বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফোর্ট সামটারের যুদ্ধ: ১৮৬১ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সূচনা

সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ

ফোর্ট সামটারের যুদ্ধ: ১৮৬১ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সূচনা
ফোর্ট সামটারের কামানের গর্জনে গৃহযুদ্ধের সূচনা

বিচ্ছিন্নতার ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কনফেডারেসির বিরোধ যখন যুদ্ধক্ষেত্রে গড়াতে চলেছে, তখন তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় চার্লস্টন বন্দরের একটি দুর্গ। ফোর্ট সামটারে উড়ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা, অথচ চারপাশের উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছিল দক্ষিণী বাহিনী। আগের কয়েক মাসের রাজনৈতিক সংকট এখানে এসে একটি বাস্তব প্রশ্নে আটকে যায়: সাউথ ক্যারোলাইনা বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দিলেও তার বন্দরের ফেডারেল দুর্গ কি মার্কিন সরকারের হাতেই থাকবে?

ফোর্ট সামটার ছিল চার্লস্টন বন্দরের প্রবেশপথে কৃত্রিম দ্বীপের ওপর নির্মিত ইটের দুর্গ। ১৮১২ সালের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র উপকূলীয় প্রতিরক্ষা জোরদারের যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, এটি তার অংশ। বহিরাগত নৌবহর ঠেকানোর জন্য নির্মিত স্থাপনাটিকে এবার দেশের ভেতরের বিদ্রোহ মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। বন্দরের সামরিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দুর্গটি হয়ে ওঠে ফেডারেল কর্তৃত্ব ও কনফেডারেট স্বাধীনতার দাবির মুখোমুখি অবস্থানের প্রতীক।

সেখানে মার্কিন সেনাদের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর রবার্ট অ্যান্ডারসন। কেন্টাকিতে জন্ম নেওয়া এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দক্ষিণের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখেন। সাউথ ক্যারোলাইনার বিচ্ছিন্নতার পর তাঁর সৈন্যরা প্রথমে কাছের ফোর্ট মোলট্রিতে অবস্থান করছিল। কিন্তু সেই দুর্গ স্থলভাগ থেকে আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকায় অ্যান্ডারসন ১৮৬০ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাতে বাহিনীকে ফোর্ট সামটারে সরিয়ে নেন। জলবেষ্টিত অবস্থান ছোট বাহিনীর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ছিল।

দক্ষিণী কর্তৃপক্ষ এই স্থানান্তরকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের ধারণায়, ফেডারেল সরকার চার্লস্টনে নিজেদের উপস্থিতি স্থায়ী করতে চাইছিল। অন্যদিকে অ্যান্ডারসনের প্রধান উদ্বেগ ছিল সৈন্যদের নিরাপত্তা। দুর্গে তাঁর নিয়মিত সেনার সংখ্যা ছিল আশিজনের মতো; সঙ্গে কিছু বেসামরিক কর্মীও ছিলেন। চারপাশের উপকূলে দক্ষিণী বাহিনী কামান বসাতে থাকায় দুর্গটি ক্রমে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অস্ত্রের পাশাপাশি খাদ্য, জ্বালানি এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বুকানন প্রশাসন পরিস্থিতি সামলাতে ১৮৬১ সালের জানুয়ারিতে স্টার অব দ্য ওয়েস্ট নামের একটি বেসামরিক জাহাজে সৈন্য ও রসদ পাঠায়। ৯ জানুয়ারি জাহাজটি চার্লস্টন বন্দরে ঢোকার চেষ্টা করলে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার বাহিনী তার দিকে গুলি চালায়। জাহাজটি ফিরে যায়। ফলে এপ্রিলের আগেই সশস্ত্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, যদিও তখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়নি। এই ব্যর্থ অভিযান দেখিয়ে দেয়, সামটারে সরবরাহ পাঠানোও সামরিক সংঘর্ষের কারণ হতে পারে।

৪ মার্চ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর আব্রাহাম লিংকন জানতে পারেন, দুর্গের খাদ্য মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাঁর সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত: দুর্গ ছেড়ে দিলে বিচ্ছিন্নতাপন্থীরা নিজেদের দাবির স্বীকৃতি হিসেবে সেটিকে প্রচার করতে পারে; আবার শক্তি দিয়ে দুর্গ রক্ষার চেষ্টা করলে যুদ্ধ বাধতে পারে। আরও কিছু দাসপ্রথাসমর্থিত রাজ্য তখনও ইউনিয়নে ছিল। কে প্রথম আক্রমণ করবে, সেই প্রশ্ন তাদের জনমতেও প্রভাব ফেলতে পারত।

লিংকন শেষ পর্যন্ত দুর্গে রসদ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এপ্রিলের শুরুতে সাউথ ক্যারোলাইনার গভর্নরকে জানানো হয়, প্রথম উদ্দেশ্য খাদ্য সরবরাহ; বাধা না দিলে অতিরিক্ত সৈন্য বা অস্ত্র নামানোর চেষ্টা হবে না। তবে অভিযানের সঙ্গে সামরিক সহায়তার প্রস্তুতিও ছিল, যাতে প্রতিরোধের মুখে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মানবিক সরবরাহ ও সামরিক কর্তৃত্ব এখানে একই সংকটের অংশ হয়ে উঠেছিল। লিংকন দুর্গ পরিত্যাগ করলেন না, আবার প্রথমে প্রকাশ্য আক্রমণের নির্দেশও দিলেন না।

কনফেডারেট প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিসের সরকার এই উদ্যোগকে নিজেদের কর্তৃত্বের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। চার্লস্টনে দক্ষিণী বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি. জি. টি. বোরেগার্ড। ঘটনাচক্রে অ্যান্ডারসন একসময় ওয়েস্ট পয়েন্টে তাঁর শিক্ষক ছিলেন। এখন সাবেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরস্পরবিরোধী সরকারের হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ব্যক্তিগত সৌজন্য বজায় থাকলেও তাঁদের ওপর থাকা রাজনৈতিক নির্দেশের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছিল।

১১ এপ্রিল বোরেগার্ডের প্রতিনিধিরা দুর্গে গিয়ে আত্মসমর্পণের দাবি জানান। অ্যান্ডারসন তা প্রত্যাখ্যান করেন, তবে জানান যে সরবরাহ না এলে খাদ্যের অভাবেই তাঁকে শিগগির সরে যেতে হবে। পরবর্তী আলোচনায় দুর্গ ছাড়ার সময় ও শর্ত নিয়ে আদানপ্রদান চলে। কিন্তু সম্ভাব্য সাহায্য পৌঁছানোর সুযোগ রেখে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতি কনফেডারেট পক্ষ গ্রহণ করতে চায়নি। ১২ এপ্রিল ভোরের আগে আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

১২ এপ্রিল ১৮৬১, ভোর সাড়ে চারটায় ফোর্ট জনসনের একটি মর্টার থেকে সংকেতসূচক গোলা ছোড়া হয়। এরপর চারপাশের কনফেডারেট কামানগুলো সামটারের দিকে গোলাবর্ষণ শুরু করে। এই আক্রমণকেই সাধারণভাবে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সূচনা ধরা হয়। দুর্গের সৈন্যরা সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গোলাবর্ষণ করেননি; তাঁরা দিনের আলো পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। সকাল সাতটার দিকে ইউনিয়নের কামান জবাব দিতে শুরু করে।

অ্যান্ডারসনের প্রতিরোধের বড় সীমাবদ্ধতা ছিল লোকবল ও নিরাপত্তা। দুর্গে কামান থাকলেও সবগুলো চালানোর মতো প্রশিক্ষিত সৈন্য ছিল না। ওপরের উন্মুক্ত স্থানে কামান চালালে সৈন্যরা শত্রুর গোলার সামনে পড়তেন। তাই তিনি মূলত সুরক্ষিত নিচের কামানকক্ষ থেকে গোলাবর্ষণ করান। এতে প্রাণহানির ঝুঁকি কমলেও আক্রমণকারী ঘাঁটিগুলোর ক্ষতি করার ক্ষমতা সীমিত হয়। দুর্গের শক্ত দেয়াল কিছু সুরক্ষা দিলেও অবরোধ ভাঙার উপায় তৈরি করছিল না।

প্রথম দিন ও রাত পেরিয়ে গোলাবর্ষণ চলতে থাকে। চার্লস্টনের বাসিন্দাদের অনেকে দূর থেকে লড়াই দেখছিলেন। কিন্তু দুর্গের ভেতরে পরিস্থিতি ছিল ক্লান্তিকর: ধোঁয়া, সীমিত খাবার, অবিরাম বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা। বাইরে থাকা ফেডারেল সাহায্যবহর আবহাওয়া, জাহাজগুলোর সমন্বয়হীনতা ও বন্দরের প্রতিরক্ষার কারণে কার্যকরভাবে সরবরাহ পৌঁছে দিতে পারেনি। সমুদ্রের দিকে সাহায্যের সম্ভাবনা থাকলেও গ্যারিসনের বিচ্ছিন্নতা কাটেনি।

১৩ এপ্রিল দুর্গের কাঠের ব্যারাক ও অন্যান্য অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া কঠিন হয় এবং বারুদের মজুত রক্ষা জরুরি হয়ে ওঠে। আগুনের কারণে গোলাবারুদ ব্যবহারের সুযোগও কমে যায়। পতাকার দণ্ড ভেঙে পড়লেও সৈন্যরা আবার পতাকা উঁচু করেন। কিন্তু শুধু পতাকা ধরে রাখা আর কার্যকর সামরিক প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া এক বিষয় ছিল না; দুর্গের ভেতরে অবস্থান ক্রমে অসহনীয় হয়ে উঠছিল।

প্রায় ৩৪ ঘণ্টা গোলাবর্ষণের পর, ১৩ এপ্রিল অ্যান্ডারসন দুর্গ ছেড়ে দেওয়ার শর্ত গ্রহণ করেন। তাঁর সৈন্যদের যুদ্ধবন্দি করা হয়নি। তাঁরা পতাকা, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং নির্ধারিত সরঞ্জাম নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি পান। ১৪ এপ্রিল দুর্গ খালি করা হয় এবং কনফেডারেট বাহিনী তার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। সামরিকভাবে এটি দক্ষিণের জয়, কিন্তু এর রাজনৈতিক ফলাফল শুধু একটি দুর্গ দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার: মূল গোলাবর্ষণে কোনো পক্ষের সৈন্য নিহত হননি। প্রাণহানি ঘটে আত্মসমর্পণের পর মার্কিন পতাকাকে কামানের স্যালুট জানানোর সময় দুর্ঘটনায়। ড্যানিয়েল হাফ নিহত হন এবং গুরুতর আহত এডওয়ার্ড গ্যালওয়ে পরে মারা যান। তাই ফোর্ট সামটার নিজে ব্যাপক প্রাণহানির যুদ্ধ ছিল না; এটি এমন এক সংঘাতের সূচনা করেছিল, যা পরবর্তী চার বছরে ভয়াবহ রক্তক্ষয় ডেকে আনে।

দুর্গ পতনের খবর উত্তরে প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেকের চোখে বিষয়টি হয়ে ওঠে জাতীয় পতাকা ও সরকারের ওপর আক্রমণ। ১৫ এপ্রিল লিংকন ৭৫ হাজার মিলিশিয়া সৈন্য আহ্বান করেন, প্রাথমিকভাবে তিন মাসের সেবার জন্য। দক্ষিণে এই আহ্বানকে বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ঘোষণা হিসেবে দেখা হয়। ভার্জিনিয়া, আরকানসাস, নর্থ ক্যারোলাইনা ও টেনেসি এরপর বিচ্ছিন্নতার পথে এগোয়।

লিংকন দক্ষিণের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণাও দেন। দুই পক্ষ সৈন্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং রসদ জোগাড় শুরু করে। ইউনিয়নের ঘোষিত প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল বিদ্রোহ দমন ও রাষ্ট্রের ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা; কনফেডারেসি চাইছিল নিজেদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে। উত্তরের রাজনৈতিক ভাষায় তখনও সর্বত্র দাসমুক্তি প্রধান যুদ্ধলক্ষ্য হয়ে ওঠেনি, যদিও দাসপ্রথা রক্ষার সংকট থেকেই বিচ্ছিন্নতার জন্ম।

সামটারের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার পরও অনেক মানুষ বিশ্বাস করেছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হবে। নতুন স্বেচ্ছাসেবকেরা সামরিক জীবনের কঠোরতা শেখার আগেই বিজয়ের প্রত্যাশায় শিবিরে যোগ দিচ্ছিলেন। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল বিশাল বাহিনী পরিচালনা, যোগাযোগ রক্ষা এবং প্রকৃত যুদ্ধের পরীক্ষা। চার্লস্টনের একটি দুর্গে শুরু হওয়া সংঘর্ষ এবার ভার্জিনিয়ার মাঠে ছড়িয়ে পড়ছিল—যেখানে দ্রুত জয়ের আশা প্রথম বড় ধাক্কা খেতে চলেছিল।