মন্টেস্কু ও ভলতেয়ার: ক্ষমতার বিভাজন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
সিরিজ: আলোকায়নের যুগ
ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিবেকের স্বাধীনতার পক্ষে আলোকায়নের দুই প্রভাবশালী কণ্ঠ।
জন লক যে প্রশ্ন সামনে এনেছিলেন—মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে কীভাবে সাজাতে হবে—অষ্টাদশ শতাব্দীতে তা আরও নির্দিষ্ট রূপ পেল। জনগণের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আইন তৈরি, শাসন পরিচালনা ও বিচার করার ক্ষমতা একই হাতে থাকলে স্বাধীনতা কতটা নিরাপদ? আবার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়া হলে আইনের অস্তিত্বই কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে? মন্টেস্কু ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসে এবং ভলতেয়ার অসহিষ্ণুতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে এই সমস্যাগুলোর উত্তর খুঁজেছিলেন। তাঁদের পথ আলাদা হলেও উভয়েই প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বকে যুক্তির বিচারের সামনে দাঁড় করান।
তাঁদের ফ্রান্সে রাজতন্ত্র ছিল শক্তিশালী, ক্যাথলিক চার্চ ছিল প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে জন্মগত বিশেষাধিকার গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবে রাজা সব বাধা উপেক্ষা করে শাসন করতেন, এমন সরল চিত্রও যথার্থ নয়। অভিজাত সমাজ, প্রাদেশিক অধিকার এবং উচ্চ আদালতগুলোর সঙ্গে রাজক্ষমতার টানাপোড়েন চলত। বই প্রকাশে অনুমোদন ও সেন্সরশিপ ছিল; লেখককে নির্বাসন, কারাবাস কিংবা রচনা বাজেয়াপ্তের মুখোমুখি হতে হতো। এই পরিবেশে রাজনৈতিক সমালোচনা প্রায়ই ভ্রমণকাহিনি, ব্যঙ্গ, তুলনামূলক আলোচনা ও দর্শনের আড়ালে প্রকাশ পেত।
১৬৮৯ সালে জন্ম নেওয়া শার্ল-লুই দ্য সেকঁদা, ব্যারন দ্য মন্টেস্কু অভিজাত পরিবার থেকে এসেছিলেন এবং বোর্দোর উচ্চ আদালতে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন। আইন ও প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৭২১ সালের পারসিয়ান লেটার্স-এ কাল্পনিক পারস্যদেশীয় পর্যটকদের চোখ দিয়ে তিনি ফরাসি সমাজকে দেখান। বাইরের মানুষের বিস্ময়ের মাধ্যমে পরিচিত আচার, রাজকীয় আত্মগরিমা ও ধর্মীয় কর্তৃত্বকে অস্বাভাবিক করে তোলা হয়। পাঠক বুঝতে পারেন, যে ব্যবস্থা নিজের দেশে স্বাভাবিক বলে মনে হয়, সেটিও অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নযোগ্য।
মন্টেস্কুর প্রধান রাজনৈতিক গ্রন্থ দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ প্রকাশিত হয় ১৭৪৮ সালে। তাঁর অনুসন্ধান ছিল ব্যাপক: বিভিন্ন সমাজের আইন কেন আলাদা, শাসনব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং স্বাধীনতার উপযোগী প্রতিষ্ঠান কী? তিনি সরকারকে প্রধানত প্রজাতন্ত্র, রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের ধরনে বিশ্লেষণ করেন। রাজতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত আইন ও মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে; স্বৈরতন্ত্রে শাসকের ইচ্ছা ও ভয় প্রাধান্য পায়। তাঁর লক্ষ্য সব রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা ছিল না; ক্ষমতা কীভাবে সংযত রাখা যায়, সেটিই ছিল কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
মন্টেস্কুর কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ইচ্ছামতো সবকিছু করার সুযোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ—অন্যায় গ্রেপ্তার, নির্বিচার শাস্তি বা ক্ষমতাবানের খেয়ালের শিকার হওয়ার ভয় থেকে মুক্ত থাকা। কোনো শাসক ব্যক্তিগতভাবে দয়ালু হলেই এই নিরাপত্তা স্থায়ী হয় না। তাঁর উত্তরাধিকারী নিষ্ঠুর হতে পারেন, কিংবা সদিচ্ছাসম্পন্ন প্রশাসনও ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে। তাই স্বাধীনতাকে ব্যক্তির চরিত্রের ওপর ছেড়ে না দিয়ে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুরক্ষিত করতে হবে। এখানেই তাঁর ক্ষমতা-বিভাজনের যুক্তির বাস্তব গুরুত্ব।
তিনি আইন প্রণয়ন, নির্বাহী কার্যক্রম এবং বিচারকার্যের মধ্যে পার্থক্য করেন। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন বানিয়ে তা কার্যকর করলে নিজের সুবিধামতো অত্যাচারী বিধান প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। বিচারকও আইনপ্রণেতা হলে ব্যক্তির জীবন ও স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারের অধীন হতে পারে; বিচার ও নির্বাহী ক্ষমতা এক হলে নিপীড়নের আশঙ্কা বাড়ে। তবে ক্ষমতার বিভাজন মানে তিনটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দপ্তর নয়; ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ক্ষমতারই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ দরকার। ভারসাম্য, পারস্পরিক বাধা এবং কর্তৃত্বের সীমা তাঁর চিন্তার অপরিহার্য অংশ।
ইংল্যান্ডে অবস্থানের অভিজ্ঞতা মন্টেস্কুর বিশ্লেষণে প্রভাব ফেলে। রাজা, অভিজাতদের সভা ও প্রতিনিধিদের সভার সম্পর্কের মধ্যে তিনি স্বাধীনতা রক্ষার সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তবে তাঁর বর্ণনা ইংরেজ রাজনৈতিক বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিবেদন ছিল না; এটি ছিল একটি ব্যাখ্যামূলক আদর্শচিত্রও। তিনি অভিজাত প্রতিষ্ঠান ও মধ্যবর্তী ক্ষমতার ভূমিকা সমর্থন করতেন, সর্বজনীন ভোটাধিকারের আধুনিক কর্মসূচি দেননি। পরবর্তী আমেরিকান সংবিধানপ্রণেতারা তাঁর চিন্তা ব্যবহার করলেও নিজেদের অভিজ্ঞতায় তা বদলেছেন। ফলে তাঁকে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পূর্ণ প্রস্তুত নকশার একক রচয়িতা বলা ভুল।
ভলতেয়ারের সংগ্রাম ছিল আরও প্রকাশ্য, তীক্ষ্ণ ও সাহিত্যনির্ভর। ১৬৯৪ সালে জন্ম নেওয়া ফ্রাঁসোয়া-মারি আরুয়ে ‘ভলতেয়ার’ নামে পরিচিত হন। ব্যঙ্গাত্মক লেখালেখি ও ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সংঘাত তাঁকে বাস্তিলের কারাগারে নিয়ে যায়। ১৭২৬ সালের বিরোধের পর ইংল্যান্ডে অবস্থান তাঁর চিন্তায় বিশেষ প্রভাব ফেলে। সেখানে ধর্মীয় বৈচিত্র্য, বাণিজ্যিক সমাজ এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পরিসর তাঁকে আকৃষ্ট করে। ১৭৩৪ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত ফিলসফিক্যাল লেটার্স ইংল্যান্ডের তুলনার মাধ্যমে ফরাসি প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে; কর্তৃপক্ষ বইটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।
ভলতেয়ারের ধর্মীয় সহনশীলতার লড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট হয় জঁ কালাসের বিচারকে কেন্দ্র করে। তূলুজের প্রোটেস্ট্যান্ট ব্যবসায়ী কালাসের ছেলে ১৭৬১ সালে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেলে অভিযোগ ওঠে, ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণে বাধা দিতে পরিবার তাকে হত্যা করেছে। যথেষ্ট প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও ধর্মীয় সন্দেহ বিচারকে প্রভাবিত করে। ১৭৬২ সালে কালাসকে নির্যাতনের পর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ভলতেয়ার ঘটনাটি অনুসন্ধান করেন এবং চিঠিপত্র, প্রকাশনা ও প্রভাবশালী যোগাযোগের মাধ্যমে পরিবারের পক্ষে প্রচার চালান। ১৭৬৫ সালে কালাসের বিরুদ্ধে রায় বাতিল হয়।
এই ঘটনার পটভূমিতে ১৭৬৩ সালে প্রকাশিত হয় ভলতেয়ারের ট্রিটিজ অন টলারেশন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, বিশ্বাসের পার্থক্য কেন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার কারণ হবে? মানুষ ভুল করতে পারে; ধর্মীয় সত্য সম্পর্কে নিজের নিশ্চয়তা অন্যকে নির্যাতনের অনুমতি দেয় না। এখানে সহনশীলতা কেবল ব্যক্তিগত ভদ্রতা ছিল না—বিচার, নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের আচরণের প্রশ্ন ছিল। ধর্মীয় গুজব প্রমাণের স্থান দখল করলে আদালতও নিপীড়নের যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে, কালাসের ঘটনা সেই বিপদকে সামনে আনে।
তবে ভলতেয়ারকে ধর্মহীনতার সরল প্রতীক ভাবলে ভুল হবে। তিনি সাধারণত ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং যাজকীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরোধিতা করতেন। তাঁর আক্রমণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রভাবকে দুর্বল করার দাবি তৈরি করে। একই সঙ্গে তাঁর নিজের কিছু লেখায় ইহুদি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অবমাননাকর সাধারণীকরণ রয়েছে। তাই সহিষ্ণুতার পক্ষে তাঁর অবদান স্বীকার করার পাশাপাশি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সীমাও দেখতে হয়। আলোকায়নের প্রবক্তারাও নিজেদের প্রচারিত নীতির সব পরিণতি মেনে নেননি।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও ভলতেয়ারের গুরুত্ব তাঁর অবিরাম প্রকাশনা ও সেন্সরশিপবিরোধী অবস্থানে। বই নিষিদ্ধ হলে বিদেশে ছাপানো, নাম গোপন রাখা কিংবা ব্যঙ্গের সাহায্যে বক্তব্য পৌঁছানোর কৌশল ব্যবহৃত হতো। তবে তাঁর নামে প্রচলিত অন্যের কথা বলার অধিকার রক্ষায় জীবন দেওয়ার বিখ্যাত বাক্যটি তাঁর নিজের উক্তি নয়; বিংশ শতাব্দীতে এভলিন বিয়াট্রিস হল তাঁর মনোভাব বোঝাতে সেটি লেখেন। ভলতেয়ারের স্বাধীনতাচিন্তাকেও বর্তমানের সীমাহীন ও সর্বজনীন অধিকারের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না।
মন্টেস্কু ও ভলতেয়ারের রাজনৈতিক প্রত্যাশাও অভিন্ন ছিল না। মন্টেস্কু প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ওপর জোর দেন; ভলতেয়ার কখনো সংস্কারমুখী শক্তিশালী রাজাকে পরিবর্তনের কার্যকর মাধ্যম ভাবেন। প্রুশিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক এবং রাশিয়ার দ্বিতীয় ক্যাথরিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সেই প্রত্যাশার পরিচয় দেয়। তাঁরা কেউই পরবর্তী ফরাসি বিপ্লবের সব দাবি আগাম সমর্থন করেননি। তবু তাঁদের লেখায় রাজা বা চার্চের মর্যাদা আর সমালোচনা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা থাকল না। আইন ও প্রতিষ্ঠানকে মানুষের নিরাপত্তা, বিচার এবং যুক্তির মানদণ্ডে ব্যাখ্যা করতে হলো।
এই পরিবর্তনই আলোকায়নের বিতর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যায়। মন্টেস্কু দেখালেন, স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে ক্ষমতার বিন্যাস জরুরি; ভলতেয়ার দেখালেন, অসহিষ্ণুতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলাও জরুরি। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত সরকার ও সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলেও সম্পদের বৈষম্য, সামাজিক নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন থেকে যায়। যাদের নামে রাষ্ট্র চলে, তারা নিজেরা কতটা সার্বভৌম? সভ্যতার অগ্রগতি কি মানুষকে সত্যিই স্বাধীন করেছে? এই প্রশ্নগুলোই আলোকায়নের পরবর্তী বিতর্কে সামাজিক চুক্তি, সাম্য এবং জনগণের ইচ্ছাকে আরও তীব্রভাবে সামনে নিয়ে আসবে।
আলোকায়ন যুগের সূচনা: বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও যুক্তিবাদে বদলে যাওয়া ইউরোপ
লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন: ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে তাঁর প্রকৃত অবদান
হেডি লামার: হলিউড তারকা থেকে বেতার প্রযুক্তির পথিকৃৎ