বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য: গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজ দখলের ইতিহাস

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্য: গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজ দখলের ইতিহাস
দুর্গ, কামান ও বন্দরনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে পর্তুগালের সামুদ্রিক সাম্রাজ্য।

ব্রাজিলে কাবরালের আগমন দেখিয়েছিল, সমুদ্রপথ অনুসন্ধান কীভাবে ভূখণ্ডের ওপর রাজকীয় দাবিতে পরিণত হচ্ছিল। ভারত মহাসাগরে সেই পরিবর্তন আরও দ্রুত সামরিক রূপ নেয়। কালিকটে বাণিজ্যিক বিরোধ এবং পরবর্তী সংঘর্ষের পর পর্তুগিজ রাজদরবার বুঝতে পারে, শুধু মসলা কিনে ফেরার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাবে না। বন্দর, জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যপথে হস্তক্ষেপ করতে হবে। গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্য ছিল সেই সশস্ত্র বাণিজ্যনীতির বাস্তব রূপ।

তবে এই আধিপত্যের সীমা শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। পর্তুগাল গোটা ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ভারতীয়, আরব, পারস্যের ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বণিকদের কার্যক্রম চলতে থাকে। পর্তুগিজ সাফল্য ছিল নির্বাচিত বন্দর ও সমুদ্রপথে সামরিক চাপ সৃষ্টি, শুল্ক আদায় এবং নিজেদের বাণিজ্যিক সুবিধা প্রতিষ্ঠায়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল দখল করে বিস্তৃত বাণিজ্যব্যবস্থাকে প্রভাবিত করাই ছিল তাদের কৌশল।

এর প্রাথমিক সাংগঠনিক ভিত্তি গড়েন ফ্রান্সিসকো দে আলমেইদা, যিনি ১৫০৫ সালে পর্তুগিজ ভারতের প্রথম ভাইসরয় হন। তাঁর অগ্রাধিকার ছিল শক্তিশালী নৌবহর এবং উপকূলীয় ঘাঁটি। কোচিনের মতো স্থানীয় মিত্রবন্দরের সহযোগিতা পর্তুগিজদের রসদ ও আশ্রয় দেয়। এই জোটগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অল্পসংখ্যক ইউরোপীয় সৈন্য ও নাবিক নিয়ে স্থানীয় সহায়তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বজায় রাখা কঠিন ছিল।

সামরিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৫০৯ সালের দিউয়ের নৌযুদ্ধে। আলমেইদার বাহিনী মিশরের মামলুক নৌবহর এবং গুজরাটের সহযোগী শক্তিকে পরাজিত করে। আগের বছর চাউলের সংঘর্ষে পর্তুগিজদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল; দিউয়ের জয় তাদের অবস্থান শক্ত করে। তবে একটি যুদ্ধেই সব প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হয়নি। এই বিজয় পর্তুগিজদের বড় অভিযান চালানোর সুযোগ বাড়ায় এবং সমুদ্রে তাদের কামানবাহী জাহাজের কার্যকারিতা প্রদর্শন করে।

আলমেইদার উত্তরসূরি আফোঁসো দে আলবুকার্ক নৌপ্রাধান্যকে স্থায়ী বন্দরনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর পরিকল্পনায় গোয়া হবে প্রশাসনিক ও সামরিক ঘাঁটি, মালাক্কা পূর্বের বাণিজ্যপথে প্রবেশের কেন্দ্র এবং হরমুজ পারস্য উপসাগরমুখী যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণের অবস্থান। লোহিত সাগরের প্রবেশপথেও কর্তৃত্ব স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন বিজয়ের বদলে তিনি পরস্পর-সংযুক্ত দুর্গ ও বন্দরের ব্যবস্থা গড়তে চেয়েছিলেন।

১৫১০ সালে গোয়া দখল এই পরিকল্পনার প্রধান সাফল্য। গোয়া তখন বিজাপুর সুলতানির অধীন, ঘোড়ার বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। স্থানীয় নৌনেতা তিমোজার সহযোগিতা আলবুকার্ককে সাহায্য করে। প্রথম দখলের পর বিজাপুরের পাল্টা আক্রমণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পর্তুগিজদের সরে যেতে হয়। কিন্তু একই বছরের নভেম্বরে ফিরে এসে তারা গোয়া পুনর্দখল করে। বিজয়ের সঙ্গে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডও ঘটে, বিশেষত মুসলিম অধিবাসীদের ওপর।

গোয়ার মূল্য শুধু অবস্থানে ছিল না। নদীবন্দর, জাহাজ মেরামত, গুদাম, বাজার এবং আশপাশ থেকে খাদ্য সংগ্রহের সুযোগ একে কার্যকর ঘাঁটিতে পরিণত করে। এখানে সৈন্য রাখা এবং মৌসুমি অভিযান প্রস্তুত করা সম্ভব হয়। পরে ১৫৩০ সালে গোয়া পর্তুগিজ ভারতের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফলে এশিয়ার বিচ্ছিন্ন পর্তুগিজ স্থাপনাগুলোর পরিচালনায় শহরটির ভূমিকা ক্রমে বাড়ে।

আলবুকার্ক এরপর নজর দেন মালাক্কার দিকে। মালয় উপদ্বীপের এই বন্দর ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের বাণিজ্যের সংযোগস্থল ছিল। গুজরাটি, তামিল, আরব, মালয়, জাভানি ও চীনা বণিকেরা সেখানে পণ্য বিনিময় করতেন। মসলার দ্বীপপুঞ্জের পণ্যও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। মালাক্কা দখল করতে পারলে পর্তুগিজরা পূর্বের বাণিজ্যের সংবাদ, বাজার এবং চলাচলের ওপর প্রভাব বাড়াতে পারত।

১৫১১ সালে আলবুকার্কের বাহিনী মালাক্কা দখল করে। সুলতান মাহমুদ শাহ সরে গেলেও তাঁর প্রতিরোধ শেষ হয়নি। পর্তুগিজরা দুর্গ নির্মাণ করে অবস্থান ধরে রাখে এবং বন্দর পরিচালনার চেষ্টা করে। কিন্তু শহর দখল মানেই সব বণিককে ধরে রাখা নয়। নিরাপত্তা, শুল্ক ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে অনেক ব্যবসায়ী বিকল্প বন্দর বেছে নেন। আচেহসহ অন্যান্য কেন্দ্রের উত্থান পর্তুগিজ একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল হরমুজ, পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখের কাছে সমৃদ্ধ দ্বীপবন্দর। পারস্যের পণ্য, আরবের বাজার, ভারতীয় বস্ত্র এবং ঘোড়ার বাণিজ্য এখানে সংযুক্ত হতো। আলবুকার্ক ১৫০৭ সালে হরমুজকে বশ্যতা স্বীকার করানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু নিজ বাহিনীর বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। ১৫১৫ সালে ফিরে এসে তিনি পর্তুগিজ কর্তৃত্ব সুসংহত করেন এবং দুর্গের মাধ্যমে উপস্থিতি স্থায়ী করেন।

হরমুজে স্থানীয় রাজতন্ত্র পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়নি; পর্তুগিজরা তার ওপর প্রভাব ও করদানের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এটি দেখায়, সাম্রাজ্য পরিচালনার পদ্ধতি সর্বত্র এক ছিল না। কোথাও সরাসরি দখল, কোথাও স্থানীয় শাসকের ওপর চাপ, আবার কোথাও মিত্রতার মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া হতো। গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভিন্ন হলেও তাদের সাধারণ কাজ ছিল বাণিজ্যিক সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করা।

এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল কার্তাজ, অর্থাৎ নৌচলাচলের অনুমতিপত্র। পর্তুগিজরা দাবি করত, নির্দিষ্ট সমুদ্রপথে চলতে হলে জাহাজকে তাদের অনুমতি নিতে হবে। এতে জাহাজের গন্তব্য, পণ্য ও চলাচলের শর্ত নির্ধারিত হতে পারত। অনুমতিবিহীন জাহাজ আটক, মালামাল বাজেয়াপ্ত কিংবা আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ত। ফলে বাণিজ্য থেকে আয়ের পাশাপাশি কার্তাজ ছিল অন্যের চলাচলের ওপর কর্তৃত্ব চাপানোর উপায়।

দুর্গ ও নৌবহর এই দাবিকে কার্যকর করার চেষ্টা করত। বন্দরের কামান, সমুদ্রে টহল এবং গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে জাহাজ মোতায়েন পর্তুগিজদের চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু ভারত মহাসাগর ছিল বিশাল; সব জাহাজ পরীক্ষা করা অসম্ভব। বণিকেরা বিকল্প পথ নিতেন, অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করতেন বা স্থানীয় শক্তির আশ্রয় চাইতেন। তাই কার্তাজ ছিল অসমভাবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, সর্বত্র প্রযোজ্য অটুট সমুদ্রসীমা নয়।

পর্তুগিজ শক্তির পেছনে ভারী নৌকামান ও কিছু ধরনের জাহাজের সুবিধা ছিল। তবে এশীয় শক্তিগুলোর অস্ত্র বা নৌজ্ঞান ছিল না—এমন ধারণা ভুল। পর্তুগিজরা বিশেষ পরিস্থিতিতে জাহাজ, কামান ও আক্রমণপদ্ধতি কার্যকরভাবে মিলিয়েছিল। পাশাপাশি স্থানীয় নাবিক, দোভাষী, ব্যবসায়ী, সৈনিক ও সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করত। রাজকীয় বাণিজ্যের বাইরেও পর্তুগিজ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা এশীয় বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।

আলবুকার্কের পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা বোঝায় ১৫১৩ সালে এডেন দখলের ব্যর্থতা। লোহিত সাগরের প্রবেশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়নি; মিশর ও ভূমধ্যসাগরমুখী বাণিজ্যও টিকে থাকে। পরবর্তী সময়ে অটোমান শক্তি, আঞ্চলিক সুলতানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগালকে চ্যালেঞ্জ করে। স্থায়ী ঘাঁটি রক্ষা, সৈন্যের বেতন ও জাহাজ মেরামতের ব্যয়ও ছিল বিপুল। বন্দর দখল তাই লাভের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দায় সৃষ্টি করেছিল।

এই সম্প্রসারণে বণিক ও উপকূলবাসীর ওপর সহিংসতা, জাহাজ লুট এবং বাধ্যতামূলক শর্ত চাপানোর ঘটনা ঘটেছে। আবার সহযোগিতা ও পারস্পরিক লাভের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। পর্তুগিজ সামুদ্রিক সাম্রাজ্যকে তাই শুধু বিজয়ের মানচিত্র দিয়ে বোঝা যায় না। ১৫১০–১৫১৫ সালের তিনটি প্রধান সাফল্য ভারত মহাসাগরে শক্তির ভারসাম্য বদলেছিল, কিন্তু পুরোনো বাণিজ্যজগতকে মুছে দেয়নি। পূর্বের মসলার বাজারে এই পর্তুগিজ অবস্থানই স্পেনকে পশ্চিম দিক থেকে সেখানে পৌঁছানোর নতুন পথ খুঁজতে আরও উৎসাহিত করবে।