বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের বিচার ও শাস্তি: অটো-দা-ফে থেকে মৃত্যুদণ্ড

সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার

স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের বিচার ও শাস্তি: অটো-দা-ফে থেকে মৃত্যুদণ্ড
গোপন তদন্ত থেকে প্রকাশ্য দণ্ডঘোষণা—ইনকুইজিশনের বিচারব্যবস্থার দুই মুখ।

মরিস্কোদের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ধর্মান্তরের পরও বংশপরিচয় ও দৈনন্দিন আচরণ কীভাবে সন্দেহের ভিত্তি হয়ে থাকত। এবার প্রশ্ন হলো, সেই সন্দেহ আদালতে পৌঁছালে কী ঘটত? কে অভিযোগ করতেন, অভিযুক্ত কতটুকু জানতে পারতেন এবং কোন পথে একটি তদন্ত মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত গড়াতে পারত? স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের শক্তি শুধু শাস্তির কঠোরতায় ছিল না; গোপন তথ্য সংগ্রহ, দীর্ঘ তদন্ত এবং প্রকাশ্য অপমানের সমন্বয়েও ছিল। তবে প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দীর কার্যক্রমকে একটি অপরিবর্তিত বিচারপদ্ধতি হিসেবে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো হারিয়ে যায়।

ইনকুইজিশনের বিচার আধুনিক আদালতের মতো নির্দিষ্ট দিনে উন্মুক্ত শুনানি ও দুই পক্ষের সরাসরি বিতর্কে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদ, লিখিত সাক্ষ্য, ধর্মতাত্ত্বিক মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া। ইনকুইজিটর, অভিযোগ পরিচালনাকারী কর্মকর্তা, নথিলেখক ও ধর্মতাত্ত্বিক পরামর্শকদের পৃথক ভূমিকা ছিল। প্রয়োজনে বিশপের প্রতিনিধিসহ পরামর্শসভায় রায় নিয়ে আলোচনা হতো। কেন্দ্রীয় সুপ্রেমা পরিষদের তত্ত্বাবধানও সময়ের সঙ্গে শক্তিশালী হয়। তোরকেমাদার নির্দেশাবলির পরে ১৫৬১ সালের নির্দেশনাসহ বিভিন্ন বিধি এই প্রক্রিয়াকে আরও নিয়মবদ্ধ করে।

তদন্তের সূত্র হতে পারত প্রতিবেশীর বক্তব্য, আত্মীয়ের স্বীকারোক্তি, কোনো বই কিংবা প্রকাশ্যে বলা কথা। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু স্থানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় অপরাধ স্বীকারের আহ্বান জানানো হতো। পরে বিশ্বাসসংক্রান্ত ঘোষণায় সন্দেহজনক আচরণের তালিকা পাঠ করে মানুষকে তথ্য দিতে উৎসাহিত করা হয়। এতে খাবারের বিধি, ধর্মীয় উৎসব কিংবা খ্রিস্টীয় মতবাদ সম্পর্কে মন্তব্য অভিযোগের উপাদান হয়ে উঠত। একই আচরণ পারিবারিক সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত অভ্যাস অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস—যেকোনোটির প্রকাশ হতে পারত; আদালতের শ্রেণিবিন্যাস সবসময় এই পার্থক্য ধরত না।

গোপন অভিযোগ মানে অবশ্য প্রতিটি অজ্ঞাত চিঠি গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হতো, এমন নয়। বক্তব্য নথিভুক্ত করা, সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই এবং অভিযোগে ধর্মীয় অপরাধের উপাদান আছে কি না বিবেচনার ধাপ ছিল। কখনো তথ্য বছরের পর বছর জমা থাকত। কিন্তু সাক্ষীর পরিচয় অভিযুক্তের কাছে গোপন রাখা আত্মপক্ষসমর্থনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়াত। অভিযোগকারী ব্যক্তিগত শত্রু কি না, তাঁর সঙ্গে সম্পত্তি বা পারিবারিক বিরোধ ছিল কি না—এসব প্রমাণ করা কঠিন হতো। আদালতের কাছে তথ্য থাকলেও অভিযুক্তের কাছে তার পূর্ণ প্রেক্ষাপট থাকত না।

গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্তকে ইনকুইজিশনের কারাগারে রাখা হতে পারত এবং সম্পত্তির তালিকা তৈরি বা সাময়িক নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হতো। বাজেয়াপ্তি সব মামলার অনিবার্য ফল ছিল না, কিন্তু সম্পদ আটকে যাওয়াই পরিবারকে বিপদে ফেলতে পারত। বন্দির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সম্পদ থেকে মেটানো হতো। কারাগারের অবস্থা স্থান ও সময়ভেদে বদলেছে; সবকটিকে একই ধরনের ভূগর্ভস্থ অন্ধকূপ ভাবা ভুল। তবে বাইরের যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং মামলার অনিশ্চিত দৈর্ঘ্য বন্দি ও পরিবারের ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করত।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তকে নিজের বিবেক পরীক্ষা করে অপরাধ স্বীকার করতে বলা হতো; শুরুতেই সব অভিযোগ স্পষ্টভাবে জানানো নাও হতে পারত। পরে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং সাক্ষ্যের সম্পাদিত বিবরণ জানানো হতো। ফলে মানুষকে কখনো অনুমান করতে হতো, কোন ঘটনা আদালতের সন্দেহ তৈরি করেছে। অভিযোগের বিস্তারিত না জেনে নিজের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার চাপ বিচারব্যবস্থার মৌলিক অসমতা বাড়াত। কেউ ভয় পেয়ে অপ্রাসঙ্গিক ঘটনা বলতেন, কেউ আদালতের প্রত্যাশিত উত্তর বুঝতে চেষ্টা করতেন। এসব বক্তব্যকে নিছক স্বতঃস্ফূর্ত সত্যকথন হিসেবে পড়া যায় না।

আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগ একেবারেই ছিল না—এ কথাও সঠিক নয়। আইনজীবীর সহায়তা, অনুকূল সাক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত শত্রুদের তালিকা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আইনজীবীর স্বাধীনতা সীমিত ছিল এবং অভিযুক্ত সব সাক্ষীর মুখোমুখি হয়ে তাঁদের জেরা করতে পারতেন না। মিথ্যা সাক্ষ্যের শাস্তিও ছিল, যদিও তা গোপনীয়তার ক্ষতি দূর করেনি। নির্দোষ ঘোষণার পাশাপাশি মামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তও হতো। স্থগিত মামলা পূর্ণ অব্যাহতির সমার্থক ছিল না; নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তদন্ত আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা থাকত।

নির্যাতন ব্যবহার করা হতো স্বীকারোক্তি বা অতিরিক্ত তথ্য আদায়ের জন্য, কিন্তু প্রত্যেক বন্দি নির্যাতিত হতেন না এবং অপরাধ অস্বীকার করলেই নির্যাতন অনিবার্য ছিল না। এর অনুমোদন ও প্রয়োগের আনুষ্ঠানিক নিয়ম ছিল। প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে দড়ি দিয়ে শরীরে চাপ সৃষ্টি, ঝুলিয়ে রাখা এবং পানি ব্যবহার করে শ্বাসকষ্ট ঘটানোর ব্যবস্থা ছিল। নথিতে কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব আনুষ্ঠানিকতা পদ্ধতিগুলোকে মানবিক করেনি। গুরুতর যন্ত্রণা, স্থায়ী আঘাত ও আতঙ্কের ঝুঁকি বাস্তব ছিল।

নিয়ম অনুযায়ী নির্যাতনের সময় দেওয়া স্বীকারোক্তি পরে নির্যাতনকক্ষের বাইরে নিশ্চিত করতে হতো। কিন্তু যিনি জানেন আবার যন্ত্রণা দেওয়া হতে পারে, তাঁর পুনঃস্বীকার কতটা স্বাধীন—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। জবরদস্তির মুখে মানুষ সত্য, অনুমান এবং তদন্তকারীর প্রত্যাশা মিশিয়ে বলতে পারেন। তাই স্বীকারোক্তির নথি অপরাধের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রমাণ নয়। একইভাবে নির্যাতন তৎকালীন ধর্মনিরপেক্ষ আদালতেও ব্যবহৃত হতো বলে ইনকুইজিশনের দায় কমে না। তুলনা ইতিহাস বোঝায় সাহায্য করে; নির্যাতনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে না।

শাস্তির অধিকাংশ ধরন মৃত্যুদণ্ড ছিল না। সতর্কীকরণ, ধর্মীয় শিক্ষা, বিশ্বাসসংক্রান্ত বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রার্থনা, জরিমানা, নির্বাসন, কারাবাস এবং কিছু অপরাধে গ্যালি জাহাজে বাধ্যতামূলক শ্রমের দণ্ড দেওয়া হতো। পুনর্মিলনের মাধ্যমে অভিযুক্তকে গির্জার মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। সানবেনিতো পরিধান বা দণ্ডের পরিচয় প্রকাশ সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করত। কিছু ক্ষেত্রে সেই কলঙ্ক উত্তরসূরিদের সুযোগেও প্রভাব ফেলত। ফলে মৃত্যুদণ্ড এড়ানো মানেই আগের জীবন ফিরে পাওয়া ছিল না; অর্থনৈতিক ও সামাজিক শাস্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারত।

অটো-দা-ফে কথাটির অর্থ বিশ্বাসের অনুষ্ঠান বা বিশ্বাসের কার্য। এর কেন্দ্রে ছিল ধর্মীয় শোভাযাত্রা, উপদেশ, অনুতাপ এবং দণ্ডের প্রকাশ্য ঘোষণা। অটো-দা-ফে নিজে আগুনে মানুষ পোড়ানোর নাম নয়। সেখানে উপস্থিত দণ্ডপ্রাপ্তদের সবাই মৃত্যুদণ্ড পেতেন না, এবং সব মামলার নিষ্পত্তিও বিশাল জনসমাবেশে হতো না। বড় অনুষ্ঠানগুলো ছিল ব্যয়বহুল ক্ষমতা প্রদর্শন। ১৬৮০ সালের ৩০ জুন মাদ্রিদের প্লাসা মায়োরে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত অটো-দা-ফে দেখায়, বিচার কীভাবে রাজকীয় ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রকাশ্য দৃশ্যে পরিণত হয়েছিল।

মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিকে ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের হাতে সমর্পণ করা হতো। সাধারণত অনুতাপহীন ধর্মদ্রোহী এবং আগে সংশোধিত হওয়ার পর পুনরায় ধর্মদ্রোহে অভিযুক্তদের ঝুঁকি বেশি ছিল। মৃত্যুদণ্ড আলাদা স্থানে কার্যকর হতো; সব ক্ষেত্রে জীবন্ত দহনও ঘটত না। কোনো কোনো অনুতপ্ত দণ্ডিতকে আগে শ্বাসরোধে হত্যা করে পরে দেহ পোড়ানো হতো। দণ্ড কার্যকর করত অন্য কর্তৃপক্ষ—এই বিভাজন ইনকুইজিশনের বিচারিক দায় দূর করে না। ধর্মীয় আদালতের সিদ্ধান্তই প্রাণঘাতী প্রক্রিয়াটি চালু করত।

মৃত্যুর সংখ্যা বোঝার সময় জীবিত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড এবং প্রতিকৃতি দহনের হিসাব আলাদা করা জরুরি। পলাতক বা মৃত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে প্রতীকী দণ্ড কার্যকর হতে পারত; সেটিকে নতুন প্রাণহানি হিসেবে যোগ করলে সংখ্যা ভুল হয়। আধুনিক গবেষণায় মোট মৃত্যুদণ্ড কয়েক হাজারের পর্যায়ে অনুমান করা হয়, প্রায়ই তিন থেকে পাঁচ হাজারের সীমা আলোচিত হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের নথি অসম্পূর্ণ এবং গবেষণার ভৌগোলিক পরিসরও ভিন্ন। পরবর্তী সময়ের কম মৃত্যুদণ্ডের হার দিয়ে প্রতিষ্ঠার প্রথম কয়েক দশকের তীব্রতা বিচার করা যায় না।

ইনকুইজিশনের প্রকৃত ইতিহাস তাই অতিরঞ্জিত নিষ্ঠুরতার দৃশ্য কিংবা আত্মপক্ষসমর্থনমূলক পরিসংখ্যানের একটিতে আটকে থাকে না। অভিযোগ যাচাইয়ের নিয়ম ছিল, তবু গোপনীয়তা আত্মরক্ষাকে দুর্বল করত; রায়ের ভিন্নতা ছিল, তবু ধর্মীয় মতভেদ অপরাধ হয়ে থাকত। নির্যাতন সর্বজনীন ছিল না, কিন্তু তার হুমকিও মানুষকে ভাঙতে পারত। এই বিচারব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি বুঝতে মৃত্যুর পাশাপাশি কারাবাস, সম্পদহানি ও সামাজিক কলঙ্ক দেখতে হয়। বিশ্বাসকে অপরাধের বিষয় বানিয়ে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব যখন একসঙ্গে বিচার করে, তখন ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতাই প্রথম অনিরাপদ হয়ে পড়ে।