স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের বিলুপ্তি: ১৮৩৪ সালের অবসান ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার
সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার
১৮৩৪ সালে প্রতিষ্ঠানের অবসান হলেও ধর্মীয় নিপীড়নের স্মৃতি ও বিতর্ক থেকে যায়।
অনুমোদিত সত্যের সীমা নির্ধারণ করার যে ক্ষমতা স্প্যানিশ ইনকুইজিশন অর্জন করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠল। আগের পর্যায়ে বই, বন্দর ও উপনিবেশে তার বিস্তার দেখা গেলেও অষ্টাদশ শতকে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। রাজকীয় কর্তৃত্ব, আলোকায়নের চিন্তা এবং বিচারসংস্কারের দাবি প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান দুর্বল করে। তবে পতন কোনো সরল অগ্রযাত্রা ছিল না। ১৮৩৪ সালের চূড়ান্ত বিলুপ্তির আগে ইনকুইজিশন একাধিকবার বিলোপ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গেছে। তার শেষ অধ্যায় বুঝতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার পাশাপাশি স্পেনের রাজতন্ত্র ও সাংবিধানিক রাজনীতির সংঘাতও দেখতে হয়।
অষ্টাদশ শতকের ইনকুইজিশন প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকের মতো একই মাত্রায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছিল না। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কমে যাওয়া মানেই চিন্তার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। বই নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় বক্তব্যের তদন্ত এবং সামাজিক ভীতি তখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বুরবোঁ রাজারা গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজমুকুটের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইতেন। ফলে একসময় রাজশক্তির সহায়ক প্রতিষ্ঠানই কখনো রাজকীয় সংস্কারের পথে বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিরোধটি সবসময় ধর্ম বনাম অধর্ম ছিল না; ধর্মীয় কর্তৃত্বের সীমানা কে নির্ধারণ করবেন, সেটিও ছিল কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে। বিপ্লবী ধারণা, নাগরিক অধিকার এবং রাজতন্ত্রবিরোধী প্রকাশনা স্পেনীয় কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ বাড়ায়। ইনকুইজিশন বিদেশি রাজনৈতিক চিন্তার প্রবেশ ঠেকানোর কাজেও ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে তার সমালোচকেরা গোপন বিচার ও বৌদ্ধিক নিয়ন্ত্রণকে স্পেনের উন্নতির প্রতিবন্ধক হিসেবে তুলে ধরেন। আলোকায়নের প্রভাব প্রতিষ্ঠানটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, কিন্তু নিজে থেকেই তাকে বিলুপ্ত করেনি। কার্যকর পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ, শাসনসংকট এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন হয়েছিল।
১৮০৮ সালে নেপোলিয়নের হস্তক্ষেপে স্পেনের রাজতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর তিনি ইনকুইজিশন বিলোপের নির্দেশ দেন। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ আঘাত, কিন্তু যুদ্ধরত সমগ্র স্পেনে নির্দেশটি সমানভাবে কার্যকর হয়নি। ফরাসি নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রতিষ্ঠানটির কিছু কার্যক্রম টিকে ছিল। আবার নেপোলিয়নের পদক্ষেপকে নিছক মানবাধিকারের আদর্শবাদী বিজয় বলাও ভুল। দখলদার শাসন পুরোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস করছিল। ফলে ইনকুইজিশনের বিরোধিতা এবং ফরাসি সামরিক আধিপত্যের বিরোধিতা একই ব্যক্তির মধ্যেও সহাবস্থান করতে পারত।
ফরাসিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মধ্যেই কাদিসের সংসদ বা কোর্তেস নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করে। ১৮১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সংসদ ইনকুইজিশন বিলোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উদারপন্থী প্রতিনিধিরা তার বিশেষ বিচারিক ক্ষমতাকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু তাঁরা আধুনিক অর্থে সর্বজনীন ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেননি। ১৮১২ সালের সংবিধান ক্যাথলিক ধর্মের একচ্ছত্র অবস্থান বজায় রেখেছিল। বিশ্বাসসংক্রান্ত অপরাধ বিচারের অন্য ব্যবস্থা রাখার অর্থ ছিল, একটি বিশেষ আদালতের অবসান ঘটলেও ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ তখনও স্বীকৃত থাকল।
১৮১৪ সালে সপ্তম ফের্দিনান্দ ফিরে এসে সাংবিধানিক ব্যবস্থা বাতিল করেন এবং ২১ জুলাই ইনকুইজিশন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কাছে এটি পুরোনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের অংশ ছিল। উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল অভিযানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাবর্তন যুক্ত হয়। তবে ১৮২০ সালের সামরিক বিদ্রোহ ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের পর রাজা আবার সেটি বিলোপ করতে বাধ্য হন। এই ঘটনাক্রম দেখায়, ইনকুইজিশনের অস্তিত্ব তখন ধর্মতাত্ত্বিক প্রয়োজনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্রের ওপর নির্ভর করছিল। নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের সংঘর্ষে প্রতিষ্ঠানটি প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
১৮২৩ সালে ফরাসি সামরিক সহায়তায় নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র ফিরে এলেও ইনকুইজিশন আগের কেন্দ্রীয় কাঠামোয় আনুষ্ঠানিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রচলিত বিবরণে কখনো বলা হয়, রাজা ফিরে এসে আগের মতোই আদালত চালু করেন। বাস্তবে স্থানীয় কিছু ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হুন্তাস দে ফে বা বিশ্বাসরক্ষার পরিষদ গঠন করেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক দমন চালানোর অন্য প্রতিষ্ঠানও ছিল। ফলে মূল প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নিপীড়নের অবসান নিশ্চিত করেনি; পুরোনো উদ্দেশ্য ভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছিল।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা শিক্ষক কায়েতানো রিপোলের বিচার। ঈশ্বরবিশ্বাস ও ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে অভিযোগে ভ্যালেন্সিয়ার বিশ্বাসরক্ষার পরিষদ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়; ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ ১৮২৬ সালের ৩১ জুলাই তাঁকে ফাঁসি দেয়। তাঁকে প্রায়ই স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের শেষ শিকার বলা হয়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি পুরোনো ইনকুইজিশন আদালতের রায়ে নিহত হননি। তাঁর ঘটনা ইনকুইজিশন-পরবর্তী ধর্মীয় নিপীড়নের ধারাবাহিকতা বোঝায়। এই পার্থক্য বজায় রাখলে ঘটনাটির গুরুত্ব কমে না; বরং প্রতিষ্ঠানের অবসান ও তার মানসিকতার স্থায়িত্ব আলাদা করে বোঝা যায়।
সপ্তম ফের্দিনান্দের মৃত্যুর পর অপ্রাপ্তবয়স্ক দ্বিতীয় ইসাবেলার পক্ষে মারিয়া ক্রিস্তিনা রাজপ্রতিনিধি হিসেবে শাসন করেন। রাজবংশীয় সংঘাত ও কারলিস্ট যুদ্ধের মধ্যে তাঁর সরকার উদারপন্থী সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে ১৫ জুলাই ১৮৩৪ সালের রাজকীয় আদেশে ইনকুইজিশন চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বাস্তবে আগেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাবর্তনের পথ আইনগতভাবে বন্ধ করা ছিল এর প্রধান তাৎপর্য। সিদ্ধান্তটি শূন্য থেকে নতুন স্বাধীন সমাজ তৈরি করেনি; দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্পত্তি ঘটিয়েছিল।
বিলুপ্তির পরও ক্যাথলিক ধর্মের বিশেষ রাষ্ট্রিক অবস্থান এবং ধর্মীয় প্রকাশের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ বজায় থাকে। স্পেনে ব্যাপকতর ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি আসে পরবর্তী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে; ১৮৬৯ সালের সংবিধান সেই ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আমেরিকার সাবেক উপনিবেশগুলোর ক্ষেত্রেও ১৮৩৪ সালকে একমাত্র সমাপ্তির তারিখ বলা যায় না। স্বাধীনতা আন্দোলন, স্থানীয় সরকার ও স্পেনীয় সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের কারণে সেখানে আদালতগুলোর অবসান আলাদা সময়ে ঘটে। মাদ্রিদের চূড়ান্ত আদেশ সমগ্র প্রাক্তন সাম্রাজ্যের জন্য একই দিনের অভিজ্ঞতা ছিল না।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিতর্কে প্রথম প্রয়োজন হিসাবের পরিসর নির্ধারণ করা। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, রোমান ও মধ্যযুগীয় ইনকুইজিশনের ঘটনাগুলো একত্র করলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একইভাবে ইহুদি ও মরিস্কো বিতাড়নের যাত্রাপথে মৃত্যু, যুদ্ধের প্রাণহানি এবং আদালতের মৃত্যুদণ্ড পৃথক বিষয়। পুরোনো লেখক হুয়ান আন্তোনিও ইয়োরেন্তে স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ত্রিশ হাজারের বেশি অনুমান করেছিলেন। আধুনিক গবেষকেরা তাঁর তথ্যের ব্যবহার ও অনুমান সম্প্রসারণের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর আপত্তি তুলেছেন। নথিতে সরাসরি পাওয়া সংখ্যা এবং অনুমানভিত্তিক মোট হিসাবকে এক করে দেখা যায় না।
আধুনিক গবেষণায় মোট মৃত্যুদণ্ড সাধারণত কয়েক হাজারের পর্যায়ে ধরা হয়; তিন থেকে পাঁচ হাজারের মতো হিসাবও আলোচিত। তবে কোনো সংখ্যাই পূর্ণাঙ্গ নামভিত্তিক তালিকা নয়। প্রাথমিক কয়েক দশকের নথি বিশেষভাবে অসম্পূর্ণ, আর পরবর্তী তুলনামূলক কম মৃত্যুদণ্ডের হার পুরো ইতিহাসে প্রয়োগ করাও সমস্যাপূর্ণ। জীবিত মানুষের মৃত্যুদণ্ডকে পলাতক বা মৃত ব্যক্তির প্রতিকৃতি দহনের সঙ্গে মেলানো যাবে না। সংখ্যার নির্ভুলতা জরুরি, কিন্তু কারাবাস, নির্যাতন, সম্পদহানি ও নির্বাসনের ক্ষতিকে শুধু মৃত্যুদণ্ডের হিসাবে মাপা যায় না।
ইনকুইজিশনের স্মৃতিকে প্রভাবিত করেছে স্পেনবিরোধী ও ক্যাথলিকবিরোধী প্রচার, যাকে সাধারণত ব্ল্যাক লেজেন্ড বা কালো কিংবদন্তির আলোচনায় রাখা হয়। কিছু বিবরণে নিষ্ঠুরতা অতিরঞ্জিত হয়েছে, বিভিন্ন সময়ের ঘটনা মিশেছে এবং কাল্পনিক নির্যাতনযন্ত্র যুক্ত হয়েছে। কিন্তু প্রচারের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না যে মূল নিপীড়ন কাল্পনিক ছিল। বিপরীতভাবে, সমসাময়িক অন্য আদালতও নিষ্ঠুর ছিল বলে ইনকুইজিশনের গোপন বিচার ন্যায্য হয়ে যায় না। ইতিহাসের কাজ হলো অতিরঞ্জন সংশোধন করা এবং একই সঙ্গে নথিভুক্ত অবিচারকে তার প্রকৃত গুরুত্বে দেখা।
১৪৭৮ সালে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি ১৮৩৪ সালে আইনগতভাবে শেষ হলেও তার উত্তরাধিকার বিচার, স্মৃতি ও পরিচয়ের আলোচনায় রয়ে গেছে। ইহুদি ও মুসলিম বংশোদ্ভূত খ্রিস্টান, প্রোটেস্ট্যান্ট, পাঠক এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের অভিজ্ঞতা দেখায়, ধর্মীয় ঐক্যের নামে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি কত সহজে সন্দেহে বদলে যেতে পারে। সিরিজের শুরুতে মধ্যযুগীয় সহাবস্থানের অসমতা দেখেছিলাম; শেষ পর্যন্ত সেই অসমতা থেকে তৈরি প্রতিষ্ঠানের অবসান দেখলাম। এই ইতিহাসের স্থায়ী শিক্ষা হলো—বিবেকের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শুধু একটি আদালত বিলোপ যথেষ্ট নয়; বিশ্বাস, পরিচয় ও মতভেদের কারণে মানুষকে শাস্তি দেওয়ার অধিকারকেই প্রশ্ন করতে হয়।
আমেরিগো ভেসপুচি: নতুন বিশ্বের পরিচয় ও আমেরিকা নামের ইতিহাস
ভাস্কো দা গামার ভারত অভিযান: ১৪৯৮ সালে কালিকটে পৌঁছানোর ইতিহাস
টরডেসিলাস চুক্তি ১৪৯৪: স্পেন ও পর্তুগালের বিশ্ব ভাগের ইতিহাস
সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়ন: নির্বাসন, মৃত্যু ও ইউরোপে তার দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার
ওয়াটারলুর যুদ্ধ: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের কাছে নেপোলিয়ন কেন পরাজিত হন?
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও হান্ড্রেড ডেজ: নেপোলিয়নের আবার ক্ষমতা দখল