার্কিন সিনেটর ও যুদ্ধমন্ত্রী জেফারসন ডেভিসকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং জর্জিয়ার রাজনীতিবিদ আলেকজান্ডার স্টিফেন্সকে অস্থায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। ডেভিস ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্টগোমেরিতে শপথ নেন। নতুন সরকার সেনাবাহিনী গঠন, অর্থ সংগ্রহ এবং বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ শুরু করে।
১১ মার্চ কনফেডারেট কংগ্রেস স্থায়ী সংবিধান গ্রহণ করে। দলিলটি অনেকাংশে মার্কিন সংবিধানের আদলে লেখা হলেও দাসপ্রথার সুরক্ষা সেখানে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন ভূখণ্ডে দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের ওপর মালিকানার অধিকার স্বীকৃত ও সুরক্ষিত রাখার বিধানও এতে ছিল। অর্থাৎ কনফেডারেসির রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করার সময় দাসপ্রথাকে তার ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিফেন্স ২১ মার্চ জর্জিয়ার সাভানায় একটি বক্তৃতায় নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বক্তব্যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের দাসত্বকে স্বাভাবিক বলে দাবি করা হয়। এই বর্ণবাদী যুক্তি প্রকাশ করে, কনফেডারেসির নেতাদের কাছে বিচ্ছিন্নতা শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল দাসপ্রথা ও বর্ণভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা রক্ষার প্রচেষ্টা।
এদিকে যুদ্ধ এড়াতে ওয়াশিংটনে আপসের উদ্যোগ চলছিল। কেন্টাকির সিনেটর জন ক্রিটেনডেন সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দাসপ্রথার সুরক্ষা এবং পশ্চিমের ভূখণ্ডে দাসপ্রথার জন্য একটি ভৌগোলিক বিভাজনরেখা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু লিংকন ও রিপাবলিকানরা নতুন ভূখণ্ডে দাসপ্রথা বিস্তারের সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেন। দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাপন্থী নেতারাও তখন ক্রমশ স্বাধীন কনফেডারেসির পথেই এগোচ্ছিলেন। ফলে প্রস্তাবটি পাস হয়নি।
৪ মার্চ ১৮৬১ সালে লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। প্রথম অভিষেক ভাষণে তিনি বলেন, যেখানে দাসপ্রথা প্রচলিত আছে, সেখানে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের কোনো উদ্দেশ্য তাঁর নেই। একই সঙ্গে তিনি বিচ্ছিন্নতাকে আইনগতভাবে অকার্যকর বলে অভিহিত করেন এবং ঘোষণা দেন, ইউনিয়ন অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ফেডারেল সম্পত্তি ও দুর্গের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কথাও তিনি জানান।
সেই প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে বিপজ্জনক পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টন বন্দরে। বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোর বিভিন্ন ফেডারেল স্থাপনা দক্ষিণী কর্তৃপক্ষ দখল করলেও ফোর্ট সামটার তখনও মার্কিন সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। দুর্গটির অবস্থান ছিল কনফেডারেসির দাবিকৃত ভূখণ্ডের মাঝখানে; ফলে সেটি কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, প্রশ্নটি হয়ে ওঠে দুই সরকারের কর্তৃত্বের পরীক্ষা।
দুর্গে খাদ্য ও অন্যান্য সরবরাহ কমে আসছিল। লিংকন সেখানে রসদ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং সাউথ ক্যারোলাইনার গভর্নরকে পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। কনফেডারেট সরকার মনে করল, সরবরাহ পৌঁছাতে দিলে ফেডারেল উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। আলোচনার পথ ব্যর্থ হলে ১২ এপ্রিল ১৮৬১ সালে কনফেডারেট বাহিনী ফোর্ট সামটারে গোলাবর্ষণ শুরু করে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের প্রথম বড় সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়।
দুর্গটির পতনের পর লিংকন বিদ্রোহ দমনে রাজ্যগুলোকে মিলিশিয়া থেকে ৭৫ হাজার সৈন্য পাঠানোর আহ্বান জানান। এই সিদ্ধান্তে উচ্চ দক্ষিণের রাজ্যগুলোর ওপর চাপ বেড়ে যায়। ভার্জিনিয়া, আরকানসাস, টেনেসি ও নর্থ ক্যারোলাইনা পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে কনফেডারেসিতে যোগ দেয়। ফলে সদস্যরাজ্যের সংখ্যা বেড়ে ১১টিতে পৌঁছায়; পরে রাজধানী মন্টগোমেরি থেকে ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডে সরানো হয়।
দাসপ্রথাসমর্থিত সব রাজ্য অবশ্য কনফেডারেসিতে যোগ দেয়নি। ডেলাওয়্যার, মেরিল্যান্ড, কেন্টাকি ও মিসৌরি ইউনিয়নের অংশ হিসেবে থেকে যায়, যদিও তাদের ভেতরেও তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন ছিল। লিংকনের নির্বাচনের পর যে বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, ফোর্ট সামটারের কামানের শব্দে তা সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নিল। এখন দুই পক্ষকে শুধু নতুন সরকার বা পুরোনো ইউনিয়নের বৈধতা নিয়ে কথা বললেই চলবে না—যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
ম্যাগেলান ও এলকানোর বিশ্বপরিক্রমা: ১৫১৯–১৫২২ সালের ঐতিহাসিক অভিযান
বালবোয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর: ১৫১৩ সালের পানামা অভিযানের ইতিহাস
পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য: গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজ দখলের ইতিহাস
জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি: জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতা
মন্টেস্কু ও ভলতেয়ার: ক্ষমতার বিভাজন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
জন লক ও আধুনিক গণতন্ত্র: প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সম্মতি