আজটেক ও ইনকা সাম্রাজ্যের পতন: কোর্তেস ও পিজারোর বিজয়ের ইতিহাস
সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান
অস্ত্রের পাশাপাশি আদিবাসী জোট, মহামারি ও রাজনৈতিক বিভাজন বদলে দেয় দুই সাম্রাজ্যের ভাগ্য।
ম্যাগেলান–এলকানোর অভিযান যখন মহাসাগরগুলোকে একটি সম্পূর্ণ যাত্রাপথে যুক্ত করছিল, তখন আমেরিকায় স্প্যানিশ সম্প্রসারণ আরেক পর্যায়ে প্রবেশ করেছিল। দ্বীপে বসতি ও উপকূল অনুসন্ধানের পর এবার লক্ষ্য হয়ে ওঠে জনবহুল, সম্পদশালী সাম্রাজ্য। ১৫১৯ সালে হার্নান কোর্তেস মেক্সিকোয় অভিযান শুরু করেন; পরের দশকে ফ্রান্সিসকো পিজারো এগিয়ে যান আন্দিজের দিকে। তাঁদের সাফল্যকে কয়েকশ ইউরোপীয় সৈন্যের হাতে লক্ষ মানুষের পরাজয়ের সরল গল্পে ব্যাখ্যা করলে আদিবাসী মিত্র, মহামারি ও রাজনৈতিক সংকটের প্রকৃত ভূমিকা হারিয়ে যায়।
আজটেক ও ইনকা একই ধরনের রাষ্ট্র ছিল না। মেক্সিকোর আজটেক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে ছিল তেনোচতিতলান, তেসকোকো ও ত্লাকোপানের ত্রিদলীয় জোট; এর মধ্যে মেক্সিকা শাসিত তেনোচতিতলান সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। বহু অধীন অঞ্চল থেকে কর ও পণ্য আদায় করা হতো। অন্যদিকে আন্দিজের তাওয়ান্তিনসুয়ু বা ইনকা সাম্রাজ্য সড়ক, প্রশাসনিক কেন্দ্র, গুদাম ও শ্রমদায়ের মাধ্যমে বিশাল ভূখণ্ড পরিচালনা করত। উভয় সাম্রাজ্যের শক্তির পাশাপাশি সম্প্রসারণজনিত অসন্তোষও ছিল।
কোর্তেস কিউবা থেকে কয়েকশ সৈন্য, অল্পসংখ্যক ঘোড়া ও কামান নিয়ে মেক্সিকোর উপকূলে পৌঁছান। তাঁর অভিযান ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্প্যানিশ রাজকীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কও বিরোধপূর্ণ হয়ে ওঠে। উপকূলে ভেরাক্রুস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজের কর্তৃত্বের ভিত্তি তৈরি করেন। এরপর স্থানীয় সমাজের রাজনৈতিক বিভাজন বুঝে মিত্র সংগ্রহে মনোযোগ দেন। এই জোট গঠনই তাঁর অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি।
যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মালিনৎসিন বা দোনিয়া মারিনা, যিনি বিভিন্ন ভাষা ও স্থানীয় পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা করেন। প্রথম দিকে তাঁর সঙ্গে হেরোনিমো দে আগিলারের মাধ্যমে অনুবাদের ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠে। দোভাষীরা শুধু শব্দ অনুবাদ করতেন না; আলোচনার অর্থ, শাসকদের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য সম্পর্ক বোঝাতেও সাহায্য করতেন। মালিনৎসিনের ভূমিকা বোঝার সময় তাঁর নিজের বন্দিত্ব ও সীমিত স্বাধীনতার বাস্তবতাও বিবেচনা করা জরুরি।
প্রাথমিক সংঘর্ষের পর ত্লাসকালার সঙ্গে কোর্তেসের মিত্রতা গড়ে ওঠে। ত্লাসকালানরা মেক্সিকা শক্তির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। অন্য জনগোষ্ঠীও করের চাপ বা আঞ্চলিক বিরোধের কারণে স্প্যানিশদের সঙ্গে যোগ দেয়। ফলে কোর্তেসের বাহিনী দ্রুত একটি বৃহত্তর যৌথ বাহিনীতে পরিণত হয়। আদিবাসী যোদ্ধারা যুদ্ধ, রসদ ও তথ্য সরবরাহে অপরিহার্য ছিলেন। তাঁরা নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে লড়েছিলেন, যদিও পরবর্তী স্প্যানিশ শাসনে সেই প্রত্যাশার অনেকটাই পূরণ হয়নি।
১৫১৯ সালের নভেম্বরে কোর্তেস তেনোচতিতলানে প্রবেশ করেন। শাসক মোক্তেজুমা দ্বিতীয় তাঁকে গ্রহণ করলেও পরিস্থিতি দ্রুত সংকটে রূপ নেয়; স্প্যানিশরা সম্রাটকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। মোক্তেজুমা কোর্তেসকে দেবতা মনে করেছিলেন বলেই সব ঘটেছে—এমন জনপ্রিয় ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অতিথি বাহিনীকে সামলানোর কৌশল এবং সামরিক চাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৫২০ সালে স্প্যানিশদের হাতে ধর্মীয় উৎসবে হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে বিস্ফোরিত করে।
মোক্তেজুমার মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বিবরণ রয়েছে। এরপর বিদ্রোহী শহর থেকে পালাতে গিয়ে স্প্যানিশ ও তাদের মিত্ররা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। কিন্তু কোর্তেস পরাজয়ের পর জোট পুনর্গঠন করেন। একই সময়ে গুটিবসন্তের মহামারি তেনোচতিতলানসহ অঞ্চলে বিপর্যয় আনে; নতুন শাসক কুইতলাহুয়াকও মারা যান। মহামারি মানুষের জীবন, নেতৃত্ব এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে দুর্বল করে, যদিও প্রতিরোধ থেমে যায়নি।
১৫২১ সালে কোর্তেস স্থল ও জলপথে তেনোচতিতলান অবরোধ করেন। হ্রদে ব্যবহারের জন্য নির্মিত ছোট যুদ্ধজাহাজ, বাঁধপথে আক্রমণ এবং খাদ্য-পানি সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা কার্যকর হয়। বিপুল আদিবাসী মিত্রবাহিনী ছাড়া এই অবরোধ পরিচালনা সম্ভব হতো না। ১৩ আগস্ট ১৫২১ সালে কুয়াউতেমোক বন্দি হন এবং শহরের পতন ঘটে। রাজধানী ধ্বংস ও সাম্রাজ্যিক নেতৃত্বের পতন স্প্যানিশ শাসনের পথ খুললেও মেক্সিকোর সব অঞ্চল তখনই বশ্যতা স্বীকার করেনি।
আন্দিজে পিজারোর অভিযানের আগে থেকেই পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছিল। ইউরোপীয় সংযোগের মাধ্যমে ছড়ানো মহামারি ইনকা ভূখণ্ডেও পৌঁছায়। সম্রাট হুয়াইনা কাপাকের মৃত্যু সাধারণত সেই মহামারির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যদিও রোগের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। উত্তরাধিকার সংকট থেকে তাঁর পুত্র হুয়াসকার ও আতাহুয়ালপার মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘাত সামরিক নেতৃত্ব, অভিজাত গোষ্ঠী ও বিভিন্ন অঞ্চলের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পিজারো আগের কয়েকটি ব্যর্থ ও কষ্টকর অভিযানের পর আন্দিজের সম্পদ ও রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা পান। স্প্যানিশ রাজমুকুটের অনুমোদন নিয়ে তিনি নতুন অভিযান চালান। ১৫৩২ সালে যখন তাঁর বাহিনী ইনকা ভূখণ্ডের গভীরে প্রবেশ করে, আতাহুয়ালপা গৃহযুদ্ধে বিজয়ী হলেও শাসন তখনও সুসংহত হয়নি। পিজারো একটি অক্ষত ও ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হননি; তিনি সদ্য সমাপ্ত ক্ষমতার সংঘাতের সুযোগ নেন।
১৬ নভেম্বর ১৫৩২ সালে কাহামার্কায় পিজারোর প্রায় ১৬৮ জনের বাহিনী আতাহুয়ালপাকে বন্দি করে। সম্রাট বড় অনুসারীদল নিয়ে সাক্ষাতে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রধান যুদ্ধবাহিনী চত্বরের ভেতরে প্রস্তুত অবস্থায় ছিল না। আড়াল থেকে স্প্যানিশ অশ্বারোহী ও পদাতিকদের আকস্মিক আক্রমণ, গোলাগুলির আতঙ্ক এবং পালকিতে থাকা শাসককে লক্ষ্য করার কৌশল পরিস্থিতি বদলে দেয়। এটি ছিল সাধারণ সম্মুখযুদ্ধের চেয়ে পরিকল্পিত অতর্কিত হামলা।
আতাহুয়ালপা মুক্তির বিনিময়ে বিপুল সোনা ও রুপা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে মূল্যবান বস্তু সংগ্রহ করা হয়; বহু শিল্পবস্তু গলিয়ে ধাতু ভাগ করা হয়। কিন্তু মুক্তিপণ দেওয়া তাঁকে রক্ষা করেনি। ১৫৩৩ সালে স্প্যানিশরা আতাহুয়ালপাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সম্রাটকে বন্দি রেখে আদেশ আদায় এবং পরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া কেন্দ্রীভূত ইনকা শাসনকে গভীর সংকটে ফেলে।
পরবর্তীতে পিজারো কুসকোর দিকে অগ্রসর হন। এখানে স্প্যানিশদের পাশে যোগ দেয় ইনকা শাসনে অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক অংশ। ১৫৩৩ সালে কুসকো দখলের পর মানকো ইনকাকে শাসক করা হয়, কিন্তু স্প্যানিশ নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতন তাঁকে বিদ্রোহে ঠেলে দেয়। ১৫৩৬ সালে তিনি কুসকো অবরোধ করেন। দীর্ঘ প্রতিরোধের পর স্বাধীন ইনকা শাসনের কেন্দ্র ভিলকাবাম্বায় টিকে থাকে, যার পতন ঘটে ১৫৭২ সালে।
দুই বিজয়েই ইস্পাতের অস্ত্র, ঘোড়া ও কিছু আগ্নেয়াস্ত্র স্প্যানিশদের সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু এগুলো একা ফল নির্ধারণ করেনি। আদিবাসী মিত্র, মহামারি, নেতৃত্বকে বন্দি করা, রসদ বিচ্ছিন্ন করা এবং রাজনৈতিক বিভাজন কাজে লাগানো ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজটেকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অবরোধ এবং ইনকাদের ক্ষেত্রে সম্রাটকে অতর্কিতে বন্দি করার পার্থক্যও মনে রাখতে হবে। একই ‘বিজয়ের কৌশল’ দিয়ে দুই ঘটনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হয় না।
সাম্রাজ্য পতনের পর আদিবাসী সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। ভাষা, কৃষিজ্ঞান, সামাজিক সম্পর্ক ও প্রতিরোধ বিভিন্ন রূপে টিকে থাকে। তবে ভূমি দখল, বাধ্যতামূলক শ্রম, ধর্মীয় হস্তক্ষেপ এবং মহামারি সমাজগুলোকে গভীরভাবে বদলে দেয়। কোর্তেস ও পিজারোর বিজয় আমেরিকায় স্প্যানিশ শাসনের ভিত্তি বিস্তৃত করেছিল, যার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে খনি, কর ও আটলান্টিকমুখী সম্পদ পরিবহনের ব্যবস্থা। সমুদ্র অভিযান এখন মহাদেশের মানুষের শ্রম ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।
মন্টেস্কু ও ভলতেয়ার: ক্ষমতার বিভাজন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
জন লক ও আধুনিক গণতন্ত্র: প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সম্মতি
আলোকায়ন যুগের সূচনা: বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও যুক্তিবাদে বদলে যাওয়া ইউরোপ
লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন: ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে তাঁর প্রকৃত অবদান
হেডি লামার: হলিউড তারকা থেকে বেতার প্রযুক্তির পথিকৃৎ