বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফরাসি বিপ্লবের সন্ত্রাসের রাজত্ব: রোবসপিয়ের, ভঁদে বিদ্রোহ ও গিলোটিন

সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব

ফরাসি বিপ্লবের সন্ত্রাসের রাজত্ব: রোবসপিয়ের, ভঁদে বিদ্রোহ ও গিলোটিন
প্রজাতন্ত্র রক্ষার জরুরি ক্ষমতা যখন বিচার, স্বাধীনতা ও জীবনের ওপর চেপে বসল।

জিরোন্দিনদের পতনের পর প্রজাতন্ত্র রক্ষার নামে জরুরি ক্ষমতা বিস্তারের যে পথ খুলেছিল, ১৭৯৩ সালের দ্বিতীয়ার্ধে তা আরও কঠোর হয়ে ওঠে। সীমান্তে বিদেশি সেনা, দেশের ভেতরে বিদ্রোহ, বাজারে খাদ্যসংকট এবং রাজধানীতে রাজনৈতিক সংঘর্ষ—সবকিছু মিলিয়ে বিপ্লবী নেতৃত্ব রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই বিপন্ন মনে করছিল। এই সংকটের মধ্যে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসের রাজত্বে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক, বিশেষ আদালতে বিচার এবং দ্রুত মৃত্যুদণ্ড রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

সন্ত্রাসের রাজত্বকে সাধারণত ১৭৯৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৭৯৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এর প্রতিষ্ঠান ও দমনপদ্ধতি আরও আগে তৈরি হচ্ছিল। বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয় মার্চে; জননিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয় ৬ এপ্রিল। আবার রোবসপিয়েরের পতনের পরও সহিংসতা সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি। তাই নির্দিষ্ট তারিখের পাশাপাশি প্রক্রিয়াটি বোঝা জরুরি: বিপ্লব রক্ষার ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা ক্রমে স্বাভাবিক আইনি সুরক্ষাকে সরিয়ে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ হয়ে যায়।

জননিরাপত্তা কমিটি ছিল জাতীয় কনভেনশনের নির্বাচিত একটি কমিটি, যার সদস্যপদ নিয়মিত নবায়নের বিধান ছিল। যুদ্ধ পরিচালনা, কূটনীতি, সরবরাহ এবং নির্বাহী তদারকিতে এর ক্ষমতা বাড়ে। দান্তোঁ প্রথম পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন; রোবসপিয়ের যোগ দেন ১৭৯৩ সালের ২৭ জুলাই। কার্নো সামরিক সংগঠনে, সাঁ-জুস্ত রাজনৈতিক ও সামরিক তদারকিতে এবং অন্য সদস্যরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতেন। ফলে কমিটিকে রোবসপিয়েরের ব্যক্তিগত দপ্তর হিসেবে দেখলে ক্ষমতার প্রকৃত কাঠামো বোঝা যায় না।

দমনব্যবস্থায় সাধারণ নিরাপত্তা কমিটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পুলিশি নজরদারি, গ্রেপ্তার এবং সন্দেহভাজনদের বিষয়ে তার ভূমিকা ছিল ব্যাপক। স্থানীয় বিপ্লবী কমিটি এবং প্রদেশে পাঠানো কনভেনশনের প্রতিনিধিরাও ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। কখনো তাঁদের মধ্যে সহযোগিতা, কখনো বিরোধ তৈরি হতো। সন্ত্রাস ছিল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত, স্থানীয় উদ্যোগ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতার সম্মিলিত ফল। রোবসপিয়ের প্রভাবশালী হলেও ফ্রান্সের প্রতিটি গ্রেপ্তার বা হত্যার নির্দেশ তাঁর কাছ থেকে আসেনি।

১৭ সেপ্টেম্বর ১৭৯৩ সালের সন্দেহভাজন আইন আটকের পরিধি বিস্তৃত করে। আচরণ, যোগাযোগ, বক্তব্য কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাউকে বিপ্লবের বিরোধী মনে করার সুযোগ তৈরি হয়। সাবেক অভিজাত, শপথপ্রত্যাখ্যানকারী যাজক এবং অবিশ্বস্ত বিবেচিত ব্যক্তিরা বিশেষ ঝুঁকিতে পড়েন। কিন্তু আটক সবাই মৃত্যুদণ্ড পাননি; অনেকে দীর্ঘদিন বিচার ছাড়াই বন্দি ছিলেন। সমস্যাটি ছিল, অপরাধের নির্দিষ্ট প্রমাণের বদলে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্রমে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রধান শর্ত হয়ে উঠছিল।

একই সময়ে সরকার শুধু দমন চালায়নি; যুদ্ধ ও অর্থনীতি সংগঠিত করার ব্যাপক উদ্যোগও নেয়। আগস্টের গণসমাবেশমূলক সৈন্যসংগ্রহ রাষ্ট্রের জনবল বাড়ায়। সেপ্টেম্বরে সাধারণ সর্বোচ্চ মূল্য আইন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও মজুরি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এসব ব্যবস্থা সাঁ-কুলোতদের কিছু দাবি পূরণ করলেও বাস্তবায়নে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ১৭৯৩ সালের গণতান্ত্রিক সংবিধান অনুমোদিত হলেও কার্যকর করা হয়নি; যুদ্ধশেষ পর্যন্ত বিপ্লবী সরকার চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঘোষিত স্বাধীনতা তাই জরুরি শাসনের অধীনে স্থগিত থাকে।

এই রাষ্ট্রসংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষেত্র ছিল পশ্চিম ফ্রান্সের ভঁদে ও আশপাশের অঞ্চল। মার্চ ১৭৯৩ সালে সৈন্যসংগ্রহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বৃহৎ বিদ্রোহে রূপ নেয়। এর পেছনে গির্জার সংস্কার, পরিচিত যাজকদের অপসারণ, স্থানীয় ক্ষোভ এবং নতুন প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাস কাজ করেছিল। সব কৃষক একই উদ্দেশ্যে লড়েননি, আর সবাই বিদ্রোহেও যোগ দেননি। তবে বিদ্রোহী বাহিনী ক্রমে রাজতন্ত্র ও ক্যাথলিক ধর্মরক্ষার পরিচয় ধারণ করে; অভিজাত সামরিক নেতারাও এতে যুক্ত হন।

বিদ্রোহীরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেলেও অক্টোবরের শোলে যুদ্ধ এবং ডিসেম্বরের ল্য মান ও সাভেনে পরাজয়ে তাঁদের বড় অভিযান ভেঙে পড়ে। কিন্তু সংগঠিত বাহিনীর পরাজয় শান্তি আনেনি। প্রজাতন্ত্রী নেতৃত্বের একটি অংশ পুরো এলাকাকে বিদ্রোহের সামাজিক ভিত্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে। সশস্ত্র প্রতিপক্ষ দমন এবং সাধারণ অধিবাসীদের শাস্তি দেওয়ার সীমা ভেঙে যায়। বিদ্রোহীদের হাতেও বন্দি ও বেসামরিক মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটে; গৃহযুদ্ধ প্রতিশোধকে আরও নির্মম করে তোলে।

১৭৯৪ সালের শুরুতে জেনারেল তুরোর অধীনে পরিচালিত তথাকথিত ‘নরকীয় কলাম’ গ্রাম ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ এবং নির্বিচার হত্যার জন্য কুখ্যাত হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাও সহিংসতার শিকার হন। নঁতে কনভেনশনের প্রতিনিধি জঁ-বাতিস্ত কারিয়েরের কর্তৃত্বকালে বন্দিদের ডুবিয়ে হত্যাসহ নৃশংস দমন চলে। ভঁদের যুদ্ধের মোট মৃত্যুসংখ্যা নির্ধারণ কঠিন; যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড, রোগ ও অনাহার মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতি ছিল বিপুল। এসব মৃত্যু গিলোটিনের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

লিয়োঁতেও বিদ্রোহ দমনের পর গুলি করে এবং গিলোটিনে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। প্যারিসের বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল রাজনৈতিক বিচারের দৃশ্যমান কেন্দ্র হলেও প্রাদেশিক আদালত ও সামরিক কমিশন বিপুলসংখ্যক দণ্ড দেয়। সন্ত্রাসের সময় আদালত ও কমিশনের রায়ে প্রায় সতেরো হাজার মৃত্যুদণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে; কারাগারে মৃত্যু এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মোট সংখ্যা আরও বেশি। নিহতদের সবাই অভিজাত ছিলেন না—সাধারণ কৃষক, কারিগর ও শ্রমজীবী মানুষও বড় অংশ জুড়ে ছিলেন।

রোবসপিয়ের এই কঠোরতার পক্ষে যুক্তি দেন প্রজাতন্ত্রের নৈতিকতা ও নিরাপত্তার ভাষায়। তাঁর ধারণায় সৎ নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষা করতে ষড়যন্ত্রকারী ও নিপীড়কের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার দরকার। কিন্তু ‘জনগণের শত্রু’ নির্ধারণের পরিধি যত বাড়ে, সেই যুক্তি তত বিপজ্জনক হয়। রাজনৈতিক আপসকে দুর্নীতি এবং মতভেদকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা বিরোধীদের নিরাপত্তা নষ্ট করে। নৈতিক শুদ্ধতার দাবি এমন ব্যবস্থাকে বৈধতা দিতে থাকে, যেখানে আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগই সংকুচিত হচ্ছিল।

১৭৯৪ সালের মার্চে এবের ও তাঁর সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; এপ্রিলে দান্তোঁ, কামিয় দেমুলাঁ এবং তাঁদের সহযোগীরাও গিলোটিনে প্রাণ হারান। ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের এই গোষ্ঠীগুলোকে দমনের ফলে বিপ্লবী নেতৃত্বের ভেতরে বিরোধ প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়। ১০ জুনের ২২ প্রেরিয়ালের আইন ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করে, প্রতিরক্ষার সুযোগ কমায় এবং খালাস বা মৃত্যুদণ্ডকে প্রধান বিকল্পে পরিণত করে। এরপর প্যারিসে মৃত্যুদণ্ডের গতি দ্রুত বাড়ে।

অথচ জুনের শেষদিকে ফ্ল্যরুসের বিজয়সহ সামরিক সাফল্য বহিঃশত্রুর তাৎক্ষণিক হুমকি কমাচ্ছিল। তখন প্রশ্ন আরও তীব্র হয়: যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভালো হলে রাজধানীতে দমন কেন বাড়ছে? কমিটিগুলোর বিরোধ, প্রতিনিধিদের আত্মরক্ষার ভয় এবং রোবসপিয়েরের অভিযোগ রাজনৈতিক জোটকে ভেঙে দেয়। প্রজাতন্ত্র রক্ষার জন্য গড়া ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের নিজস্ব নেতাদেরও অনিরাপদ করে তুলেছিল। ১৭৯৪ সালের জুলাইয়ে সেই ভয় একত্র হয়ে রোবসপিয়েরের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াবে—এবং থার্মিদরের ক্ষমতার পরিবর্তন সন্ত্রাসের রাজত্বের নতুন পরিণতি নির্ধারণ করবে।