বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সিউলের পতন ও পাল্টা আক্রমণ: ১৯৫১ সালে যুদ্ধ যেভাবে আবার ৩৮তম সমান্তরালে ফিরে আসে

সিরিজ: কোরীয় যুদ্ধ

সিউলের পতন ও পাল্টা আক্রমণ: ১৯৫১ সালে যুদ্ধ যেভাবে আবার ৩৮তম সমান্তরালে ফিরে আসে
সিউল পুনর্দখল ও স্থির হয়ে আসা রণাঙ্গন

১৯৫০ সালের শেষভাগে কোরীয় যুদ্ধের গতিপথ দ্বিতীয়বারের মতো নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ইনচন অবতরণ ও সিউল পুনর্দখলের পর জাতিসংঘ বাহিনী দ্রুত উত্তর কোরিয়ার গভীরে অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু ইয়ালু নদীর কাছে পৌঁছানোর সময় চীনের বিপুলসংখ্যক সেনা গোপনে যুদ্ধে প্রবেশ করে। নভেম্বরের শেষদিকে চীনা পাল্টা আক্রমণে পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন অষ্টম সেনাবাহিনী এবং পূর্বাঞ্চলে চোসিন জলাধারের কাছে অবস্থানরত বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। পিয়ংইয়ং পরিত্যক্ত হয়, হুংনাম বন্দর দিয়ে সেনা ও শরণার্থীদের সরিয়ে নেওয়া হয় এবং জাতিসংঘ বাহিনী আবার দক্ষিণমুখী হয়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আশা ভেঙে পড়ে; এবার দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল আবারও সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে।

চীনা পিপলস ভলান্টিয়ার আর্মি ও পুনর্গঠিত উত্তর কোরীয় বাহিনী ডিসেম্বরজুড়ে দক্ষিণে অগ্রসর হতে থাকে। তাদের কৌশল ছিল রাতে পাহাড়ি পথ ধরে অনুপ্রবেশ করা, জাতিসংঘ বাহিনীর দুই পাশ ঘুরে যোগাযোগপথ আক্রমণ করা এবং সামনের অবস্থানগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। ভারী অস্ত্র ও আকাশশক্তিতে দুর্বল হলেও চীনা বাহিনী জনবল, গোপন চলাচল এবং আকস্মিক রাতের আক্রমণ কাজে লাগাচ্ছিল। বিপরীতে জাতিসংঘ বাহিনীর মনোবল নেমে গিয়েছিল। অনেক ইউনিট চীনা শক্তির প্রকৃত আকার সম্পর্কে বিভ্রান্ত ছিল এবং নতুন করে ঘেরাও হওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত পিছু হটছিল।

এই সংকটের মধ্যে ২৩ ডিসেম্বর মার্কিন অষ্টম সেনাবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়ালটন ওয়াকার একটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ম্যাথিউ রিজওয়ে। তিনি কোরিয়ায় এসে দেখেন, বাহিনীটি অস্ত্র ও রসদের দিক থেকে শক্তিশালী হলেও মানসিকভাবে প্রতিরক্ষামুখী এবং পরাজয়ের আশঙ্কায় জর্জরিত। রিজওয়ে দ্রুত সম্মুখসারি পরিদর্শন করেন, অধিনায়কদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রতিটি ইউনিটকে নিজেদের দুই পাশের বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার নির্দেশ দেন। তিনি নির্বিচারে ভূখণ্ড ধরে রাখার বদলে শত্রুর জনবল ও সরঞ্জাম ধ্বংসকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেন।

১৯৫০ সালের শেষ রাতে চীনা ও উত্তর কোরীয় বাহিনী তাদের তৃতীয় পর্যায়ের অভিযান শুরু করে। প্রধান আঘাত পড়ে ৩৮তম সমান্তরালের কাছে অবস্থানরত দক্ষিণ কোরীয় ইউনিটগুলোর ওপর। কিছু প্রতিরক্ষাস্থল দ্রুত ভেঙে গেলে জাতিসংঘ বাহিনীর সম্মুখসারিতে বড় ফাঁক সৃষ্টি হয়। চীনা সেনারা এই ফাঁক দিয়ে দক্ষিণে প্রবেশ করে এবং সিউলের উত্তর ও পূর্বদিকের পথগুলো হুমকির মুখে ফেলে। শহরটি ধরে রাখার চেষ্টা করলে বাহিনী ঘেরাও হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় রিজওয়ের অধীন কমান্ডাররা সুশৃঙ্খলভাবে হান নদীর দক্ষিণে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৫১ সালের ৪ জানুয়ারি সিউল আবার চীনা ও উত্তর কোরীয় বাহিনীর দখলে চলে যায়। কোরীয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি ছিল রাজধানীটির তৃতীয়বার হাতবদল—১৯৫০ সালের জুনে উত্তর কোরিয়ার দখল, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ বাহিনীর পুনর্দখল এবং এবার চীনা অভিযানের পর আবার পতন। সরকার ও সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি অসংখ্য বেসামরিক মানুষ তীব্র শীতের মধ্যে দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যায়। হান নদীর সেতুগুলোর ক্ষতি ও যানবাহনের ভিড় তাদের যাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে। পরিবারগুলো সামান্য খাবার ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে বরফঢাকা পথে হাঁটতে বাধ্য হয়।

সিউলের পতন আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধাক্কা সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্রে আশঙ্কা দেখা দেয় যে জাতিসংঘ বাহিনী হয়তো আবার পুসান পর্যন্ত পিছু হটবে অথবা পুরো কোরিয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং সংঘাতকে চীনের ভূখণ্ডে বিস্তৃত করার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। কিন্তু রণাঙ্গনের বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে রিজওয়ে বুঝতে পারেন, চীনা অগ্রযাত্রা অপরাজেয় নয়। চীনা সেনারা দীর্ঘ দূরত্বে পায়ে হেঁটে খাদ্য ও গোলাবারুদ বহন করছিল। জাতিসংঘের বিমান হামলায় দিনের বেলা তাদের চলাচল সীমিত ছিল এবং কয়েক দিন তীব্র আক্রমণের পর রসদের ঘাটতিতে তাদের গতি কমে যেত।

রিজওয়ে এই সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধ পুনর্গঠন করেন। তিনি ইউনিটগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে সড়কের পাশে না রেখে পরস্পরকে সহায়তা করতে পারে এমন অবস্থানে মোতায়েন করেন। গোলন্দাজ বাহিনী, ট্যাংক ও বিমানশক্তির সমন্বিত ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়। রাতের আক্রমণের সময় অযথা অবস্থান ছেড়ে না দিয়ে পূর্বনির্ধারিত প্রতিরক্ষাব্যূহ, আলোকসজ্জা ও ঘন গোলাবর্ষণ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আহত সরিয়ে নেওয়া, গরম খাবার, শীতবস্ত্র এবং অধিনায়কদের সম্মুখসারিতে উপস্থিতির মাধ্যমে সেনাদের মনোবল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। রিজওয়ের নেতৃত্বে অষ্টম সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে পিছু হটা একটি বাহিনী থেকে পরিকল্পিত পাল্টা আক্রমণে সক্ষম বাহিনীতে পরিণত হয়।

জানুয়ারির মাঝামাঝি সীমিত অনুসন্ধানী অভিযানে দেখা যায়, চীনা বাহিনী সিউলের দক্ষিণে প্রত্যাশিত শক্তিতে অবস্থান করছে না। ২৫ জানুয়ারি অপারেশন থান্ডারবোল্ট শুরু হয়। এটি দ্রুত রাজধানীর দিকে ছুটে যাওয়ার অভিযান ছিল না; বরং প্রতিদিন সতর্কভাবে অগ্রসর হয়ে শত্রুর অবস্থান শনাক্ত ও ধ্বংস করার পরিকল্পনা ছিল। পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন প্রথম ও নবম কোর ট্যাংক, পদাতিক, কামান ও বিমান সহায়তা নিয়ে উত্তরমুখী হয়। প্রতিটি পাহাড় ও গ্রাম দখলের পর যোগাযোগব্যবস্থা নিরাপদ করা হতো, যাতে চীনা সেনারা পেছনে ঢুকে সরবরাহপথ কেটে দিতে না পারে।

ফেব্রুয়ারির শুরুতে মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে অপারেশন রাউন্ডআপ শুরু হয়। এর জবাবে চীনা ও উত্তর কোরীয় বাহিনী হোয়েংসং এলাকায় শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণ চালায়। দক্ষিণ কোরীয় কয়েকটি ইউনিট গুরুতর ক্ষতির শিকার হয় এবং তাদের সহায়তায় থাকা মার্কিন বাহিনীকেও কঠিন পরিস্থিতিতে পিছু হটতে হয়। কিন্তু চিপইয়ং-নি এলাকায় চীনা আক্রমণ থামিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ঘেরাও হয়ে পড়া মার্কিন ও ফরাসি সেনারা কয়েক দিন ধরে বৃত্তাকার প্রতিরক্ষা বজায় রাখে। বিমান থেকে রসদ, ঘন গোলন্দাজ সহায়তা এবং সাঁজোয়া বাহিনীর সহায়তায় তারা অবস্থান ধরে রাখে। চিপইয়ং-নির প্রতিরোধ প্রমাণ করে যে সুশৃঙ্খল প্রতিরক্ষা ও সমন্বিত অগ্নিশক্তির সামনে চীনা আক্রমণ পরাজিত করা সম্ভব।

এরপর রিজওয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি অপারেশন কিলার এবং ৭ মার্চ অপারেশন রিপার শুরু করেন। নামগুলো আক্রমণাত্মক হলেও উদ্দেশ্য ছিল তাড়াহুড়ো করে ভূখণ্ড দখল না করে চীনা ও উত্তর কোরীয় বাহিনীকে ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতির মুখে ফেলা। জাতিসংঘ বাহিনী হান নদীর দিকে এগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও উচ্চভূমি দখল করে। সিউলে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ায় চীনা ও উত্তর কোরীয় বাহিনী শহর ছেড়ে উত্তরে সরে যায়। ১৪ মার্চ রাতে তাদের প্রত্যাহার স্পষ্ট হয় এবং ১৫ মার্চ দক্ষিণ কোরীয় ও জাতিসংঘ সেনারা ব্যাপক নগরযুদ্ধ ছাড়াই সিউলে প্রবেশ করে।

সিউল পুনর্দখল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয় ছিল, কিন্তু শহরটি তখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বারবার দখল, গোলাবর্ষণ, অগ্নিকাণ্ড এবং জনসংখ্যার স্থানান্তরে স্বাভাবিক জীবন ভেঙে পড়েছিল। বহু ভবন ধ্বংস হয়, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায় এবং রাস্তায় যুদ্ধের চিহ্ন ছড়িয়ে ছিল। রাজধানী ফিরে পাওয়া মানেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়া নয়—এ কথা রিজওয়ে ভালোভাবে বুঝতেন। তাই বাহিনী সিউলে থেমে না থেকে উত্তর দিকে এগিয়ে ৩৮তম সমান্তরালের কাছাকাছি প্রতিরক্ষাযোগ্য পাহাড়ি রেখা দখল করতে থাকে।

এই পর্যায়ে জেনারেল ম্যাকআর্থার ও প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়। ম্যাকআর্থার চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিস্তৃত করা, চীনা ভূখণ্ডে হামলা এবং তাইওয়ানের জাতীয়তাবাদী বাহিনীকে ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। ট্রুম্যান প্রশাসন আশঙ্কা করছিল, এতে সোভিয়েত ইউনিয়ন জড়িয়ে পড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে পারে। প্রকাশ্যে প্রশাসনের নীতির বিরোধিতা ও বেসামরিক কর্তৃত্ব অমান্যের অভিযোগে ১১ এপ্রিল ম্যাকআর্থারকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। তাঁর স্থলে ম্যাথিউ রিজওয়ে জাতিসংঘ কমান্ডের সর্বাধিনায়ক হন এবং জেনারেল জেমস ভ্যান ফ্লিট অষ্টম সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন।

এপ্রিলের শেষদিকে চীন আবার ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। চীনা বসন্তকালীন অভিযান নামে পরিচিত এই পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক সেনা সিউলের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। ইমজিন নদীর যুদ্ধে ব্রিটিশ ২৯তম ব্রিগেড প্রবল চাপের মুখে পড়ে; গ্লস্টারশায়ার রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়ন প্রায় ঘেরাও হয়ে যায়। কাপিয়ং অঞ্চলে অস্ট্রেলীয় ও কানাডীয় সেনারা গুরুত্বপূর্ণ উপত্যকার পথ রক্ষা করে। জাতিসংঘ বাহিনী কিছু এলাকায় পিছু হটলেও এবার ১৯৫০ সালের মতো ভেঙে পড়েনি। পূর্বনির্ধারিত অবস্থানে সরে গিয়ে কামান ও বিমানশক্তি ব্যবহার করে তারা চীনা আক্রমণের গতি থামিয়ে দেয়।

মে মাসে চীনা বাহিনী পূর্ব-মধ্যাঞ্চলে আরেকটি শক্তিশালী আক্রমণ চালায়। কিছু দক্ষিণ কোরীয় ইউনিট পিছিয়ে পড়লেও মার্কিন ও জাতিসংঘ বাহিনী দ্রুত ফাঁক বন্ধ করে পাল্টা আঘাত হানে। চীনা সেনারা আবারও সরবরাহসংকট ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। মে মাসের শেষদিকে জাতিসংঘ বাহিনী উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধরেখাকে ৩৮তম সমান্তরালের আশপাশে এবং কিছু স্থানে তার উত্তরে নিয়ে যায়। কিন্তু এবার রাজনৈতিক নেতৃত্ব উত্তর কোরিয়ার গভীরে আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে আগ্রহী ছিল না।

১৯৫১ সালের মাঝামাঝি এসে কোরীয় যুদ্ধের দ্রুত অগ্রযাত্রা ও পশ্চাদপসরণের পর্যায় কার্যত শেষ হয়। উত্তর কোরিয়ার প্রাথমিক আক্রমণ, ইনচনের পাল্টা আঘাত, ইয়ালুমুখী জাতিসংঘ অগ্রযাত্রা এবং চীনা হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধ আবার প্রায় সেই বিভাজনরেখার কাছেই ফিরে আসে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ পরাজিত করার মতো সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। সিউল দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে থাকলেও সামনে ছিল পাহাড়ি অবস্থানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ স্থবির যুদ্ধ। এভাবেই ১৯৫১ সালের পাল্টা আক্রমণ দক্ষিণ কোরিয়াকে আবার রক্ষা করে, কিন্তু কোরীয় উপদ্বীপকে একত্র করার পরিবর্তে তার বিভাজনকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে।


আপনার পছন্দ হতে পারে